বিবিসি : ইউরোপ গ্রিনল্যান্ড হস্তান্তর না করলে ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর বড় অঙ্কের শুল্ক আরোপের যে হুমকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দিয়েছেন, তার তীব্র সমালোচনা করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ। তিনি বলেছেন, ভয়ভীতি বা দাদাগিরির কাছে ইউরোপ কখনোই মাথা নত করবে না। আটলান্টিকের দুই পাড়ের মধ্যে উত্তেজনা এড়াতে ইউরোপের অনেক নেতা যেখানে সতর্ক ভাষায় কথা বলছেন, সেখানে মাক্রোঁ কড়া অবস্থান নিয়েছেন। দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে তিনি বলেন, ফ্রান্স ও ইউরোপ কোনোভাবেই ‘শক্তির জোরে চাপিয়ে দেওয়া নিয়ম’ মেনে নেবে না। তা করলে ইউরোপ ধীরে ধীরে পরাধীন হয়ে পড়বে বলে তিনি সতর্ক করেন। মাক্রোঁ আরও বলেন, বিশ্ব রাজনীতি যদি নীতিহীনতার দিকে এগোয়ও, ইউরোপ ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা ও আইনের শাসনের প্রশ্নে আপস করবে না। তার ভাষায়, গুণ্ডামির বদলে সম্মান এবং বর্বরতার বদলে আইনের শাসনই ইউরোপের পছন্দ।
বক্তৃতার সময় তিনি এভিয়েটর সানগ্লাস পরেছিলেন। এলিসি প্রাসাদের বরাতে জানানো হয়, চোখের রক্তনালী ফেটে যাওয়ায় সুরক্ষার জন্য তিনি এই চশমা ব্যবহার করছেন। ফরাসি ওয়াইন ও শ্যাম্পেইনের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকির প্রেক্ষাপটেই দাভোসে এসব মন্তব্য করেন মাক্রোঁ। এর আগে ট্রাম্প কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভেঙে মাক্রোঁর পাঠানো একটি ব্যক্তিগত বার্তা প্রকাশ করেন, যেখানে গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনা জানতে চাওয়া হয়েছিল। একই বার্তায় রাশিয়া ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে একটি জি–৭ বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাবও দেন মাক্রোঁ। গত শনিবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রকে দিতে অস্বীকৃতি জানানো পর্যন্ত ফ্রান্সসহ কয়েকটি ইউরোপীয় মিত্র দেশের পণ্যের ওপর ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুল্ক বসানো হবে। ইউরোপের প্রভাবশালী দেশগুলো এই পদক্ষেপকে সরাসরি ‘ব্ল্যাকমেইল’ হিসেবে দেখছে। দাভোসে মাক্রোঁ বলেন, ওয়াশিংটনের লাগাতার শুল্ক আরোপ সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য, বিশেষ করে যখন তা ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
মাক্রোঁ জানিয়েছেন, তিনি বুধবারের আগেই দাভোস ত্যাগ করবেন। অন্যদিকে ট্রাম্পের বক্তব্য দেওয়ার কথা বুধবার, ফলে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে দুই নেতার মুখোমুখি সাক্ষাৎ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে ট্রাম্প যে বার্তাটি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন, তাতে মাক্রোঁ তাকে গত বৃহস্পতিবার প্যারিস সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ট্রাম্প সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন কি না, তা এখনও জানা যায়নি।
এদিকে গ্রিনল্যান্ড দখলের পরিকল্পনা নিয়ে নিজের অবস্থানে এখনো অনড় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত থেকে ‘পিছু হটার আর কোনো সুযোগ নেই’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি ‘অপরিহার্য’। হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়, গ্রিনল্যান্ড দখলে কত দূর যেতে রাজি আছেন। জবাবে তিনি বলেন, ‘সময় হলে আপনারা ঠিকই জানতে পারবেন।’ এমনকি দ্বীপটি দখলে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও নাকচ করে দেননি ট্রাম্প। এমন এক প্রশ্নে সরাসরি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান তিনি।
এদিকে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে বিরোধিতার জেরে আটটি ইউরোপীয় দেশের ওপর আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। এর জবাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নও পালটা ব্যবস্থা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্যচুক্তি স্থগিতের কথা ভাবছে। ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেন তারই সাবেক উপদেষ্টা ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের ফলে সামরিক জোট ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ট্রাম্প ন্যাটোর প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করলেও বিপদের সময় এই জোট যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়াবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।