মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম প্যারিস (ফ্রান্স) থেকে একসময় প্রবাসে সম্মাননা, ক্রেস্ট, অ্যাওয়ার্ড কিংবা গুণীজন সংবর্ধনা ছিল সমাজে অবদান রাখা ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা ও স্বীকৃতি জানানোর একটি মর্যাদাপূর্ণ মাধ্যম। সমাজসেবক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিককর্মী, ব্যবসায়ী কিংবা মানবিক কর্মকা-ে যুক্ত প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের অবদানকে মূল্যায়ন করতেই আয়োজন করা হতো এসব অনুষ্ঠান। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সম্মাননার সংস্কৃতির একটি অংশ এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে, আর সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্স-বাংলাদেশ কমিউনিটিতে তথাকথিত ‘পেইড অ্যাওয়ার্ড’ বা অর্থের বিনিময়ে সম্মাননা দেওয়ার অভিযোগ ক্রমেই আলোচনায় আসছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই চোখে পড়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন, গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড, ডায়াসপোরা সম্মাননা কিংবা এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডের রঙিন পোস্টার। জমকালো হলরুম, আলোকসজ্জা, অতিথির তালিকা এবং বিশাল ব্যানারে ভরপুর এসব আয়োজনের আড়ালে কতটা স্বচ্ছতা রয়েছে—সেই প্রশ্ন তুলছেন কমিউনিটির সচেতন ব্যক্তিরা।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এখন অনেক অনুষ্ঠানে যোগ্যতা বা সামাজিক অবদানের চেয়ে অর্থনৈতিক অংশগ্রহণই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কোথাও স্পন্সর ফি, কোথাও টেবিল চার্জ, কোথাও আবার ডোনেশন কিংবা সদস্য ফি’র বিনিময়ে সম্মাননা নিশ্চিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের কাজ, ত্যাগ কিংবা কমিউনিটির প্রতি অবদানের চেয়ে কে কত অর্থ ব্যয় করলেন, সেটিই অনেক ক্ষেত্রে মূল বিবেচনায়
পরিণত হচ্ছে।
ফ্রান্স-বাংলাদেশ কমিউনিটিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গড়ে ওঠা কিছু নামসর্বস্ব সংগঠন নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব সংগঠনের সারা বছরে দৃশ্যমান কোনো সামাজিক কার্যক্রম না থাকলেও বছরে একবার জমকালো অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান আয়োজনই যেন তাদের প্রধান কাজ। কোনো কোনো সংগঠন শুধুমাত্র একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই সক্রিয় হয়ে ওঠে, অনুষ্ঠান শেষে যাদের কার্যক্রম প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। প্রবাসে ব্যবসায়ীদের বৃহৎ সংগঠন আয়েবা’র মহাসচিব এনায়েত উল্লাহ ইনু বলেন, এখন অনেকেই সম্মাননাকে সামাজিক পরিচিতি বাড়ানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন। আগে মানুষ কাজের স্বীকৃতি পেত, এখন অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়—টাকা দিলেই মঞ্চে ওঠার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, এ ধরনের পদক-বাণিজ্য কমিউনিটিকে বিভক্ত করছে। তাঁর মতে, একশ্রেণির সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি অর্থনৈতিক সুবিধা হাসিলের উদ্দেশ্যে এ ধরনের কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ছেন।
ফ্রান্স কমিউনিটির প্রবীণ সদস্য ও ব্যবসায়ী আশরাফুল ইসলাম বলেন, সম্মাননা অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু যখন নির্বাচন প্রক্রিয়া অস্পষ্ট থাকে, তখন সেটি আর সম্মানের জায়গায় থাকে না। এতে প্রকৃত গুণীজনদের অবদানও ম্লান হয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, পদক যিনি নিচ্ছেন এবং যিনি দিচ্ছেন—অনেক সময় কেউই বিষয়টির গভীরতা সত্যিকার অর্থে অনুধাবন করতে পারেন না। তিনি এ ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে সম্মাননা নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে। আন্তর্জাতিক মানের কোনো পুরস্কার বা সম্মাননা প্রদানের ক্ষেত্রে সাধারণত থাকে নিরপেক্ষ জুরি বোর্ড, মনোনয়ন প্রক্রিয়া, যাচাই-বাছাই এবং অবদানের বিস্তারিত মূল্যায়ন। কিন্তু ফ্রান্সের প্রবাসী কমিউনিটির কিছু অনুষ্ঠানে সেই কাঠামোর কোনো দৃশ্যমান উপস্থিতি নেই বলেই অভিযোগ উঠেছে।