আল জাজিরা, রয়টার্স, আল-আরাবিয়া : ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার দেইর আল-বালাহ শহরে পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল শনিবার সকাল থেকে শুরু হয় ভোট গ্রহণ। গাজায় সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ২০০৬ সালের ২৫ জানুয়ারি। সেই নির্বাচনে জিতেই উপত্যকায় ক্ষমতাসীন হয়েছিল সশস্ত্র ইসলামি রাজনৈতিক গোষ্ঠী হামাস। তবে ক্ষমতায় যাওয়ার পর প্রথমেই প্রতিপক্ষ ফাতাহ-কে গাজা থেকে উচ্ছেদ করে হামাস। ফাতাহ পশ্চিম তীরে ক্ষমতাসীন এবং ফিলিস্তিনের বৈধ সরকার হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) জোটের অন্যতম শরিক দল। ২০০৭ সালে ফাতাহকে বিতাড়িত করার পর অলিখিতভাবে গাজায় সব ধরনের নির্বাচন বন্ধ করে দিয়েছিল হামাস। ২০০৬ সালের পর থেকে পরবর্তী ২০ বছর আক্ষরিক অর্থেই কোনো নির্বাচন হয়নি উপত্যকায়।
২০২৩ সালের ইসরায়েলে হামাসের অতর্কিত হামলা এবং তার জবাবে ২ বছর ধরে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর ভয়াবহ সামরিক অভিযান চলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাব মেনে নিয়ে ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে হামাস এবং ইসরায়েল। যুদ্ধবিরতিতে যাওয়ার পাশাপাশি গাজার ক্ষমতাও ছাড়তে হয় হামাসকে; কারণ ট্রাম্পের প্রস্তাবের একটি পয়েন্টে উল্লেখ করা ছিল যে হামাসকে অবশ্যই ক্ষমতা ছাড়তে হবে এবং নির্বাচিত সরকার আসার আগ পর্যন্ত গাজার শাসনক্ষমতা থাকবে একটি অরাজনৈতিক টেকনোক্র্যাট সরকার। কয়েক মাস আগে সেই টেকনোক্র্যাট সরকার গঠিতও হয়েছে। সেই সরকারের অধীনেই হচ্ছে এই নির্বাচন। পশ্চিম তীরে ক্ষমতাসীন পিএ জোট এই নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে গাজার রাজনীতিতে ফের নিজের জায়গা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছে। ইউরোপ এবং মধ্যপ্রচ্যের অনেক দেশের সরকার গাজার এই স্থানীয় নির্বাচনের পূর্ণ প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তাদের মতে, ফিলিস্তিনে একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকলে পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালের ও গাজা উপত্যকার সমন্বয়ে প্রস্তাবিত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের গঠন প্রক্রিয়া এবং ফিলিস্তিনের জনগণের স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম আরও গতিশীল হবে। পশ্চিমা কূটনীতিকদের মতে, দেইর আল বালাহের নির্বাচন যদি সফল হয়— তাহলে তা পুরো গাজায় নির্বাচনের পরিস্থিতি সৃষ্ট করবে এবং দুই দশক পর গাজায় একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার সম্ভাবনাকে জোরাল করবে।
গাজায় ক্ষমতাসীন টেকনোক্র্যাট সরকারের নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুরো গাজা উপত্যকায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আয়োজন করতে চেয়েছিলেন তারা; কিন্তু ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানে গাজার শহরগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এবং এখনও জঞ্জাল পরিষ্কার না হওয়ায় আপাতত দেইর আল-বালাহ শহরেই নির্বাচনের আয়োজন করা হয়েছে। ইসরায়েলি অভিযানে অন্যান্য শহরের তুলনায় এই শহরটিতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কম। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেইর আল-বালাহের পৌর নির্বাচনে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ৭০ হাজার ৪৪৯ জন। শহরজুড়ে মোট ১২টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ চলছে; এসব ভোট কেন্দ্রের বেশিরভাগই জাতিসংঘের সহায়তায় তাবু স্থাপন করে তৈরি করা হয়েছে। গাজার সাবেক ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী হামাস অবশ্য এই নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দিয়েছে, তবে হামাসের সঙ্গে কোনো না কোনো ভাবে সম্পর্কিত কয়েক জন ব্যক্তি এই নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন বলে জানিয়েছে ।
দেইর আল-বালাহের সাধারণ ভোটাররা এই নির্বাচনকে স্বাগত জানিয়েছেন। আদহাম আল-বারদিনি নামের এক তরুণী ভোটার এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “আমি জন্মের পর থেকে নির্বাচনের কথা শুধু শুনে এসেছি। আজ নিজের চোখে দেখলাম নির্বাচন ব্যাপারটা আসলে কী।” “আমরা এতে অংশ নিতে আগ্রহী। কারণ যে বাস্তবতা আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে— আমরা তার পরিবর্তন চাই।”
এদিকে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় কথিত যুদ্ধবিরতি উপেক্ষা করে ইসরাইলি বাহিনীর ধারাবাহিক হামলায় অন্তত ১২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার খান ইউনিসে একটি পুলিশ গাড়িকে লক্ষ্য করে চালানো হামলায় অন্তত আটজন নিহত হন, যাদের মধ্যে তিনজন সাধারণ পথচারী ছিলেন। গাজা সিটিতে পৃথক আরেকটি হামলায় নিহত হয়েছেন দুইজন পুলিশ কর্মকর্তা। এ ছাড়া উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ায় একটি বাড়িতে বোমা হামলায় আরও দুজন প্রাণ হারান। গাজার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যাতে তারা হস্তক্ষেপ করে বেসামরিক এলাকায় নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে কাজ করা স্থানীয় পুলিশ বাহিনীর ওপর দখলদার ইসরাইলের হামলা বন্ধ করে।
মন্ত্রণালয় জানায়, খান ইউনিসের হামলাটি ঘটে তখন, যখন নিরাপত্তা বাহিনী একটি সংঘর্ষ থামাতে হস্তক্ষেপ করছিল।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘বেসামরিক পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নীরবতা আসলে ইসরাইলি দখলদার শক্তির সঙ্গে পরোক্ষ সহযোগিতার শামিল, যা তাদের আরও অপরাধে উৎসাহিত করছে।' তারা আরও জোর দিয়ে বলে, ‘গাজার পুলিশ বাহিনী জনগণের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেবা দিয়ে থাকে। তাদের লক্ষ্যবস্তু করা বা হত্যা করার কোনো বৈধতা নেই।'
মন্ত্রণালয়ের দাবি, ইসরাইল পরিকল্পিতভাবে গাজার পুলিশ সদস্যদের হত্যা করছে এবং একই সঙ্গে দখলকৃত এই অঞ্চলে অপরাধী চক্রগুলোর সঙ্গে আঁতাত করছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসনের সময় নিয়মিতভাবে ত্রাণবাহী কাফেলা নিরাপদ রাখতে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। ফলে ত্রাণ লুটপাট বেড়ে যায় এবং অঞ্চলটির খাদ্যসংকট আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও দক্ষিণ লেবাননের গ্রামগুলোতে বাড়িঘর ধ্বংস বন্ধের ব্যাপারে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এখনো কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি। চলমান যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। শুক্রবার এ হামলার ঘটনা ঘটে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, গত শুক্রবার দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ছয়জন নাগরিক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরো দুজন আহত হয়েছেন। বিবৃতিতে জানানো হয়, দক্ষিণ লেবাননের ওয়াদি আল-হুজাইর এলাকায় দুইজন, টাউলিনে দুইজন এবং স্রিফা ও ইয়াতের এলাকায় একজন নিহত হন।
এদিকে, লেবাননে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন (ইউএনআইএফআইএল) জানিয়েছে, গত ২৯ মার্চ তাদের একটি ঘাঁটিতে হামলায় আহত হওয়া এক ইন্দোনেশীয় শান্তিরক্ষী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। প্রাথমিক তদন্তে জাতিসংঘ বলেছে, ওই হামলায় তিনি ইসরায়েলি ট্যাংকের গোলায় নিহত হন। অন্যদিকে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, দক্ষিণ লেবাননের বিন্ত জবেইল শহরে তারা ছয়জনকে হত্যা করেছে, যারা সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সদস্য। তবে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া নিহতদের তথ্য এবং ইসরায়েলের দাবি করা নিহতদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হলে এমন একটি চুক্তি প্রয়োজন, যেখানে স্থায়ীভাবে সংঘাত বন্ধ হবে এবং দক্ষিণ লেবানন থেকে সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে নেওয়া হবে ইসরায়েলি বাহিনীকে।