মিজানুর রহমান
সময়টা ছিল গত ১১ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার শীতের রাত, ঠিক যখন ঘড়ির কাঁটা দশটা ছুঁই ছুঁই করছে। গাজীপুরের মাওনা এলাকা থেকে আমাদের বাসটি বেরিয়ে গেল ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের উদ্দেশ্যে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বহু আকাঙ্ক্ষিত সেই ভ্রমণের সূচনা হলো। বাসের আরামদায়ক সিটে গা এলিয়ে দিলাম, মন তখন থেকেই কল্পনার রাজ্যে পাড়ি জমিয়েছে- দেখা হবে সবুজ আর পাথরের দেশ সিলেটকে।
পথের ক্লান্তি দূর করতে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই বাসটি এসে থামলো হবিগঞ্জের বিখ্যাত হাইওয়ে হোটেলে। এটি যেন এক চলমান আড্ডার বিরতিস্থল। নাস্তার বিরতিতে সহযাত্রীদের সঙ্গে গল্পে মেতে উঠলাম। কিন্তু ভ্রমণের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতা, আর সে রাতে সেটাই ঘটলো। হোটেল থেকে বেরিয়েই বাসটি পড়লো এক বিশাল জ্যামের মুখে। মনে হচ্ছিল, যেন পুরো রাতের ঘুমটা এই সড়কেই আটকা পড়ে আছে। ২-৩ ঘণ্টা ধরে কাছিমের গতিতে এগিয়ে চলল আমাদের বাহন। জানালার কাঁচ ভেদ করে রাতের স্নিগ্ধ ঠান্ডা বাতাস আসছিল বটে, কিন্তু অপেক্ষার প্রহর কাটছিল না। অবশেষে, ভোরের আলো ফোটার আগেই জ্যাম মুক্ত হয়ে বাস দ্রুত গতিতে ছুটতে শুরু করলো।
দীর্ঘ, প্রায় নয় ঘণ্টার যাত্রার পর সকাল সাতটায় আমরা পৌঁছলাম পুণ্যভূমি সিলেটে। বাসের জানালা খুলে চোখ মেলতেই দেখা গেল সিলেটের পরিচিত সবুজের ছোঁয়া। ক্লান্তি তখন উধাও, মন ভরে উঠলো এক অচেনা উদ্দীপনায়।
সিলেটে পৌঁছানোর প্রথম গন্তব্য ছিল আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্রÑহযরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহ। দরগাহ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতেই এক পবিত্র শান্তি অনুভূত হলো। শত শত মানুষের সমাগম, ধূপের গন্ধ আর নীরব প্রার্থনার মধ্য দিয়ে যেন এক অন্য জগতে প্রবেশ করলাম। জিয়ারত শেষে দরগাহ-সংলগ্ন এলাকার প্রাচীন মাদ্রাসার স্থাপত্য ও পরিবেশ দেখে মন ভরে গেল। ইতিহাসের সাক্ষী এই স্থানগুলোতে কিছু সময় কাটানো এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা এনে দিল। আমার আকাঙ্ক্ষিত স্থানগুলো দেখে সত্যিই ভালো লাগলো, যা ছিল এই ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্য।
ধর্মীয় স্থান পরিদর্শন শেষে আমরা ফিরে এলাম লোকালয়ে। স্থানীয় এক রেস্টুরেন্টে নাস্তা সারলাম। আমাদের পরবর্তী গন্তব্যÑ প্রকৃতির কন্যা জাফলং।
বাস আবার চলতে শুরু করলো। সিলেটের ভেতরের মায়াময় পথ ধরে ছুটে চললাম আমরা। পথের দু’পাশে ছিল ঘন সবুজের সারি, ছোট-বড় টিলা আর চা বাগান, যা চোখ জুড়িয়ে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, যেন কোনো শিল্পীর আঁকা ক্যানভাস ধরে এগিয়ে চলেছি। একসময় জাফলং-এর বুকে গিয়ে পৌঁছলাম। জাফলং মানেই যেন মেঘালয়ের কোলে বাংলাদেশের এক টুকরো স্বর্গের প্রতিচ্ছবি। পিয়াইন নদীর তীরে এসে পৌঁছাতেই মনটা আনন্দে নেচে উঠলো। নদীর জলে স্বচ্ছতা, দূর পাহাড়ের নীলাভ আভা আর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ছোট-বড় পাথর—সব মিলিয়ে এক অসাধারণ দৃশ্য। এখানে বহু রঙের পাথর দেখা যায়, যা সংগ্রহ করার লোভ সামলানো কঠিন। স্থানীয়দের কাছ থেকে বিভিন্ন জিনিসপত্র কেনা আর তাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানা, অর্থাৎ অজানাকে জানার এক সুযোগ পেলাম। সবচেয়ে মজার অভিজ্ঞতা ছিল হিমশীতল ঠান্ডা পানিতে গোসল করা। শরীরের সব ক্লান্তি যেন এক মুহূর্তে ধুয়ে মুছে গেল সেই স্ফটিক স্বচ্ছ জলের স্পর্শে। বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে এই আনন্দে মেতে ওঠা, পাথরের স্তূপের উপর বসে ছবি তোলাÑ সবই আমাদের এই ভ্রমণ কাহিনিতে যোগ করেছে এক নতুন মাত্রা। এটিই ছিল আমাদের ভ্রমণের সবচেয়ে আনন্দের অংশ, যা মনে থাকবে দীর্ঘদিন।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো, আর সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে শুরু হলো ফেরার পালা। মন ভরে গেলেও সময় তো ফুরোয়। একরাশ তৃপ্তি আর আনন্দের স্মৃতি নিয়ে আমরা আবার বাসের আসনে চেপে বসলাম।
এবার আর কোনো জ্যাম ছিল না, ছিল শুধু বাড়ির দিকে ফেরার তীব্র আকাক্সক্ষা। আমাদের বাস হনহন করে সিলেটের সবুজ পথ ধরে বাড়ির উদ্দ্যেশ্যে রওনা করলো। রাতের আঁধারে বাসের আলো ঝলমলে দৃশ্য আর ভেতরের হালকা কোলাহল এক মিশ্র অনুভূতির জন্ম দিচ্ছিল।
সারারাতের নীরব যাত্রার পর, ফজরের আজানের আগেই আমাদের বাস বাড়ির একেবারে কিনারে এসে থামলো। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পরও মনে কোনো ক্লান্তি ছিল না, ছিল কেবল আনন্দের রেশ। সহিহ সালামতে ঘরে ফেরা হলো, আর স্মৃতিতে রয়ে গেল সিলেটের এক অসাধারণ, মায়াময় এবং অবিস্মরণীয় ভ্রমণ কাহিনি।