এপি, আল-মনিটর : গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরাইলের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে স্পেন। কেবল কঠোর বার্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে মাদ্রিদ এই যুদ্ধের বিরোধিতাকে সরাসরি রাষ্ট্রীয় নীতিতে রূপান্তর করেছে, যা ব্লকটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই যুদ্ধকে ‘অবৈধ ও বিপজ্জনক’ বলে অভিহিত করে নিন্দা জানিয়েছেন। গত ৪ মার্চ এক টেলিভিশন ভাষণে তিনি বলেন, স্পেনের অবস্থান স্পষ্ট, ‘যুদ্ধকে না’। তিনি সতর্ক করেন যে এই সংঘাত আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভয়াবহতা ডেকে আনবে।
সানচেজ প্রশাসন কেবল কথায় নয়, কাজেও কঠোরতা দেখিয়েছে। মার্চ মাসের শেষের দিকে স্পেন তার আকাশসীমা সব ধরনের মার্কিন সামরিক বিমানের জন্য বন্ধ করে দেয়। এর আগে রটা এবং মোরন-এর মতো যৌথ সামরিক ঘাঁটিগুলো ইরান অভিযানে ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকার করে মাদ্রিদ। স্প্যানিশ কর্মকর্তাদের মতে, এই ‘অবৈধ ও অন্যায্য’ যুদ্ধে স্পেন কোনোভাবেই অংশীদার হতে চায় না। বার্সেলোনা সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক পোল মোরিলাস বলেন, অন্য অনেক দেশ উত্তেজনা কমানোর কথা বললেও স্পেন তার নীতিতে অটল। সানচেজের নেতৃত্বাধীন বামপন্থি দল ইরাক থেকে শুরু করে গাজা, ইউক্রেন ও ভেনিজুয়েলা সব ক্ষেত্রেই সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে আসছে।
ভূমধ্যসাগরীয় দেশ হিসেবে স্পেনের অন্যতম বড় উদ্বেগ হলো নতুন করে শরণার্থী সংকট। ২০২৪ সালে সিরিয়া ও ইয়েমেনের সংঘাতের কারণে ২ লাখ ৮ হাজারের বেশি মানুষ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে ঢুকেছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এই সংখ্যা ২২ শতাংশ কমলেও, ইরান যুদ্ধের ফলে আবারও নতুন করে গণ-উদ্বাস্তু ঢল শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে মাদ্রিদ। স্পেনের এই কঠোর অবস্থানের কারণে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে এখন ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাতে দীর্ঘ পথ ঘুরতে হচ্ছে। এর ফলে জ্বালানি খরচ ও সময় উভয়ই বাড়ছে। ইতালিও তাদের বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি, তবে ফ্রান্স শর্তসাপেক্ষে তাদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি রেখেছে।
বিশ্লেষক হাভিয়ের কার্বোনেল মনে করেন, স্পেনের এই অবস্থানের পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বড় ভূমিকা রয়েছে। ২০০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ইরাক যুদ্ধ নিয়ে স্পেনের সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র বিভাজন ছিল। বিশেষ করে ২০০৪ সালের ১১ মার্চ মাদ্রিদের ট্রেনে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ক্ষত আজও স্প্যানিশদের মনে সতেজ। ১৯১ জন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া সেই হামলার নেপথ্যে ছিল স্পেনের ইরাক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া। বর্তমান সানচেজ সরকার সেই জনমতকেই ধারণ করছে। সানচেজ নিজেকে বিশ্ব প্রগতিশীল রাজনীতির নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চান। আগামী ১৭ এপ্রিল বার্সেলোনায় অনুষ্ঠেয় একটি সম্মেলনে তিনি ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা এবং কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ডানপন্থি পপুলিজম ও একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে সুর মেলাবেন।
যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা সামাল দিতে স্পেন তাদের কৌশলগত মজুদ থেকে ১ কোটি ১৫ লাখ ব্যারেল তেল ছাড় করেছে এবং সাধারণ মানুষের জন্য ৫৭০ কোটি ডলারের সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক নির্ভরশীলতা কম হওয়াও স্পেনের জন্য একটি বড় সুবিধা। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্পেনের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ছিল মাত্র ৪৭ বিলিয়ন ডলার, যেখানে জার্মানির ছিল ২৭৬ বিলিয়ন। এছাড়া ইইউ-এর একক বাজারের সদস্য হওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসন চাইলেই এককভাবে স্পেনের ওপর বাণিজ্যিক প্রতিশোধ নিতে পারবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বিরোধিতা করলেও স্পেন নিজেকে ন্যাটোর অনুগত সদস্য হিসেবেই দাবি করে। কার্বোনেল বলেন, স্পেন সব সময় উত্তেজনা প্রশমন চায়, তবে ন্যাটোর ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী কোনও সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে স্পেন অবশ্যই সহযোগিতার হাত বাড়াবে। সাইপ্রাসে একটি ব্রিটিশ ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর স্পেন দ্রুত তাদের যুদ্ধজাহাজ ক্রিস্টোবাল কোলন পাঠিয়ে সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে। সানচেজ মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে নতজানু না হয়ে সম্মান আদায়ের নীতি অনুসরণ করছেন।