ইফতেখার রবিন

বাংলা কাব্য সাহিত্যে আধুনিকতা এবং বহুবিধ নতুন ধারার প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন দত্ত। মাত্র চারখানি কাব্য, দুটি প্রহসন, তিনটি নাটক এবং বহু সনেট ও গীতিকবিতা রচনার জন্য তিনি বাংলা সাহিত্যে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তিনি বাংলা ভাষায় প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দ প্রবর্তন করেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মহাকাব্যের ধারার সূত্রপাতও করেন মধুসূদন। তার সীমাহীন কৃতিত্ব প্রকাশ পেয়েছে তার বৈচিত্র্যপূর্ণ সৃষ্টি সম্ভারের মাধ্যমে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা কাব্য সাহিত্যে আধুনিক যুগের প্রবর্তক। মধ্যযুগের কাব্যে দেবদেবীর মাহাত্ম্যসূচক কাহিনির বৈশিষ্ট্য অতিক্রম করে বাংলা কাব্যধারায় মানবতাবোধ সৃষ্টিপূর্বক আধুনিকতার লক্ষণ ফোটানোতেই মাইকেল মধুসূদন দত্তের অতুলনীয় কীর্তি প্রকাশিত। তিনি তার সাহিত্য সৃষ্টিতে, বিষয় নির্বাচনে ও প্রকাশ ভঙ্গিতে, ভাবে ও ভাষায়, অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যে এমন একটি আশ্চর্য শিল্প কুশলতা ফুটিয়ে তুলেছেন যাকে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে সম্পূর্ণ অভিনব হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। বস্তুত এসব দিক থেকে তার অপরিসীম কৃতিত্ব বাংলা সাহিত্যের গতি পরিবর্তনে সহায়তা করেছিল।

বিরাট প্রতিভাবান মধুসূদন বাংলা কাব্য সাহিত্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা না করে সম্পূর্ণ নতুন কাব্যধারার প্রবর্তন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি সাহিত্য সাধনায় সাফল্যের মাধ্যমে এমন একটি অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন যাকে ভিত্তি হিসেবে অবলম্বন। করে পরবর্তী পর্যায়ে বাংলা সাহিত্যের দ্রুত উন্নতি সাধিত হয়। পাশ্চাত্য কাব্যপুষ্ট, প্রতিবেশ নিরপেক্ষ কবিকল্পনার অধিকারী ছিলেন মধুসূদন। এ বৈশিষ্ট্য সমসাময়িককালে ছিল একান্ত অচিন্তনীয় এবং এর প্রভাবেই তিনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি নতুন যুগের প্রবর্তন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার কবিকৃতির প্রকাশকাল মোটামুটি ১৮৬০ সাল থেকেই আধুনিক যুগের প্রকৃত লক্ষণ ফুটে উঠেছে।

বাংলা সাহিত্যে মাইকেল মধুসূদনের সগৌরব আবির্ভাব ঘটেছিল নাট্য রচনার সূত্র ধরে। বাংলা নাটকের দীনহীন অবস্থা প্রত্যক্ষ করে তিনি নাটক রচনায় আত্মনিয়োগ করেন এবং পরবর্তী পর্যায়ে তার বিস্ময়কর প্রতিভা বৈচিত্র্যমুখী হয়ে ওঠে। বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক নাট্যকার হিসেবে তার স্থান সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তার প্রথম নাটক শর্মিষ্ঠার মাধ্যমে পাশ্চাত্য রোমান্টিক নাট্যকলার আদর্শ প্রদর্শিত হওয়ায় তা বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম সার্থক নাটক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এর পরে প্রকাশিত পদ্মাবতী ও কৃষ্ণকুমারী নাটকদ্বয়ের মাধ্যমে তিনি প্রথম আধুনিক কমেডি ও ট্র্যাজেডির সৃষ্টি করেন। তাছাড়া একেই কি বলে সভ্যতা এবং বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ নামক প্রহসন দুটি নতুনত্ব প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়। তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য রচনার মাধ্যমে অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত প্রথম কাব্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য মেঘনাদবধ কাব্য রচনা করে বাংলা মহাকাব্যের ধারার প্রবর্তন করেন। বীরাঙ্গনা কাব্যের পৌরাণিক নারী চরিত্রের পুনর্বিচারে এবং অমিত্রাক্ষর ছন্দের চরমোৎকর্ষ সাধনে মাইকেল নতুনতর বৈশিষ্ট্য প্রদর্শনে সক্ষম হন। এ অমিত্রাক্ষর ছন্দ প্রবর্তনের মাধ্যমে তিনি বাংলা ছন্দে নতুন যুগের সৃষ্টি করেন। ব্রজাঙ্গনা কাব্যও নতুন বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। এখানে পৌরাণিক রাধাকে তিনি নতুন রূপে প্রত্যক্ষ করেন। এসব দিক ছাড়া তার চতুর্দশপদী কবিতাবলী, বাংলা কাব্যধারায় সনেট জাতীয় কবিতা রচনার পথিকৃৎ হিসেবে অপরিসীম গুরুত্বের অধিকারী।

মধুসূদন বাংলা সাহিত্যে বিদেশি সাহিত্যাদর্শের প্রাণধর্মের প্রতিষ্ঠা করেন। সমাজসচেতনতা, মানবপ্রীতি ও নতুনত্ব প্রকাশ করেই মধুসূদন বাংলা কাব্যে যথার্থ আধুনিকতা আনয়ন করেন। তার প্রথম নাটক শমিষ্ঠা বাংলা নাটকে প্রাণসঞ্চার করেছিল। এ নাটকের পূর্বেকার বাংলা নাটকে কৌতুক রসের বাহুল্য, রচনার গুরুভার ইত্যাদি ত্রুটি বিদ্যমান ছিল। মধুসূদন পূর্ববর্তী প্রভাব কাটিয়ে বাংলা নাটককে উদ্দেশ্যহীন গতি থেকে মুক্তি দিয়ে কাহিনিবিন্যাস, ঘটনার সংস্থাপন এবং কৌতুক রসের সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে এক নতুন জীবন দান করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সংস্কৃত আলংকারিকদের বিধিনিষেধ থেকে মুক্তি, কাহিনিতে নিরবচ্ছিন্ন গতি, নাট্যরীতিতে পাশ্চাত্য আদর্শ গ্রহণ ইত্যাদির ফলে বাংলা নাটক তার হাতেই ভাবীকালের পথের সন্ধান পেয়ে সার্থকতর সৃষ্টির পর্যায়ে উন্নীত হয়।

গ্রিক পুরাণের আখ্যায়িকা হিন্দু পুরাণের ছাঁচে ঢেলে হিন্দু ধর্মসংস্কারানুযায়ী রূপ প্রদানপূর্বক মধুসূদন তার দ্বিতীয় নাটক পদ্মাবতী রচনা করেন। এ নাটকেই তিনি প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার করেন। তবে এর ভাষারীতি প্রধানত গদ্য। মধুসূদনের পরবর্তী নাটক কৃষ্ণকুমারী বাংলা ঐতিহাসিক রোমান্টিক ট্র্যাজেডির পথপ্রদর্শক। ইতিহাসের কাহিনি অবলম্বনে লিখিত এটিই প্রথম বাংলা নাটক। তবে ইতিহাসের মূল কাহিনির সঙ্গে নাট্যকাহিনির সংযোগ ক্ষীণতম বলে একে সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক নাটক বলা যায় না। প্রতীচ্য আঙ্গিকের ব্যবহারে রচিত কৃষ্ণকুমারী মধুসূদনের সর্বশ্রেষ্ঠ নাটক। মধুসূদনের প্রহসন একেই কি বলে সভ্যতা এবং বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ বাংলা নাট্যসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ প্রহসনের স্থান লাভ করতে পারে। প্রথম প্রহসনটির মধ্যে তৎকালীন ইংরেজি শিক্ষাভিমানী যুবসম্প্রদায়ের উচ্ছৃঙ্খলতা ও অনাচারের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। অন্যটির মধ্যে অধর্মাচারী লোকের ভন্ডামি ও চরিত্রহীনতার চিত্র বিদ্যমান। ‘নাট্যকার প্রহসন দুটিতে টাইপ জাতীয় চরিত্র সৃষ্টি করে সমকালীন সমাজের স্বরূপ প্রকাশ করেছেন। এগুলোর অনুসরণে পরবর্তীকালে এ প্রকার অনেক প্রহসন রচিত হয়েছে। প্রহসন হিসেবে নিখুঁত এ রচনা দুটিকে বাস্তবতা প্রধান বলে অভিহিত করা যায়। প্রহসন দুটিতে বাগভঙ্গির সাবলীলতা সংলাপ ও বাস্তব পরিবেশ সচেতনতা নিঃসন্দেহে উৎকর্ষের কারণ হয়েছে। মধুসূদনের কাব্য শাখায় অবিস্মরণীয় দান তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য। অমিত্রাক্ষর ছন্দে চার সর্গে রচিত এ কাব্যের বিষয়বস্তু ভারতীয় পুরাণকাহিনি থেকে সংগৃহীত। এ কাব্য রূপায়ণে মধুসূদন দেশি-বিদেশি কাব্যের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। পদ্মাবর্তী নাটকে মধুসূদন প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দের সামান্য ক্ষমতা উপলব্ধি করে তিলোত্তমাসম্ভব কাব্যে তার সার্থক ব্যবহার দেখান।

মধুসূদনের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ মেঘনাদবধ কাব্য বাংলা সাহিত্যের প্রথম এবং শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য। বাল্মীকির সংস্কৃত মহাকাব্য রামায়ণ থেকে কাহিনি নিয়ে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ভাবের সম্মিলনে কবি এ কাব্য রূপায়িত করেন। নয় সর্গে সমাপ্ত এ গ্রন্থে প্রাচ্য-পাশ্চাত্য মহাকাব্যিক আদর্শ একত্রিত হয়েছে। এর কাহিনি রামায়ণের হলেও উপস্থাপনারীতি কবির নিজস্ব। এর চরিত্রচিত্রণ পাশ্চাত্য স্টাইলে, কাব্যের পরিণতি গ্রিক ট্র্যাজেডির অনুবর্তী। এ কাব্যের শ্রেষ্ঠত্ব আজও অম্লান।

মধুসূদনের ব্রজাঙ্গনা কাব্যটি বৈষ্ণব পদাবলির অনুকরণে আধুনিক রূপে রূপায়িত। কবি এখানে রাধাকৃষ্ণের আধ্যাত্মিক রূপক গ্রহণ না করে রাধার বিরহের মানবিক বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তুলেছেন, যা বাংলা সাহিত্যে আধুনিক। রাধার এ রূপান্তরে উনিশ শতকের মানবতাবাদের পরিচয় বিধৃত। কবি এ কাব্যে ভাষা ও ছন্দ নিয়ে নতুন পরীক্ষানীরিক্ষা চালিয়েছেন। এগুলো সুরের সহযোগে গেয় মহাজন পদাবলিও নয়, বিভিন্ন পালায় বিভক্ত কবি বা পাঁচালী শ্রেণির গানও নয়; কবি স্বয়ং এগুলোকে ড়ফব আখ্যা দিয়েছেন। তার অমিত্রাক্ষর ছন্দ ও চতুর্দশপদী কবিতার মতো বাংলায় এ শ্রেণির গীতিকবিতারও তিনি জন্মদাতা।

বীরাঙ্গনা ইতালির কবি ওভিদের ঐবৎড়রফবং কাব্যের আদর্শানুসারে লিখিত পত্রকাব্য। অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত এ কাব্যে মধুসূদন ছন্দের দিক থেকে চরম সার্থকতা লাভ করেছেন। চতুর্দশপদী কবিতাবলী নামে সনেট জাতীয় কবিতা রচনার মাধ্যমে মধুসূদন বাংলা কাব্যে একটি নতুন শাখার সৃষ্টি করেন। গীতিকবিতার পর্যায়ভুক্ত এ সনেটে কবিহৃদয়ের একটি সম্পূর্ণ অনুভূতি চৌদ্দ পঙক্তির মধ্যে আঙ্গিকগত বৈশিষ্ট্যসহকারে প্রকাশ পায়। ইতালির কবি পেত্রার্কের আদর্শে মধুসূদন অধিকাংশ সনেট রচনা করেছেন।

পৌরাণিক আদর্শের কালোচিত রূপান্তর, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ভাবধারায় সামঞ্জস্যপূর্ণ সমন্বয় এবং যুগোপযোগী জীবনজিজ্ঞাসার প্রতিফলন তার কাব্যকে যেমন ঐতিহ্য বিরহিত করেছে, তেমনি অনাগত কালের জন্য রেখে গেছে অন্তহীন আবেদন। বাংলা সাহিত্যে একটি নতুন যুগের প্রবর্তনার মাধ্যমে মধুসূদন আশ্চর্য প্রতিভার যে উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে গেছেন তা চিরদিন অম্লান হয়ে থাকবে। গতানুগতিক সাহিত্যাদর্শে তার বলিষ্ঠ বিদ্রোহের ফলে বাংলা সাহিত্যের মুক্তিলাভ এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে গৌরবময় ইতিহাস সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়।