সিএনএন ,টাইমস অব ইন্ডিয়া, সিএনএন : বিশাল এক পরিবহন প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে নরওয়ে। জনসাধারণের চোখের আড়ালেই মূলত এ কাজ চলছে। উত্তর সাগরের গভীর তলদেশে চলমান এই প্রকল্পের নাম ‘রগফাস্ট’। এটি সমুদ্রতলে একটি টানেল (সড়কসুড়ঙ্গ), যা দেশটির পশ্চিম উপকূলজুড়ে ফেরিবিহীন একটি নিরবচ্ছিন্ন সড়কপথের অংশ হবে। এরই মধ্যে কঠিন শিলা কেটে সুড়ঙ্গ খননের কাজ শুরু হয়েছে। পুরো সুড়ঙ্গের দৈর্ঘ্য হবে ২৭ কিলোমিটারের বেশি, আর এটি সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ৪০০ মিটার নিচ পর্যন্ত নেমে যাবে। প্রকল্পটি শেষ হলে নরওয়ের প্রধান শহরগুলোর মধ্যে যাতায়াতের সময় কমবে এবং ফেরি পারাপারের প্রয়োজনও কমে আসবে। এখন ফেরি পারাপার অনেকটাই আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। এই সড়কসুড়ঙ্গ নির্মাণকাজের অগ্রগতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে সংবাদমাধ্যম। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রকল্পে জটিল প্রযুক্তিগত কাজ রয়েছে, তাই কাজ শেষ করতে দীর্ঘ সময় লাগবে। রগফাস্ট নামটি এসেছে ‘রোগাল্যান্ড ফাস্টফোরবিনডেলসে’ থেকে। এটি যে অঞ্চলকে সংযুক্ত করবে, সেই রোগাল্যান্ড এলাকার নাম এবং স্থায়ী সংযোগ বোঝাতে ব্যবহৃত নরওয়েজীয় নামকরণ। এই সড়ক সুড়ঙ্গটি র্যান্ডাবার্গ ও বোকনকে সংযুক্ত করবে। এটি উপকূলীয় মহাসড়ক ই৩৯-এর একটি অংশ হবে। এই সড়কটি উত্তরে ত্রোনহাইম থেকে দক্ষিণে ক্রিস্তিয়ানসান্দ পর্যন্ত বিস্তৃত, যার মোট দৈর্ঘ্য ১ হাজার ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি। বর্তমানে এই পথে যাত্রা চলাচল করতে গাড়িচালকদের সাতটি ফেরি ব্যবহার করতে হয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিভিন্ন সড়ক সুড়ঙ্গ ও সেতুর মাধ্যমে এই ফেরি পারাপার বন্ধ করা হবে। রগফাস্ট সুড়ঙ্গ এই পরিকল্পনার মধ্যে সবচেয়ে জটিল অংশগুলোর একটি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে ভূপৃষ্ঠের নিচে নির্মাণ শুরু হওয়া অংশগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।
সুড়ঙ্গ নির্মাণের প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ : রগফাস্ট সড়কসুড়ঙ্গের সবচেয়ে গভীর অংশ সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ৩৯২ মিটার নিচে নেমে যাবে। এটি বর্তমানে বিশ্বে সড়ক বা রেল চলাচলের জন্য ব্যবহৃত কোনো সমুদ্রতল সুড়ঙ্গের চেয়ে বেশি গভীর।
সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকৌশলীরা সুড়ঙ্গটির উভয় প্রান্ত থেকে একসঙ্গে খননকাজ শুরু করেছেন। এর ফলে খনন দলগুলো সমুদ্রের তলায় একে অপরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের লক্ষ্য, ৫ সেন্টিমিটারের কম ত্রুটিসীমা বজায় রেখে দুই প্রান্তের খননকে এক জায়গায় মিলিত করা। এই মাত্রার নির্ভুলতা অপচয় কমায় এবং ব্যয়বহুল সংশোধনের প্রয়োজন এড়িয়ে যাওয়া যায়, বিশেষ করে যখন এত বিশাল পরিমাণ কঠিন শিলা সরিয়ে কাজ করতে হয়।
পানির চাপ ও ফাটল বন্ধ করা বড় চ্যালেঞ্জ: সমুদ্রপৃষ্ঠের শতাধিক মিটার নিচে কাজ করার সময় শিলার ও সমুদ্রের পানির চাপ সব সময় থাকে। সমুদ্রের নিচে সুড়ঙ্গ নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রধান প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের একটি হলো শিলার ফাটলগুলো সিল বা বন্ধ করা, যাতে লবণাক্ত পানি সুড়ঙ্গের ভেতর ঢুকতে না পারে। রগফাস্টের উত্তর অংশ নির্মাণ করছে স্কানস্কা। সুইডিশ বহুজাতিক এই নির্মাণ ও প্রকৌশল কোম্পানিটির প্রকল্প ব্যবস্থাপক অ্যান ব্রিট মোয়েন সিএনএনকে বলেন, খননের সময় পানি ঢুকে যাওয়ার ঘটনা এরই মধ্যে ঘটেছে। মোয়েনের দল তাই গ্রাউটিং পদ্ধতি উন্নত করতে অধিক মনোযোগ দিচ্ছে। সুড়ঙ্গ খননের কাজ মাটির যত গভীরে যাচ্ছে, তাঁরা তত নিরাপদ কাজের পরিবেশ বজায় রাখতে চাইছে। উত্তরের এই অংশটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৯ কিলোমিটার এবং এতে সুড়ঙ্গের সবচেয়ে গভীর অংশগুলোও অন্তর্ভুক্ত।
সড়কসুড়ঙ্গের নকশা: রগফাস্ট দুটি আলাদা টিউবের সমন্বয়ে তৈরি হবে, প্রতিটি টিউবে দুই লেনে যানবাহন চলাচল করবে। সুড়ঙ্গের প্রায় অর্ধেক অংশে গিয়ে চালকেরা ঘুরে গিয়ে চলার দিক পরিবর্তন করতে পারবেন বা সংযোগ সুড়ঙ্গে চলে যেতে পারবেন। মূল সড়কসুড়ঙ্গের এই অংশটি সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ২৬০ মিটার নিচে অবস্থিত। এই ভূগর্ভস্থ সংযোগস্থলটির একটি শাখা সুড়ঙ্গের সঙ্গে যুক্ত, যা নরওয়ের সবচেয়ে ছোট পৌরসভা কভিৎসোয় দ্বীপের দিকে যাবে। টানেলের ভেতরের বাতাসের মানও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নকশায় বায়ুপ্রবাহ–ব্যবস্থা সংযুক্ত আছে। বলেছে, দুর্ঘটনা শনাক্ত করতে এবং যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণে রাখতে রিয়েল-টাইম মনিটরিং সিস্টেম, ক্যামেরা ও রাডার ব্যবহার করা হবে।
অর্থনৈতিক প্রভাব: রগফাস্টের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৮ সালে। কিন্তু অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রয়োজন পড়তে পারে এমন ধারণা থেকে ২০১৯ সালে কাজ স্থগিত করা হয়। পুনঃ পর্যালোচনা শেষে ২০২১ সালে সড়কসুড়ঙ্গ নির্মাণকাজ আবার শুরু হয়। ২০৩৩ সাল নাগাদ এই সড়কসুড়ঙ্গের নির্মাণকাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি নরওয়েজীয় ক্রোনার, যা প্রায় ২৪০ কোটি মার্কিন ডলারের সমান। এই সুড়ঙ্গসড়ক তৈরি হয়ে গেলে ফেরি পারাপার–সংক্রান্ত কর্মসংস্থান কমে যাবে। তবে উন্নত সড়ক–সুবিধা অন্যান্য কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করবে বলে সিএনএনকে বলেছেন প্রকল্প ব্যবস্থাপক মোয়েন।
মোয়েন বলেন, উন্নত সড়ক–সুবিধা অন্যান্য কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও জনসেবাকে সমর্থন করবে। যাতায়াত খরচ কমে যাওয়ার কারণে সামুদ্রিক খাবার প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন শিল্পেও সুবিধা পাওয়া যাবে। এই কর্মকর্তা মনে করেন, সড়কসুড়ঙ্গের প্রভাব রাতারাতি বোঝা যাবে না; বরং ধীরে ধীরে তা প্রকাশ পাবে এবং হঠাৎ কোনো পরিবর্তন না ঘটিয়ে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার রূপ ধীরে ধীরে বদলে দেবে।