মিয়ানমারে ভূমিকম্পে প্রাণহানির সংখ্যা তিন হাজার পৌঁছেছে। এছাড়া, এখন পর্যন্ত চার হাজার ৬৩৯ জন আহত এবং ৩৭৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন। দেশটির তথ্য পরিষদের বরাতে চীনা সংবাদমাধ্যম এ খবর জানিয়েছে। গত শুক্রবার ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প দেশটির উত্তরপশ্চিমাঞ্চলীয় সাগাইং শহরে আঘাত হানে। এতে মিয়ানমারের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ভূকম্পনের রেশ গিয়ে পৌঁছায় একদিকে থাইল্যান্ড ও অন্যদিকে বাংলাদেশ পর্যন্ত। রয়টার্স, সিনহুয়া, বিবিসি, এপি ।
বাংলাদেশে তেমন ক্ষয়ক্ষতি না হলেও, থাইল্যান্ডে একাধিক মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। এসময় নির্মাণাধীন একটি বহুতল ভবন ধসে যাওয়ায় কয়েক ডজন মানুষ আটকা পড়েন। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) বরাতে সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, মূল ভূ কম্পনের পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কমপক্ষে ১৪টি আফটারশক আঘাত হানে। এগুলোর বেশিরভাগের মাত্রা ছিল তিন থেকে পাঁচ। তবে সবচেয়ে শক্তিশালী ৬ দশমিক ৭ মাত্রার আফটারশকটি আঘাত হানে মূল ভূমিকম্পের প্রায় ১০ মিনিট পরে। ইউএসজিএসের আশঙ্কা, প্রাণহাণির সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়াতে পারে।
মিয়ানমারের সাগাইং অঞ্চলে গত শুক্রবার যখন জুমার নামাযের আজানের ধ্বনি ভেসে আসছিলো, তখন শত শত মুসলমান মসজিদের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তারা রমযানের শেষ শুক্রবারের নামায আদায় করতে উৎসুক ছিলেন, কারণ ঈদ উৎসবের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি ছিল। কিন্তু তাদের আনন্দযাত্রা নিমেষেই পরিণত হয় শোকের মিছিলে।
সেদিন স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৫১ মিনিটে এক মারাত্মক ভূমিকম্প আঘাত হানে। তিনটি মসজিদ ধসে পড়ে, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় মসজিদ ছিল মায়োমা। এর ভেতরে প্রায় সবাই মারা যান। জান্তা সরকারের দেওয়া তথ্য অনুসারে, সেখানকার পাঁচটি মসজিদে থাকা পাঁচ শতাধিক মানুষ মারা গেছেন।
সাগাইং ও মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ের কাছে সংঘটিত এই ভূমিকম্পে প্রায় ৩০০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে মৃতদেহ উদ্ধার অব্যাহত রেখেছেন। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সাগাইং অঞ্চল প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দিরগুলোর জন্য পরিচিত হলেও শহরগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম বসবাস করেন। জান্তা সরকারের প্রধান মিন অং হ্লাইং সোমবার জানিয়েছেন, মসজিদে নামায পড়ার সময় পাঁচ শতাধিক মুসলমান নিহত হয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বিবিসিকে জানিয়েছেন, শহরের মসজিদগুলোর মধ্যে মায়োমা স্ট্রিটে অবস্থিত মসজিদের অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ। ওই সড়কের আরও অনেক ভবনও ধসে পড়েছে। শত শত মানুষ এখন রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছে- কারও বাসা ভেঙে গেছে, কেউ আবার আফটারশকের ভয়ে ঘরে ফিরতে সাহস পাচ্ছেন না। খাদ্যের সরবরাহও সংকটাপন্ন বলে জানা গেছে।
শুধু মায়োমাতেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ৬০ জনের বেশি মানুষ মারা গেছেন, আর মিয়োদাও ও মোইকিয়া মসজিদেও বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত সেখানে মৃতদেহ উদ্ধার অব্যাহত ছিল।
ত্রাণ সংকট ও যুদ্ধবিরতি ঘোষণা
মিয়ানমারে গত শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পে প্রায় ৩০০০ মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানীর ৭০ শতাংশ ভবন। স্থানীয় এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “পানিই নেই, খাবার তো দূরের কথা। বিদ্যুৎ নেই। জ্বালানি, ওষুধ, আশ্রয়-এসব এখন বিলাসিতা।”
১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের পর দেশটিতে যুদ্ধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব লেগেই আছে। গত শুক্রবারের ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর গৃহযুদ্ধের কারণে ত্রাণ কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেনাবাহিনী অং সান সু চির সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের পর এই সংঘাত শুরু হয়।
বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো ‘ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট’ (এনইউজি)। তবে এই সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী গতকাল শনিবার ঘোষণা দিয়েছে, তারা রোববার থেকে দুই সপ্তাহের জন্য একতরফা যুদ্ধবিরতি পালন করবে। তবে সেনা সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সংঘাতে বাস্তুচ্যুত ৩০ লাখের বেশি মানুষের জন্য ত্রাণ সরবরাহে সেনাবাহিনী কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। সমালোচকরা বলছেন, সেনারা ত্রাণকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করছে।