আতা সরকার

১. আমাদের চাইতে খানিকটা বড়োই হবে। পাড়ায় নতুন এসেছে। ঢুকে পড়েছে আমাদের বন্ধু মহলে। বন্ধু-বান্ধবরা আমরা পরস্পরকে তুই-তোকারি করি। কখনো কখনো তুমি। গুরুজন বা আমাদের চাইতে খানিক বড়দেরকে আপনি। আমাদের এই নবাগত বন্ধু ছোট-বড় সবাইকে আপনি আপনি। আমি তখন ফাইভ কি সিক্সে পড়ি। এক বিকেলে আমাকে একলা পেয়ে আচমকাই চেপে ধরল: আপনি তো এই এতোটুকুন পিচ্চি মানুষ। পোলাপান তো বটেই, আপনার চাইতে বড়দেরকেও দেখেছি আপনাকে সাহেব বলে ডাকে। শুধুই নাম ধরে ডাকে না কেন? আমি সরাসরি জবাব না দিয়ে পাল্টা জিজ্ঞেস করলাম: আমার নাম কি, বলুন তো? জবাব এলো: জানি তো, আপনি কবির। সবাই এর সাথে সাহেব লাগিয়ে ডাকে। কবির সাহেব। আমার তো হাসি চাপাই দায়। আমার পাশে যে খেলার সাথীরা রয়েছে, তারা হেসে ফেলল। আমি হাসি চেপেই বললাম: আমার নাম কবির নয়। আমি আতাউর রহমান। ডাকনাম মিন্টু। নতুন বন্ধুর মুখে বিস্ময়: তাহলে সবাই কবির সাহেব বলে কেন? জবাবটা দিল আমার পাশের সাথী: কবির সাহেব নয়, ওকে ডাকা হয় কবি সাহেব বলে। ও তো কবিতা লেখে। তাই। সাথীর মুখ থেকে জবাবটা শুনে বুকটা কি একটু ফুলে গেল? গর্বে মাথাখান খানিক সোজা হলো? নাকি লাজুক একটুকরো ভাব মুখ রাঙ্গিয়ে দেমাকটারই জানান দিল? কিছুই হলো না। সাধারণ একটা বিষয় যেন। তখন থেকেই মনে গেঁথে আছে, আমি কবিই হবো।

২. ছন্দের দুলুনিটা মনের কোণায় জায়গা করে নিয়েছে সেই ছোটবেলার অ আ ক খ পাঠকালেই। শুরু ‘চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে কদমতলায় কে/ হাতি নাচে ঘোড়া নাচে রামছাগলের বে’ দিয়ে শুরু; পোক্ত হয়েছে ‘বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ/ মাগো আমার শোলোক বলা কাজলা দিদি কই?’ দিদি নন, মাথার উপর আমার দুইজন বোন রয়েছেন বড়ো বুজান আর ছোটো বুজান। তাঁদের আবার চার ভাই। এক ভাই মাথার উপর ডাকেন মিয়াভাই বলে। বাকি তিনজন তাঁদের ছোট। সব ছোটোটিই আমি। গায়ে-গতরে হ্যাংলা, গায়ের রং কালো। আমাকে কালো বললে রেহাই নেই কারো। সোজা জানিয়ে দেন, তাঁদের ভাইটি কালো নয় মোটেও- শ্যামলা। এই ভাইটি তাঁদের পুতুল যেন। তাকে গোছল করিয়ে দেন আবে জমজমের পানির লোভ দেখিয়ে, ধুমছে সাবান ঘষে যেন এক গোছলেই কালো ভাইটিকে ফরসা করে তুলবেন। স্নো পাউডার মাখিয়ে দেন মুখে। গায়ে মাথায় ঘানির খাঁটি সরিষার তেল। আমার ডাগর দুটো চোখ নাকি জগতের সেরা নয়ন যুগল। যত্ন করে চোখের পাপড়িতে কাজল এঁকে দেন। কখনো কখনো ভাইটিকে মেয়ের সাজ পরিয়েও আনন্দ পান। এভাবেই আমার বেড়ে ওঠা। এরপর আমাদের ঘরে আসে আরো দুটি মিষ্টি বোন। আমাদের ভাইবোনের সংখ্যা দাঁড়ায় আটজনে চার ভাই চার বোন।

৩. বোনের কাছেই আমার অক্ষর জ্ঞান। সেকালে দুটো বই অক্ষরজ্ঞানে কাজে লাগানো হতো শিশুশিক্ষা ও বাল্যশিক্ষা। হাল আমলের বইগুলোর মতো কোনো রঙ ছিল না, ছবি ছিল না- নিপাট সাদাকালো, আকর্ষণহীন। এই বই খেলার মাঠকে ভুলাতে পারতো না। অসুখ হলে যেমন ্ওষুধ খেতে হবে, তেমনি বড়ো হতে হলে এই বইটাই পড়তে হবে। এই বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে যখন ঝুরঝুরা হয়ে যাওয়ার উপক্রম, সেদিনই সাইকেলের বেল বাজাতে বাজাতে মিয়াভাই এলেন নতুন বই নিয়ে। রঙ্গিন। ছবিওয়ালা। কী যে আনন্দ! ঈদে নতুন জামা পাওয়ার মতো। অন্যদিন টেনে পড়াতে বসানো যায় না, সেদিন সন্ধ্যায় নিজে থেকেই হাতমুখ ধুয়ে হাঁটু মুড়ে বসলাম পড়তে। তখন ইলেক্ট্রিসিটির বালাই নে, নামই জানি না। হারিকেনের সলতে উস্কে দিয়ে মনোযোগী ছাত্র হয়ে গেলাম। মুগ্ধতা আরো পেয়ে বসল ছন্দের দোলা, পদ্যের ঘোর। কবি রবীন্দ্র নজরুলের জীবনকাহিনী তো আগেই জেনেছি বোনদের কাছে। এবার কবি হওয়ার বাসনা আমার মনেও হ্যারিকেনের সলতেয় আগুন উস্কে উঠল। শুধু মুখে নয়, কাগজে কলমেও শুরু হলো ছন্দ বোনা। ক্লাস টুয়ে পড়ি। বাড়ির কাছেই খেলার জন্য হিন্দু বোর্ডিংমাঠ। তার একধারে মডেল প্রাইমারি স্কুল। সেই স্কুলটাতেই ভর্তি হয়েছি মাত্র। তখন থেকেই ছন্দের আর বাণীর আঁকিবুকি, লুকোচুরি খেলা। এভাবেই লেখা হয়ে গেল ছোটখাটো আস্তো এক কবিতা। তারপর চলতে থাকল।

৪. কবিতা তো লেখা হচ্ছে, পাঠকদের কাছে না পৌঁছালে তো শান্তি নেই। বাহবার সাথে সাথে কবি খ্যাতি না পেলে লাভ কি! পাঠকের কাছে পৌঁছাতে হলে বই করতে হবে। অতো কবিতা তো এখনো লেখা হয় নাই। স্কুল ম্যাগাজিনে আমাদের মতো পুঁচকের কবিতা কি ছাপবে? সেটাও তো বছরে একবার ছাপা হয়। তখন ক্লাস ফোরের ছাত্র। জামালপুর সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয়ে, এখনকার জামালপুর জেলা স্কুল। আমাদের বকুলতলাতেই এক ছাপাখানা রয়েছে, সমবায় প্রেস। মতি ভাই তার ম্যানেজার।

মতি ভাই মিয়াভাইয়ের বন্ধু। সমবায় প্রেস থেকেই ছাপা হলো আমার কবিতার একপাতার লিফলেট। ওটাই ছিল আমার প্রথম লেখা কবিতা প্রথম প্রকাশিতও। এবং কী আশ্চর্য! দুনিয়ার অনেক কিছু ভুলে গেলেও কবিতাটা হুবহু মনে আছে: “ঐ দেখা যায় গোলাপ ফুলের গাছ মা বলেন নেই তোর লাজ আছে অনেক কাজ ওগো ফুলের রানী, তুমি বসন্তের বাণী আমরা তোমাকে কতো ভালোবাসি তোমাকে ছিঁড়ে হই সর্বনাশী।” কবিতার ফরম রূপকল্প অনুপ্রাস উৎপ্রেক্ষা ছন্দ সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই, কবিতা কবিতা ভাব নিয়ে লিখলেই যেন কবিতা! এমন এক কবিতা নিয়েই ছিল বেরিয়ে গেল কবিতার লিফলেট। কেউ মনে করল শহরে আগত নতুন সিনেমার হ্যান্ডবিল, কারো মনে হলো কোনো জটিল রোগের ধন্বন্তরি ওষুধের প্রচারপত্র। কিন্তু কবিতা পেয়ে সবাই খুশি। পাল্টে আমার নতুন নাম দিয়ে দিল: কবি সাহেব। কেউ কেউ আবার দ্বিধা করল কাগজটা হাত দিয়ে স্পর্শ করতে, যদি টাকা দিতে হয়! আশ্বস্ত করলেও তাদের ভয় কাটতে চায় না।

৫. কবিতার বিষয় হাজারো রকম হলেও শুধু কবিতা নয়, এরপর হাত পড়তে শুরু করল গল্পে, প্রবন্ধে, এমনকি নাটকেও। সেসময় জামালপুর শহরে টাউন হলের একপাশেই ছিল পাবলিক লাইব্রেরি। প্রতি বিকেলে সেটা চালু হতো। লাইব্রেরিয়ানও ছিলেন পার্টটাইমের জন্য একজন স্কুলশিক্ষক। সেখানে বসেই ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলোর সাথে পরিচয় ঘটে। সাহিত্য পাতার সাথেও, শিশুপাতা মুকুলের মাহফিল, কচি কাঁচার আসর, খেলাঘর, সাত ভাই চম্পা। শুরু খেলাঘর ও কচি কাঁচার আসরে। ক্লাস সেভেনে পড়াকালে দৈনিক পাকিস্তানের সাত ভাই চম্পায় গল্প বেরোয়। পর পর দুই সপ্তাহে। ক্লাস এইটে পড়াকালে ম্যাগাজিন ‘ প্রভা’ বের করি অভিন্নহৃদয় স্কুলবন্ধু আব্দুল বারী খানের সহযোগিতায় আর সেসময়েই পড়ে যাই পাকিস্তানী গেয়েন্দাদের নজরে ও কবলে। ম্যাগাজিনটিকে বন্ধ করে এর সব কপি বাজেয়াপ্ত করা হয়। ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে প্রকাশক আব্দুল বারী খান ও সম্পাদক আমার নামে শোকজ নোটিস জারি করা হয়।

৬. জামালপুর তখন ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত একটি মহকুমা শহর। যোগাযোগ ব্যবস্থার দিক দিয়ে সময়ের প্রক্ষাপটে জামালপুর রাজধানী থেকে পশ্চাৎপদ হলেও সমৃদ্ধ ও সংগ্রামী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যসম্পন্ন ছিল। এই পরিবেশটা আমাদের পরিবারেও ছিল। আমাদের মিয়াভাই তখনই ছাত্রনেতা। ছিলেন জামালপুর আশেক মাহমুদ কলেজ ছাত্রসংসদের সাধারণ সম্পাদক। ১৯৫৮ সালে আয়ুব খানের সামরিক শাসন আমলে তিনি জামালপুরের বিপ্লবী ও স্বাধীনতাকামী আলী আসাদ কালো খোকার নেতৃত্বে সংগঠিত ইস্ট বেঙ্গল লিবারেশন মুভমেন্টের সাথে যুক্ত থাকার অপরাধে কারারুদ্ধ হন। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু আমজাদ হোসেন ছিলেন কথাসাহিত্যিক। পরে তিনি চলচ্চিত্রের কাহিনীকার ও পরিচালক হিসেবে খ্যাতিমান হন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারও লাভ করেন। তিনিসহ আরো কয়েকজন আমার অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়ান। শহরের লোকজন সহপাঠী ও বন্ধুরা আমাকে কবি সাহেব সম্বোধন করায় আমার স্বভাব-চরিত্র আচার-আচরণে কবি-কবি ভাব এসে যায়। এটা নিশ্চয়ই বড়দের চোখে পড়ে থাকবে। বিশেষ করে আমার বড়ো বুজান ও ছোট বুজান আমাকে মিয়াভাইয়ের বন্ধু শেখ আব্দুল জলিল ভাইয়ের সাথে তুলনা করতেন। তখন তিনি শহরে কবি হিসেবে খ্যাতিমান ছিলেন। জামালপুরে তাঁর সাথে আমার দেখা হয়নি কখনো। প্রথম সাক্ষাৎ ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবে। তিনি তখন ময়মনসিংহের এক স্কুলের হেডমাস্টার। শান্ত ধীর সজ্জন নিপাট ভালো মানুষ একজন। পুরোপুরি সাহিত্যে নিবেদিত। তাঁকে বাল্যকালে আমার কথা জানালে তিনি রসিকতা করে জানান, কবি লেখকদেরকে আপন পরিবারে এমন কথা শুনতেই হয়। তাঁকে চলমান পান্ডুলিপি বলা হতো, সেটাও রসিয়ে জানালেন। এখনকার সময়ের আলোচিত প্রতিভাবান কবি মেহেদী ইকবাল তাঁরই ছেলে। আমাদের সেজো ভাই আবদুল কাইয়ুম। খেলতে খুব পছন্দ করতেন। ফুটবলের চৌকস খেলোয়াড় ছিলেন। কিন্তু বই পড়াতেও ছিল প্রবল ঝোঁক। স্কুলে পড়াকালেই তাঁর আনা বইগুলোই আমার পড়া হয়ে গিয়েছে। ক্লাসিক সব সাহিত্য। তিনি আশেক মাহমুদ কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়াকালে কলেজের সাহিত্য সম্পাদক হন, সম্পাদনা করেন কলেজ বার্ষিকী। সেখানে তাঁর লেখা গল্পও ছাপা হয়। কিছু কিছু লেখার ঝোঁক তাঁরও ছিল। পেশাগত জীবনের ব্যস্ততা, উচ্চপদে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন তাঁকে শেষ পর্যন্ত লেখক হয়ে উঠতে দেয়নি। তবে বই পড়া তিনি কখনো ছাড়েননি এমনকি পুলিশের আইজি ও সচিবের দায়িত্ব পালন কালেও। আমার লেখালেখিতে পরিবারের এই পরিবেশ খুব অনুকূল হয়েছে। মিয়াভাইয়ের খানিকটা ঝোঁক ছিল ছবি আঁকার দিকে। তাঁরা আমাকে অনুপ্রেরণা ও উৎসাহ দিতেন। জামালপুর শহরে আমাদের ভাড়াটে বাসায় বড় ভাইদের সুবাদে কখনো কখনো কোনো কোনো লেখকের আড্ডা জমে উঠত। আসতেন সৈয়দ রফিকুল হায়দার, আলাউদ্দিন আল আজাদ। নাম উচ্চারিত হতো আজিজুর রহমান, পরে যিনি কলেজের লাইব্রেরিয়ান হয়েছিলেন। লেখালেখির সাথে জড়িয়ে ছিলেন সৈয়দ আব্দুস সাত্তার, সৈয়দ আব্দুস সোবহান, ডা. জিয়াউল হক। কবি ইমামুর রশীদ তখনকার প্রখ্যাত সনেটকার। তাঁদের কথাবার্তায় সেসময়ের এক আলোচিত ম্যাগাজিন ‘পৃথিবী’-র কথা। এই ‘পৃথিবী’ এখনকার ‘পৃথিবী’ নয়, তখন সেটা ছিল বাম ঘরানার ম্যাগাজিন। এখানেই এক সংখ্যায় একটা পূর্ণ নাটক দেখতে পেলাম: শপথ। নাটকটার আকর্ষণ দুটো কারণে: নাটকের পাত্রপাত্রী কোনো মানুষ নয়, বিভিন্ন দেশ। সংলাপের মাধ্যমে উঠে এসেছে সেসময়কার বিশ্বপরিস্থিতি। নাটকটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মঞ্চস্থ হয়েছে। লিখেছেন একজন ছাত্রই আব্দুল্লাহ আল মামুন, পরবর্তিকালে খ্যাতিমান নাট্যকার, পরিচালক, বিটিভির উর্ধতন কর্মকর্তা।এই জামালপুরেরই সন্তান। এঁরা প্রত্যেকেই আমার লেখার অনুপ্রেরণা।

৭. ক্লাস ফোরে পড়াকালেই আমি জামালপুর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। ঠিক আমার এক ক্লাস উপরে পড়তেন হামিদুল ইসলাম, এসময়কার প্রথিতযশা প্রচ্ছদশিল্পী ও চিত্রসাংবাদিক। তাঁর গুণপনার পরিচয় আমরা সেই তখন থেকেই পেয়েছি। তিনি শুধু শিল্পীই নন, সম্ভাবনাময় কবিও ছিলেন। বিশেষ করে লিরিকে তাঁর কলম পোক্ত। আমাদের স্কুলের পাশ দিয়েই ব্রহ্মপুত্র নদ বয়ে গিয়েছে। টিফিন আওয়ারে আমাদের আড্ডার এক অন্যতম স্থান ছিল এর পাড়। আমরা নদের পাশ ঘেঁষে নেমে যেতাম। পলি জমা মাটিতে ছুটোছুটি করতাম। সেখানে দেখতাম আমাদের উপরের ক্লাসের দুজন ছাত্র সেই পলিবালিমাটি কেটে কেটে নানা ধরনের আঁকিবুঁকি করছেন। জানতে পারলাম, ওরা মহিউদ্দীন স্যারের ছেলে আলো ও সুরুয। এই সুরুযই আমাদের প্রিয় হামিদ ভাই। স্যারও আমাদের প্রিয় ছিলেন। বেশির ভাগ সময় বাংলা পড়াতেন। আমরা ভেবেছিলাম, হামিদ ভাই আর্ট কলেজে পড়বেন। কিন্তু তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্সসহ মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। কিন্তু পেশা হিসেবে বেছে নেন সংবাদপত্রে আর্টিস্ট হিসেবে। আমি যখন এইটে, হামিদ ভাই তখন নাইনে। স্কুল ছাত্রসংসদের নির্বাচন। আমি সাহিত্য ও ম্যাগাজিন সম্পাদকের পদে দাঁড়াই। আমার প্রতিদ্বন্দ্বী হামিদ ভাই। নির্বাচনে আমি বিজয়ী হলেও আমার ভোটটি কিন্তু হামিদ ভাইকেই দিয়েছিলাম। স্কুলে ও শহরে বিভিন্ন পর্যায়ে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা হতো। স্বরচিত গল্প কবিতা লেখা ও বলা রচনা প্রতিযোগিতা আমি নাম লিখাতাম বক্তৃতা, বিতর্কে। কখনোই কবিতা, গল্প, রচনা লেখায় যেতাম না। ঐটুকু বয়সেই আমার ভিতর বোধ তৈরি হয়েছে: আমার লেখা আমারই। আমার জন্য, পাঠকদের জন্য প্রতিযোগিতার জন্য নয়। কিন্তু এমন প্রতিযোগিতার দর্শক হতে তো বাধা নেই। এধরনের এক প্রতিযোগিতায় দেখতে পাই শামিম আজাদকে কবিতা লেখায় প্রথম হয়ে পুরস্কার নিচ্ছেন। জামালপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী। আমার এক ক্লাস উপরে। ফুড ইন্সপেক্টরের মেয়ে। পরবর্তীতে সাংবাদিক হিসেবে খ্যাতিমান হন, এখন বিদেশে। এখনকার সাংস্কৃতিক সংগঠক নাট্যাকার, সাংবাদিক নেতা সাঈদ তারেকও স্কুলে আমার এক ক্লাস উপরে ছিলেন। চুটিয়ে কবিতা লিখতেন আর নাটক করতেন। নায়কের রোল তাঁর বাধা। সেসময় পত্র-পত্রিকায় বেশ কবিতা ছাপা হতো পথচারী শাহ খায়রুল বাশারের। তাঁর সাথে পরিচয় না হলেও নামটা জানা হয়ে গিয়েছিল। আমাদের উপরের ক্লাসের কবি ছিলেন সুজাউদ্দৌলা। তাঁর কবিতা দৈনিক ইত্তেফাকে বেশ ছাপা হতো। পরে তিনি সেখানে কর্মে যোগদানও করেছিলেন। প্রখ্যাত সাংবাদিক মরহুম মোহাম্মদ শাহজাহান তাঁর স্বজন ছিলেন। সেসময় আমরা কয়েকজন লেখালেখির সাথে বেশ জড়িয়ে পড়েছিলাম। আমাদের আড্ডাও জমে উঠত। স্কুল পড়াকালেই ঢাকার পত্রিকাগুলোতে আমাদের লেখা প্রকাশ হতে শুরু করে। পত্রিকা আসত ট্রেনে, দুপুরের আগ দিয়ে। সাহিত্য পাতার প্রকাশ ছিল রোববারে সেসময়কালের সাপ্তাহিক ছুটির দিনে। আমরা কয়েকজন দল বেধে চলে আসতাম স্টেশনে। হামলে পড়তাম পত্রিকার উপর। পাতার পর পাতা উল্টে শুধুই নিজেদের লেখার খোঁজ করতাম না, জেনে নিতাম সাহিত্যের সর্বশেষ খবরাখবর। এই দলে ছিলেন হামিদুল ইসলাম। তাঁর কবিতাই শুধু ছাপা হতো না, তিনি কবিতার যে শিরোনাম কলমে লিখে ডিজাইন করে পাঠাতেন, সেই ডিজাইনটাও কবিতার উপর ব্লক করে ছাপা হতো। তখন লেটারপ্রেস ছাপাখানার যুগ, অফসেট এসেছে পরে। কবি মাহবুব বারীও তখন আমাদের এি দলের সঙ্গী হয়ে উঠেছিলেন। আরেকজন লেখক ছিলেন যিনি স্কুলের ছাত্র হয়েও ভারি ভারি প্রবন্ধ লিখতেন, ছাপা হতো প্রধানত দৈনিক পাকিস্তানে। এক-আধখান কবিতাও লিখতেন। ছিলেন কবি তারিক হাসান। আমাদের মাঝে চলত তুমুল আড্ডাবাজি। পত্রিকায় আমার কবিতা খুব একটা ছাপা হতো না। প্রকাশ পেতো গল্প ও প্রবন্ধ। সেই সময়ই কিছু কিছু পোস্টএডিটরিয়াল ধরনের লেখা লিখতাম সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে। সম্পাদকীয় পাতাতেই ছাপা হতো সেগুলো। আমার সাংবাদিকতায় প্রবেশে হাতেখড়ি।

৮. আমার লেখালেখি চলত আতাউর রহমান নামে। আমি তখন ঢাকা কলেজের ছাত্র। দৈনিক সংবাদে আসতাম খেলাঘরের সাহিত্য আসরে এর প্রথম আসর থেকেই। তখন সাহিত্য সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত। লেখা নিয়ে গেলে তাঁর ঘোরতর আপত্তি ছিল আমার নাম নিয়ে। আতাউর রহমান নামে একজন বিখ্যাত কবি রয়েছেন। একজন নাট্যকারও। আমার নাম তো তাঁদের সাথে গুলিয়ে যাবে। অগত্যা আমার নামটার সাথে ব্র্যাকেটে বংশগত পদবী যুক্ত করে রাখলাম: আতাউর রাহমান (সরকার)। রণেশদা বললেন: ব্র্যাকেট তুলেই দিলে হয়। পদবীসহ ব্র্যাকেট তুলে লিখতে লাগলাম: আতাউর রাহমান। ইতোমধ্যে এক সাপ্তাহিক পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখতে শুরু করি। কলাম লেখকদের তো ছদ্মনাম দিতে হয়। আমিও আমার নাম ঠিক করলাম: আতা সরকার। কালপ্রবাহে এই নামটাই আমার লেখক নাম হয়ে ওঠে। পত্রিকায় গল্পের জন্য আমি লেখক সম্মানী পাই প্রখ্যাত গবেষক প্রবন্ধকার অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমানের হাত থেকে। তিনি তখন এক দৈনিকের সাহিত্য সম্পাদক। সাল ১৯৭০। সম্মানীর পরিমাণ বিশ টাকা। পনেরো টাকা দিয়ে উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের কমপ্লিট ওয়ার্কস কিনি, যা এখনো আমার বইয়ের আলমারিকে গর্বিত করছে। বাকি পাঁচ টাকায় বন্ধুদের নিয়ে রেস্তোরাঁয় ভোজন উৎসব।

৯. ১৯৭০-এর মধ্যেই তিনটি বইয়ের পান্ডুলিপি প্রস্তুত করতে হয় তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ এক স্বায়ত্তশাসিত দপ্তরের জন্য একটি কবিতার, একটা গল্পের, আরেকটি প্রবন্ধের। পান্ডুলিপিগুলো জমা দেয়ার পর অনুমোদিত হলে রয্যালটি বাবদ অর্ধেক হিসেবে ৭৫০ টাকা পাই। বাকি অর্ধেক বই প্রকাশের পর। পরপরই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। সেই ডামাডোলে পান্ডুলিপিগুলো হারিয়ে যায়। আমার প্রথম বই প্রকাশ আর হয়নি। সেগুলোর কোনো কপি আমার কাছেও নেই। আর এখন স্মৃতির উপর জঞ্জাল জমে জমে তিনটি বইয়ের নামই ভুলে গিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের গ্রামের বাড়ির পুরোটাই আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়। আমার সাত দাদার সাত খন্ডের সুপরিসর জমির উপর গড়ে ওঠা বিশাল বাড়ির নাম সরকারবাড়ি হলেও মূলত ছিল একটা পাড়া। মুক্তিযুদ্ধোত্তর দেশে ফিরে গ্রামের পোড়ামাটিতে পা রেখেই টের পাই, আমাদেরকে নামতে হচ্ছে আরেক লড়াইয়ে। এর ভিতরেও জেগে ওঠে প্রাণস্পন্দন। নতুন করে শুরু হয় গড়ার কাজ। বিমর্ষতায় নয়, আনন্দে উৎসবে। আমার স্বজনরা নাটক করার আগ্রহ দেখান। আর নাটক লেখার দায়িত্ব চাপান আমার উপর। আমি তখনো কিশোর। নাটকটা লিখতেই হলো। মুক্তিযুদ্ধের নাটক। নামও রাখা হলো তেমনি: ‘রক্তস্নান’। কয়েক হাজার দর্শকের সামনে এই নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। অভিনয় করেন আমারই আত্মীয়-স্বজনরা। নাট্যকার আতাউর রাহমান। রচনাকাল জানুয়ারি ১৯৭২। মঞ্চায়ন: মার্চ ১৯৭২। প্রকাশ: মে ১৯৭২। প্রকাশক: মেরী আশরাফ, ময়মনসিংহ। এসময় আমি কবিতাতেও নিমগ্ন। আপ্লুত করে ট্রিওলেট। লিখি গুচ্ছ গুচ্ছ ট্রিওলেট। লেখালেখির কাল: মার্চ ১৯৭২। প্রকাশ পায় আতাউর রাহমানএর কবিতার বই: রক্তিম ট্রিওলেটগুচ্ছ। প্রকাশকাল: জুন ১৯৭৩। প্রকাশক: কল্লোল, ময়মনসিংহ। আতাউর রাহমানের এই দুটি বইয়ের দায় এখন আতা সরকারের নেই।

১০. ইতোমধ্যে বুঝে গিয়েছি, কবিতা লেখা আমার কম্মো নয়। তাই আমার লেখালেখি থেকে কবিতার বিদায়। আমার মনোনিবেশ: গল্প, উপন্যাস, স্কেচ, প্রবন্ধ; এসবের পাশাপাশি জার্নালও কলাম, উপসম্পাদকীয়, সমকালীন ঘটনার পর্যালোচনা। সত্তর দশকের মাঝামাঝিতে লেখা হয় ‘তিতুর লেঠেল’। কবি মুকুল চৌধুরী অগ্রপথিকের ঈদ সংখ্যার জন্য লেখা চাইলেন। ‘তিতুর লেঠেল’ সেখানেই প্রকাশিত হয়। কবি আসাদ বিন হাফিজ নিজে স্বাধীন বই প্রকাশনার ব্যবসায় নামার আগ্রহ পোষণ করেন। আগ্রহ দেখান ‘তিতুর লেঠেল’ প্রকাশ করতে। আগ্রহ আরো কেউ কেউও করেছিলেন। আমি আসাদ বিন হাফিজের আগ্রহেই সাড়া দিই। যাত্রা শুরু হয় প্রীতি প্রকাশনীর। আতা সরকারের প্রথম বই ‘তিতুর লেঠেল’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৭ সালে। তখন আমি সদ্য বিবাহিত। ঘরে প্রবেশ করে নতুন বৌয়ের সাথে সাথে নতুন বই। ‘তিতুর লেঠেল’ প্রকাশের সাথে সাথে অভাবিত জনপ্রিয়তা পায়। বইটির সর্বশেষ সংস্করণের প্রকাশক অ্যাডর্ন পাবলিকেশন। আমি কি কবিতা লেখা একেবারেই ছেড়ে দিয়েছি? না, এখনো লিখি। শুধুই নিজের জন্য। গদ্যকে পেলব ও মসৃণ করতেও কবিতা চর্চা কাজে লাগে।