হংকংয়ের একটি আদালত দেশটির গনতন্ত্রপন্থী মিডিয়া টাইকুন জিমি লাইকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। গত ডিসেম্বর মাসে তাকে জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর আগে পৃথক একটি ঔপনিবেশিক আইনের আওতায় রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে সাজা পেয়েছিলেন ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী লাই। ২০২০ সাল থেকেই তিনি বিভিন্ন অভিযোগে জেলে আছেন। পরিবার কারাগারে তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রায় ঘোষণার সময় লাই আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তার সমর্থকদের অনেককে আদালতের বাইরে রাতভর অবস্থান করেন।

লাইয়ের কারাদণ্ডকে ‘কার্যত একটি মৃত্যুদণ্ড’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে আন্তর্জাতিক সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সংস্থাটি বলছে, এমন দীর্ঘমেয়াদি একটি সাজা একই সঙ্গে একটি নিষ্ঠুরতা ও অন্যায়। লাইয়ের ওপর বছরের পর বছর চালানো নিপীড়ন চীনা সরকারের স্বাধীন সাংবাদিকতাকে ধ্বংস করা এবং যারা কমিউনিস্ট পার্টির সমালোচনা করে তাদের কণ্ঠ রোধ করার চেষ্টারই বহিঃপ্রকাশ। লাইয়ের ছেলে সেবাস্টিয়ান বলেছেন, ব্রিটিশ সরকার তার বাবার মুক্তির জন্য যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি।

তিনি এমন সময় এই অভিযোগ করেছেন যখন মাত্র কয়েকদিন আগেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার বেইজিং সফর করেছেন। যুক্তরাজ্যের জোরপূর্বক আটক ও জিম্মি বিষয়ক পার্লামেন্টারি গ্রুপও এক বিবৃতিতে বলেছে, দুর্বল কূটনীতির কারণে তার মুক্তি নিশ্চিত করার সুযোগ হাতছাড়া হলো।

লাইয়ের অপরাধকে গুরুতর ও পূর্বপরিকল্পিত বলে উল্লেখ করেছেন আদালত। পুরো রায় ৪৭ পৃষ্ঠার হলেও আদালত তার পুরোটা না পড়ে শুধু সাজার অংশটুকু পড়ে শুনিয়েছেন। ফলে মাত্র ৩০ মিনিটেই রায় পড়া শেষ হয়। লাইকে এ সময় শান্তভাবে ও হাসিমুখে মাথা নাড়তে দেখা গেছে।

সাদা জ্যাকেট ও কালো সানগ্লাস পরিহিত লাই ছাড়াও তার আপল ডেইলি নিউজপেপারের ছয়জন সিনিয়র এক্সিকিউটিভ আদালতে ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে। বিচারকরা তাদের রায়ে বলেছেন, অন্য কিছু বিষয়ের পাশাপাশি লাইয়ের অপরাধগুলো ছিল গুরুতর। যে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে তা সবচেয়ে গুরুতর শ্রেণির মধ্যে পড়ে।

জিমি লাই সবসময় নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আসছেন। ওদিকে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় দেওয়া লাইয়ের সাজাকে 'কঠিনতম সাজা' হিসেবে বর্ণনা করছেন অনেকে। এই আইনের আওতায় সাবেক আইনবিদ বেনি তাইকে ২০২৪ সালের নভেম্বরে ১০ বছরের জেল দেওয়া হয়েছিল।

কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট (সিপিজে) এক বিবৃতিতে জিমি লাইয়ের কারাদণ্ড দেওয়ার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। কমিটির সিইও জোডি গিনসবার্গ বলেছেন, হংকংয়ে আইনের শাসন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সিপিজে সাংবাদিকদের টার্গেট না করা এবং যেসব সাংবাদিক জেলে আছে তাদের মুক্তির জন্য হংকং কর্তৃপক্ষের প্রতি আহবান জানিয়েছে। সংস্থাটির হিসেবে চীনে এখন কমপক্ষে ৫১ জন সাংবাদিক জেলে আছে এবং হংকংয়ে আছেন ৮ জন।

চীনের ২০২০ সালে প্রবর্তিত জাতীয় নিরাপত্তা আইনের অধীনে মামলা হওয়া সবচেয়ে সুপরিচিত ব্যক্তি ৭৮ বছর বয়সী জিমি লাই। এই আইন তৈরি করা হয়েছিল ২০১৯ সালের হংকংয়ের গণতান্ত্রিক বিক্ষোভের পর। লাইকে হংকংয়ে অনেকে স্বাধীনতার রক্ষক মনে করেন। কিন্তু বেইজিং তাকে চীনের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে।

চীনের গুয়াংজুতে জন্ম নেওয়া জিমি লাই ১২ বছর বয়সে হংকংয়ে এসেছিলেন। পরে এক পর্যায়ে জনপ্রিয় পোশাক ব্রান্ড গিয়র্দানোসহ কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। পাশাপাশি তিনি নেক্সট ম্যাগাজিন ও আপল ডেইলির মতো গনতন্ত্রপন্থী সংবাদমাধ্যম চালু করেন। ১৯৮৯ সালে বেইজিংয়ের তিয়েনআননে স্কয়ারের গণতান্ত্রিক বিক্ষোভ দমনের পর লাই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কণ্ঠ হয়ে ওঠেন।