ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে হঠাৎ করেই নতুন রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এখানকার পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে উপসাগরের দুই বড় শক্তি—সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এমন প্রেক্ষাপটে ইয়েমেনের দক্ষিণে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে রিয়াদে সংলাপে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
দীর্ঘদিন ধরে গৃহযুদ্ধের কবলে থাকা ইয়েমেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে শুরুতে একসঙ্গে হস্তক্ষেপ করেছিল সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই জোটে মতবিরোধ দেখা দেয়। এখন তারা দেশটির ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীকে সমর্থন দিচ্ছে। এর মধ্যে একটি গোষ্ঠী দক্ষিণ ইয়েমেনকে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণার লক্ষ্যে কাজ করছে।
গত শুক্রবার সংযুক্ত আরব আমিরাত–সমর্থিত দক্ষিণ ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি) নতুন করে লড়াই শুরুর ঘোষণা দেয়। তাদের অভিযোগ, সৌদি আরব–সমর্থিত স্থলবাহিনী দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালিয়েছে এবং সৌদি বিমানবাহিনীও তাতে অংশ নেয়।
ইয়েমেনের সংঘাত তীব্র আকার নেয় ২০১৫ সালে, যখন ইরানসমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানাসহ উত্তরাঞ্চলের বড় একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তখন সৌদি আরব ও আমিরাতের নেতৃত্বে গঠিত জোট সরকারকে ক্ষমতায় ফেরাতে সামরিক অভিযান শুরু করে।
এই জটিল পরিস্থিতির মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রিয়াদে বড় আকারের একটি সম্মেলন আয়োজন করা প্রয়োজন—যেখানে দক্ষিণ ইয়েমেনের সব গোষ্ঠী একত্র হয়ে ন্যায়সংগত সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে পারে।
ইয়েমেন সরকারের পক্ষ থেকেই আলোচনার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলেও জানায় রিয়াদ।
ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় ২০১৪ সালে। এর আগে থেকেই প্রাণঘাতী সংঘাত দারিদ্র্যপীড়িত দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ খাদ্যসংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
গৃহযুদ্ধের শুরুতে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা দ্রুতগতিতে রাজধানী সানাসহ ইয়েমেনের উত্তরের বেশির ভাগ অংশের দখল নেয়। সংঘাত তীব্র হয় ২০১৫ সালে। তখন সৌদি আরব, আমিরাতসহ আরব দেশগুলোর একটি জোট ইয়েমেন সরকারকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে সেখানে সামরিক অভিযান শুরু করে।
তবে হুতিদের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতির পর কয়েক বছর ধরে ইয়েমেনে সংঘাত ও লড়াই অনেকটা কমে এসেছে। ২০২২ সালে সৌদি আরবের সমর্থনে ইয়েমেনে প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল (পিএলসি) গঠিত হয়। হুতিবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীকে একত্র করতে এ কাউন্সিল গঠন করা হয়েছিল, যা এখন ভাঙনের পথে।
এদিকে, ২০২২ সালের পর দক্ষিণ ইয়েমেনের বৃহৎ অংশ আমিরাত-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) দখলে চলে গেছে। এসটিসিও আনুষ্ঠানিকভাবে পিএলসি জোটের অংশ। কিন্তু গত ২ ডিসেম্বর থেকে জোটের ভেতর সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠে।
এসটিসি এখন দক্ষিণে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এ লক্ষ্যে তারা দেশের পূর্বাংশে একটি বড় সামরিক অভিযান চালিয়েছে এবং দ্রুতই সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চল দখলে নিয়েছে।
এসটিসি ইয়েমেনের তেলসমৃদ্ধ হাজরামাউত প্রদেশও দখল করেছে। প্রদেশটি সৌদি আরব সীমান্তে অবস্থিত। এসটিসির দাবি, দক্ষিণে ‘স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার’ জন্য এ অভিযানের প্রয়োজন ছিল।
যদিও পিএলসির প্রধান রাশাদ আল-আলিমি এসটিসির অভিযানকে ‘বিদ্রোহ’ বলে বর্ণনা করে এর নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বিচ্ছিন্নভাবে এসটিসির এ চেষ্টা ইয়েমেনকে টুকরা টুকরা করে ফেলতে এবং এ অঞ্চলকে বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
এসটিসি এখন দক্ষিণে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এ লক্ষ্যে তারা দেশের পূর্বাংশে একটি বড় সামরিক অভিযান চালায় এবং দ্রুত সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চলের দখল নেয়।
এসটিসির সামরিক অভিযানের পাল্টা জবাব দিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলায় ওই অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। শুক্রবার হাজরামাউতে এসটিসির একটি সামরিক শিবিরে এ জোটের বিমান হামলায় সাতজন নিহত হয়েছেন।
এর আগে গত মঙ্গলবার দক্ষিণের মুকাল্লা বন্দরে বিমান হামলা চালায় এ জোট। তখন জোটের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়, আরব আমিরাতের পক্ষ থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্য সামরিক সরঞ্জামভর্তি দুটি জাহাজ পাঠানো হয়েছে।
হামলায় হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তবে হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগুনে পোড়া যানবাহনের ছবি দেখা গেছে।
আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা বলেছে, জাহাজে কোনো অস্ত্র ছিল না এবং ওই যানবাহনগুলো ইয়েমেনে অবস্থিত আমিরাতি বাহিনীর ব্যবহারের জন্য পাঠানো হয়েছিল।
মঙ্গলবারের হামলার পর ইয়েমেনের প্রেসিডেনশিয়াল কাউন্সিলের প্রধান বলেন, তাঁরা আমিরাতের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বাতিল করেছেন এবং তাঁদের বাহিনীকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন।
ইয়েমেন ইস্যুতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে কড়া অবস্থান নিয়েছে সৌদি আরব। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আমিরাত-সমর্থিত বাহিনীর কার্যক্রম ইয়েমেনের পূর্বাঞ্চলে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে এবং এসব পদক্ষেপ সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। এসটিসি বাহিনী ইতিমধ্যে সৌদি সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত অবশ্য এসটিসির সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানে নিজেদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে অভিযোগ অস্বীকারের কিছুক্ষণ পরই তারা ইয়েমেন থেকে বাহিনী প্রত্যাহারে সম্মতি দেয়—যা অনেকের কাছে অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা দিয়েছে।
চ্যাথাম হাউসের গবেষক ফারিয়া আল-মুসলিমির মতে, শুধুমাত্র বাহিনী প্রত্যাহার করলেই পরিস্থিতি বদলাবে না। তার ব্যাখ্যা, ২০১৯ সালের পর থেকে আমিরাত ইয়েমেনে বড় ধরনের সেনা উপস্থিতি রাখেনি; বরং তারা বিশেষ বাহিনী ও প্রক্সি নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করছে। ফলে এসটিসির আগ্রাসন থামার সম্ভাবনা কম।
ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট নেতৃত্বাধীন পরিষদ (পিএলসি)–এর প্রধান রাশাদ আল-আলিমি এসটিসির পদক্ষেপকে ‘বিদ্রোহ’ বলে উল্লেখ করে নিন্দা জানিয়েছেন। তার আশঙ্কা, এমন পদক্ষেপ দেশটিকে আরও ভেঙে দেবে এবং অস্থিতিশীলতা বাড়াবে।
নতুন উত্তেজনাকে অনেক বিশ্লেষক উপসাগরের দুই প্রভাবশালী শক্তি—সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে উদীয়মান প্রক্সি যুদ্ধ হিসেবে দেখছেন। তবে কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, এসটিসির সাম্প্রতিক অগ্রগতি ছিল বহুদিনের পরিকল্পিত ও প্রত্যাশিত।
বিবিসি আরবির সঙ্গে আলাপচারিতায় সাংবাদিক আনোয়ার আল-আনসি বলেন, দক্ষিণ ইয়েমেনের অধিকাংশ এলাকাই নিয়ন্ত্রণে আসায় এসটিসির আকাঙ্ক্ষা আরও জোরদার হয়েছে। আর গবেষক মুসলিমির ভাষায়, এসটিসির শীর্ষ নেতা আল-জুবাইদি বহুদিন ধরে স্বাধীন দক্ষিণ ইয়েমেনের দাবি তুলে আসছেন—এ দাবি থেকে তারা সহজে সরে দাঁড়াবেন না।
এসটিসির মুখপাত্র আনোয়ার আল-তামিমিও স্পষ্ট ভাষায় জানান, তাদের লক্ষ্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। তার দাবি, দক্ষিণের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে এবং তারা কাউকে বিভ্রান্ত করতে চাননি। তবে এই লক্ষ্য সৌদি নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয় বলেও আশ্বস্ত করেন তিনি।
তবে এই আশ্বাসে সৌদি-সমর্থিত পিএলসি বাহিনী পিছু হটবে কি না—তা এখনো অনিশ্চিত। বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেন ইস্যুতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দৃষ্টিভঙ্গি মূলত ভিন্ন। মুসলিমি বলেন, ভূগোল ও কৌশলগত স্বার্থেই দুই দেশের অবস্থান আলাদা—সৌদির সঙ্গে ইয়েমেনের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, কিন্তু আমিরাতের কোনো সীমান্তই নেই।
তার মতে, যদি এই দ্বন্দ্ব সরাসরি সংঘাতে রূপ নেয়, তবে পুরো অঞ্চলই বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সূত্র: বিবিসি