সুমন রায়হান
শিল্প ও সাহিত্যের কাগজ ডাকটিকিটি। জুলাই বিপ্লব সংখ্যাটি বের হয়েছে চলতি বছরের অক্টোবরে। ৩৭৬ পৃষ্ঠার সমৃদ্ধ সংখ্যাটি প্রকাশ করে ডাকটিকিট পরিবার এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন। স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা যেমন কঠিন তেমন বিপ্লব। দুই হাজার প্রাণ, চল্লিশ হাজার মানুষের অঙ্গহানি আর অগণিত মানুষের রক্ত আর চোখের পানির বিনিময়ে এসেছে আমাদের এই বিপ্লব। এখন আমাদের এই বিপ্লব টিকিয়ে রাখতে হবে যে কোন মূল্যে। আমাদের থাকতে হবে মাঠে থাকতে হবে পাঠে এবং লেখায়। অর্থাৎ আগামী প্রজন্মের জন্য লিখতে হবে অদম্য সাহসের এই বিজয় গাঁথা। চব্বিশের এই বিপ্লবকে নিয়ে লিখতে হবে কবিতা গান গল্প উপন্যাস নাটক ও প্রবন্ধ। আর এভাবেই বেঁচে থাকবে বিপ্লব প্রজন্মের পর প্রজন্ম। ডাকটিকিটের এই সংখ্যাটি একদিকে বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির ধারক ও বাহক অন্যদিকে বিপ্লবের ঐতিহাসিক দলিল।
শুরুতেই ঋষি কাব্যের অসাধারণ দুটি বিপ্লবী কবিতা। তুমুল আগ্রহ নিয়ে পড়তেই বিপ্লবী হয়ে ওঠে মন । তারপর শহীদ আনাস এর চিঠি ও ফাইয়াজ এর মায়ের চিঠি পড়ে চোখ ভিজে যায়। শহীদ আনাস এর চিঠি প্রমাণ করে এই প্রজন্ম দেশকে কত ভালবাসে। দেশের জন্য জীবন দেয়া কতটা গৌরবের!
এখনও চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে জুলাই। আহা রক্তাক্ত জুলাই। অম্লান ৩৬। জুলাই স্মৃতি কাঁদায় আবার প্রেরণা যোগায়। সেই জুলাই স্মৃতি নিয়ে লিখেছেন সম্মুখ সারির সমন্বয়কগণ। তাদের লেখা পড়ে অনেক অজানা বিষয় জেনেছি- যা এত দিন শুধু শুনেছি । পেয়েছি প্রেরণা। নাহিদ ইসলাম-এর আন্দোলনে বন্দিত্বের দিনগুলো পড়ে পাঠক নির্মম নির্যাতন আর সাহসের চিত্র খুঁজে পাবেন।
যেভাবে শুরু: ছাত্র অধিকার থেকে ছাত্রশক্তি নিবন্ধে একটি নিরপেক্ষ নির্মোহ ইতিহাস তুলে ধরেছেন রাফে সালমান রিফাত, গণঅভ্যুত্থানের নেপথ্যের শক্তি- সাদিক কায়েম এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ। শিবিরের ভূমিকা তুলে ধরেছেন অত্যন্ত স্বচ্ছ সাবলীলভাবে। আলী আহসান জুনায়েদ-এর জুলাই স্মৃতি, এস এম ফরহাদ-এর ৯ দফা থেকে শেখ হাসিনার পতন সমৃদ্ধ রচনা। ৯ দফার আঁতুড়ঘর রুম নম্বর ১২০৪ রচনায় অন্তু মুজাহিদ তুলে ধরেছেন তার চোখের সামনে কিভাবে ৯ দফা তৈরি হয়েছিল। কারা কিভাবে তা মিডিয়ায় পৌঁছানো ও প্রচারের দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ক্ষেত্রে শিবিরের অবদান চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে নিয়ে প্রবন্ধ লিখে পত্রিকাটি সমৃদ্ধ করেছেন সময়ের অন্যতম চিন্তক ও প্রাবন্ধিকগণ। নিচে প্রবন্ধ ও প্রাবন্ধিকের নাম উল্লেখ করা হল।
ছাত্র-জনতার সফল বিপ্লব বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় -ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী, কথা বলার স্বাধীনতা -কাজী জহিরুল ইসলাম, কালচারাল ফ্যাসিবাদ -জগলুল আসাদ, অভ্যুত্থানের দায় ও আত্মনির্ভর চিন্তাতত্ত্বের গঠন- মুসা আল হাফিজ, ঐতিহাসিক পলায়ন লক্ষ্মণ সেন থেকে শেখ হাসিনা -সরদার আবদুর রহমান, আমাদের শত্রু- কায় কাউস, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সাংস্কৃতিক রাজনীতি-সরোয়ার তুষার। মনোজ মিত্রের ‘মেষ ও রাক্ষস’: রাষ্ট্রনৈতিক ক্ষত ও জুলাই বিপ্লব প্রাসঙ্গিকতা- মো. দিদারুল ইসলাম, জুলাই বিপ্লবের আবাবিল পাখিরা ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দেয়া নেপথ্য নায়কের দল -সরোজ মেহেদী, তিতুমীর থেকে জুলাই বিপ্লব আত্মপরিচয়ের প্রতিরোধ চেতনার ধারাবাহিকতা- মীর সালমান শামিল, স্লোগানে স্লোগানে জুলাই বিপ্লব তুমি কে, আমি কে? বিকল্প। বিকল্প! -জব্বার আল নাঈম।
সীসান্ত আকরাম-এর মল্লিকের গান-কবিতায় দ্রোহ ও জাগরণ রচনায় কবি মতিউর রহমান মল্লিককে তুলে ধরেছেন সাবলীলভাবে। শাহাদাৎ সরকার-এর দেয়ালে দেয়ালে জাগ্রত জুলাইতে উঠে এসেছে গ্রাফিতির আদ্যোপান্ত। মজনু শাহ থেকে নুরউদ্দিন বাকের জং, ফুলচৌকি থেকে ২৪: ইতিহাস জালিয়াতির সিলসিলাহ্ - নোমান সাদিক-এর তথ্যসমৃদ্ধ প্রবন্ধ। তবে আরো প্রাঞ্জল সাবলীল ও গতিশীল হওয়া বাঞ্ছনীয়।
দুটি সাক্ষাৎকারই অসাধারণ ও ঐতিহাসিক। সাক্ষাৎকারদাতা ও গ্রহীতার পরিমিতিবোধ বেশ ভাল লেগেছে। পাঠকের প্রবল পাঠ আগ্রহের মধ্যেই শেষ করেছেন কথা। শিরোনাম দুটিও মনে রাখার মত, কোট করার মত। সময়ের সাহিত্য সংস্কৃতি, রাজনীতি বিষয়ক অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা উঠে এসেছে সাক্ষাৎকারে।
‘ইনসাফের লড়াই চালিয়ে যাওয়াই বিজয়, জিতে যাওয়াই শুধু বিজয় নয়’ -শরিফ ওসমান হাদি
“কবি ও কবিতাকে যদি বলি ‘বিপ্লবের প্রতীক’ তাহলে এই বিচারে অনেক কবিই বাদ পড়ে যাবেন, কিন্তু মল্লিক বরং উজ্জ্বল হয়ে উঠবেন” -মুন্সী বোরহান মাহমুদ ।
একটি বিপ্লব - অগনিত গল্প। তার কিছু উঠে এসেছে ছোট গল্পে। সবগুলো গল্পেই বিপ্লবকে ধারণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রিয় সেই গল্প ও গল্পকারের নাম এক নজরে দেখে নিতে পারি।
শহীদ-নাজিব ওয়াদুদ, শহীদের বোন-দেওয়ান মোহাল্লাদ শামসুজ্জামান, জুলাই বিপ্লবের গল্প জীবনের বুদবুদ -জুবায়ের হুসাইন, শহীদ আলী রায়হানের বিড়াল- মনির বেলাল, শেকল ভাঙার শব্দ -আসাদুল্লাহ মামুন, শিশুর রক্তে ঋণের বিপ্লব- তাসনীম মাহমুদ, ডিবি-রহমান মাজিদ, কালের গল্প-সাইফ আলি।
তাহসান কবির-এর অসৎপুরাণ ও লোকমান হোসেন জীবন-এর বীর সাইদ মঞ্চনাটকের ডায়ালগ অনেকটাই কাব্যিক। পিনাকির ফুলকুমারী নিয়ে চমৎকার আলোচনা করেছেন জুবায়ের বিন ইয়াছিন।
এক সাথে নয়-গদ্যের ফাঁকে ফাঁকে দেয়া হয়েছে বিপ্লবী কবিদের কবিতা। বিষয়টি উপভোগ্য। আবদুল হাই শিকদার, জাহাঙ্গীর ফিরোজ, পিনাকী ভট্টাচার্য, আশরাফ আল দীন, আমিনুল ইসলাম, জুলফিকার শাহাদাৎ, জগলুল হায়দার, রকমনু, নয়ন আহমেদ, মনসুর আজিজ, রেদওয়ানুল হক, তাজ ইসলাম, আবু জাফর সালেহী, মুহিববুলাহ জামী, জুননু রাইন, সুমন রায়হান, পলিয়ার ওয়াহিদ, হাবীব কাইউম, ওয়াহিদ আল হাসান, হাসনাইন ইকবাল-এর কবিতায় সমৃদ্ধ হয়েছে ডাকটিকিট। ফিলিস্তিনি কবি মুইন বাসিসুর কবিতা ‘পদচ্ছাপ অনুবাদ করেছেন হিজল জোবায়ের। তবে আরো কয়েকটি কবিতার অনুবাদ হলে কবিকে জানার আরো সুযোগ হত।
’২৪-এর বিপ্লবের টাইমলাইন: ৫ জুন থেকে ৫ আগস্ট, জুলাই ঘোষণাপত্র, জুলাই সনদের খসড়া ও জুলাই গ্যালারিতে দর্শনার্থীদের স্টেটম্যান্ট -
ছাপিয় ডাকটিকিট প্রমাণ করল জুলাই শুধু তাদের মুখে নয় অন্তরেও লেপটে আছে। ডাকটিকিট এগিয়ে যাক নতুন বাংলাদেশের দিকে। ইনকিলাব জিন্দাবাদ।