আল পারভেজ

ভাষা কি কেবল ভাব প্রকাশের মাধ্যম, নাকি এটি একটি রাজনৈতিক ভূখণ্ড? এই প্রশ্নটি চিরকালই অমীমাংসিত। মানুষ যখন কথা বলে, তখন সে কেবল শব্দ উচ্চারণ করে না, বরং একটি ইতিহাস, একটি সংস্কৃতি এবং সর্বোপরি একটি নির্দিষ্ট মনস্তত্ত্বকে বহন করে। বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘আজাদি’, ‘ইনকিলাব’, ‘বয়ান’ কিংবা ‘বন্দোবস্তের’ মতো শব্দগুলো নিয়ে যে তুমুল বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা আদতে কেবল ব্যাকরণগত বা ভাষাতাত্ত্বিক কোনো বিরোধ নয়; বরং এটি একটি গভীর রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের বহিঃপ্রকাশ। শব্দ এখানে অস্ত্র, আবার শব্দই এখানে আত্মপরিচয়ের ঢাল।

শব্দের বিবর্তন ও ইতিহাসের সরণি

বাংলা ভাষা কোনো বদ্ধ জলাশয় নয়, এটি একটি প্রবাহমান নদী। এই নদীতে আর্য, অনার্য, দ্রাবিড় থেকে শুরু করে তুর্কি, ফারসি, আরবি, ইংরেজি ও পর্তুগিজ শব্দের পলি জমেছে যুগে যুগে। আজ যারা ‘ইনকিলাব’ বা ‘আজাদি’ শব্দ শুনে চমকে উঠছেন বা একে ‘বিদেশি’ বলে তকমা দিচ্ছেন, তারা সম্ভবত ভুলে যান যে, আমরা যখন ‘আদালত’ বলি, ‘আইন’ বলি, কিংবা ‘চেয়ার-টেবিল’ বলি—সেগুলোও কোনোটিই খাঁটি তদ্ভব শব্দ নয়।

উপমহাদেশের রাজনীতিতে ভাষার ব্যবহার সবসময়ই ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ব্রিটিশ আমলে ‘লিবার্টি’ বা ‘ফ্রিডম’ শব্দটি যখন শিক্ষিত শ্রেণির মুখে মুখে ফিরত, তখন সাধারণ মানুষের কাছে ‘আজাদি’ বা ‘মুক্তি’ ছিল প্রাণের স্পন্দন। খেলাফত আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন, এরপর ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি মোড়েই নির্দিষ্ট কিছু শব্দ মানুষের মনে স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়েছে। একাত্তরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের স্লোগান ছিল না, সেটি ছিল একটি জাতির অস্তিত্বের ঘোষণা। কিন্তু সময়ের আবর্তে দেখা যায়, রাজনৈতিক দলগুলো যখন ক্ষমতায় জেঁকে বসে, তখন তারা ভাষার ওপর একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম করতে চায়। তারা ঠিক করে দিতে চায় কোন শব্দটি ‘দেশপ্রেমিক’ আর কোনটি ‘বিজাতীয়’।

ট্যাগিংয়ের রাজনীতি ও মনস্তাত্ত্বিক খেলা

বিগত কয়েক দশকের বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ট্যাগিং’ বা তকমা দেওয়ার সংস্কৃতি একটি ভয়াবহ ব্যাধিতে পরিণত হয়েছিল। শাসকগোষ্ঠীর জন্য এটি ছিল একটি অব্যর্থ মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র। কাউকে কোণঠাসা করতে হলে বা তার কণ্ঠরোধ করতে হলে তার গায়ে নির্দিষ্ট কিছু শব্দের লেবেল এঁটে দেওয়াই ছিল যথেষ্ট। ‘রাজাকার’, ‘শিবির’, ‘বিএনপি-জামায়াত’—এই শব্দগুলোকে কেবল রাজনৈতিক পরিচয় হিসেবে নয়, গালি বা অপবাদ হিসেবে ব্যবহারের একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া আমরা দেখেছি।

এই মনস্তাত্ত্বিক খেলার মূল লক্ষ্য ছিল ভীতি তৈরি করা। আপনি যদি কোনো যৌক্তিক দাবি তোলেন, আর শাসকগোষ্ঠী যদি আপনাকে ‘রাজাকার’ বা ‘দেশদ্রোহী’ ট্যাগ দিতে পারে, তবে আপনার দাবির নৈতিক ভিত্তি সমাজিক ও আইনিভাবে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এটি এক ধরনের ‘লিঙ্গুইস্টিক ফ্যাসিজম’ বা ভাষাগত ফ্যাসিবাদ। এখানে সাহিত্য বা ব্যাকরণ কোনো বিষয় নয়, বরং শব্দকে ব্যবহার করা হয় অপরকে খারিজ করে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে। এই যে মানুষকে নির্দিষ্ট বাক্সে বন্দি করে ফেলার প্রবণতা, এটি মুক্তচিন্তা ও সংস্কৃতির জন্য সবচেয়ে বড়ো বাধা। যখন মানুষের মুখ দিয়ে স্বাভাবিক শব্দগুলো কেড়ে নেওয়া হয়, তখন সে তার ক্ষোভ প্রকাশের জন্য বিকল্প শব্দের সন্ধান করে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে ‘ইনকিলাব’ বা ‘আজাদি’ শব্দগুলোর পুনরুত্থান মূলত সেই রুদ্ধ দুয়ার ভেঙে বেরিয়ে আসার একটি চেষ্টা।

নজরুল, গ্রাফিতি এবং ২০২৬-এর প্রেক্ষাপট

বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ছিলেন দুঃসাহসী। তিনি যখন ‘রক্তাম্বরধারিণী মা’ লিখছেন, তখনই আবার লিখছেন ‘আনোয়ার’, ‘খালেদ’ বা ‘আজাদ’। তিনি সংস্কৃত শব্দের পাশে অবলীলায় ফারসি শব্দ বসিয়ে দিয়েছেন। তার ‘বিদ্রোহী’ কবিতা আজও কেন প্রাসঙ্গিক? কারণ নজরুল জানতেন, বিদ্রোহের কোনো নির্দিষ্ট ভাষা নেই; বিদ্রোহের ভাষা হলো সেই ভাষা যা অত্যাচারীর সিংহাসন কাঁপিয়ে দেয়।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আমরা দেখলাম দেয়ালে এবং শহরের রাজপথে নজরুলের কবিতার পঙক্তিগুলো নতুন করে প্রাণ পেয়েছে। ‘কারার ওই লৌহকপাট, ভেঙে ফেল কর রে লোপাট’—এই শব্দগুলো কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের বা দলের নয়, এগুলো হয়ে উঠেছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সর্বজনীন প্রতিবাদ। গ্রাফিতিতে যখন ‘আজাদি’ লেখা হয়, তখন সেটি আর কেবল একটি উর্দু বা ফারসি শব্দ থাকে না, সেটি হয়ে ওঠে শৃঙ্খলমুক্তির আকাঙ্ক্ষা। এই যে শব্দের শক্তি, যা মানুষকে রাস্তায় নামিয়ে আনে, তার চূড়ান্ত ফল হিসেবেই আমরা ২০২৬ সালের নির্বাচন পেলাম। এই নির্বাচনে মানুষ কেবল ভোট দিতে চায় নি, সে তার নিজের ভাষায় কথা বলার ‘বন্দোবস্ত’ চেয়েছিল। তবে বিপত্তিটা ঘটল নির্বাচন পরবর্তী সময়েই।

কেন এই শব্দ বিতর্ক?

বর্তমানে ‘ইনকিলাব’ বা ‘ইনসাফ’ শব্দগুলো নিয়ে যে আপত্তি উঠছে, তার পেছনে কাজ করছে পরিবর্তনের ভয়। যখন কেউ বলে ‘নয়া বন্দোবস্ত’, তখন পুরনো ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা শঙ্কিত বোধ করেন। ইনকিলাবের বদলে ‘বিপ্লব’ বলা যায় অথবা ইনসাফের বদলে ‘সুবিচার’ বলা যায়। তবে এই শব্দগুলোর মধ্যে যে প্রতিবাদ উচ্চারিত হউ, সেগুলো অন্য শব্দে খুব একটা ফুটে ওঠে না।

আসলে শব্দ একীভূত হয় যুগের প্রয়োজনে। ভাষা কোনো স্থবির ডিকশনারি নয়। আজ যা ‘নতুন’ বা ‘অপরিচিত’, কাল তা-ই প্রাত্যহিক হয়ে উঠতে পারে। বিশ্ব রাজনীতিতে এমন উদাহরণ ভুরি ভুরি। ‘প্রলেতারিয়েত’ শব্দটি একসময় কেবল তাত্ত্বিক ছিল, কিন্তু রুশ বিপ্লবের পর তা সারা বিশ্বের শোষিত মানুষের পরিচয়ে পরিণত হয়। আবার বর্তমান বিশ্বে ‘ওয়াক’ (ডড়শব) বা ‘ক্যানসেল কালচার’-এর মতো শব্দগুলো রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।

রাজনীতিবিদরা কেন শব্দের এই লড়াইয়ে নামেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ‘পারসেপশন’ বা ধারণার রাজনীতিতে। তারা জানেন, যদি কোনো শব্দের সঙ্গে বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর তকমা লাগিয়ে দেওয়া যায়, তবে সেই গোষ্ঠীকে আক্রমণ করা সহজ হয়। যখন কোনো মন্ত্রী বলেন, ‘ইনকিলাব বাংলার সাথে সম্পর্কহীন’, তখন তিনি আসলে ভাষার পরিধি ছোটো করছেন না, তিনি একটি নির্দিষ্ট আদর্শিক গোষ্ঠীকে জনবিচ্ছিন্ন করতে চাইছেন। এটি একটি ধ্রুপদী রাজনৈতিক কৌশল। কিন্তু তারা ভুলে যান যে, ভাষা কোনো সরকারি আদেশে চলে না। ভাষা চলে মানুষের প্রয়োজনে।

সাহিত্য ও সংস্কৃতির দায়

একজন লেখক বা চিন্তাবিদ হিসেবে আমাদের দেখা প্রয়োজন, এই শব্দগুলো কি আমাদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করছে নাকি সংকীর্ণ করছে? নজরুল যখন ‘খুন’ শব্দটিকে ‘রক্ত’ অর্থে ব্যবহার করতেন, তখন কি বাংলা ভাষা ছোটো হয়েছিল? হয়নি। বরং বাংলার ভাঁড়ার পূর্ণ হয়েছিল। শব্দ তো কেবল বর্ণের সমষ্টি নয়, এর পেছনে থাকে একটি মেজাজ বা ‘মুড’। ‘বিপ্লব’ বললে যে ধীরস্থির পরিবর্তনের ছবি ভাসে, ‘ইনকিলাব’ বললে তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষিপ্রতা ও তীব্রতা অনুভূত হয়। আবার ‘আজাদি’ শব্দটির মধ্যে যে রোমান্টিকতা ও ত্যাগের আবহ আছে, ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি অনেক সময় রাষ্ট্রীয় ও দাপ্তরিক গাম্ভীর্যে তা হারিয়ে ফেলে।

সমস্যা শব্দের নয়, সমস্যা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির। আমরা যখন শব্দকে রাজনৈতিক পক্ষালম্বনের হাতিয়ার বানাই, তখনই বিভাজন তৈরি হয়। সাহিত্যিক বা সংস্কৃতিকর্মীরা কেন এই শব্দগুলো ব্যবহার করছেন? কারণ তারা বর্তমান সময়ের স্পন্দন অনুভব করতে পারছেন। সাধারণ মানুষের মনে যে ক্ষোভ, যে দীর্ঘশ্বাস বা যে স্বপ্ন জমা হয়ে আছে, তা প্রকাশের জন্য তারা প্রচলিত অভিধানের বাইরে গিয়ে নতুন বা পুরনো কিন্তু শক্তিশালী শব্দের আশ্রয় নিচ্ছেন।

উপসংহার: ভাষার মুক্তিই মানুষের মুক্তি

শব্দ কি চিরকাল একই অর্থ বহন করে? না। সময়ের সাথে শব্দের অর্থ ও দ্যোতনা বদলে যায়। একসময় ‘কমরেড’ শব্দটি ছিল সম্মানের, আজ তা অনেক জায়গায় ব্যঙ্গ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আবার ‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দটি একসময় নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শকে বোঝাত, আজ তা যে কোনো স্বৈরাচারী আচরণের সমার্থক।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘আজাদি’, ‘ইনকিলাব’ বা ‘নয়া বন্দোবস্ত’ শব্দগুলো কেবল কিছু ধ্বনি নয়; এগুলো হলো একটি পরিবর্তনের সংকেত। মানুষ যখন পুরনো শৃঙ্খল ভাঙতে চায়, তখন সে ভাষাকেও শৃঙ্খলমুক্ত করতে চায়। শাসকগোষ্ঠীর ‘ট্যাগিং’-এর রাজনীতি যখন ব্যর্থ হয়, তখনই নতুন শব্দের জোয়ার আসে।

আমাদের মনে রাখা উচিত, ভাষা কোনো মমি নয় যে তাকে মিউজিয়ামে কাঁচের নিচে সাজিয়ে রাখতে হবে। ভাষা হলো একটি সজীব সত্তা। তাকে বাড়তে দিতে হবে, তাকে গ্রহণ ও বর্জনের স্বাধীনতা দিতে হবে। ‘ইনসাফ’ বা ‘ইনকিলাব’ শব্দগুলো যদি মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে তীব্র করে, তবে তাতে কার কী ক্ষতি? যদি ‘আজাদি’ শব্দটির মাধ্যমে মানুষ তার হারানো অধিকার ফিরে পাওয়ার প্রেরণা পায়, তবে তাকে বিজাতীয় বলার সংকীর্ণতা কেন?

প্রশ্নটি এখানে শেষ হয় না, বরং শুরু হয়—আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে কেবল অনুমোদিত শব্দে কথা বলতে হবে? নাকি এমন একটি সমাজ চাই যেখানে ভাষার প্রতিটি রঙ, প্রতিটি সুর তার নিজস্ব মহিমায় বিকশিত হবে? উত্তরটি সময়ের গর্ভে নিহিত, তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—শব্দের রাজনীতি দিয়ে মানুষের মনের ভাষা কোনোদিনও স্তব্ধ করা যায়নি, যাবেও না। ভাষার দুয়ার উন্মুক্ত থাকাই হোক আমাদের আগামীর অঙ্গীকার। ২০২৬-এর প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আমরা যেন কেবল নতুন শাসক নয়, একটি নতুন ও উদার ভাষাগত সংস্কৃতিরও প্রত্যাশা করি। কারণ, ভাষার মুক্তিই শেষ পর্যন্ত মানুষের মুক্তি।