ইরানের মেয়েদের একটি প্রাথমিক স্কুলে গত শনিবার হামলা হয়। এতে ১৬৫ জন নিহত হন। তার মধ্যে বেশিরভাগই ছোট ছোট শিক্ষার্থী ছিল। নিহত অন্যরা স্কুলের স্টাফ ছিলেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস আজ শুক্রবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে ওই স্কুলে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে নিখুঁত অস্ত্র দিয়ে হামলা হয়।

সংবাদমাধ্যমটি বলেছে, ওই স্কুলে হামলার সময় পাশেই অবস্থিত ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডের নৌ ঘাঁটিতে হামলা হয়।

নিউইয়র্ক টাইমস বলেছে, হরমুজ প্রণালীর পাশে অবস্থিত এ স্কুলে যখন হামলা হয় তখন মার্কিন সেনাপ্রধান এক ব্রিফিংয়ে বলেছিলেন, তারা ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালাচ্ছেন। তিনি ওই ব্রিফিংয়ে একটি মানচিত্র প্রদর্শন করেছিলেন। সেই মানচিত্রে মিনাব অঞ্চলটি দেখা গিয়েছিল। যা নির্দেশ করছে ইরানি নৌ ঘাঁটির পাশাপাশি স্কুলটিতে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

এছাড়া দখলদার ইসরায়েলও সেখানে ওই সময় হামলা চালাচ্ছিল।দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের সংগ্রহ করা প্রমাণ– স্যাটেলাইট চিত্র, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট ও যাচাই করা ভিডিও ইঙ্গিত করছে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) পরিচালিত একটি নৌঘাঁটিতে হামলার সময় একটি নির্ভুল হামলায় স্কুল ভবনটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

হরমুজ প্রণালীর কাছে যেখানে আইআরজিসি ঘাঁটি অবস্থিত সেখানে মার্কিন বাহিনী আক্রমণ করছিল বলে যে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়েছে তা থেকেও বোঝা যায়, সম্ভবত তারাই এ হামলাটি চালিয়েছিল।

গত বুধবার হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র কি স্কুলে বিমান হামলা চালিয়েছে? তিনি জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমাদের জানামতে না।’ ওয়ার ডিপার্টমেন্ট বিষয়টি তদন্ত করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ইরানি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, মিনাব শহরের ওই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় অন্তত ১৭৫ জন নিহত হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই শিশু।

হামলার পর বেশ কয়েকদিন পার হলেও মার্কিন কর্মকর্তারা এর দায় স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটিই করেননি। প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ বুধবার বলেছেন, একটি তদন্ত চলছে। ইসরায়েলি সামরিক মুখপাত্র নাদাভ শোশানি রোববার সাংবাদিকদের বলেছেন, এখন পর্যন্ত তিনি ওই সময়ে ওই এলাকায় কোনো ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের বিষয়ে অবগত নন।

তবে মার্কিন কর্মকর্তারা বিবৃতিতে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ওইদিন মার্কিন বিমানগুলো সেই অঞ্চলে অপারেশন পরিচালনা করছিল যেখানে স্কুলটি অবস্থিত।

মিনাব শহরের প্রাথমিক বিদ্যালয়টির অবস্থান তেহরান থেকে ৬০০ মাইলেরও বেশি দূরে। কিন্তু হরমুজ প্রণালীর গুরুত্বপূর্ণ জলপথের কাছে। শনিবার ইরানের প্রথম কর্মদিবস, সেদিন হামলার সময় শিশু ও শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে ছিলেন বলে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।

স্থানীয় সময় বেলা ১১টা ৩০ মিনিটের কিছু পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রথম হামলার খবর পাওয়া যায়। সেই পোস্টগুলো বিশ্লেষণের পাশাপাশি হামলার এক ঘণ্টার মধ্যে ধারণ করা পথচারীদের ছবি এবং ভিডিও স্কুল ও নৌঘাঁটিতে একই সময়ে আঘাত হানার বিষয়টি নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।

ভূ-অবস্থান বিশেষজ্ঞদের চিহ্নিত একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, ঘাঁটির এলাকা ও স্কুল থেকে বেশ কয়েকটি বিশাল ধোঁয়ার কুণ্ডলী বের হচ্ছে।

এরপরই একটি ইরানি মানবাধিকার গোষ্ঠী স্কুল ভবনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ছবি শেয়ার করে। ইরানি মিডিয়ার পোস্ট করা ও নিউইয়র্ক টাইমসের স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা ভিডিওগুলোতে দেখা গেছে, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আহত ও ভুক্তভোগীদের সন্ধানে মানুষ ভিড় করেছে।

আরেকটি ভিডিও আইআরজিসি ঘাঁটির প্রবেশপথ দিয়ে যাওয়া এক মোটরসাইকেল চালকের ধারণ করা। ভিডিওতে কম্পাউন্ডের দুটি প্রবেশপথে আইআরজিসির প্রতীক ও একটি নৌ চিকিৎসা কমান্ডের চিহ্ন দেখা গেছে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যেখানে সামরিক ভবনগুলোতে আঘাত করা হয়েছিল সেখান থেকে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছিল।

ঘাঁটির ভেতরের ক্ষয়ক্ষতি ও ঘটনার কারণ পূর্ণাঙ্গভাবে মূল্যায়ন করতে নিউইয়র্ক টাইমস স্যাটেলাইট চিত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘প্ল্যানেট ল্যাবস’ থেকে নতুন চিত্র সংগ্রহ করেছে। বুধবার তোলা একটি ছবি এ ঘটনার ধারাবাহিকতাকে আরও নিশ্চিত করেছে।

চিত্রগুলোতে দেখা যায়, স্কুলের পাশাপাশি আইআরজিসির অন্তত ছয়টি ভবনে একাধিক নির্ভুল আঘাত করা হয়েছে। নৌঘাঁটির ভেতরে চারটি ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং অন্য দুটি ভবনের ছাদের মাঝখানে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে, যা নির্ভুল আঘাতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ওয়েস জে. ব্রায়ান্ট যিনি মার্কিন বিমান বাহিনীতে কাজ করেছেন এবং পেন্টাগনে বেসামরিক ক্ষতি বিষয়ক সিনিয়র উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি নতুন স্যাটেলাইট চিত্রগুলো পর্যালোচনা করেছেন এবং উপসংহারে পৌঁছেছেন যে, স্কুলসহ সব ভবনে ‘পিকচার পারফেক্ট’ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে আঘাত করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে স্কুলটিকে ভুল লক্ষ্যবস্তু হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছিল। অর্থাৎ বাহিনীটি সেখানে বিপুলসংখ্যক বেসামরিক লোক থাকতে পারে তা উপলব্ধি না করেই আক্রমণ করেছিল।

মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, মার্কিন বাহিনী সেই সময় দক্ষিণ ইরানে হামলা চালাচ্ছিল। তার উপস্থাপিত একটি মানচিত্রে দেখা গেছে, মিনাবসহ একটি এলাকা অপারেশনের প্রথম ১০০ ঘণ্টায় হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল। যদিও এটি স্পষ্টভাবে শহরটিকে শনাক্ত করেনি।

ব্রিফিংয়ে জেনারেল কেইন বলেন, ইসরায়েলি বাহিনী প্রধানত আরও উত্তরের অংশে কাজ করছে। তিনি সেখানে কোনো ইসরায়েলি তৎপরতার উল্লেখ না করেই দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযানের বেশ কয়েকটি লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করেন।

সুনির্দিষ্টভাবে জেনারেল কেইন বলেন, দক্ষিণ অক্ষ বরাবর, ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন স্ট্রাইক গ্রুপ দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল বরাবর সমুদ্র থেকে চাপ সৃষ্টি অব্যাহত রেখেছে এবং প্রণালী জুড়ে নৌ সক্ষমতা হ্রাস করছে।

নিউইয়র্ক টাইমসের পর্যালোচনা করা ২০১৩ সালের স্যাটেলাইট চিত্র অনুযায়ী, স্কুলটি একসময় আইআরজিসি নৌঘাঁটির অংশ ছিল। ঘাঁটির অন্যান্য এলাকা থেকে রাস্তাগুলো স্কুল ভবন পর্যন্ত গিয়েছিল, যেখানে শনিবার আঘাত হানা হয়। কিন্তু ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরের স্যাটেলাইট চিত্র দেখায়, ভবনটি আলাদা করে দেওয়া হয়েছে এবং সেটি আর ঘাঁটির সঙ্গে যুক্ত ছিল না।

মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, হামলাটি এখনো তদন্তাধীন। যদি নিশ্চিত হওয়া যায় একটি মার্কিন বোমাই মিনাব শহরের স্কুলটিতে আঘাত করেছে, তবে প্রশ্ন উঠতে পারে– স্কুলে হামলাটি ভুল ছিল নাকি পুরোনো তথ্যের ভিত্তিতে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।