আল-জাজিরা, বিবিসি, এএফপি, রয়টার্স : ইরানের ড্রোন হামলায় বাহরাইনে একটি পানি শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র–ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের নবম দিন গতকাল রোববার প্রথমবার উপসাগরীয় কোনো দেশে পানি ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টে হামলা হলো।
এ হামলার ঠিক এক দিন আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি একটি অভিযোগ করেন। তিনি দাবি করেন, দক্ষিণ ইরানের কেশম দ্বীপে অবস্থিত একটি পানি শোধনাগারে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে।
গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে আরাগচি লেখেন, (ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টে) হামলার ফলে ৩০টি গ্রামে পানি সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের (এ ধরনের) অবকাঠামোতে হামলা চালানো একটি বিপজ্জনক পদক্ষেপ। এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। এই নজির ইরান নয়, তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
বাহরাইনে হামলার বিষয়ে তেহরান তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে এ ঘটনা উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ, মরু অঞ্চলের এসব দেশ তাদের ব্যবহারের পানির চাহিদার বড় অংশের জন্য শোধনাগারগুলোর ওপর নির্ভরশীল।
উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টগুলো কতটা গুরুত্বপূর্ণ? জ্বালানি ও অন্যান্য বেসামরিক স্থাপনা সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার এই সময়ে অঞ্চলটির পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কি সম্ভব?
ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট কী
ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট মূলত সমুদ্রের লোনাপানিকে সুপেয় পানিতে রূপান্তরিত করে। এই পানি পানের পাশাপাশি সেচ ও শিল্পকারখানায় ব্যবহারের উপযোগী করা হয়।
ডিস্যালিনেশন প্রক্রিয়ায় তাপীয় পদ্ধতি বা মেমব্রেন-ভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সমুদ্রের পানি থেকে লবণ, শৈবাল এবং অন্যান্য দূষক সরিয়ে ফেলা হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে কুয়েত পর্যন্ত উপকূলে ৪০০টির বেশি ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট রয়েছে। এসব প্ল্যান্ট মরুময় এই অঞ্চলে পানির জোগান দিয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি দপ্তরের মতে, এই ব্যবস্থায় পানিকে এমনভাবে উত্তপ্ত করা হয়, যেন তা বাষ্পে পরিণত হয়। এতে অপদ্রব্যগুলো নিচে পড়ে থাকে। এরপর সেই বাষ্পকে পুনরায় তরল করে মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করা হয়।
অন্যদিকে মেমব্রেন-ভিত্তিক ডিস্যালিনেশনে একধরনের বিশেষ অর্ধভেদ্য ছাঁকনি ব্যবহার করা হয়। এই ছাঁকনির মধ্য দিয়ে পানি প্রবাহিত হতে পারলেও লবণ বা অন্যান্য কঠিন বস্তু আটকে যায়।
রিভার্স অসমোসিস মেমব্রেন প্রযুক্তির সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) অধিকাংশ দেশ সাধারণত এই প্রযুক্তি বেশি ব্যবহার করে। কারণ, এতে জ্বালানি সাশ্রয় হয়।
উপসাগরীয় অঞ্চলে কেন গুরুত্বপূর্ণ
শুষ্ক জলবায়ু এবং অনিয়মিত বৃষ্টির কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে পানির তীব্র সংকট রয়েছে। এ অঞ্চলের দেশগুলোতে প্রাকৃতিক মিঠা পানির উৎসও অত্যন্ত সীমিত।
গালফ রিসার্চ সেন্টারের ২০২০ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ অঞ্চলের পানির উৎসের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে ভূগর্ভস্থ পানি এবং লবণমুক্ত করা পানি থেকে।
পানির বহুমুখী চাহিদার চাপে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে পানি সরিয়ে অন্য কাজে ব্যবহার করতে হতে পারে। এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, অঞ্চলটি এমনিতে আমদানি করা খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল। এর ওপর হরমুজ প্রণালির সংকটের কারণে তারা সম্ভাব্য খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিতে রয়েছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যেতে শুরু করেছে। এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের পানির চাহিদা মেটাতে সমুদ্রের পানি শোধনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তবে প্রক্রিয়াটিতে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি খরচ হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে কুয়েত পর্যন্ত বিস্তৃত আরব সাগরের উপকূলে ৪০০টির বেশি ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট রয়েছে। এসব প্ল্যান্ট বিশ্বের পানিশূন্য এই অঞ্চলে পানির জোগান দিয়ে যাচ্ছে।
আরব সেন্টার ওয়াশিংটন ডিসির ২০২৩ সালের একটি গবেষণাপত্র অনুসারে, বিশ্বের মোট পানি শোধনসক্ষমতার প্রায় ৬০ শতাংশই রয়েছে জিসিসিভুক্ত সদস্যদেশগুলোর হাতে। তারা বিশ্বে উৎপাদিত মোট পরিশোধিত পানির প্রায় ৪০ শতাংশ উৎপাদন করে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের সুপেয় পানির প্রায় ৪২ শতাংশ আসে ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট থেকে। কুয়েতে এই হার ৯০ শতাংশ, ওমানে ৮৬ শতাংশ এবং সৌদি আরবে তা ৭০ শতাংশ। তবে (সুপেয় পানির বাইরে) বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় সবচেয়ে বেশি পানি পরিশোধন করে সৌদি আরব।
এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ডিস্যালিনেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে জানান উপসাগরীয় দেশগুলোর পরিবেশবিষয়ক গবেষক নাসের আল সায়েদ।
নাসের আল সায়েদ বলেন, ১৯৩০-এর দশকের শেষের দিকে তেল আবিষ্কৃত হওয়ার পর উপসাগরীয় দেশগুলোতে জনসংখ্যা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়তে থাকে। কিন্তু তখন প্রাকৃতিক মিঠাপানির উৎস অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় বাড়তি চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছিল না।
আল-জাজিরাকে নাসের বলেন, ‘এই সংকট মেটাতে ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টগুলো স্থাপন করা হয়েছিল।’ তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের উন্নয়নে পরিশোধিত পানির অবদানকে প্রায় উপেক্ষা করা হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নাসেরের মতে, পানি শোধনাগারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা বা সেগুলোতে বিঘ্ন ঘটানো হলে তা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধিকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারের মতো ছোট ও তীব্র পানিশূন্য দেশসহ জিসিসিভুক্ত অধিকাংশ দেশের জন্য এই কেন্দ্রগুলো মিঠাপানির প্রধান উৎস। যেহেতু এই পানি মূলত মানুষের পানের কাজে ব্যবহৃত হয়, তাই এর সঙ্গে মানবিক দিকটি গভীরভাবে জড়িত। এই অঞ্চলের স্বাভাবিক জনজীবন বজায় রাখতে এটি অপরিহার্য। এর ফলে এসব স্থাপনায় যেকোনো বিঘ্ন সাধারণ মানুষের ওপর সরাসরি বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।
পারস্য উপসাগরের কেশম দ্বীপসহ নিজেদের আরও কিছু উপকূলীয় এলাকায় ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট রয়েছে ইরানের। তবে ইরানের অনেক নদী ও বাঁধ রয়েছে। তাই উপসাগরীয় অন্যান্য দেশের মতো ইরান এসব প্ল্যান্টের ওপর অতটা নির্ভরশীল নয়।
ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট আক্রান্তের প্রভাব
ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলো সংঘাতের সময় বেশ ঝুঁকিতে পড়ে। ১৯৯০-৯১ সালে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইরাকি বাহিনী কুয়েতের পানি শোধনসক্ষমতা উদ্দেশ্যমূলকভাবে ধ্বংস করে দিয়েছিল। এর ফলে দেশটির পানি সরবরাহব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
পানিবিজ্ঞানী রাহা হাকিমদাভার আল-জাজিরাকে জানান, এসব প্ল্যান্টে হামলার প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদে স্থানীয় খাদ্য উৎপাদনের ওপরও পড়তে পারে। এসব খাদ্য উৎপাদনে মূলত ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা হয়।
কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি এবং আর্থ কমন্সের ডিনদের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হাকিমদাভার বলেন, পানির বহুমুখী চাহিদার চাপে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে পানি সরিয়ে অন্য কাজে ব্যবহার করতে হতে পারে। এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, অঞ্চলটি এমনিতে আমদানি করা খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল। এর ওপর হরমুজ প্রণালির সংকটের কারণে তারা সম্ভাব্য খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিতে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) ২০১০ সালের একটি প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছিল, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর পানির নির্ভরতা ভিন্ন ভিন্ন হলেও অধিকাংশ আরব দেশের জন্য ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট অকেজো হওয়া অন্য যেকোনো শিল্প বা পণ্য হারানোর চেয়ে বেশি ভয়াবহ হতে পারে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর পরিবেশবিষয়ক গবেষক নাসের আল সায়েদের মতে, এই অঞ্চলে কোনো প্ল্যান্ট আক্রান্ত হলে তার প্রভাব কেমন হতে পারে, তা সংশ্লিষ্ট দেশের স্থানীয় পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
নাসের বলেন, সৌদি আরব ডিস্যালিনেশনের ওপর তুলনামূলক কম নির্ভরশীল এবং তাদের ভৌগোলিক আয়তনও অনেক বড়। লোহিত সাগরে অবস্থিত তাদের স্থাপনাগুলো সংকটের সময় সহায়ক হবে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের ২০৩৬ পানিনিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে ৪৫ দিনের পানি মজুত রেখেছে। এর ফলে যেকোনো বিপর্যয় সামাল দেওয়ার মতো আপৎকালীন পরিকল্পনা তাদের রয়েছে।
নাসের বলেন, কাতার, বাহরাইন ও কুয়েতের মতো ছোট দেশে (প্ল্যান্ট আক্রান্ত হওয়ার) প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে। কারণ, তারা ডিস্যালিনেশনের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল এবং তাদের কৌশলগত পানি মজুতও খুব সামান্য।
তবে নাসেরের মতে, সবচেয়ে বড় প্রভাবটি হবে মনস্তাত্ত্বিক। পানি মানুষের জীবনের জন্য অপরিহার্য। তাই পানির সংকটের আশঙ্কা জনমনে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি করতে পারে।
পানির নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত যায়
উপসাগরীয় দেশগুলোতে জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত থাকায় নাসের আল সায়েদ একটি বিষয়ের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর পানির নিরাপত্তাকে প্রতিটি দেশের জন্য আলাদা সমস্যা হিসেবে না দেখে একটি আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
নাসের বলেন, দেশগুলোর মধ্যে আরও নিবিড় সমন্বয় ও একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন। পানিসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম থাকলেও তারা এর পূর্ণ ব্যবহার করেনি। জিসিসি ইউনিফায়েড ওয়াটার স্ট্র্যাটেজি ২০৩৫ অনুযায়ী, ২০২০ সালের মধ্যে সব সদস্যরাষ্ট্রের একটি জাতীয় সমন্বিত জ্বালানি ও পানি পরিকল্পনা থাকার কথা ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা অর্জিত হয়নি।
নাসের আল সায়েদের ভাষায়, আঞ্চলিক পানির গ্রিড তৈরি করা, জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য সদস্যদেশগুলোর মধ্যে যৌথভাবে পানি মজুত রাখা অথবা পানির উৎসে বৈচিত্র্য আনার মাধ্যমেই কেবল উপসাগরীয় অঞ্চলের পানির নিরাপত্তা শক্তিশালী করা সম্ভব।
পানিবিজ্ঞানী রাহা হাকিমদাভার বলেন, নিকট ভবিষ্যতে জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর জন্য ডিস্যালিনেশনের কোনো বিকল্প নেই। তবে উপসাগরীয় দেশগুলো কৌশলগত পানি মজুত ব্যবস্থার ওপর ভরসা করতে পারে। অনেক দেশে বর্তমানে বিশাল পানির ভান্ডার রয়েছে, যা দিয়ে সংশ্লিষ্ট শহরগুলোতে বেশ কয়েক দিন বা তার বেশি সময় পানি সরবরাহ করা সম্ভব।
হাকিমদাভার আরও বলেন, দেশগুলো পানি সরবরাহব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনতে পারে। পাশাপাশি কয়েকটি বিশাল স্থাপনার ওপর নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য শক্তিচালিত ছোট ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টে বিনিয়োগ করতে পারে।