ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট যুদ্ধ পরিস্থিতি বড় আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন জাতিসংঘে কর্মরত মোহাম্মদ সাফা নামে এক উচ্চপদস্থ কূটনীতিক। তার অভিযোগ, ইরানের ওপর পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার হলে যে সম্ভাব্য পরিস্থিতি তৈরি হবে, সেটি সামলানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে জাতিসংঘ। এই পরিকল্পনার কথা ‘ফাঁস’ করার জন্য ওই কূটনীতিক তার সব কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন।

প্রায় ১২ বছর ধরে প্যাট্রিয়টিক ভিশন অর্গানাইজেশনের (পিভিএ) হয়ে জাতিসংঘে স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মোহাম্মদ সাফা রোববার (২৯ মার্চ) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ তার এক পোস্টে বলেন, তিনি আর ‘মানবতার বিরুদ্ধে এই অপরাধের সাক্ষী’ হয়ে থাকতে পারেন না।

সাফার অভিযোগ, জাতিসংঘের শীর্ষ নেতৃত্ব ভিন্নমত দমন করে একটি ‘প্রভাবশালী লবি’র স্বার্থ রক্ষা করছে, যারা ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে পরিকল্পিত ভ্রান্ত তথ্য প্রচারের মাধ্যমে যুদ্ধমুখী পরিবেশ তৈরি করছে।

এক্স-এ দেওয়া পোস্টে মোহাম্মদ সাফা ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ঘিরে সৃষ্ট বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব মানুষ ঠিকভাবে বুঝতে পারছে না উল্লেখ করে বলেন, ‘মানুষ পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পারছে না, কারণ জাতিসংঘ ইরানে সম্ভাব্য পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছে।’

তিনি পোস্টে সংযুক্ত তেহরানের ছবির কথা উল্লেখ করে বলেন, এটি তেহরানের একটি ছবি। তোমাদের মতো... যুদ্ধবাজদের জন্য বলছি—যারা এটিতে বোমা হামলার চিন্তায় আনন্দ পাচ্ছ।

এটি কোনো কম জনবসতিপূর্ণ মরুভূমি নয়। এখানে পরিবার আছে, শিশু আছে, পোষা প্রাণী আছে। স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকা সাধারণ কর্মজীবী মানুষ আছে। তোমরা অসুস্থ মানসিকতার বলে যুদ্ধ চাইছো।

‘তেহরান প্রায় এক কোটি মানুষের একটি শহর। কল্পনা করো—ওয়াশিংটন, বার্লিন, প্যারিস, লন্ডন কিংবা অন্য কোনো বড় শহরে পারমাণবিক বোমা হামলা হচ্ছে।’

এই তথ্য প্রকাশের জন্য নিজের কূটনৈতিক ক্যারিয়ার ত্যাগ করার কথা জানিয়ে সাফা বলেন, আমি আমার দায়িত্ব পালন স্থগিত করেছি, যাতে মানবতার বিরুদ্ধে এই অপরাধের অংশীদার বা সাক্ষী না হই—এবং দেরি হওয়ার আগে অন্তত একটি পারমাণবিক শীত (নিউক্লিয়ার উইন্টার) ঠেকানোর চেষ্টা করতে পারি।

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে শনিবার (২৮ মার্চ) যুদ্ধবিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গতকাল যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় এক কোটি মানুষ “নো কিংস” (রাজার শাসন চাই না) স্লোগানে প্রতিবাদ করেছে। পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কাকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে নেওয়া উচিত।এটি বিপজ্জনক।

তিনি জনগণকে রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এখনই পদক্ষেপ নিন। এই বার্তাটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিন। রাস্তায় নামুন। আমাদের মানবতা ও ভবিষ্যতের জন্য প্রতিবাদ করুন। কেবল জনগণই এটিকে থামাতে পারে। ইতিহাস আমাদের মনে রাখবে।

এছাড়া, সাফা তার পদত্যাগপত্রে গত তিন বছরে তার ক্রমবর্ধমান হতাশার কথা উঠে আসে। তিনি অভিযোগ করেন, জাতিসংঘের শীর্ষ কর্মকর্তারা ‘ক্ষমতার অপব্যবহার করে ওই লবির স্বার্থ রক্ষা করছেন’ এবং ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ থেকে আড়াল করছেন’।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, শীর্ষ কর্মকর্তারা ‘গাজায় যা ঘটছে তাকে গণহত্যা, লেবাননে যা ঘটছে তাকে যুদ্ধাপরাধ ও জাতিগত নিধন, কিংবা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী—এভাবে বর্ণনা করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন’।

তিনি আরও দাবি করেন, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর ভিন্ন মত দেওয়ার চেষ্টা করায় তিনি ও তার পরিবার ‘মৃত্যুর হুমকি’ পেয়েছেন এবং পেশাগতভাবে একঘরে হয়ে পড়েছেন।

কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি নেওয়ার আগে মোহাম্মদ সাফা জাতিসংঘের পরামর্শমূলক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন। ২০১৩ সাল থেকে তিনি প্যাট্রিয়টিক ভিশনের (পিভিএ) নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে (ইকোসক) বিশেষ পরামর্শক মর্যাদা পেয়েছে। ২০১৬ সালে তিনি সংস্থাটির স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত হন এবং এক দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন মহাসচিব ও মানবাধিকার পরিষদের সভাপতিদের অধীনে প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন।

সাফা জানান, জাতিসংঘ মহাসচিব প্রস্তাবিত সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে ফিরবেন না।

সাফার মতে, ইরানকে পারমাণবিক হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা একটি পরিকল্পিত ভ্রান্ত তথ্য প্রচার, যার মাধ্যমে বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধকে উসকে দেওয়া হচ্ছে।

তিনি অভিযোগ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম ও বৈশ্বিক গণমাধ্যম ব্যবহার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে, যাতে তারা বিশ্বাস করে ইরান বিশ্বশান্তির জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি।

তিনি এ কৌশলকে গাজা ও লেবাননের ঘটনাগুলোর যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার সঙ্গে তুলনা করেন।