ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ঘিরে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আশঙ্কা জোরালো হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এ হামলা চালানো হতে পারে বলে গতকাল বুধবার জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। তবে যে বিক্ষোভের জেরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই নতুন সংকট, তা বেশ কমে এসেছে। ইরান থেকে সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার সংবাদদাতা জানিয়েছেন, গত সোমবার থেকে খুবই সামান্য পরিসরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হচ্ছে। সরকারপন্থী সমাবেশ বেড়েছে। এ ছাড়া গতকাল তেহরানে বিক্ষোভে নিহত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জানাজায় অংশ নিয়েছেন হাজার হাজার মানুষ।

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ থমথমে। যেকোনো সময় বড় কিছু ঘটতে পারে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের একটি চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যেকোনো মুহূর্তে ইরানে সামরিক হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত কয়েকদিন ধরেই ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছিলেন। বিশেষ করে ইরানে চলমান গণবিক্ষোভ দমনে সরকারের কড়াকড়ির প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প সরাসরি বিক্ষোভকারীদের পক্ষ নিয়ে সরকার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ইরানকে খুব বড় মূল্য দিতে হবে এবং মার্কিন সাহায্য খুব শীঘ্রই সেখানে পৌঁছাবে।

ইতোমধ্যেই উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন সামরিক শক্তিতে বড় ধরনের রদবদল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কাতারসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি থেকে মার্কিন সেনাদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। ইরান পাল্টা হুমকি দিয়ে বলেছে, তাদের ওপর হামলা হলে ওই অঞ্চলে থাকা সমস্ত মার্কিন ঘাঁটি এবং মিত্র দেশগুলোর ওপর ভয়াবহ প্রতিশোধ নেওয়া হবে। তেহরান সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা তুরস্কের মাটি ব্যবহার করে যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায়, তবে সেসব দেশও ইরানি মিসাইলের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, তারা যুদ্ধ চান না তবে যুদ্ধের জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন।

এদিকে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু বিবৃতি। বিক্ষোভকারীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে তিনি তাদের সরকারি দপ্তরগুলো দখলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। যদিও বুধবার রাতে ট্রাম্প কিছুটা নমনীয় সুর দেখিয়ে দাবি করেছেন, ইরানে বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতা বন্ধ হয়েছে বলে তিনি খবর পেয়েছেন, তবুও সামরিক হামলার আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছে না আন্তর্জাতিক মহল। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, ট্রাম্প ইতোমধ্যে হামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন এবং এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা। অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলো মার্কিন প্রশাসনকে সংযত থাকার এবং সামরিক পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়ে আসছে।

এমন পরিস্থিতিতে ইরানের সামরিক বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং যেকোনো আগ্রাসন ঠেকাতে ‘সর্বোচ্চ প্রস্তুতি’ ঘোষণা করেছে। তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে তারা ‘পুরো অঞ্চলে আগুন জ্বালিয়ে দেবে’। বুধবার (১৪ জানুয়ারি) রয়টার্স ও আল জাজিরাসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির চিত্র ফুটে উঠেছে।

ইউরোপীয় কর্মকর্তারা মনে করছেন, ট্রাম্প প্রশাসন এবার সত্যিই সামরিক পদক্ষেপের দিকে এগোচ্ছে। পেন্টাগন ইতিমধ্যে ট্রাম্পের কাছে ইরানের পরমাণু প্রকল্প, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা এবং সাইবার লক্ষ্যবস্তুসহ বিভিন্ন বিকল্প হামলার পরিকল্পনা জমা দিয়েছে।

যুদ্ধ পরিস্থিতির আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটি থেকে সেনাসদস্যদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং কাতারসহ অন্যান্য দেশের ঘাঁটিগুলোতে সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে লোহিত সাগরে ইউএসএস রুজভেল্টসহ যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি যুদ্ধজাহাজ অবস্থান করছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফের নির্ধারিত বৈঠক বাতিল হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে সব ধরনের কূটনৈতিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বলে জানা গেছে। এদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ স্পষ্ট করেছেন যে, যেকোনো বিদেশি আক্রমণ মোকাবিলায় তেহরান বিন্দুমাত্র পিছু হটবে না।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও সংলাপের মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্প হয়তো সরাসরি স্থল যুদ্ধের বদলে ২০২০ সালের মতো শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ড্রোন বা বিমান হামলা চালাতে পারেন।

সূত্র: রয়টার্স