মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের এমন এক দীপ্তিময় নক্ষত্র, যিনি ধর্ম, মানবতা, বিদ্রোহ এবং প্রেমকে একসঙ্গে গেঁথে দিয়েছেন কাব্য ও সংগীতে। তার অনূদিত “আমপারা” (পবিত্র কুরআনের ৩০তম পারার সূরাগুলোর কাব্যিক অনুবাদ) বাংলা ভাষায় ইসলামী ভাবধারার কাব্যরূপে অনন্য এক উচ্চতাকে স্পর্শ করেছে। শুধু অনুবাদ নয়; বরং এটি বাংলা কবিতার পরিমণ্ডলে ধর্মীয় ভাষ্যকে নান্দনিক ও ছন্দময় রূপ দেওয়ার ব্যতিক্রমী এক প্রয়াস।

‘কাব্য-আমপারার’ ‘আরজ’ (ভূমিকা) অংশে গ্রন্থটি লিখার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে কবি লিখেছেন, “আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সাধ ছিল পবিত্র ‘কোর-আন শরীফের বাঙলা পদ্যানুবাদ করা। সময় ও জ্ঞানের অভাবে এতদিন তা করে উঠতে পারিনি। বহু বৎসরের সাধনার পর খোদার অনুগ্রহে অন্ততঃ পড়ে বুঝবার মতও আরবী-ফার্সি ভাষা আয়ত্ত করতে পেরেছি বলে নিজেকে ধন্য মনে করছি। কোর-আন শরীফের মত মহাগ্রন্থের অনুবাদ করতে আমি কখনো সাহস করতাম না বা তা করবারও দরকার হত নাÑযদি আরবী ও বাঙলা ভাষায় সমান অভিজ্ঞ কোনো যোগ্য ব্যক্তি এদিকে অবহিত হতেন। আমার বিশ্বাস, পবিত্র কোর-আন শরীফ যদি সরল বাঙলা পদ্যে অনূদিত হয়, তাহলে তা অধিকাংশ মুসলমানই সহজে কণ্ঠস্থ করতে পারবেনÑঅনেক বালক-বালিকাও সমস্ত কোর-আন হয়ত মুখস্থ করে ফেলবে। এই উদ্দেশ্যেই আমি যতদূর সম্ভব সরল পদ্যে অনুবাদ করবার চেষ্টা করেছি।”

‘কাব্য-আমপারা’র প্রথম প্রকাশ ১৯৩৩ সাল; প্রকাশক: মেসার্স করিম বক্স ব্রাদার্স পাবলিশার্স ও বুক-সেলার্স, ৯, আন্তনী বাগান, কলকাতা। পৃষ্ঠাসংখ্যা: ১২৮। মূল্য : সরেশ বাঁধাই ২‖ক্স (২.৫০) টাকা, মলাট বাঁধাই: ২˴ (২.০০) টাকা। উৎসর্গ করেছেন ‘বাঙলার নায়েবে-নবী মৌলবী সাহেবানদের দস্ত-মোবারকে।’ ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন’, ‘বাংলা একাডেমি’ ও ‘নজরুল ইনস্টিটিউট’ পৃথক-পৃথকভাবে ‘কাব্য-আমপারা’ প্রকাশ করেছে।

এ গ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে কবি উল্লেখযোগ্য ৮টি তাফসির-গ্রন্থের সহায়তা নেওয়ার কথা ‘আরজ’ (ভূমিকা)-অংশে উল্লেখ করেছেন। ভাবতে অবাক লাগে: কবির মতো সাধারণ-অল্পশিক্ষিত একজন ব্যক্তি কীভাবে জগদবিখ্যাত ৮টি আরবি তাফসির গ্রন্থ আয়ত্ত করলেন! এ ছাড়াও তিনি মৌলানা আক্রাম খান ও মৌলানা রুহুল আমীন সাহেবের আমপারা অধ্যয়নের কথাও উল্লেখ করেছেন। সূচিপত্রের নাম দিয়েছেন ‘খোলাসা’ (সারাংশ) এবং সূচি-পৃষ্ঠার শেষে রয়েছে ‘তাম্মাত’ (সমাপ্ত) শব্দটি। গ্রন্থের পরিশিষ্টে সূরাসমূহের যাবতীয় শানে-নুজুল ও আবশ্যিক শব্দের ‘হাওয়ালা’ (রেফারেন্স) উল্লেখ করেছেন। কবি এখানে শানে-নুজুলের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় শব্দের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা, আয়াত-সংখ্যা, শব্দ-সংখ্যা, অক্ষর-সংখ্যা এবং রুকুর সংখ্যাও উল্লেখ করেছেন। ‘সূরা ফাতেহা’ আমপারার অংশ না-হলেও তবু কেন এ-সূরাকে ‘আমপারা’য় যুক্ত করেছেন তারও কৈফিয়ত দিয়েছেন। তিনি বলেন: “ইহা কোর-আনের শেষ খণ্ড আমপারায় নাই, ইহা কোর-আন শরীফের প্রথম খণ্ডের প্রথম সূরা। নামাজ, বন্দেগী, প্রার্থনা প্রভৃতি সকল পবিত্র কাজেই সূরা ফাতেহার প্রয়োজন হয় বলিয়া আমপারার সঙ্গে ইহার অনুবাদ দেওয়া হইল।” কবি কুরআন শরিফের তরতিব বা ধারাবাহিক সাজানোর অনুরূপ ‘সূরা নাবা’ থেকে ‘সূরা নাস’ পর্যন্ত সাজাননি; বরং তিনি উল্টোভাবে ‘সূরা নাস থেকে ক্রমান্বয়ে ‘সূরা নাবা পর্যন্ত সাজিয়েছেন। এটা কবির ব্যতিক্রম প্রয়াস। ‘কাব্য-আমপারা’য় মোট ৩৮টি কনটেন্ট বা বিষয়বস্তু রয়েছে। প্রত্যেক সূরার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’র ভিন্ন-ভিন্ন কাব্যানুবাদ কবির কাব্য-দক্ষতার প্রমাণ বহন করে।

বাংলা বাহিত্যে পবিত্র কুরআনের অনুবাদের বিরল দৃষ্টান্তের মধ্যে নজরুল অনুবাদ করলেন ‘কাব্যে আমপারা’। সমকালে ধর্মীয় সাহিত্যে যেখানে শুধু গদ্যানুবাদকে প্রাধান্য দেওয়া হতো সেখানে কাব্য ও ধর্মের মিলিত বন্ধনে আধুনিক ইসলামি কাব্য-ভাবধারার সূচনা করলেন নজরুল। এর ফলে ধর্ম ও সাহিত্যের উপলব্ধির মাত্রা বেড়ে যায় বহুগুণ।

‘কাব্য-আমপারা’ অনুবাদ করে কবি নজরুল ধর্মীয় অনুবাদের ক্ষেত্রে স্বীয় ধর্মভাবনা, ইসলামি চেতনা ও সৃজনশীলতার দুয়ার খুলে দেন। এ অনুবাদ সে-সময় ইসলামি ভাবধারার ভিন্নতর ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। তার পূর্বে বাংলা ভাষায় পবিত্র কুরআনের অনুবাদ বলতে গদ্য, অর্থ ও ব্যাখ্যামূলক অনুবাদকে বোঝাত; কিন্তু নজরুল এর বিপরীতে অবস্থান করে ছন্দ ও অলংকারে উৎকর্ষ সাধন করে দেখান যে, পবিত্র কুরআনের কাব্যানুবাদ করাও সম্ভব। তার এ-অনুবাদ সে-সময় শুধু ধর্মানুভূতির প্রকাশই ছিল না; বরং এটি ছিল একপ্রকার যুদ্ধÑযা ধর্মীয় সাহিত্যে কৃত্রিমতার বেড়া ভেঙে দেয়।

তিনি ইসলামের মৌলিক দিক ঠিক রেখে ভাষা ও তাত্ত্বিকতাকে উচ্চকিত করে ‘আমপারা’ অনুবাদ করেন। তার ‘কাব্য-আমপারা শুধু অর্থানুবাদ নয়; বরং উৎকৃষ্ট ভাবানুবাদ। এতে রয়েছে আরবি ভাষার সৌন্দর্য, ছন্দ ও ভাবকে ভাষান্তর করার প্রয়াস। এ অনুবাদ শাশ্বত কুরআনের খোদায়ি জ্যোতির আলোকে কৃত একটি সফল তর্জমা—যাতে ছন্দ, ধ্বনি ও ভাবের একপ্রকার রোশনির ঝলক দেখা যায়।

এ অনুবাদ-গ্রন্থটিতে পরকালের ভয়াবহতা (সূরা তাকভীর, ইনফিতার, ইনশিকাক), আল্লাহর একত্ব (সূরা ইখলাস), ইহকালের ক্ষণস্থায়ীত্ব (সূরা আসর), মিথ্যার পরিণাম ও সত্যের বিজয় (সূরা হুমাযা, কাওসার), পারলৌকিক ভাবনা (সূরা মাউন) ইত্যাদি সম্মিলিতভাবে গ্রন্থিত হয়েছে। এখানে নজরুল দেখিয়েছেন ধর্ম কুসংস্কার নয়; বরং ধর্মই হচ্ছে মানবমুক্তির একমাত্র পথ। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে সমকালীন বাংলা বানানরীতি অক্ষুণ্ন রেখে কবিকৃত অনুবাদের হুবহু পাঠ উদাহরণ হিসেবে পেশ করা হলো। কবিকৃত ‘সূরা ফাতেহার অনুবাদ নিম্নরূপ:

শুরু করিলাম লয়ে নাম আল্লার,/করুণা ও দয়া যার অশেষ অপার।

সকলি বিশ্বের স্বামী আল্লার মহিমা,/ করুণা কৃপার যার নাই নাই সীমা।

বিচার দিনের বিভু! কেবল তোমারি/ আরাধনা করি আর শক্তি ভিক্ষা করি।

সরল সহজ পথে মোদেরে চালাও,/ যাদেরে বিলাও দয়া সে পথ দেখাও।

অভিশপ্ত আর পথ-ভ্রষ্ট যারা, প্রভু,/ তাহাদের পথে যেন চালায়ো না কভু!

‘কাব্য-আমপারা কবি নজরুলের একটি মৌলিক অনুবাদÑযেখানে মিশে আছে তার ধর্মীয় বিশ্বাস, ভাষার লালিত্য ও ছন্দের জাদুকরী প্রভাব। যেমন নজরুলের অনূদিত ‘সূরা আল-কাওসার লক্ষ করলে দেখা যায়—“অনন্ত কল্যাণ তোমা দিয়াছি নিশ্চয়,/ অতএব তব প্রতিপালক যে হয়/ নামাজ পড় ও দাও কোরবাণী তারেই,/ বিদ্বেষে তোমারে যে, অপুত্রক সে-ই।” অনুবাদে কবি ভাব, ভাষা, ছন্দ ও সুরের প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করেছেন।

কবি আমপারার কাব্যিক অনুবাদ করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি ভাষার ভাব, ছন্দ ও অলংকারকে সূরার অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবনে পাঠকের মর্মমূলে পৌঁছে দিয়েছেন। যেমন ‘সূরা আদিয়াত-এর অনুবাদে রয়েছে: “বিদ্যুৎ-গতি দীর্ঘশ্বসা/ (বীর-বাহী উটের শপথ),/ যাহার চরণ-আঘাতে উগারে/ তপ্ত ব‎িহ্ন ফিনকি বৎ।” এখানে কবি আরবের উষ্ট্র ও অশ্বারোহীর রণদৃশ্য এমনভাবে চিত্রায়িত করেছেন, যা তাঁর চিত্রকল্প ও রূপকের ব্যবহারে হয়ে উঠেছে অদ্বিতীয়।

পবিত্র কুরআনের অনুবাদের ক্ষেত্রে ‘কাব্য-আমপারা এ-যাবৎকালের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। কেননা কবির ব্যক্তিগত বিশ্বাস, ধর্মানুশীলন ও শব্দের সংগীতীয় অনুরণন মহান স্রষ্টার দিকে পাঠককে সম্মোহিত করে। তাঁর অনুবাদ ‘মর্মার্থ তুলে আনে; রচে ‘অর্থের শরীর। এ ছাড়া নজরুলের কাব্যানুবাদে কোথাও আরবি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, আবার কোথাও বাংলা শব্দের ব্যাখ্যা দিয়েছেন; যেন পাঠক চিন্তন ও অনুভবÑউভয় স্তর আয়ত্ত করতে পারে। ‘সূরা আল-ইখলাস-এ তিনি লেখেন: “বল, আল্লাহ এক! প্রভু ইচ্ছাময়,/ নিষ্কামনিরপেক্ষ, অন্য কেহ নয়।/ করেন না কাহারেও তিনি যে জনন,/ কাহারও ঔরস-জাত তিনি নন।/ সমতুল তার/ নাই কেহ আর।” আল্লাহ নিজেই চিরন্তন, অজন্মা এবং কারো দ্বারা সৃষ্ট নন; এমনকি এমন চিন্তা বা ধারণা করাও অমূলক যে, আল্লাহর কোনো পূর্বসূরি বা জন্মদাতা থাকতে পারে।

‘কাব্য-আমপারা নিছক অনুবাদ নয়; বরং খোদাভীতি, প্রত্যাশা ও আত্মসমপর্ণের শিল্পিত এক অবয়ব। সুফিবাদ, তাকওয়া, হক, সবর, ইখলাস ইত্যাদি কুরআনিক ধারণা কাব্যিক ব্যঞ্জনায় মর্মরিত। সবচেয়ে বড় কথা: কবি নজরুলের ‘কাব্য-আমপারা শুধু মুসলিম নয়; বরং বাংলা সাহিত্যের পাঠক এতে এক অনির্বচনীয় শিল্পগুণ খুঁজে পাবেন। এটি ধর্মীয় অনুভূতিকে কাব্যিক উচ্চতায় পৌঁছানোর অনন্ত এক প্রয়াস।

পবিত্র কুরআনের দীপশিখা যুগে-যুগে পথহারা মানুষকে দিয়েছে সুপথের দিশা। কবি এখানে পথহারা সে মানুষের কাক্সিক্ষত ফল-লাভের সেতুবন্ধন তৈরি করেছেন। কবির চোখে শাশ্বত গ্রন্থের কাব্যানুবাদ হয়ে উঠেছে চিরকালীন চেতনার সৌধ। তিনি বাংলা ভাষাকে দান করলেন অমূল্য রত্ন। এ অনুবাদ হৃদয়ে প্রশান্তি আনে, যাবতীয় পঙ্কিলতা ঝরনার মতো ধুয়ে দেয় আর আকাশের মতো বিশালতায় সবকিছুকে ঢেকে রাখে করুণার ছায়ায়।

কবির অনুবাদে আছে মেঘের গর্জন, ফুলের সৌরভ, সবুজের বুকে মায়াময় প্রশান্তি। এ অনুবাদ যেন ধ্যানমগ্ন সাধকের লক্ষ্যভেদী শর। ‘কাব্য-আমপারা পাঠকের কাছে কখনও জ্যোৎস্নার আলো; কখনও সূর্যের অমিত তেজ; আবার কখনও মৃদুমন্দ সমীরণ। এটি শুধু ধর্মবিশ্বাসের ভাষ্য নয়; এটি যেন শাশ্বত আরাধনার কবিতা। নজরুলের অনুবাদ যেন বাংলা ভাষায় গানের ছন্দ, পাখির কলতান, কলকল নদীর বয়ে চলার চপল ধ্বনি। এ অনুবাদ বায়তুল্লাহর ইমামের যেন কণ্ঠস্বরÑবহু দূর থেকে ভেসে আসা আজানের সুমধুর তান। এ অনুবাদের মাধ্যমে বাংলা ভাষাও লাভ করেছে নান্দনিক পূর্ণতা। এটি শুধু অনুবাদ নয়; যেন সাহিত্যিক একটি বিপ্লব। বাংলা ভাষায় নজরুলের ‘কাব্য-আমপারা’ সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সাহিত্যগুণসম্পন্ন কাব্যিক এক খনি। তিনি এ অনুবাদের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে একটি নবজাগরণ সৃষ্টি করেছেনÑযে জাগরণের ফল্গুধারা যুগ থেকে যুগান্তরে সাহিত্য-প্রেমিকদের জোগাবে অনন্ত রসধারা। প্রতিটি মুসলমানের মনের মিনারে কাব্যিক এ অনুবাদ যেন পত-পত করে উড্ডীন পতাকা। ভাষারীতির দিক থেকে এ-গ্রন্থের প্রতিটি ছত্র উৎকর্ষিত। নজরুল আরবি শব্দ, কুরআনিক পরিভাষা এবং বাংলা ভাষার রসধারা একত্র করে নতুন এক সুর সৃষ্টি করেছেন। যেমন: কবি ‘সূরা নাজিয়াতে’র ১৬-১৭ নং আয়াতের অনুবাদ করেন: “তাহার প্রভু যখন তারে করিলেন সেই সম্বোধন/ পূত “তোওয়া” প্রান্তরে, “ফেরাউনের বরাবর,/ উচ্ছৃঙ্খল হয়েছে সে। বলবে তারে অতঃপর,-/ তুমি পাক হতে কি চাও? দেখাইয়া দিই তোমায়/ তোমার প্রভুর দিকের পন্থা, চলবে হে ভয় করে তার।” কবি ঐতিহাসিক প্রতীক সৃষ্টি করে আধুনিক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। এখানে অলংকারের যথাযথ ব্যবহারে মধুর এক সুর সৃষ্টির প্রত্যয় লক্ষ করা যায়। কবি এ-কাব্যানুবাদে মাত্রাবৃত্ত ও অক্ষরবৃত্ত ছন্দের ব্যবহার করেছেন। তবে ক্ষণে ক্ষণে মুক্তছন্দের প্রয়োগও লক্ষ করা যায়। এতে করে তিনি আরবি ভাষার সংগীতধর্মীতা রক্ষা করেছেন।

তবে অনুবাদের ক্ষেত্রে কবি যদি মূল আরবি-টেকস্ট পাশাপাশি রাখতেন তা হলে পাঠকগণ আরও বেশি উপকৃত হতেন। “বাঙলার নায়েবে-নবী মৌলবী সাহেবানদের দস্ত-মোবারকে”Ñকবি কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করলেও সেই “নায়েবে-নবীগণ” গ্রন্থটির সঠিক গুরুত্ব অনুধাবন করেছেন কি-না তার নজির খুব একটা চোখে পড়ে না। তাই ‘কাব্য-আমপারার গুরুত্ব বিবেচনায় একটিকে দেশের প্রাথমিক স্তরে পাঠ্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত করা যায় কি-না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে বই-কি। এতে করে আমাদের দেশে জাতীয় কবির অবদান চর্চার দৈন্য কিছুটা হলেও লাঘব হবে বলে আমার বিশ্বাস।

বাংলা সাহিত্যে কুরআন-বিষয়ক সাহিত্যকর্মে এ-বইটি অগ্রপথিক। ড. আনিসুজ্জামান এই কাব্যগ্রন্থ নিয়ে গবেষণা করেন ও তাঁর “কাজী নজরুল ইসলামের কাব্য আমপারা: ধর্মীয় কাব্যানুবাদের নতুন ধারা” প্রবন্ধে এ-গ্রন্থের সাহিত্যগুণ বিশ্লেষণ করেন। এ গ্রন্থ নজরুলকে শুধু একজন ধর্মনিষ্ঠ কবি নয়, একাধারে কাব্যপ্রতিভা ও অনুবাদক-হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এটি নজরুলের ঈমানি চেতনার শিল্পসাধনা। বাংলা সাহিত্যে কুরআনের অনুবাদ ও ব্যাখ্যাকে সৃষ্টিশীল এক ভাষায় উপস্থাপন করার এটি সফল একটি প্রয়াস। এই গ্রন্থ প্রমাণ করেÑধর্মীয় বিষয়েও কবিতা সর্বোচ্চ সৌন্দর্য ও গভীরতা লাভ করতে পারে, যদি অনুবাদক হন নজরুলের মতো একজন “বিদ্রোহী ধার্মিক কবি”।

তথ্যসূত্র:

১. কাব্য-আমপারা, কাজী নজরুল ইসলাম, ১ম প্রকাশ ১৯৩৩ খ্রি. প্রকাশক: মেসার্স করিম বক্স ব্রাদার্স পাবলিশার্স ও বুক-সেলার্স, ৯ আন্তনী বাগান, কলিকাতা, পিডিএফ প্রিন্ট।

২. নজরুল-রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ, ২০১২, ৫ম খণ্ড, বাংলা একাডেমী, ঢাকা।

৩. শব্দে শব্দে আল কুরআন, মাওলানা মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, ১৪শ খণ্ড, নিউ সৌরভ বর্ণালী প্রকাশনী, বাংলাবাজার, ঢাকা।

৪. বাংলায় আল কোরআনের কাব্যানুবাদের পরম্পরা : একটি পর্যবেক্ষণ, আবদুল্লাহ আল মুনীর; অনলাইন ব্লগ রাইটিং

৫. বুক রিভিউ : কাব্য আমপারা- আবদুল কাইয়ুম শেখ, অনলাইন ব্লগ রাইটিং।