মোহাম্মাদ মনিরুজ্জামান, মোংলা : বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলবর্তী সুন্দরবনে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যটনের নতুন এক মাত্রা যুক্ত হয়েছে। বনসংলগ্ন খাল ও নদীর তীরে গোলপাতা, কাঠ ও বাঁশ দিয়ে নির্মিত নান্দনিক ইকো-রিসোর্টগুলো এখন পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। একসময় সুন্দরবনে ভ্রমণ করতে এসে থাকার উপযুক্ত ব্যবস্থার অভাবে পর্যটকদের ভোগান্তিতে পড়তে হতো। কিন্তু বর্তমানে এসব পরিবেশবান্ধব রিসোর্ট সেই ঘাটতি পূরণ করেছে এবং একইসাথে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

রিসোর্টগুলো মূলত প্রাকৃতিক উপকরণে নির্মিত এবং ম্যানগ্রোভ বনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ডিজাইন করা হয়েছে। নদীর জোয়ার-ভাটার ছন্দে ঘেরা এই রিসোর্টগুলোর প্রতিটি কক্ষে রয়েছে নিজস্ব বারান্দা, যেখানে বসে পর্যটকরা উপভোগ করতে পারেন বন ও নদীর অপার সৌন্দর্য। যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল থেকে দূরে নীরব নিস্তব্ধ প্রকৃতির মাঝে রাত্রিযাপন, ওপেন ডাইনিং স্পেসে বসে ন্যাচারাল মেডিটেশন, এবং স্থানীয় রান্নার স্বাদ—সব মিলিয়ে পর্যটকদের জন্য এটি এক অনন্য অভিজ্ঞতা হয়ে উঠছে।

ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা এক পর্যটক বলেন, “আগে সুন্দরবনে কোথায় থাকব তা নিয়ে চিন্তা করতে হতো। এখন এই রিসোর্টগুলো হওয়ায় অনেক সুবিধা হয়েছে।” আরেক নারী পর্যটক জানান, “রিসোর্ট থেকে বানর দেখা বা প্রাকৃতিক জীবজন্তুর দেখা পাওয়া এক অন্যরকম অনুভূতি।” একইভাবে, এক শিক্ষার্থী পর্যটক জানান, “আমরা বাজেট-ফ্রেন্ডলি থাকার ব্যবস্থা খুঁজতাম; এই রিসোর্টগুলো আমাদের জন্য যথেষ্ট আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী।”

বর্তমানে শুধু ঢাংমারী খালের পাশেই গড়ে উঠেছে প্রায় ১৩টি ফরেস্ট রিসোর্ট, যা স্থানীয় পর্যটন খাতকে গতিশীল করেছে। এসব রিসোর্টে প্রত্যেকটিতে পাঁচ থেকে দশজন পর্যন্ত স্থানীয় কর্মী কাজ করেন—ফলে প্রায় এক হাজার মানুষের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে। এতে দেশের পর্যটন খাত যেমন সমৃদ্ধ হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে স্থানীয় আয় ও সরকারি রাজস্বও।

স্থানীয় পর্যটন বিনিয়োগকারীরা জানান, “আমাদের উদ্দেশ্য কেবল পর্যটন বিকাশ নয়, বরং আশেপাশের লোকাল কমিউনিটিকে আর্থ-সামাজিকভাবে আরও এগিয়ে নেওয়া।” বন কর্মকর্তারাও মনে করেন, এসব রিসোর্টের মাধ্যমে এলাকার মানুষ বিকল্প আয়ের উৎস পাচ্ছেন, ফলে বনের উপর নির্ভরশীলতা কমছে এবং অবৈধ কর্মকা- হ্রাস পাচ্ছে। ঘাগরামারী ফরেস্ট ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, “রিসোর্টগুলোর মাধ্যমে এলাকার তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, তারা এখন বনের সম্পদের উপর নির্ভর না করে সেবামূলক কাজে যুক্ত হতে পারছে।”

সরকার ইতোমধ্যে দেশের পর্যটন শিল্পকে বিকাশিত করতে নানাবিধ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ উদ্যোগের পরিপূরক হিসেবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে এমন পরিবেশ-সম্মত ইকো-রিসোর্ট গড়ে ওঠা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দিক। এতে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগমন বাড়বে, এবং সুন্দরবনকে ঘিরে একটি টেকসই ও দায়িত্বশীল পর্যটন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হবে। সব মিলিয়ে, গোলপাতা ও কাঠ-বাঁশের এই ইকো-রিসোর্টগুলো শুধুমাত্র সুন্দরবনের পর্যটন সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করছে না; বরং স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নেরও বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠছে।