এএফপি : জাতিসংঘের নির্যাতন-নিপীড়নবিরোধী কমিটি সম্প্রতি ইসরাইল, আলবেনিয়া, আর্জেন্টিনা এবং বাহরাইনের প্রতি তাদের পর্যবেক্ষণ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এই কমিটি বিশেষভাবে ইসরাইলের প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে- তাদের ধারা অনুযায়ী দেশটির মানবতাবিরোধী আচরণ এবং নির্যাতন ও দুর্ব্যবহার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ত্রুটি দেখা যাচ্ছে। কমিটি স্পষ্টভাবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসসহ অন্যান্য সংগঠনের ইসরাইলে আক্রমণকে নিন্দা জানিয়েছে। তবে তারা ইসরাইলের জবাবদিহিতার ওপরও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সম্প্রতি কমিটির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘গাজার ওপর ইসরাইলের প্রতিক্রিয়া ছিল চরম পর্যায়ের, যা ফিলিস্তিনে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ও দুর্ভোগের কারণ হয়েছে।’ কমিটি আরও জানিয়েছে, ‘বন্দিদের অধিকার ভেঙে আটককেন্দ্রগুলোর জীবনযাত্রার মান মারাত্মকভাবে খারাপ হয়েছে। এটি যেন সমষ্টিগত শাস্তির জন্য একটি পরিকল্পিত রাষ্ট্র নীতি।’ তারা ইসরাইলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেছে, ‘ফিলিস্তিনিদের ওপর সংগঠিত ও বিস্তৃত নির্যাতন এবং দুর্ব্যবহার একটি বাস্তব নীতি হিসেবে কাজ করছে এবং ৭ অক্টোবরের পর তা আরও প্রকট হয়েছে।’ একই সঙ্গে, ইসরাইলের ‘অবৈধভাবে অধিকৃত ফিলিস্তিন অঞ্চলে অব্যাহত অভিযান’ ফিলিস্তিনিদের জন্য নিষ্ঠুর ও অমানবিক জীবনযাত্রার পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে বলে সতর্ক করেছে কমিটি। জাতিসংঘের এই কমিটি ইসরাইলকে নির্দেশ দিয়ে বলেছে, অবিলম্বে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। যাতে বর্তমান সশস্ত্র সংঘর্ষে সংঘটিত সব নির্যাতন ও নিপীড়নের অভিযোগ পরীক্ষা করা যায় এবং দায়ীদের বিচার করা হয়। যাতে বিশেষ করে উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হয়।

এছাড়াও গাজার মধ্যে মানবিক সাহায্য ও ত্রাণ কর্মীদের প্রবেশ নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছে বিশেষ এই কমিটি।

আইনসংক্রান্ত দিক বিবেচনায় কমিটি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, ইসরাইলের আইন এখনো ‘পৃথকভাবে নির্যাতনের অপরাধকে’ অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত করে না। দেশটির আইন অনুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয়তার আড়ালে অপরাধ থেকে মুক্তি পেতে পারে। জাতিসংঘ কমিটি এ বিষয়ে ইসরাইলকে নির্যাতনের জন্য পৃথক অপরাধ আইন প্রণয়ন, ব্যবহৃত ‘বিশেষ জোর প্রয়োগ’-এর বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ এবং কোনো ব্যাতিক্রমী পরিস্থিতিতেই নির্যাতন বা দুর্ব্যবহার বৈধ নয়- তা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে কমিটি হামাসের আক্রমণে ইসরাইলে প্রাণহানি ও মানসিক ক্ষতির জন্য শোক প্রকাশ করেছে এবং এই হামলার জন্য নিন্দা জানিয়েছে। পাশাপাশি এই কমিটি ইসরাইলের ‘অধিকৃত ফিলিস্তিন অঞ্চল’ সংক্রান্ত প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে এবং আইনি কাঠামোর মাধ্যমে নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা মান্য করার স্বীকারোক্তিও নোট করেছে।

এদিকে গাজায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। শনিবারের ওই হামলায় গাজায় একই পরিবারের দুই ছেলে শিশু নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলেছে যে তারা ‘তাৎক্ষণিক হুমকি সৃষ্টি করা’ দুই সন্দেহভাজনকে শনাক্ত কারার পর তাদেরকে হত্যা করা হয়। খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র। দুই ভাইয়ের চাচা এএফপিকে জানিয়েছেন, বালকদের বয়স আট এবং দশ বছর। তারা জ্বালানি কাঠের খোঁজে বেরিয়েছিল। গাজা উপত্যকার তথাকথিত ইয়েলো লাইনের আশেপাশে এই মারাত্মক ড্রোন হামলার ঘটনাটি ঘটে। ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে মার্কিন-মধ্যস্থতায় ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির অধীনে ইসরাইলি সেনাবাহিনী হলুদ রেখার পিছনে অবস্থান নিয়েছে।

গত ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে, ইয়েলো লাইন এলাকায় ইসরাইলি বাহিনীর গুলিবর্ষণের একাধিক প্রাণঘাতী ঘটনা ঘটেছে। হামাস কর্তৃপক্ষের অধীনে উদ্ধারকারী বাহিনী হিসেবে কাজ করা গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থার মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল এএফপিকে জানিয়েছেন, দক্ষিণ গাজা উপত্যকার খান ইউনিসের পূর্বে বানি সুহেইলায় স্থানীয় সময় সকাল ৮ টা ৩০ মিনিটে (০৬৩০ জিএমটি) ইসরাইলি ড্রোন হামলায় দুই ভাই নিহত হয়েছেন। বাসাল বলেন, তাদের একজনের নাম ফাদি এবং অপর জনের নাম জুমা তামের আবু আসি।

নিহত দুই ভাইয়ের চাচা আলা আবু আসি বলেন, তারা ছিল ‘নিষ্পাপ শিশু, তাদের কাছে কোনো রকেট বা বোমা ছিল না।’ তিনি বলেন, ‘তারা জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করছিল।’ খান ইউনিসের নাসের হাসপাতাল শিশুদের মৃতদেহ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে এবং জানিয়েছে যে বিকেলে তাদের পরিবার তাদের মৃতদেহ দাফন করেছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘ইয়েলো লাইন অতিক্রমকারী সন্দেহজনক কার্যকলাপ পরিচালনাকারী এবং দক্ষিণ গাজা উপত্যকায় কর্মরত আইডিএফ (সামরিক) সৈন্যদের কাছে পৌঁছানো দুই সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করা হয়। যা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়, তাদেরকে সন্দেহভাজন হিসাবে চিহ্নিত করার পর আইএএফ (ইসরায়েলি বিমান বাহিনী) হুমকি দূর করার জন্য তাদেরকে হত্যা করে।

গাজায় পুলিশ বাহিনীর জন্য কয়েক শ ফিলিস্তিনিকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে মিসর : গাজা উপত্যকায় যুদ্ধ–পরবর্তী নিরাপত্তা বাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করতে ফিলিস্তিনি কয়েক শ পুলিশ সদস্যকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে মিসর। ফিলিস্তিনি এক কর্মকর্তা এএফপিকে এ কথা বলেছেন। মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি গত আগস্টে ফিলিস্তিনি প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মুস্তফার সঙ্গে কথা বলার সময় গাজার জন্য পাঁচ হাজার কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফিলিস্তিনি এক কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, মার্চে কায়রোতে প্রথম ভাগে পাঁচ শতাধিক কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আরও কয়েক শ জনকে প্রশিক্ষণ দিতে সেপ্টেম্বর থেকে আবার দুই মাসের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, বাহিনীর সব সদস্য গাজা উপত্যকা থেকে নেওয়া হবে এবং দখল করা পশ্চিম তীরের রামাল্লাভিত্তিক ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ তাঁদের বেতন দেবে। ২৬ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি এ প্রশিক্ষণের বিষয়ে খুব খুশি। আমরা চাই, যুদ্ধ ও আগ্রাসনের স্থায়ী সমাপ্তি হোক। আমরা আমাদের দেশ ও দেশের নাগরিকদের সেবা করতে উদ্গ্রীব হয়ে আছি।’

ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে বলেন, তিনি আশা করছেন, নিরাপত্তা বাহিনী স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে। তারা শুধু ফিলিস্তিনের প্রতি অনুগত থাকবে এবং কোনো বাইরের জোট বা উদ্দেশ্য দিয়ে প্রভাবিত হবে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফিলিস্তিনি এক লেফটেন্যান্ট বলেন, ‘সীমান্তে নজরদারির জন্য আধুনিক সরঞ্জামের পাশাপাশি আমরা কার্যক্রম পরিচালনা–সংক্রান্ত দারুণ প্রশিক্ষণ পেয়েছি।’ নিরাপত্তার কারণে ওই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। ওই লেফটেন্যান্ট গত বছর তাঁর পরিবারসহ গাজা ছেড়ে এসেছেন। তিনি বলেন, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের ওপর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়া এবং এর ফলে ফিলিস্তিনের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টিকে প্রশিক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলে হামাসের হামলায় ১ হাজার ২২১ জন নিহত হন বলে দাবি করে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে ওই ঘটনার প্রতিশোধ হিসেবে গাজায় শুরু করা ইসরায়েলের তাণ্ডবে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৭০ হাজার ১০০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে উপত্যকাটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। জাতিসংঘ এ মন্ত্রণালয়ের সংখ্যাকে নির্ভরযোগ্য বলে মনে করে।