স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে গোপনীয়তা বলে একটি কথা আছে। বিশেষভাবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বহু গোপন কথা থাকে। সেসব কথা হয়তো পরস্পরের, নয়তো একেবারে নিজস্ব। কিছু গোপন বিষয় প্রকাশিত হলে তা নিয়ে টানাপড়েন, অশান্তি, বিবাদ-কলহ তৈরি হয়। লজ্জিত হন স্ত্রী। স্বামী-স্ত্রীর গোপন কথা প্রকাশ করা তার জন্য বিব্রতকর, লজ্জাজড়িত, বিপজ্জনকও বটে। এসব ঘটনা বর্তমানকে যেমন তিক্ত ও বিষময় করে তোলে, তেমনি ভবিষ্যতকেও করে তোলে অনিরাপদ। পরম্পরায় ছড়িয়ে পড়ে নীরব সংক্রমণ। আপনার স্ত্রীর সাথে আপনি কেমন সময় কাটাবেন তা শুধু আপনিই জানবেন; অন্য কেউ নয়। আপনি যখন অন্য কারো সাথে গল্প করবেন তখন সে আপনার জায়গায় নিজেকে কল্পনা করবে। মনে মনে আপনার স্ত্রীর সাথে জেনা করবে। এটা আপনার জন্য অধিকতর লজ্জাজনক।
পুরুষেরা বিশেষ করে এই কাজগুলো লুকাতে পারেনা খুব একটা।
স্ত্রী যদি জানে তার স্বামী কারো সাথে গল্প করেছে কতইনা লজ্জিত ও অপমানিত হবেন। ইসলাম ধর্মে মানুষকে এমন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে নিষেধ করা হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর একান্ত বিষয় অন্যের কাছে প্রকাশ করা গর্হিত অপরাধ। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন,
حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا مَرْوَانُ بْنُ مُعَاوِيَةَ، عَنْ عُمَرَ بْنِ حَمْزَةَ الْعُمَرِيِّ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ سَعْدٍ، قَالَ سَمِعْتُ أَبَا سَعِيدٍ الْخُدْرِيَّ، يَقُولُ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " إِنَّ مِنْ أَشَرِّ النَّاسِ عِنْدَ اللَّهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ الرَّجُلَ يُفْضِي إِلَى امْرَأَتِهِ وَتُفْضِي إِلَيْهِ ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا " .
রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ ক্বিয়ামাতের দিন সে ব্যাক্তি হবে আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম পর্যায়ের, যে তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সাথে মিলিত হয়, অতঃপর সে তার স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৩৪৩৪
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস)
কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম মানুষ হবে ওই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সঙ্গে মিলিত হয়, অতঃপর সে তার স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয়। (মুসলিম, হাদিস : ৩৪৩৪)
অন্য বর্ণনায় হাদিসটি এভাবে এসেছে, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘ওই ব্যক্তি কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সর্বাপেক্ষা বড় আমানত খিয়ানতকারী বিবেচিত হবে, যে তার স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সঙ্গে মিলিত হয়। অতঃপর সে তার স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয়। (মুসলিম, হাদিস : ৩৪৩৫)
শুধু স্বামী-স্ত্রী নয়, পরিবারের যেকোনো সদস্যের এ ধরনের গোপন কথা প্রকাশ করাটাও খুবই অন্যায়। নবী-পরিবারের (সা.) সদস্যরা এ ব্যাপারে খুবই সজাগ ও সতর্ক ছিলেন। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত,
حَدَّثَنَا مُوسَى، عَنْ أَبِي عَوَانَةَ، حَدَّثَنَا فِرَاسٌ، عَنْ عَامِرٍ، عَنْ مَسْرُوقٍ، حَدَّثَتْنِي عَائِشَةُ أُمُّ الْمُؤْمِنِينَ، قَالَتْ إِنَّا كُنَّا أَزْوَاجَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم عِنْدَهُ جَمِيعًا، لَمْ تُغَادَرْ مِنَّا وَاحِدَةٌ، فَأَقْبَلَتْ فَاطِمَةُ ـ عَلَيْهَا السَّلاَمُ ـ تَمْشِي، لاَ وَاللَّهِ مَا تَخْفَى مِشْيَتُهَا مِنْ مِشْيَةِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَلَمَّا رَآهَا رَحَّبَ قَالَ " مَرْحَبًا بِابْنَتِي ". ثُمَّ أَجْلَسَهَا عَنْ يَمِينِهِ أَوْ عَنْ شِمَالِهِ، ثُمَّ سَارَّهَا فَبَكَتْ بُكَاءً شَدِيدًا، فَلَمَّا رَأَى حُزْنَهَا سَارَّهَا الثَّانِيَةَ إِذَا هِيَ تَضْحَكُ. فَقُلْتُ لَهَا أَنَا مِنْ بَيْنِ نِسَائِهِ خَصَّكِ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِالسِّرِّ مِنْ بَيْنِنَا، ثُمَّ أَنْتِ تَبْكِينَ، فَلَمَّا قَامَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم سَأَلْتُهَا عَمَّا سَارَّكِ قَالَتْ مَا كُنْتُ لأُفْشِيَ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم سِرَّهُ. فَلَمَّا تُوُفِّيَ قُلْتُ لَهَا عَزَمْتُ عَلَيْكِ بِمَا لِي عَلَيْكِ مِنَ الْحَقِّ لَمَّا أَخْبَرْتِنِي. قَالَتْ أَمَّا الآنَ فَنَعَمْ. فَأَخْبَرَتْنِي قَالَتْ أَمَّا حِينَ سَارَّنِي فِي الأَمْرِ الأَوَّلِ، فَإِنَّهُ أَخْبَرَنِي أَنَّ جِبْرِيلَ كَانَ يُعَارِضُهُ بِالْقُرْآنِ كُلَّ سَنَةٍ مَرَّةً " وَإِنَّهُ قَدْ عَارَضَنِي بِهِ الْعَامَ مَرَّتَيْنِ، وَلاَ أَرَى الأَجَلَ إِلاَّ قَدِ اقْتَرَبَ، فَاتَّقِي اللَّهَ وَاصْبِرِي، فَإِنِّي نِعْمَ السَّلَفُ أَنَا لَكَ ". قَالَتْ فَبَكَيْتُ بُكَائِي الَّذِي رَأَيْتِ، فَلَمَّا رَأَى جَزَعِي سَارَّنِي الثَّانِيَةَ قَالَ " يَا فَاطِمَةُ أَلاَ تَرْضَيْنَ أَنْ تَكُونِي سَيِّدَةَ نِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ ـ أَوْ ـ سَيِّدَةَ نِسَاءِ هَذِهِ الأُمَّةِ ".
(সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৬২৮৫)
একবার আমরা নবী (সা.)-এর সব স্ত্রী তাঁর কাছে জমায়েত হয়েছিলাম। আমাদের একজনও অনুপস্থিত ছিলাম না। এমন সময় ফাতেমা (রা.) হেঁটে আসছিলেন। আল্লাহর কসম! তাঁর হাঁটা রাসুল (সা.)- এর হাঁটার মতো ছিল। তিনি যখন তাঁকে দেখলেন, তখন তিনি ‘আমার মেয়ের আগমন 'শুভ হোক’ বলে তাঁকে সংবর্ধনা জানালেন। এরপর তিনি তাঁকে নিজের ডান পাশে অথবা বাম পাশে বসালেন। তারপর তিনি তাঁর সঙ্গে কানে কানে কিছু কথা বলেন। তিনি (ফাতেমা) খুব বেশি কাঁদতে লাগলেন। এরপর তাঁকে চিন্তিত দেখে দ্বিতীয়বার তাঁর সঙ্গে তিনি কানে কানে আরো কিছু কথা বললেন। তখন ফাতেমা (রা.) হাসতে লাগলেন।
তখন নবী (সা.)-এর স্ত্রীদের মধ্য থেকে আমি বললাম, আমাদের উপস্থিতিতে রাসুল (সা.) বিশেষ করে আপনার সঙ্গে বিশেষ কী গোপনীয় কথা কানে কানে বললেন, যার ফলে আপনি খুব কাঁদছিলেন? এরপর যখন নবী (সা.) উঠে চলে গেলেন, তখন আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি আপনাকে কানে কানে কী বলেছিলেন? ফাতেমা (রা.) বলেন, আমি রাসুল (সা.)-এর ভেদ (গোপনীয় কথা) ফাঁস করব না।
এরপর রাসুল (সা.)-এর ওফাত হলো। তখন আমি তাঁকে বললাম, আপনার ওপর আমার যে দাবি আছে, আপনাকে আমি তার কসম দিয়ে বলছি যে আপনি কি গোপনীয় কথাটি আমাকে জানাবেন না? তখন ফাতেমা (রা.) বললেন, হ্যাঁ, এখন আপনাকে জানাব। সুতরাং তিনি আমাকে জানাতে গিয়ে বলেন, প্রথমবার তিনি আমার কাছে যে গোপন কথা বলেন, তা হলো এই যে তিনি আমার কাছে বর্ণনা করেন যে জিবরাঈল (আ.) প্রতিবছর এসে পূর্ণ কুরআন একবার আমার কাছে পেশ করতেন। কিন্তু এ বছর তিনি এসে তা আমার কাছে দুইবার পেশ করেছেন।
এতে আমি ধারণা করছি যে আমার চির বিদায়ের সময় সন্নিকট। সুতরাং তুমি আল্লাহকে ভয় করে চলবে এবং বিপদে ধৈর্য ধারণ করবে। নিশ্চয়ই আমি তোমার জন্য উত্তম অগ্রগমনকারী। তখন আমি কাঁদলাম যা আপনি নিজেই দেখলেন। তারপর যখন আমাকে চিন্তিত দেখলেন, তখন দ্বিতীয়বার আমাকে কানে কানে বলেন, তুমি জান্নাতের মুসলিম নারীদের অথবা এ উম্মতের নারীদের নেত্রী হওয়াতে সন্তুষ্ট হবে না? (আমি তখন হাসলাম)। (বুখারি, হাদিস : ৬২৮৫)
এভাবেই স্বামী-স্ত্রী ও পরিবারের গোপন কথা সংরক্ষিত রাখা ইসলামের অনুপম সৌন্দর্য। অতএব ইসলাম নারীর ব্যাপারে পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতার সংশোধন করে। নারীকে সম্মান ও সহানুভূতির স্থানে অধিষ্ঠিত করে। পুরুষের মনে আল্লাহর ভয় ও আখেরাতের জবাবদিহির কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। নারীর প্রতি যে কোনো ধরনের অন্যায় আচরণের ক্ষতি ও ভয়াবহতা তুলে ধরে পুরুষকে অন্যায় থেকে বিরত রাখে।
পুরুষের অন্তরে এ-কথা বদ্ধমূল করে যে, নারীর সাথে আচরণ হতে হবে তার সম্মান ও মর্যাদা বিবেচনায় রেখেই। তার প্রতি মানসিকতা থাকবে সম্মান ও সহানুভূতির। নিজের মা, বোন, স্ত্রীদের মতো অন্য নারীদেরকেও সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। আর এর অনুকূল সকল ব্যবস্থা-ই ইসলাম গ্রহণ করেছে।
عَبْدُ الْعَزِيزِ بْنُ عَبْدِ اللهِ قَالَ حَدَّثَنِي مَالِكٌ عَنْ أَبِي الزِّنَادِ عَنِالأَعْرَجِ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ الْمَرْأَةُ كَالضِّلَعِ إِنْ أَقَمْتَهَا كَسَرْتَهَا وَإِنْ اسْتَمْتَعْتَ بِهَا اسْتَمْتَعْتَ بِهَا وَفِيهَا عِوَجٌ.
আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিতঃ:
রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, নারীরা হচ্ছে পাঁজরের হাড়ের ন্যায়। যদি একেবারে সোজা করতে চাও, তাহলে ভেঙ্গে যাবে। সুতরাং, যদি তোমরা তাদের থেকে উপকার লাভ করতে চাও, তাহলে ঐ বাঁকা অবস্থাতেই লাভ করতে হবে। [১৭] [৩৩৩১; মুসলিম ১৭/১৭, হাঃ ১৪৬৮](আধুনিক প্রকাশনী- ৪৮০৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৮০৬)
এ প্রসঙ্গে রসূল (সা.) এর একটি হাদীস উল্লেখ করা হচ্ছে। এ হাদীসে তিনি স্ত্রীলোকদের প্রকৃতিগত এক মৌলিক দুর্বলতার প্রতি বিশেষ খেয়াল রেখে চলার জন্যে স্বামীদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন। রাসূল (সা.) বলেছেন - স্ত্রীলোক সাধারণত স্বামীদের অকৃতজ্ঞ হয়ে থাকে এবং তাদের অনুগ্রহকে অস্বীকার করে। তুমি যদি জীবন ভরেও কোন স্ত্রীর প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন কর আর কোন এক সময় যদি সে তার মর্জি মেজাজের বিপরীত কোন ব্যবহার তোমার মাঝে দেখতে পায় তাহলে তখনি বলে উঠবে- আমি তোমার কাছে কোনদিনই সামান্য কল্যাণ দেখতে পাইনি- (বুখারী)।
রাসূল (সা.)- এর এই কথা থেকে একদিকে যেমন নারীদের মৌলিক প্রকৃতিগত দোষের কথা জানা গেল। তেমনি এ হাদীস স্বামীদের জন্যে এক বিশেষ সাবধান বাণী। স্বামীরা যদি নারীদের এ প্রকৃতিগত দোষের কথা স্মরণ না রাখে, তাহলে পারিবারিক জীবনে অতি তাড়াতাড়ি ভাঙ্গন ও বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। এ জন্য পুরুষদের অবিচল নিষ্ঠা ও অপরিসীম ধৈয্য ধারণের প্রয়োজন রয়েছে এবং এ ধরনের নাজুক পরিস্থিতিতে ধৈয্য ধারণ করে পারিবারিক জীবনের মাধুর্য ও মিলমিশকে অক্ষুণ্ন রাখতে পুরুষদেরকেই প্রধান ভূমিকা রাখতে হবে। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৫১৮৪, হাদিসের মান: হাসান হাদিস)
এ ব্যাপারে আরো হাদীস বর্ণিত হয়েছে,
حَدَّثَنَا أَبُو الْيَمَانِ، أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، قَالَ حَدَّثَنِي عَبْدُ اللَّهِ بْنُ أَبِي بَكْرٍ، أَنَّ عُرْوَةَ بْنَ الزُّبَيْرِ، أَخْبَرَهُ أَنَّ عَائِشَةَ زَوْجَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم حَدَّثَتْهُ قَالَتْ جَاءَتْنِي امْرَأَةٌ مَعَهَا ابْنَتَانِ تَسْأَلُنِي، فَلَمْ تَجِدْ عِنْدِي غَيْرَ تَمْرَةٍ وَاحِدَةٍ، فَأَعْطَيْتُهَا، فَقَسَمَتْهَا بَيْنَ ابْنَتَيْهَا، ثُمَّ قَامَتْ فَخَرَجَتْ، فَدَخَلَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فَحَدَّثْتُهُ فَقَالَ " مَنْ يَلِي مِنْ هَذِهِ الْبَنَاتِ شَيْئًا فَأَحْسَنَ إِلَيْهِنَّ كُنَّ لَهُ سِتْرًا مِنَ النَّارِ ".
নবী (সা.) -এর স্ত্রী ‘ হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিতঃ:
তিনি বলেনঃ একটি স্ত্রীলোক দু’টি মেয়ে সাথে নিয়ে আমার কাছে এসে কিছু চাইলো। আমার কাছে একটি খুরমা ব্যতীত আর কিছুই সে পেলো না। আমি তাকে ওটা দিলাম। স্ত্রীলোকটি তার দু’মেয়েকে খুরমাটি ভাগ করে দিল। তারপর সে উঠে বের হয়ে গেল। এ সময় নবী (সা.) এলেন, আমি তাঁকে ব্যাপারটি জানালাম। তখন তিনি বললেনঃ যাকে এ সব কন্যা সন্তান দিয়ে কোন পরীক্ষা করা হয়, অতঃপর সে তাদের সাথে ভাল ব্যবহার করে, এ কন্যারা তার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে প্রতিবন্ধক হবে।
(সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৫৯৯৫), (হাদিসের মান: সহিহ হাদিস)
কন্যা সন্তান যেখানে আমাদের সমাজে অভিশাপ রূপে দিনে দিনে বিপর্যয়কর রূপ ধারণ করছে সেখানে রাসূল (সা.) সেই যুগেই কন্যা সন্তানদেরকে স্নেহ, ভালবাসার সর্বোচ্চ পর্যায়ে রেখেছিলেন। কন্যা সন্তান হচ্ছে ঘরের রহমত এটা ইসলাম সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে যদিও মানুষ ইসলাম মানে না বিধায় সমাজে নারীদের সম্মান নেই। পরিবারই প্রথমে পুত্র, কন্যার মাঝ্র বিভেদ সৃষ্টি করে। হাদিস মানা মানেই যে বইতে যা লেখা সেগুলো মানতে হবে এরূপ তো নয়। আপনি চার বিবাহের হাদিস মানার আগে রাসূল (স.) এর জীবনী অনুসরণ করুন। তখন দেখবেন।পারছেন না। তেমনিভাবে রাসূল (সা.) যেভাবে কন্যাদের স্নেহ করতেন বাবা মায়েরা তা করতে পারেন না বরঞ্চ পিতা মাতাই সর্বপ্রথম সন্তানদের মধ্যে বিভেদের দেয়াল তুলতে অগ্রনায়কের ভূমিকা পালন করে থাকেন। নারীদের ব্যাপারে অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে,
حَدَّثَنَا أَبُو الْيَمَانِ، أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، قَالَ أَخْبَرَنِي سُلَيْمَانُ بْنُ يَسَارٍ، أَخْبَرَنِي عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَبَّاسٍ ـ رضى الله عنهما ـ قَالَ أَرْدَفَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم الْفَضْلَ بْنَ عَبَّاسٍ يَوْمَ النَّحْرِ خَلْفَهُ عَلَى عَجُزِ رَاحِلَتِهِ، وَكَانَ الْفَضْلُ رَجُلاً وَضِيئًا، فَوَقَفَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم لِلنَّاسِ يُفْتِيهِمْ، وَأَقْبَلَتِ امْرَأَةٌ مِنْ خَثْعَمَ وَضِيئَةٌ تَسْتَفْتِي رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَطَفِقَ الْفَضْلُ يَنْظُرُ إِلَيْهَا، وَأَعْجَبَهُ حُسْنُهَا، فَالْتَفَتَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَنْظُرُ إِلَيْهَا، فَأَخْلَفَ بِيَدِهِ فَأَخَذَ بِذَقَنِ الْفَضْلِ، فَعَدَلَ وَجْهَهُ عَنِ النَّظَرِ إِلَيْهَا، فَقَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ فَرِيضَةَ اللَّهِ فِي الْحَجِّ عَلَى عِبَادِهِ أَدْرَكَتْ أَبِي شَيْخًا كَبِيرًا، لاَ يَسْتَطِيعُ أَنْ يَسْتَوِيَ عَلَى الرَّاحِلَةِ، فَهَلْ يَقْضِي عَنْهُ أَنْ أَحُجَّ عَنْهُ قَالَ " نَعَمْ ".
আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিতঃ:
তিনি বলেনঃ একবার কুরবানীর দিনে রসূলুল্লাহ (সা.) ফায্ল ইবনু ‘আব্বাস (রা.)–কে আপন সওয়ারীর পিঠে নিজের পেছনে বসালেন। ফায্ল একজন সুপুরুষ ছিলেন। নবী (সা.) লোকেদের মাসাআ'লা মাসায়িল বলে দেয়ার জন্য আসলেন। এ সময় খাশ’আম গোত্রের এক সুন্দরী নারী রসূলুল্লাহ্ (সা.) -এর নিকট একটা মাসাআলা জিজ্ঞেস করার জন্য আসল। তখন ফায্ল (রা.) তার দিকে তাকাতে লাগলেন। মহিলাটির সৌন্দর্য তাঁকে আকৃষ্ট করল। নবী (সা.) ফায্ল (রা.) –এর দিকে ফিরে দেখলেন যে, ফায্ল (রা.) তাঁর দিকে তাকাচ্ছেন। তিনি নিজের হাত পেছনের দিকে নিয়ে ফায্ল (রা.) –এর চিবুক ধরে ঐ নারীর দিকে না তাকানোর জন্য তার মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিলেন।
এরপর স্ত্রীলোকটি জিজ্ঞেস করলঃ হে আল্লাহ্র রসূল! আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে তাঁর বান্দাদের উপর যে হজ্জ ফরয হবার বিধান দেয়া হয়েছে, আমার পিতার উপর তা এমন অবস্থায় এসেছে যে, বৃদ্ধ হবার কারণে সওয়ারীর উপরে বসতে তিনি অক্ষম। যদি আমি তার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করে নেই, তবে কি তার পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যাবে?
তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেনঃ হ্যাঁ। (আধুনিক প্রকাশনী- ৫৭৮৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৬৮২)
রাসূল (সা.) নারীর দিকে তাকানোর জন্য চিবুক ধরে টেনে তার লাগাম টেনে ধরেছেন। বুঝিয়ে দিয়েছেন, নারীর দিকে বেপরোয়াভাবে তাকানো যাবেনা অথচ আমাদের সমাজে এখন এটা কোনো ব্যাপারই ময়। রাতদিন মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকে ৬০/৭০ বছর বয়সের মুরুব্বীরাও। যেখানে পরতে পরতে নারীকে পন্যায়িত করে বিজ্ঞাপনের নতুন নতুন ফিচার দেখানো হয় মোবাইলের স্ক্রিনে। স্ক্রল করলেই শুধু নারী আর নারী, শেষ বয়সে যারা কাজ পান না তাদের কথা ছিল- ইবাদাতে মগ্ন থাকা অথচ তারা এখন নফসের তাড়নায় যুগের রঙে ভাসিয়ে দিচ্ছে পুরো জীবনের ঈমান আমল, আখলাক।
উপোরক্ত আয়াত নাযিল হওয়ার উপলক্ষ ছিল এই যে, একজন মহিলা সহাবী রসূলে কারীম ﷺ-এর নিকটে হাজির হয়ে বললেনঃ ‘‘হে আল্লাহর রসূল! আমি আমার ঘরে এমন অবস্থায় থাকি যে, তখন আমাকে সে অবস্থায় কেউ দেখতে পাক তা আমি মোটেই পছন্দ করি না- সে আমার ছেলে-সন্তানই হোক কিংবা পিতা অথচ এ অবস্থায়ও তারা আমার ঘরে প্রবেশ করে। এখন আমি কী করব? এরপরই এ আয়াতটি নাযিল হয়।
বস্তুতঃ আয়াতটিতে মুসলিম নারী-পুরুষের পরস্পরের ঘরে প্রবেশ করার প্রসঙ্গে এক স্থায়ী নিয়ম পেশ করা হয়েছে। মেয়েরা নিজেদের ঘরে সাধারণত খোলামেলা অবস্থায়ই থাকে। ঘরের অভ্যন্তরে সব সময় পূর্ণাঙ্গ আচ্ছাদিত করে থাকা মেয়েদের পক্ষে সম্ভব হয় না। এমতাবস্থায় কারো ঘরে প্রবেশ করা- সে মুহাররম ব্যক্তিই হোক না কেন- মোটেই সমীচীন নয়। আর গায়র মুহাররম পুরুষের প্রবেশ করার তো কোন প্রশ্নই উঠতে পারে না। নারী রান্নাঘরে ব্যস্ত থাকলে সে তার মতো করে সবটা করতে চায় কিন্তু পরিবারের অন্য সদস্যরা তাতে বিঘ্ন ঘটায়। যৌথ পরিবারে দ্বীন মেনে চলা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দেবর, ভাষুর রান্না ঘরে গিয়ে বসে থাকবে আর বউদের রান্না করতে হয় এমন বিব্রতকর অবস্থার জন্যই এখন নারীরা একক সংসার করতে চায় না। মূলত যারা মোটামুটি ধর্ম মেনে চলে, তারাও চায় তার রান্নাঘরে বা ঘরে স্বামী, সন্তান ব্যতীত অন্য কেউ না আসুক। হোক সে দেবর, ভাষুর কিংবা শ্বশুর।
কেননা বিনা অনুমতিতে ও পূর্বেই না জানিয়ে কেউ যদি কারো ঘরে প্রবেশ করে তাহলে ঘরের মেয়েদেরকে অপ্রস্তুত অবস্থায় দেখার এবং তাদের দেহের যৌন অঙ্গের উপর নজর পড়ে যাওয়ার খুবই সম্ভবনা রয়েছে। তাদের সঙ্গে চোখাচোখি হতে পারে যা মানুষকে জেনার পথে অগ্রসর হতে সাহায্য করে। তাদের রূপ-যৌবন দেখে পুরুষ দর্শকের মনে যৌন লালসার আগুন জ্বলে উঠতে পারে। এখন তো, গ্রামাঞ্চলে শ্বশুর ও বৌমার পরকীয়া ছড়িয়ে পড়েছে এইডস এর মতো। আর তারই পরিণামে এ মেয়ে-পুরুষের মাঝে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে উঠে গোটা পরিবারকে তছনছ করে দিতে পারে। মেয়েদের যৌন অঙ্গ ঘরের আপন লোকদের দৃষ্টি থেকে এবং তাদের রূপ-যৌবন ভিন পুরুষের নজর থেকে বাঁচাবার উদ্দেশ্যেই এ ব্যবস্থা পেশ করা হয়েছে।
অথচ সংসার আলাদা করাকে এক শ্রেণীর মানুষ খারাপ মনে করে। সত্যিকার অর্থে, যৌথ পরিবারে কোনো নারীই তার পর্দার সম্পূর্ণ হক্ব আদায় করতে পারেনা। সংসারের কাজটিই পরিবারের কাছে সবার আগে প্রাধান্য পায়। নারীরা ইবাদাত করলে, অন্য সদস্যরা মনে করে সে কাজে ফাঁকি দেয়ার জন্য ইবাদাতে সময় নষ্ট করে এভাবে অনেকে পড়ায় বদনামও করে বেড়ায়। অনেকে পর্দার জন্য কটাক্ষ করর কথা বলে। জাহেলিয়াতের যুগে এমন হতো যে, কারো ঘরের দুয়ারে গিয়ে আওয়াজ দিয়েই টপ করে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করত এতে করে মেয়েদের নিজেকে সামলে নেবারও কোন সময় দেয়া হত না। ফলে কখনো ঘরের মেয়ে পুরুষকে একই শয্যায় কাপড় মুড়ি দেয়া অবস্থায় দেখতে পেত, মেয়েদেরকে দেখত অসংবৃত বস্ত্রে। কখনো চুল আলগা থাকতো যা সতরের আতওতাভুক্ত। আর এসব দৃশ্য বাকী জীবনে ওই ব্যক্তি অপর ব্যক্তির নিকট লজ্জার পাত্র হয়ে থাকা ছাড়া কিছুই করার থাকতো না।
এজন্যে নির্দেশ দেয়া হয়েছেঃ
فَإِنْ لَمْ تَجِدُوا فِيهَا أَحَدًا فَلَا تَدْخُلُوهَا حَتَّىٰ يُؤْذَنَ لَكُمْ ۖ وَإِنْ قِيلَ لَكُمُ ارْجِعُوا فَارْجِعُوا ۖ هُوَ أَزْكَىٰ لَكُمْ ۚ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ
‘‘সেই ঘরে যদি কোন লোক না পাও তবে তাতে তোমরা প্রবেশ করবে না যতক্ষণ না তোমাদেরকে প্রবেশ করার অনুমতি দেয়া হবে। আর যদি তোমাদেরকে ফিরে যেতে বলা হয়, তাহলে অবশ্যই ফিরে যাবে। এ হচ্ছে তোমাদের জন্য অধিক পবিত্রতর নীতি। তোমরা যা করো সে সম্পর্কে আল্লাহ পূর্ণ মাত্রায় অবহিত রয়েছেন।’’ সূরা নূর আয়াতঃ ২৮)
আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। নাবী কারীম ﷺ বলেছেনঃ
يَابُنَيَّ اِذَا دَخَلْتَ عَلى اهلِكَ فَسَلِّمْ تَكُوْنَ بَرْكَةً عَلَيْكَ وعَلى اَهْلِ بَيْتِكَ- ترمذي)
‘‘হে প্রিয় পুত্র, তুমি যখন তোমার ঘরের লোকদের সামনে যেতে চাইবে, তখন বাইরে থেকে সালাম কর। এ সালাম করা তোমার ও তোমার ঘরের লোকদের পক্ষে বড়ই বারাকাতের কারণ হবে।"
কারো ঘরে প্রবেশ করতে চাইলে প্রথমে সালাম দেবে, নাকি প্রথমে ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইবে, এ নিয়ে দু’রকমের মত পাওয়া যায়। কুরআনে প্রথমে অনুমতি চাওয়ার নির্দেশ হয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করেন যে, প্রথমে অনুমতি চাইবে, পরে সালাম দিবে। কিন্তু এ মত বিশুদ্ধ নয়। কুরআনে প্রথমে অনুমতি চাওয়ার কথা বলা হয়েছে বলেই যে প্রথমে তাই করতে হবে এমন কোন কথা নেই। কুরআনে তো কী কী করতে হবে তা এক সঙ্গে বলে দেয়া হয়েছে। এখানে পূর্বাপরের বিশেষ কোন তাৎপর্য নেই। বিশেষত বিশুদ্ধ হাদীসে প্রথমে সালাম করার উপরই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।’’
বনী ‘আমের গোত্রীয় এক সহাবী হতে বর্ণিত হয়েছে তিনি বলেনঃ আমি রসূল (সা.) -এর ঘরে প্রবেশ করার অনুমতি চাইলাম। রসূল (সা.) তাঁর দাসীকে নির্দেশ দিলেন বেরিয়ে গিয়ে তাকে বলঃ আপনি আস্সালামু আলাইকুম বলে বলুনঃ আমি কি প্রবেশ করব? কারণ সে কীভাবে প্রবেশ করতে হয় ভাল করে তা জানে না। ('‘সহীহ্ আবী দাঊদ’’ ৫১৭৭), ‘‘সহীহ্ আদাবিল মুফরাদ’’ ১০৮৪)
আতা বলেনঃ আমি আবূ হুরাইরাহ্ -কে বলতে শুনেছিঃ কেউ যদি বলেঃ আমি কি [ঘরে] প্রবেশ করব আর সালাম প্রদান না করে তাহলে তুমি তাকে না বল যে পর্যন্ত চাবি না নিয়ে আসে সে পর্যন্ত সে প্রবেশ করবে না । আমি বললামঃ আসসালাম। তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। (‘‘সহীহ্ আদাবিল মুফরাদ’’ ১০৮৩).
কালদা ইবনে হাম্বল বলেনঃ আমি রসূলের ঘরে প্রবেশ করার অনুমতি চাইলাম, কিন্তু প্রথমে সালাম করিনি বলে অনুমতিও পাইনি। তখন নাবী ﷺ বললেনঃ
اِرجِعْ فَقُلْ اَلسَّلاَمُ عَلَيْمُمْ ءَاَدْخُلُ- ابو اداؤد،ترمذى)
"ফিরে যাও, তারপর এসে বল আসসালামু ‘আলাইকুম, তার পরে প্রবেশের অনুমতি চাও।"
একদা এক ব্যক্তি রসূলে কারীম ﷺ কে জিজ্ঞেস করলেনঃ
আমার মায়ের ঘরে যেতে হলেও কি আমি অনুমতি চাইব?
রসূলে কারীম ﷺ বললেনঃ অবশ্যই।
সে লোকটি বললঃ আমি তো তার সঙ্গে একই ঘরে থাকি-তবুও?
রসূল ﷺ বললেনঃ হ্যাঁ, অবশ্যই অনুমতি চাইবে।
সেই ব্যক্তি বললঃ আমি তো তার খাদেম।
তখন রসূলে কারীম ﷺ বললেনঃ
اِسْتاْذَنْ عَلَيْهاَ اَتُحِبُّ اَنْتَرَاهَا عُرْيَانَةً-
অবশ্যই পূর্বাহ্ন অনুমতি চাইবে, তুমি কি তোমার মাকে উলঙ্গ অবস্থায় দেখতে পছন্দ কর?
তার মানে, অনুমতি না নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলে মাকে উলঙ্গ অবস্থায় দেখতে পাওয়া অসম্ভব কিছু নয়।
উলঙ্গই দেখতে হবে এমন নয় অনেকসময় তিনি অপ্রস্তুত থাকতে পারেন। তিনি নাও চাইতে পারেন যে, এখন কেউ তার ঘরে প্রবেশ করুক। তার ব্যক্তিগত কাজও থাকতে পারে যা তিনি গোপনে করতে পছন্দ করেন। এজন্য ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে প্রথমে সালাম দিতে হবে এবং পরে প্রবেশের অনুমতি চাইতে হবে। অনুমতি না পেলে ফিরে যেতে হবে। এ ফিরে যাওয়া অধিক ভাল ও সম্মানজনক হবে। প্রবেশের জন্য কাতর অনুনয়-বিনয় করার হীনতা প্রকাধের চাইতে ফিরে যাওয়া অত্যাধিক ভালো।
ইবনে আববাস (রা.) হাদীসের ইলম লাভের জন্যে কোন কোন আনসারীর ঘরের প্রবেশ পথে গিয়ে বসে থাকতেন এবং ঘরের মালিক বের হয়ে না আসা পর্যন্ত তিনি প্রবেশের অনুমতি চাইতেন না। এ ছিল উস্তাদের প্রতি ছাত্রের বিশেষ আদব, শালীনতা।
কারো বাড়ির সামনে গিয়ে প্রবেশের অনুমতির জন্যে দাঁড়িয়ে থাকতে হলে দরজার ঠিক সোজাসুজি দাঁড়ানও সমীচীন নয়। দরজার সোজাসুজি দাড়ালে অনেকসময় দরজা খুলে আঘাতপ্রাপ্তও হতে পারেন অথবা অপরিচিত হলে ঘরের মানুষ ইতস্ততও হতে পারেন।
এজন্য একপাশে দাঁড়িয়ে নিকের পরিচয় দেয়াই সর্বাধিক ভদ্রতার লক্ষণ। এছাড়া দরজার সোজাসুজি দাড়ালে দরজার ফাঁক দিয়ে ভিতরে নজর করতেও চেষ্টা করবে না। আর শয়তান কুমন্ত্রণা দিবে ভেতরে দেখার জন্য। কেউ দেখা গেলো ভেতরে উঁকি দিলো আর ঐ সময়েই দরজা খুলে সে দেখে নিলো যে বাহিরে থাকা ব্যক্তি উঁকি দিচ্ছে। এতে করে সম্মানী ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব নষ্ট হয়। কারণ, নাবী কারীম ﷺ থেকে এ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছেঃ আব্দুল্লাহ ইবনে বুসর বলেনঃ
كَانَ رَسُوْلُ ﷺاِذَا اَتى بَابَ قَوْمٍ لَمْ يَسْتَقْبِلِ اْلبَابَ مِنْ يِلْقَاءِ وَجْهِه وَلكِنْ مِنْ رُكِْنِه الاَيْمَنِ اَوِالاَيْسَرِفَيَقُوْلُ اَلسَّلاَمُ عَلَيْكُمْر ابو داؤد)
নাবী কারীম ﷺ যখন কারো বাড়ি বা ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াতেন, তখন অবশ্যই দরজার দিকে মুখ করে সোজা হয়ে দাঁড়াতেন না। বরং দরজার ডান কিংবা বাম পাশে সরে দাঁড়াতেন এবং সালাম করতেন।
এক ব্যক্তি রসূলে কারীমের বিশেষ কক্ষপথে মাথা উঁচু করে তাকালে রসূলে কারীম ﷺ তখন ভিতরে ছিলেন এবং তাঁর হাতে লৌহ নির্মিত চাকুর মত একটি জিনিস ছিল। তখন তিনি বললেনঃ
لواعلم ان هذا ينظرني لطعنت بالمد رى فى عينه وهل جعل الاستيذان الامن اجل البصر-
এ ব্যক্তি বাইরে থেকে উঁকি মেরে আমাকে দেখবে তা আগে জানতে পারলে আমি আমার হাতের এ জিনিসটি দ্বারা তার চোখ ফুটিয়ে দিতাম। এ কথা তো বোঝা উচিত যে, এ চোখের দৃষ্টি বাঁচানো আর তা থেকে বাঁচবার উদ্দেশ্যেই পূর্বাহ্ন অনুমতি চাওয়ার রীতি করে দেয়া হয়েছে।
(এ সম্পর্কে আবূ হুরাইরাহ রা.) থেকে স্পষ্ট, আরো কঠোর হাদীস বর্ণিত হয়েছে। নাবী কারীম ﷺ বলেছেনঃ
لَوْ اَنَّ امْرَأً اَطَّلَعَ عَلَيْكَ بِغَيْرِ اِذْنٍ فَخَذَفْتِهُ بِحَصَاةِ فَفَقاْتِ عَيْنَهُ مَاكَانَ عَلَيْكِ ضِلْعٌ-
কেউ যদি তোমার অনুমতি ছাড়াই তোমার ঘরের মধ্যে উঁকি মেরে তাকায়, আর তুমি যদি পাথর মেরে তার চোখ ফুটিয়ে দাও, তাহলে তাতে তোমার কোন দোষ হবে না।
তিনবার অনুমতি চাওয়ার পরও যদি অনুমতি পাওয়া না যায়, তাহলে ফিরে চলে যেতে হবে। আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) একবার উমর ফারূক (রা.)- এর দাওয়াত পেয়ে তাঁর ঘরের দরজায় এসে উপস্থিত হলেন এবং তিনবার সালাম করার পরও কোন জবাব না পাওয়ার কারণে তিনি ফিরে চলে গেলেন। পরে সাক্ষাত হলে উমার ফারূক বললেন,
‘‘তোমাকে দাওয়াত দেয়া সত্ত্বেও তুমি আমার ঘরে আসলে না কেন?’’
তিনি বলেন, ‘‘আমি তো এসেছিলাম, আপনার দরজায় দাঁড়িয়ে তিনবার সালামও করেছিলাম। কিন্তু কারো কোন সাড়া-শব্দ না পেয়ে আমি ফিরে চলে এসেছি। কেননা নাবী কারীম ﷺ আমাকে বলেছেন, তোমাদের কেউ কারো ঘরে যাওয়ার জন্যে তিনবার অনুমতি চেয়েও না পেলে সে যেন ফিরে যায়।’’ (বুখারী, মুসলিম)
আমাদের রাসূলুল্লাহ (সা.) মহিলাদের সম্পর্কে এক হাদিসে বলেছেন,
حَدَّثَنَا حَسَنُ بْنُ عَلِيٍّ الْحُلْوَانِيُّ، حَدَّثَنَا أَبُو تَوْبَةَ الرَّبِيعُ بْنُ نَافِعٍ، حَدَّثَنَا مُعَاوِيَةُ، - يَعْنِي ابْنَ سَلاَّمٍ - عَنْ زَيْدٍ، أَنَّهُ سَمِعَ أَبَا سَلاَّمٍ، يَقُولُ حَدَّثَنِي عَبْدُ اللَّهِ بْنُ فَرُّوخَ، أَنَّهُ سَمِعَ عَائِشَةَ، تَقُولُ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ " إِنَّهُ خُلِقَ كُلُّ إِنْسَانٍ مِنْ بَنِي آدَمَ عَلَى سِتِّينَ وَثَلاَثِمَائَةِ مَفْصِلٍ فَمَنْ كَبَّرَ اللَّهَ وَحَمِدَ اللَّهَ وَهَلَّلَ اللَّهَ وَسَبَّحَ اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ اللَّهَ وَعَزَلَ حَجَرًا عَنْ طَرِيقِ النَّاسِ أَوْ شَوْكَةً أَوْ عَظْمًا عَنْ طَرِيقِ النَّاسِ وَأَمَرَ بِمَعْرُوفٍ أَوْ نَهَى عَنْ مُنْكَرٍ عَدَدَ تِلْكَ السِّتِّينَ وَالثَّلاَثِمِائَةِ السُّلاَمَى فَإِنَّهُ يَمْشِي يَوْمَئِذٍ وَقَدْ زَحْزَحَ نَفْسَهُ عَنِ النَّارِ " . قَالَ أَبُو تَوْبَةَ وَرُبَّمَا قَالَ " يُمْسِي " .
‘হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত:
রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তা’‘আলা প্রত্যেক আদম সন্তানকেই ৩৬০ টি গ্রন্থি বিশিষ্ট করে সৃষ্টি করেছেন। অতএব যে ব্যক্তি ঐ সংখ্যা পরিমাণ ‘আল্ল-হ-আকবার’ বলবে, ‘‘আলহামদু লিল্লাহ’’ বলবে, ‘‘লা-ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ’’ বলবে, ‘‘সুবহা-নাল্ল-হ’’ বলবে, "আস্তাগফিরুল্ল-হ’’ বলবে, মানুষের চলার পথ থেকে একটি পাথর বা একটি কাঁটা বা একটি হাড় সরবে। "সৎ কাজের আদেশ দিবে এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে", সে কেয়ামতের দিন এমনভাবে চলাফেরা করবে যে, সে নিজেকে ৩৬০ (গ্রন্থি) সংখ্যা পরিমাণ জাহান্নাম থেকে দূরে রাখবে অর্থাৎ বেঁচে থাকবে। আবূ তাওবাহ্ তাঁর বর্ণনায় এ কথাও উল্লেখ করেছেন যে, সে এ অবস্থায় সন্ধ্যা করবে।
(সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২২২০, হাদিসের মান: সহিহ হাদিস।)