গত এক বছর ধরে বাণিজ্যযুদ্ধ, অভিবাসন সংকট ও ধারাবাহিক অর্থনৈতিক চাপ সামলে এগোনো যুক্তরাষ্ট্র-এর অর্থনীতি এখন এক বড় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ইরানের দীর্ঘদিনের ইসলামপন্থি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রকাশ্য লক্ষ্য নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে আকস্মিক ও অনির্দিষ্টকালের সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়—পুরো বিশ্বকেই গভীর উদ্বেগে ফেলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশল মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দেওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক অস্থিরতা ও উত্তেজনার নতুন ঢেউ সৃষ্টি করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরান-এর পাল্টা হামলা এবং সংঘাত ‘অন্তত কয়েক সপ্তাহ’ চলতে পারে—এমন সতর্কবার্তার পর বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা আরও তীব্র হয়েছে। সংঘাত শুরুর পরপরই এর প্রভাব পড়ে বিশ্ববাজারে। তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলার থেকে হঠাৎ বেড়ে প্রায় ৮০ ডলারে পৌঁছায়, যদিও পরে কিছুটা স্থিতিশীল হয়। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী। এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা এখন বড় ঝুঁকির মুখে।
নিজস্ব তেল ও গ্যাস উৎপাদনের কারণে যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলকভাবে এই সংকটের সরাসরি ধাক্কা কম অনুভব করতে পারে। কিন্তু বৈশ্বিক বাণিজ্য, দ্রব্যমূল্য ও বিনিয়োগে এর নেতিবাচক প্রভাব শেষ পর্যন্ত মার্কিন অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বছরের শুরুতে যে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত মিলছিল, এই সংঘাত তা ব্যাহত করতে পারে।
সম্প্রতি গবেষণা ও থিঙ্ক ট্যাঙ্ক কনফারেন্স বোর্ড-এর এক জরিপে দেখা গেছে, মার্কিন অর্থনীতি ও নিজ নিজ খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিইওদের আস্থা বাড়ছিল। তবে একই জরিপে প্রায় ৬০ শতাংশ সিইও জানিয়েছেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ব্যবসায়িক পরিবেশের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এর আগে বিশ্বব্যাংক মার্কিন অর্থনীতির ভবিষ্যৎকে আশাব্যঞ্জক বলে উল্লেখ করেছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদনকারী অঞ্চলে এই আকস্মিক সংঘাত নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। শিপিং, সরবরাহ চেইন ও নিত্যপণ্যের দামে এর নেতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে—যা বিশ্বব্যাংকের সেই ইতিবাচক মূল্যায়ন টিকিয়ে রাখা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
জেপি মরগান-এর অর্থনীতিবিদ জোসেফ লুপটন লিখেছেন, ২০২৬ সালের জন্য তাদের পূর্বাভাসের ভিত্তি ছিল মার্কিন নীতি নিয়ে ব্যবসায়িক মহলের দ্বিধা কমে আসা। বছরের শুরুতে পাওয়া তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছিল, প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন নিয়োগ ও বিনিয়োগে ফিরছে। তবে এখন সেই ‘উদীয়মান পুনরুদ্ধার’ বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তাঁর মতে, চলমান বাণিজ্যযুদ্ধের সঙ্গে যদি সামরিক সংঘাত যুক্ত হয়, তবে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হবে।
তিনি আরও বলেন, এই সংঘাত ফেডারেল রিজার্ভের নীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে তেলের দাম কতটা বাড়ে এবং সংঘাত কতটা দীর্ঘস্থায়ী ও বিস্তৃত হয় তার ওপর। পাশাপাশি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি-এর মৃত্যুর পর পরিস্থিতি অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ে রূপ নেয় কি না, সেটিও বড় বিবেচ্য বিষয়।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়া-র সামরিক অভিযানের সময় যেমন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লেগেছিল, বর্তমান ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত সেই স্মৃতিই ফিরিয়ে আনছে। তখন ফেডারেল রিজার্ভ শুরুতে সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্তে কিছুটা নমনীয়তা দেখালেও, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরে কঠোর অবস্থানে যেতে বাধ্য হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি আরও বেশি অনিশ্চিত। এসজিএইচ ম্যাক্রো অ্যাডভাইজারস-এর প্রধান মার্কিন অর্থনীতিবিদ টিম ডুই সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে এই সংঘাত এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি ‘ওয়াইল্ড কার্ড’। সংঘাত যদি আঞ্চলিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না থেকে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ সংকটে রূপ নেয়, তবে বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারিয়ে পুঁজি সরিয়ে নিতে পারেন—যার ফল হবে গভীর বৈশ্বিক সংকট।
এসজিএইচ-এর প্রেসিডেন্ট ও সিইও হাসান ঘাহরামানি মনে করেন, ইরান শুধু বাহ্যিক যুদ্ধ নয়, সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধের ঝুঁকিতেও পড়েছে। তাঁর আশঙ্কা, তেহরান ‘স্কর্চড আর্থ’ কৌশল গ্রহণ করে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় আঘাত হানতে পারে, যাতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য করা যায়।
অন্যদিকে সিটি-র বিশ্লেষকদের মতে, ভূরাজনৈতিক এই নাটকীয় পরিবর্তন ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার নীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে না। মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়ার ঝুঁকি থাকলেও কঠোর আর্থিক পরিস্থিতি সেই প্রভাব অনেকটাই প্রশমিত করবে। ফলে ফেড এখন মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক তথ্যের দিকেই নজর রাখবে।