নেপালে তিব্বত সীমান্তবর্তী পার্বত্য এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছেন। তিব্বতের একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্রে ভূমিধসের ফলে ব্যাপক হতাহতের কথা জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় মাধ্যম। খবর বিবিসি ও এএফপির।

নেপালে আকস্মিক বন্যার প্রবল স্রোতে ভেসে গেছে বেশ কয়েকটি গ্রাম। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ প্রকল্প। এ ঘটনায় শত শত মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের উদ্ধারে হেলিকপ্টার মোতায়েন করেছে নেপাল কর্তৃপক্ষ।

তিব্বত সীমান্ত সংলগ্ন নেপালের এই এলাকাটিতে হঠাৎ ঢল নেমে আসার পর পর্যটকসহ অন্তত ৩৮০ জনেরও বেশি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। নেপাল পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, পর্যটন ও ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী আক্রান্ত এলাকা থেকে ২৮১ জন বিদেশি ও ৯৩ জন নেপালি নাগরিকসহ মোট ৩৮৪ জন পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন। কর্তৃপক্ষ তাদের সঠিক অবস্থান ও নিরাপত্তার বিষয়টি যাচাইয়ে কাজ করছে।

নেপাল পুলিশ প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওতে হিমালয় অঞ্চলের পাহাড়ি উপত্যকার মধ্য দিয়ে কাদাপানির প্রচণ্ড ঢল বয়ে যেতে এবং বাড়িঘর ও যানবাহন ভাসিয়ে নিয়ে যেতে দেখা গেছে। নেপাল পুলিশের মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফলে বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান, এখন পর্যন্ত ১৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

প্রবল স্রোতের কারণে নেপালের রাসুয়া জেলার শ্যাফ্রুবেশি ও তিমুরে এলাকায় হেলিকপ্টার অবতরণ করতে পারছে না। পার্বত্য এই জেলায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বসবাস। রাসুয়া জেলার প্রশাসক নরেন্দ্র পারিয়ার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘এ ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানি বা সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে। তবে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।’ তিনি ভোতে কোশি নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। স্থানীয় কয়েকটি গ্রাম ও অবকাঠামো প্রকল্পের এলাকা বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে সীমান্তের ওপারে তিব্বতের গিরং কাউন্টিতেও ব্যাপক হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। চীন ও নেপালের মধ্যকার একটি স্থলবন্দর এলাকায় ভূমিধসের পর সেখানে বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে।

সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, ভূমিধসে চীনের গিরং বন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে শিগাতসে অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিখোঁজদের উদ্ধারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি দ্বিতীয় দফা দুর্যোগ এড়াতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

নেপালের জলবায়ু ন্যায়বিচারকর্মী প্রয়াশ অধিকারী বলেন, ভয়াবহ এই বন্যায় ‘পুরো গ্রাম’ পর্যন্ত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কাঠমান্ডু থেকে আল জাজিরাকে তিনি বলেন, শত শত মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন এবং ভবন, স্কুল, সেতু ও মহাসড়ক পানির স্রোতে ভেসে গেছে। নেপাল পুলিশ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, পাহাড়ি উপত্যকার মধ্য দিয়ে প্রবল স্রোতে কাদামিশ্রিত পানি ধেয়ে যাচ্ছে।

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে প্রকাশিত ইংরেজি দৈনিক রিপাবলিকার সম্পাদক কোশ রাজ কৈরালা বলেন, আকস্মিক বন্যার সময় অনেক মানুষ কোনো ধরনের প্রস্তুতির সুযোগ পাননি। কারণ ওই এলাকায় তখন ভারী বৃষ্টিপাতও হয়নি। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘মানুষজন তখন বাড়িতে ছিলেন। কয়েকটি বাড়ি নদীর স্রোতে ভেসে গেছে।’

পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটির জরুরি বৈঠক ডেকেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, চিকিৎসক দল, স্কাউট ও রেড ক্রসের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে।

নেপাল সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দুর্গত এলাকায় হেলিকপ্টার ও দুর্যোগ মোকাবিলা দলের সদস্যদের পাঠানো হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের কাজও চলছে। নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎসহ প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। দুর্যোগের কারণে বেশ কয়েকটি মহাসড়কও বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

নেপালের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের (আইসিআইএমওডি) জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমবাহ থেকে সৃষ্ট তুষারধসের কারণে আকস্মিক এই বন্যার সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। তাদের মতে, ভোতে কোশি নদীর উপনদী লেন্দে খোলা নদীতে বুধবার সর্বোচ্চ মাত্রার বন্যা দেখা গেছে।

জলবায়ু গবেষণা সংস্থাটির দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিশেষজ্ঞ শাশ্বত সান্যাল বলেন, ১৪ মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো লেন্দে খোলা নদীতে বন্যা দেখা দিয়েছে। এবার হিমবাহ থেকে বরফ-পাথরের ধস নেমে নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পর হঠাৎ করে বিপুল পানির স্রোত নিচের দিকে নেমে আসায় বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। জলবায়ুকর্মী প্রয়াশ অধিকারী বলেন, দুর্গত জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষিত রাখতে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভোতে কোশি নদীর উৎপত্তি তিব্বতে। পরে এটি নেপালে প্রবেশ করে ত্রিশূলী নদীতে মিশেছে। ত্রিশূলী নদী পরবর্তী সময়ে ভারতে প্রবেশ করে গণ্ডক নদী হিসেবে প্রবাহিত হয়েছে। গত বছরও ভোতে কোশি নদীতে বন্যায় নয়জন নিহত ও ২৪ জন নিখোঁজ হয়েছিলেন। ওই বন্যায় নেপাল ও চীনের মধ্যে যোগাযোগকারী ‘ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ’ ভেসে যায়। ফলে কয়েক মাস ধরে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও বাণিজ্য ব্যাহত হয়। আঞ্চলিক জলবায়ু পর্যবেক্ষণকারী একটি সংস্থার মতে, তিব্বতের একটি হিমবাহ-সংলগ্ন হ্রদের পানি হঠাৎ নেমে যাওয়ায় ওই বন্যার সৃষ্টি হয়েছিল।

দক্ষিণ এশিয়ায় জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মৌসুমি বৃষ্টিপাতের কারণে নিয়মিতই ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এ অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন এবং তীব্র হয়ে উঠছে।