কঠোর ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও ব্যাপক দমন–পীড়নের মধ্যেও শনিবার (১০ জানুয়ারি) রাতে ইরানের রাজধানী তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন শহর সরকারবিরোধী স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের পরও বিক্ষোভকারীরা রাজপথে প্রতিবাদ চালিয়ে যান।
বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরের মধ্যে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে এটি সবচেয়ে বড় গণআন্দোলন। দুই সপ্তাহ আগে অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার অবসানের দাবিতে রূপ নিয়েছে।
ইরান সরকার এই অস্থিরতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করলেও বিক্ষোভকারীরা পিছু হটছেন না। বরং তারা বিভিন্ন শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, দমন অভিযানে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫১ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে শিশুদের উপস্থিতির কথাও বলা হচ্ছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অভিযোগ করেছে, নিরাপত্তা বাহিনী বেআইনিভাবে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে বিক্ষোভ দমন করছে।
ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস জানায়, বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) থেকে ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন থাকায় ভেতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করে বলেছেন, ইরান এখন স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজন হলে সহায়তা দিতে প্রস্তুত। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের বিভিন্ন বিকল্প নিয়েও ট্রাম্পকে অবহিত করা হয়েছে।
তেহরানের উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভকারীরা আতশবাজি ফাটিয়ে এবং হাঁড়ি–পাতিল বাজিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। অনেক জায়গায় অপসারিত রাজতন্ত্রের পক্ষে স্লোগান শোনা যাচ্ছে এবং শাহ আমলের পতাকা প্রদর্শন করা হচ্ছে। নির্বাসিত শাহজাদা রেজা পাহলভি যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় বিক্ষোভকারীদের শহরের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলো দখলের আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বিক্ষোভকারীদের ‘নাশকতাকারী’ আখ্যা দিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সেনাবাহিনীও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় যে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইরানি কর্তৃপক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানালেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লিয়েন বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে তাদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন।
এদিকে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে তেহরানের সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়লেও অনেকেই এই আন্দোলনকে ‘মুক্তির জন্য অপরিহার্য মূল্য’ হিসেবে দেখছেন। আন্দোলনের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বাইরেও—লন্ডনে ইরানি দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হয়ে সরকারবিরোধী স্লোগান দিয়েছেন, যা এই আন্দোলনের আন্তর্জাতিক প্রতিধ্বনি স্পষ্ট করে তুলেছে।