রয়টার্স , সিবিএস নিউজ : যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে কতক্ষণ যুদ্ধ চালাবে এবং সেখানে মার্কিন সামরিক অভিযানের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী হবে—তা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সোমবার অস্পষ্ট ও সাংঘর্ষিক এক পূর্বাভাস দিয়েছেন। বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলো যখন আঞ্চলিক সংঘাত আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আছে, তখন ট্রাম্প বিশ্ববাজার এবং উদ্বিগ্ন মিত্রদের শান্ত করার চেষ্টায় গতকাল এক সংবাদ সম্মেলন করেন।
ট্রাম্প মিত্রদের আশ্বস্ত করে বলেন, ইরাক যুদ্ধের পর থেকে এখন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় যে অভিযানটি চলছে, তা শেষ করার একটি পরিষ্কার পরিকল্পনা আছে। তবে সে পরিকল্পনাটি কী, তা ওই সংবাদ সম্মেলনে খোলাসা করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ৩৫ মিনিটের ওই সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সুনির্দিষ্ট তথ্য এড়িয়ে গেছেন। বরং তিনি যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত যুদ্ধে ইরানের কতটুকু সামরিক শক্তি ধ্বংস করেছে, তার ওপরই বারবার জোর দিচ্ছিলেন। এক প্রতিবেদকের ফোনে করা প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘যুদ্ধ অনেকটা পরিপূর্ণ।’ এরপর এক প্রতিবেদক তাঁকে প্রশ্ন করেন, ‘এর মানে কি যুদ্ধ এই সপ্তাহেই শেষ হতে পারে?’ জবাবে ট্রাম্প নির্দিষ্ট সময় উল্লেখ না করে বলেন, ‘না, তবে শিগগিরই শেষ হবে। আমার মনে হয়, শিগগিরই। খুব শিগগিরই।’ সাংবাদিক আবারও প্রশ্ন করেন, ‘আপনি বলেছেন যুদ্ধ “অনেকটা পরিপূর্ণ” অবস্থায় আছে। কিন্তু আপনার প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন “এটি কেবলই শুরু”। তাহলে বিষয়টি কী?’
জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মনে করি, দুটিই বলা যায়।’ এর পরপরই ট্রাম্প আবার বলে ওঠেন, ‘এটি একটি নতুন দেশ গড়ে তোলার শুরু।’ এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ট্রাম্প ও তাঁর শীর্ষ উপদেষ্টারা এর আগে ইরানে দেশ গঠনের কোনো প্রচেষ্টা চালানোর কথা নাকচ করে দিয়েছিলেন। সিবিএসের সাংবাদিকের সঙ্গে ট্রাম্পের ফোনালাপের পর মনে হচ্ছিল, তিনি সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে পারেন। কিন্তু ট্রাম্প তা করেননি এবং বলেছেন যুদ্ধ চলবে।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা এখন এটাকে বিশাল সাফল্য বলতে পারি বা আমরা আরও এগোতে পারি। আমরা আরও এগোব।’ সংবাদ সম্মেলনের আগে ট্রাম্প রিপাবলিকান মিত্রদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমরা অনেক দিক থেকে জিতেছি। কিন্তু আমরা এখনো যথেষ্ট জিততে পারিনি।’ ট্রাম্পের এমন মন্তব্য নিয়ে সিনেটের সংখ্যালঘু ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাঁর মতে, ইরানে ট্রাম্পের লক্ষ্যের কোনো সুষ্পষ্ট রূপরেখা নেই বা তা প্রায় অনুপস্থিত।
চাক শুমার নিউইয়র্ক থেকে লিখেছেন, ‘এককথায় বলা যায়, ট্রাম্পের সংবাদ সম্মেলনটি ইঙ্গিতবিহীন। তিনি কোনো পরিকল্পনা বা লক্ষ্য প্রকাশ করতে পারছেন না। কারণ, তাঁর কোনো পরিকল্পনা বা লক্ষ্য নেই। এমনকি তিনি এটাও বলতে পারছেন না, দেশ যুদ্ধে লিপ্ত আছে কি না। মুহূর্তের ইচ্ছা ও আবেগের বশে তিনি বিশ্ব অর্থনীতি এবং লাখ লাখ মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলছেন।’ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত পথে চলে গেছে। গতকাল ট্রাম্প বলেন, বাজার স্থিতিশীল রাখতে তিনি কিছু দেশের তেল বিক্রির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবেন। এটি অনেকটা তাঁর নিজের নীতির বিপরীতে অবস্থান। কারণ, এর আগে ট্রাম্প ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করতে রাশিয়ার তেলের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়েছিলেন। ট্রাম্প আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার স্বাভাবিক হলে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো সেই নিষেধাজ্ঞা নতুন করে আরোপ করবে না। ট্রাম্প বলেন, ‘কে জানেৃহয়তো আমাদের এগুলো আর চাপাতে হবে না, তখন অনেক শান্তি থাকবে।’
ট্রাম্প হাস্যকরভাবে ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান গোপনে একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র পেয়েছে এবং সেটি ব্যবহার করে মিনাব শহরের মেয়েদের একটি স্কুলে হামলা করেছে। মিনাব শহরের ওই স্কুলে হামলার ঘটনায় ১৬৮ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে—যার বেশির ভাগই শিশু। মিনাব শহরে ইরানের একটি নৌঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরপরই ওই স্কুলে বিস্ফোরণ হয়েছিল। এ হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র কোনো দায় স্বীকার করবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘অনেক দেশই টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে এবং “ইরানের কাছে কিছু টমাহক আছে।” ট্রাম্পের এ বক্তব্য উপস্থিত সাংবাদিকের অনেকে মেনে নিতে পারেননি। এক সাংবাদিক তখন ট্রাম্পকে বলেন, ‘আপনি মাত্রই ইঙ্গিত দিলেন, ইরান কোনো না কোনোভাবে একটি টমাহক পেয়েছে এবং যুদ্ধের প্রথম দিনে নিজের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলা করেছে। আপনার সরকারের মধ্যে একমাত্র আপনিই কেন এটি বলছেন?’ ট্রাম্প জবাবে বলেন, ‘কারণ, আমি এ বিষয়ে যথেষ্ট জানি না। আমার মনে হয়, তদন্তনাধীন কোনো বিষয় নিয়ে আমি কথা বলেছি।’