রয়টার্স

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে শান্তিচুক্তির অংশ হিসেবে ইউক্রেনকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়ার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র একটি শর্ত জুড়ে দিয়েছে। শর্তটি হলো—ইউক্রেনকে তাদের পূর্বাঞ্চলীয় দনবাস অঞ্চলের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দিতে হবে। জেলেনস্কি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বেশি মনোযোগী। এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চার বছর ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধের দ্রুত অবসান ঘটাতে চাচ্ছেন। এ জন্য তিনি ইউক্রেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। ২০২২ সালে রাশিয়ার আক্রমণের মধ্য দিয়ে এ যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট রয়টার্সকে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তাঁর পরবর্তী যেকোনো পদক্ষেপের ওপর নিশ্চিতভাবে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির প্রভাব আছে। আমার মতে, দুর্ভাগ্যবশত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখনো ইউক্রেনের ওপর বেশি চাপ দেওয়ার কৌশলই বেছে নিচ্ছেন।’ দনবাস থেকে সেনা প্রত্যাহার করলে ওই অঞ্চলের শক্তিশালী প্রতিরক্ষাবলয় রাশিয়ার হাতে চলে যাবে, যা ইউক্রেন এবং সামগ্রিকভাবে ইউরোপের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। চলতি বছর আবুধাবি ও জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে তিন দফা উচ্চপর্যায়ের ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী এই সংঘাত বন্ধ করা। যুদ্ধে এ পর্যন্ত ইউক্রেনের বড় একটি অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রাণ হারিয়েছেন লাখো মানুষ।

ইউক্রেনের নেতা বারবার বলে আসছেন, কোনো শান্তিচুক্তি হওয়ার পর রাশিয়া যাতে ভবিষ্যতে আবারও যুদ্ধ শুরু করতে না পারে, সে জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছ থেকে শক্তিশালী নিরাপত্তা নিশ্চয়তা প্রয়োজন। নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিষয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে বলে জানান জেলেনস্কি। প্রথমত, ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা বজায় রাখতে অস্ত্র ক্রয়ে কে অর্থায়ন করবে? দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে রাশিয়ার কোনো আগ্রাসনের মুখে মিত্ররা ঠিক কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে? চলতি বছর আবুধাবি ও জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে তিন দফা উচ্চপর্যায়ের ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী এ সংঘাত বন্ধ করা। ৪৮ বছর বয়সী জেলেনস্কি বলেন, ‘ইউক্রেন দনবাস থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে রাজি হলে তবেই যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিষয়টি চূড়ান্ত করবে।’ দুবাইয়ে আয়োজিত ওই বৈঠকে জেলেনস্কি সরাসরি অংশ নেননি। তবে মার্কিন অবস্থানের ‘সুক্ষ্ম দিকগুলো’ তিনি ভালোভাবেই বোঝেন বলে জানিয়েছেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জোর দিয়ে বলছেন, পুরো দনবাসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া তাঁর যুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। আলোচনার টেবিলে এ লক্ষ্য অর্জিত না হলে যুদ্ধের মাধ্যমেই তা অর্জন করা হবে।

তবে রণাঙ্গনে গত দুই বছরে রাশিয়ার অগ্রগতির গতি ছিল বেশ ধীর। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, পুরো দনবাস দখল করতে দীর্ঘ সময় এবং প্রচুর জনশক্তির প্রয়োজন হবে। কারণ, এ অঞ্চলে ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর শক্তিশালী প্রতিরক্ষাবলয় রয়েছে। জেলেনস্কি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, দনবাস থেকে সেনা প্রত্যাহার করলে ওই অঞ্চলের শক্তিশালী প্রতিরক্ষাবলয় রাশিয়ার হাতে চলে যাবে, যা ইউক্রেন এবং সামগ্রিকভাবে ইউরোপের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। তিনি বলেন, ‘আমি চাই যুক্তরাষ্ট্র এটা বুঝুক, আমাদের দেশের পূর্বাঞ্চল আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চয়তারই একটি অংশ।’ এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। এর আগে গত জানুয়ারিতে জেলেনস্কি বলেছিলেন, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা–সংক্রান্ত একটি দলিল শতভাগ প্রস্তুত। এখন শুধু স্বাক্ষরের অপেক্ষা। তবে গত সপ্তাহে মায়ামিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের বৈঠকের পর গত মঙ্গলবার তিনি বলেন, এ বিষয়ে আরও কাজ বাকি আছে। কিয়েভে প্রেসিডেন্টের প্রেসিডেন্সিয়াল অফিসে বসে জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়ার প্রত্যাশা, শান্তি আলোচনা স্থবির হয়ে পড়লে ওয়াশিংটন আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে এবং একসময় মধ্যস্থতার টেবিল থেকে সরে যাবে। এমন একটি ঝুঁকি আসলেই আছে। ইরান সংকটের কারণে চলতি মাসে নির্ধারিত চতুর্থ দফার ত্রিপক্ষীয় আলোচনা স্থগিত করা হয়েছে। জেলেনস্কি বলেন, সীমানা ও নিরাপত্তা–সংক্রান্ত অমীমাংসিত সমস্যাগুলো সমাধান করে একটি শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর একমাত্র পথ হলো ট্রাম্প, পুতিন এবং তাঁর নিজের একটি শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে বসা।