নিউইয়র্কে জন্ম নেওয়া এপস্টেইন ১৯৭০-এর দশকে শহরের অভিজাত ডাল্টন স্কুলে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান পড়াতেন। এক শিক্ষার্থীর প্রভাবশালী বাবার সুবাদে তিনি বিনিয়োগ ব্যাংক বেয়ার স্টার্নসে চাকরি পান এবং মাত্র চার বছরের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটির অংশীদার হন।
১৯৮২ সালে তিনি নিজস্ব বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ‘জে এপস্টেইন অ্যান্ড কো’ প্রতিষ্ঠা করেন। এক সময় এই প্রতিষ্ঠান এক বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ পরিচালনা করত। অল্প সময়েই তিনি নিউইয়র্কের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত বাড়ি, ফ্লোরিডার প্রাসাদসম বাড়ি ও নিউ মেক্সিকোর বিশাল র্যাঞ্চের মালিক হন।
এর সঙ্গে গড়ে ওঠে রাজনীতিক, সেলিব্রিটি ও শিল্পপতিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ যৌন অপরাধী এপস্টিন সম্পর্কিত প্রায় ত্রিশ লাখ পাতা, ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি এবং ২ হাজার ভিডিও গত শুক্রবার প্রকাশ করছে। প্রকাশিত নথিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম এসেছে শত শত বার।
এই নথিগুলোর মধ্যে আছে জেফরি এপস্টেইনের কারাগারের থাকার সময়ের বিস্তারিত তথ্য যার মধ্যে তার মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক রিপোর্ট ও জেলে থাকার সময়ে মৃত্যুর তথ্য আছে।
প্রকাশিত নথিপত্রের মধ্যে এপস্টেইন ও বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির মধ্যে আদান-প্রদান করা ই-মেইলও রয়েছে।
ট্রাম্পের সাথে এপস্টিনের বন্ধুত্ব ছিল। তবে তিনি বলেছেন সেটি চুকে গেছে বহু বছর আগেই এবং তার যৌন অপরাধ বিষয়েও তার কিছু জানা ছিলো না বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চ বলেছেন, এগুলো আজ প্রকাশের মাধ্যমে দীর্ঘ ও বিস্তারিতভাবে নথি খুঁজে বের করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কাছে আইন মেনে চলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য এগুলোর যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলো।
এছাড়া এপস্টিনের সহযোগী গিসলেন ম্যাক্সওয়েলের বিরুদ্ধে তদন্তের নথিও আছে এর মধ্যে। ম্যাক্সওয়েলকে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের পাচারে এপস্টেইনকে সাহায্য করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।
প্রকাশিত নথিগুলোর মধ্যে এফবিআই গত বছর তৈরি করেছিল এমন একটি তালিকাও আছে। এতে ন্যাশনাল থ্রেট অপারেশন সেন্টারের কলসেন্টারে কর দিয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছিল সেগুলোও রাখা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলোই কোনো যাচাই না করা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা এবং এর পক্ষে কোনো প্রমাণ ছিল না।
এই তালিকায় ট্রাম্প, এপস্টেইন এবং আরও কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অনেক অভিযোগ রয়েছে।
ট্রাম্প বরাবরই এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়মের কথা অস্বীকার করে আসছেন এবং এপস্টেইনের অপরাধের কোনো ভুক্তভোগীও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ করেননি।
সর্বশেষ অভিযোগগুলো সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে হোয়াইট হাউস ও বিচার বিভাগ নতুন নথির সঙ্গে প্রকাশিত এক বিবৃতির একটি অংশের দিকে ইঙ্গিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের ওই বিবৃতিতে বলা হয়, কিছু নথিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত অভিযোগ রয়েছে। এগুলো ২০২০ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে এফবিআইয়ের কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল।
এতে আরও বলা হয়, স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই এবং মিথ্যা। যদি এগুলোর সামান্য বিশ্বাসযোগ্যতাও থাকত, তাহলে সেগুলো অনেক আগেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের একজন মুখপাত্র সর্বশেষ প্রকাশিত এপস্টিন নথিতে থাকা অভিযোগের জবাব দিয়েছেন। গেটস যৌনবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন-এমন তথ্যও সেখানে করা হয়েছে।
তার মুখপাত্র এসব অভিযোগকে 'একেবারেই হাস্যকর এবং সম্পূর্ণ মিথ্যা' বলে মন্তব্য করেছেন। ২০১৩ সালের ১৮ জুলাইয়ের দুটি ইমেইল এপস্টিনের লেখা বলে মনে হয়, তবে সেগুলো আদৌ বিল গেটসকে পাঠানো হয়েছিল কি-না, তা পরিষ্কার নয়।
ইমেইল দুটিই এপস্টিনের নিজস্ব ইমেইল ঠিকানা থেকে পাঠানো এবং আবার সেই একই ঠিকানায় ফেরত এসেছে। গেটসের সঙ্গে যুক্ত কোনো ইমেইল ঠিকানা সেখানে দেখা যায়নি। এছাড়া ইমেইলই স্বাক্ষরবিহীন।
ইমেইলগুলোর একটিতে বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন থেকে পদত্যাগপত্রের মতো করে লেখা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে যে রুশ মেয়েদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কের 'পরিণতি সামলাতে' গেটসের জন্য ওষুধ সংগ্রহ করতে হয়েছিল।
নতুন প্রকাশ করা নথিতে ব্রিটেনের এলিট ব্যক্তিদের সাথে এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক উঠে এসেছে। এর মধ্যে এপস্টিন ও 'দ্যা ডিউক' নামের একজনের মধ্যকার ইমেইলও আছে। ধারণা করা হয় তিনি হলেন এন্ড্রু মাউন্টব্যাটেন উইন্ডসর। ইমেইলে ডিনারের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যেখানে অনেক গোপনীয়তা থাকবে।
আরেকটি ইমেইলে এপস্টিন 'দ্য ডিউক'-কে ২৬ বছর বয়সী এক রাশিয়ান মহিলার সঙ্গে পরিচয় করানোর প্রস্তাব দিয়েছেন।
এই ইমেইলগুলো আগস্ট ২০১০-এ আদান-প্রদান করা হয়, যা এপস্টেইন একজন নাবালিকাকে প্রলুব্ধ করার দোষ স্বীকারের দুই বছর পরের ঘটনা।
এসব ইমেইলে কোনো অপরাধের ইঙ্গিত নেই। এপস্টিনের সঙ্গে অতীত বন্ধুত্বের কারণে মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরকে অনেক বছর ধরেই তদন্ত ও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। তিনি সবসময় কোনো অপরাধে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে আসছেন।
এপস্টিন সম্পর্কিত সব নথি প্রকাশের গল্প এখানেই শেষ হলো কি না তা এখনো নিশ্চিত নয়। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ বলেছেন, নথিগুলো প্রকাশের মাধ্যমে নথি খুঁজে যাচাই করার দীর্ঘ ও বিস্তারিত কাজ শেষ হয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে বিচার বিভাগ তার কাজ শেষ করেছে।
তবে, ডেমোক্র্যাটরা এখনও দাবি করছেন যে বিচার বিভাগ কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই সম্ভবত প্রায় দুই লাখ পঞ্চাশ হাজার নথি আটকে রেখেছে।
ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান রোহ খানা রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান থমাস মেসির সঙ্গে মিলে এপস্টেইন ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন যে, তিনি এ বিষয়ে সতর্ক।
"বিচার বিভাগ জানিয়েছে তারা ৬ মিলিয়নের বেশি পেইজ শনাক্ত করেছে, কিন্তু যাচাই ও কিছু অংশ কাটছাট করার পর মাত্র প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন পেইজ প্রকাশ করা হয়েছে," বলেছেন তিনি।
সূত্র: বিবিসি