সংযম ও আত্মশুদ্ধির প্রতীক রমযান মাসের অন্যতম নিয়ামত হল ইতিক্বাফ। আর এ মাসেই রয়েছে পবিত্র লাইলাতুল কদর, যা হাজার রাতের চেয়েও উত্তম। ২০ রোজার দিন সূর্যাস্তের আগেই পরবর্তী ১০ দিনের জন্য মসজিদে অবস্থান নিয়েছেন ইতিক্বাফ প্রত্যাশীরা। আরবী শব্দ ইতিক্বাফের আভিধানিক অর্থ হলো বাধ্যতামূলকভাবে কোনো কিছুকে ধরে রাখা। আর আহকামে শরীয়াহর পারিভাষায়, আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করার অপর নাম ইতিক্বাফ।
ইতিক্বাফের মূলভাবধারা হলো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবিন্দুতে মন-মগজকে এমন দৃঢ়ভাবে নিবদ্ধ রেখে অবস্থান করা যে, সেদিক থেকে দৃষ্টি মোটেও অন্যকোনো দিকে ফিরবে না। অর্থাৎ মসজিদে অবস্থান করাই হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্যে। অন্য কোনো দিকে দৃষ্টি দিতে গেলে লক্ষ্যে পৌঁছা বিঘিœত হবেই।
ইতিক্বাফ মূলত লাইলাতুল কদরের ফায়দা অর্জন ও নাজাত লাভের এক ঐশী আয়োজন। অন্য কথায় বলতে গেলে ইতিক্বাফ অনেকটা দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য অবস্থান ধর্মঘটের মতো। যতক্ষণ দাবি-দাওয়া আদায় না হবে ততক্ষণ অবস্থান থেকে একটুও নড়া হবে না। অনুরূপভাবে আল্লাহ তায়ালা যতক্ষণ পর্যন্ত লাইলাতুল কদরের বরকত ও ফজিলত লাভের সুযোগ না দিবেন ততক্ষণ পর্যন্ত আমি রমযান মাসে এই মসজিদ ছাড়া কোথাও নড়ব না, এই হল ইতিক্বাফ।
ইতিক্বাফকে বলা যায় বান্দাহকে রিলিফ দেয়ার জন্য আল্লাহতায়ালার ধার্যকৃত একটি সময়কাল। আল্লাহতায়ালার অনুগ্রহ ও সান্নিধ্য লাভ, গুনাহ-খাতা মাফ এবং বড় মাফের মর্যাদা অর্জনের জন্য একটি বিশেষ ওয়ার্কশপ।
ইতিক্বাফের আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। তা হল, ১. ইতিক্বাফ রোজার ত্রুটিসমূহের ক্ষতিপূরণ করে। ২. আল্লাহপাক ইতিক্বাফকারীদের গুনাহর দরজা বন্ধ করে দেন। ৩. কুচিন্তা, কুকথা ও কুকাজ থেকে বিরত থাকার এক মহা প্রশিক্ষণ ইতিক্বাফ। ৪. সকল বিষয়ে সংযম শিক্ষা দেয়। ৫. ইতিক্বাফে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রয়োজনে ঘরবাড়ি, স্ত্রী-ছেলে-মেয়ে, আত্মীয়-স্বজন, চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য সকল কিছু ত্যাগের জজবা পয়দা হয়। ৬. ইতিক্বাফ হলো রোজাদার বান্দার কাছ থেকে লাইলাতুল কদরের মতো মূল্যবান রাতটি যাতে হাতছাড়া হয়ে না যায়, মনিবের তরফ থেকে তারই হিকমতপূর্ণ ব্যবস্থা। ৭. হাদীসে বলা হয়েছে, ইতিক্বাফকারী যাবতীয় গুনাহ থেকে বেঁচে যায়। তার জন্য নেকীহসমূহ লিখা হয় ঐ ব্যক্তির মতো যে যাবতীয় নেক কাজ করে। (ইবনে মাজাহ)
ইত্বেকাফ সর্ম্পকে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আর যতক্ষণ তোমরা ইতেকাফ অবস্থায় মাসজিদসমূহে অবস্থান কর ততক্ষণ পর্যন্ত স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা করো না। এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। অতএব তোমরা এর নিকটবর্তী হয়ো না। এভাবে আল্লাহ তাঁর নিদর্শনাবলী মানব জাতির জন্যে সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন, যাতে তারা তাকওয়া অবলম্বন করে।“ (আল-বাক্বরহঃ ২:১৮৭)
আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সা. রমযানের মধ্যম দশকে ইতিকাফ করতেন। এক বছর এরূপ ইতিকাফ করেন, যখন একুশের রাত এল, যে রাতের সকালে তিনি তাঁর ইতিকাফ হতে বের হবেন, তিনি বললেন, যারা আমার সঙ্গে ইতিকাফ করেছে তারা যেন শেষ দশক ইতিকাফ করে। আমাকে স্বপ্নে এই রাত (লাইলাতুল কদর) দেখানো হয়েছিল। পরে আমাকে তা (সঠিক তারিখ) ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। অবশ্য আমি স্বপ্নে দেখতে পেয়েছি যে, ঐ রাতের সকালে আমি কাদা-পানির মাঝে সিজদা করছি। তোমরা তা শেষ দশকে তালাশ কর এবং প্রত্যেক বেজোড় রাতে তালাশ কর। পরে এই রাতে আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষিত হল, মসজিদের ছাদ ছিল খেজুর পাতার ছাউনির। ফলে মসজিদে টপটপ করে বৃষ্টি পড়তে লাগল। একুশের রাতের সকালে রাসূলুল্লাহ সা.এর কপালে কাদা-পানির চিহ্ন আমার দু’চোখ দেখতে পায়। (বুখারী)
ইতিক্বাফকারীদের জন্য কয়েকটি কাজ নিষেধ আছে। ১. প্রাকৃতিক প্রয়োজন ছাড়া মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে না। ২. স্ত্রী সহবাস করার সুযোগ নেই। ৩. রোগী দেখার জন্য যাওয়া যাবে না। ৪. দূরে কারো জানাযায় যাওয়া যাবে না। ৫. রোজা ভঙ্গ করা যাবে না। তাহলে ইতিক্বাফ হবে না। ৬. পুরুষেরা জামে মসজিদ ছাড়া ইতিক্বাফ করতে পারবে না।
লাইলাতুল কদর অনুসন্ধানের জন্য মূলত ইতেক্বাফ করা হয়। লাইলাতুল কদর বা শবে কদর। কদর শব্দের দু’টি অর্থ : ১. মর্যাদা নির্ধারণ, ২. লাইলা বা শব অর্থ : রাত। সে হিসাবে লাইলাতুল কদর বা শবে কদর অর্থ হলো মর্যাদার রাত্রি, ভাগ্য নির্ধারণের রাত্রি।
লাইলাতুল কদরে ইবাদত করে পাপী-তাপী বহু মর্যাদাহীন মানুষও পাপ-তাপ মুক্ত হয়ে মর্যাদাবান হয়ে যায়। আবার এই রাতেই মানুষের সারা বছরের ভাগ্য নির্ধারণ করা হয়। তাই এই রাতের নাম লাইলাতুল কদর বা শবে কদর। শবে বরাতকে ভাগ্য রজনী বলা হয়। কিন্তু কথাটা সঠিক নয়। কারণ এক বছরে আল্লাহর দু’বার ভাগ্য নির্ধারণের বিষয় কুরআন হাদীসে পাওয়া যায় না।
রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান এবং ইতিসাবের জন্য কদরের রাতে দাঁড়ায় (দাঁড়িয়ে নামায আদায় করে) আল্লাহতায়ালা তার পূর্বের গুনাহসমূহ মাফ করে দেন। (বুখারী)
কদরের রাতে যে দু’আটি বেশি বেশি পড়তে হয় তা হলো, আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন গাফুরা, তুহিব্বুল আফুউয়া, ফাআফুআন্নী। হে আল্লাহ! নিশ্চয় আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতেই ভালোবাসেন অতএব, আমাকে ক্ষমা করে দিন।
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা লাইলাতুল কদর তালাশ করবে রমযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে। (বুখারী)।