ড. মোজাফফর হোসেন

ত্রয়োদশ শতাব্দীর আগে বাংলা গান ছিল মূলত কীর্তন। বাংলা গানের প্রথম পদাবলী চর্যাপদ। বৌদ্ধ গান ও দোহা হিসাবে চর্যাপদের খ্যাতি আছে। চর্যাপদ পরবর্তী রচনা বৈষ্ণব কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দ; গীতগোবিন্দের বিষয় রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা। তারপর রচিত হয় শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। পর্যায়ক্রমে রচিত হয় শ্রীচৈতন্য লিখিত পদাবলীকীর্তন; রাম প্রসাদের রচনা শাক্তগীতি; রামনিধিগুপ্ত বা নিধিগুপ্ত রচিত টপ্পাগান; রাজা রামমোহন রায়ের ব্রহমসঙ্গীত। রবীন্দ্রনাথ, ডিজেন্দ্রলাল রায়-ও অসংখ্য গান রচনা করেছেন।

আধুনিক বাংলা গানের যে ধারা, সেটা আরম্ভ হয়েছিল সুলতানি সময়ে। বাদ্যযন্ত্রের সাথে তাল, লয় সুরের বৈচিত্র এদেশে আমদানী করেছে মুসলমানরা। মরমি ও ভক্তিবাদ গানেরও পরিমার্জন করেন মুসলমানরা। হিন্দুস্থানী উচ্চাঙ্গসঙ্গীত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সুরসমন্বয়ে। তাই ভারতবর্ষীয় সঙ্গীতশিল্পের উন্নতিতে সুলতান, আমির-উমরাদের অবদান অনস্বীকার্য। তাদের মধ্যে সুরস¤্রাট স¤্রাট আলাউদ্দিন খলজি ছিলেন অন্যতম। অন্যান্যদের মধ্যে কাশ্মিরের সুলতান জয়নুল আবেদীন। গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহ। সুলতান সিকান্দার লোদী। জৌনপুরের সুলতান হোসেন শাহ শুর্কী। স¤্রাট আকবর। স¤্রাট জাহাঙ্গীর। স¤্রাট শাহজাহান প্রমূখ। খাজা মুইনুদ্দি চিশতি ও মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি সঙ্গীতের মাধ্যমে যিকির করতেন। খাজা মুইনুদ্দিন চিশতি ভারতের তারগড় পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে তোলেন খানকা। এই খানকা এখন আজমির শরিফ নামে পরিচিত। এখানে সঙ্গীত র্চ্চা করতেন আলাউদ্দিন খিলজি, আমির খসরু। পুরা সুলতানি আমল (তেরো শতক থেকে আঠারো শতকের মাঝামাঝি) ইসলামি গানের চর্চা করেছেন সুফি-দরবেশরা। গানের এই ধারা সুলতানি বাংলাকেও প্রভাবিত করেছিল। তবে গানে ইসলামি ইতিহাস-ঐতিহ্য উপেক্ষিত হতে থাকল ইংরেজ শাসন থেকে।

ব্রিটিশ শাসনের ফলে ঢাকা, সোনারগাঁ, মুর্শিদাবাদের পরিবর্তে কলকাতার জৌলুস বাড়তে থাকল। কলকাতায় লোকসঙ্গীত, কীর্তন, কবিগান, যাত্রাগান রামপ্রসাদী, পাঁচালী প্রভৃতি গানের আগমন ঘটল। ইংরেজদের পৃষ্ঠপোষকতায় এ সময় নব্যধনাঢ্য ও ব্যবসায়িক শ্রেণির উদ্ভব ঘটল। এরা ইয়ংবেঙ্গল নামেও পরিচিত হলো। স্থাপন করা হলো শ্রীরামপুর মিশন, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ। এসব প্রতিষ্ঠানে বাংলা বিভাগ চালু করা হলো এবং ইউরোপ থেকে ইংরেজি সাহিত্য ও বইপুস্তক এনে বাংলায় অনুবাদ করে সেসব অনূদিত বইপুস্তক বিতরণ করা শুরু হলো। এভাবে চলতে থাকল ইউরোপীয় সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতির ধ্যান-জ্ঞান-চিন্তা-চেতনার সাধনা। এ সাধনায় যুক্ত হলেন রাজা রামমোহন রায়; বঙ্কিম চন্দ্রচট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ও তার পরিবারসহ আরও অনেকেই। ওদিকে মাইকেল মধুসূদন দত্ত তো একেবারেই খাঁটি ইংরেজই হতে চেয়েছিলেন। নজরুল ছিলেন এ ধারার বাইরে একেবারে স্বতন্ত্র।

রবীন্দ্র-নজরুল যুগ পর্যন্তু আধুনিক বাংলা গান শালীন ছিল। আল্লাহ ভক্তি, প্রকৃতি বর্ণনা, দেশপ্রেম, নরনারীর প্রেম ছিল গানের বিষয়। এরপর থেকে প্রেমবিরহের গানই বেশি রচিত হয়েছে। শহুরে ভাব-ভাষায় শালীনতা বর্জিত এক ধরণের রসালো গান রচিত হতে থাকল। রচিত হলো ঝুমুর গান। এ ধারায় গান রচনা করেছিল ক্ষেত্রমোহন, শৌরিন্দ্রমোহন, জ্যোতিন্দ্রনাথ ঠাকুর, গোস্বামী, কৃষ্ণধন বন্দোপাদ্যায়সহ অনেকে। এরপর যারা রচনা করেছিলেন তাদের মধ্যে সলিল চৌধুরী, গীতাদত্ত, নচিকেতা ঘোষ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্নাদে, ভূপেন হাজারিকা, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, কিশোর কুমার বেশি পরিচিত। এদের গানের তোড়ে নজরুলের ইসলামি গান মুখ থুবরে পড়ে থাকল। আর ঢাকা বেতার এবং গ্রামোফোনে বাজানো গানকে মুসলিম কিশোর তরুণরা সাদরে গ্রহণ করল।

নজরুলের ইসলামি গানকে দূরে সরে রাখা যায় না। সরে রাখার মতো গানও নয়। মুসলিম তরুণ-কিশোররা ইয়ংবেঙ্গলের প্রভাবে নজরুলের গানের মর্মার্থ আস্বাদন করতে না পেরে, তারা চটুল টপ্পা ও ঝুমুর গানে আকৃষ্ট হয়েছিল। তাছাড়া কলকাতা ও ঢাকা বেতার ইংরেজ কর্তৃক আমদানীকৃত পশ্চিমা জীবনদশর্নে প্রভাবিত হয়ে নজরুলের ইসলামি গান প্রচারে নিরুৎসাহিত হয়েছিল। ফলে আব্বাসউদ্দীনের গাওয়া গ্রামোফোনে রেকর্ডকৃত গান পরিবর্তিত সময়ে এসে সংকটে পড়েছিল। সংকট যে এখন কেটে গেছে, এটা বলা যায় না।

সঙ্গীতজ্ঞ নজরুলের শিল্পী জীবনের সূত্রপাত হয়েছিল লেটোদল থেকে। সেখাইেন তাঁর সংগীত চর্চার সূত্রপাত। ড সুশীলকুমার গুপ্ত বলেন- ‘সঙ্গীতের প্রতি নজরুলের আকর্ষণ সহজাত। বাল্যকাল থেকেই তাঁর সঙ্গীতানুরাগের প্রকাশ ঘটে। ১২-১৩ বছর বয়সে যখন তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে আসানসোলে এক রুটির দোকানে পাঁচ টাকা মাইনের চাকরি নেন, তখন তার যন্ত্রসঙ্গীত শুনে কাজী রফিজউদ্দীন নামে আসানসোনের এক দারোগা তাঁকে তার নিজ দেশ মৈমনসিংহ জেলার কাজীরসিমলা গ্রামে নিয়ে গিয়ে এক স্কুলে ভর্তি করে দেন। এর পূর্বে লেটোর দলে থাকাকালে তাঁকে গান রচনা এবং প্রয়োজন হলে সুর সংযোজন করতে হতো।’ এখানেই তাঁর কবিতা, গান ও নাটক রচনার শুরু। হিন্দু পুরাণ ও বাংলা লোকসংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয়ও ঘটে এই লেটোদল থেকেই। কাজী নজরুল ইসলাম আুষ্ঠানিকভাবে আধুনিক বাংলা সক্সগীভুবনে প্রবেশ করেন কলকাতায়। বিশ দশকের প্রথমে। তখন ভারতবর্ষে চলছিল ইংরেজ উচ্ছেদের নানান নামে আন্দোলন, এসব আন্দোলনের অনুপ্রেরণায় ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে নজরুল নিয়মিত সঙ্গীত রচনা শুরু করেন। ১৯২৬ সালের শেষপ্রান্তে তিসি গজল রজনা শুরু করেন এবং ১৯৩০ সালের শেষাবধি তিনি বহু উৎকৃষ্টমানের গজল রচনা করেন। আব্বাসউদ্দীন তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেন তার অনুরোধেই নজরুলের ইসলামি গানের যাত্রা শুরু হয়। আব্বাসউদ্দীনের অনুরোধে নজরুল রচনা করে ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ’ এবং ‘ইসলামের ঐ সওদা লয়ে এলো নবীন সওদাগর’। আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠেই নজরুলের বেশিল ভাগ গান পরিচিতি পেয়েছে। ১৯৩০ -৩১ সালে দিকে নজরুল ইসলাম নতুন এক ধারার সঙ্গীত অর্থাৎ ভক্তিমূলক ও ইসলামি গান রচনায় প্রতিষ্ঠালাভ করেন। তিনি প্রায় এক হাজারের কাছাকাছি ধর্মীয় সঙ্গীত রচনা করেন যার মধ্যে সনাতনী ঐতিহ্যের শ্যামাসঙ্গীত, ভজন, কীর্তনও রয়েছে; একই সাথে ইসলামি ঐতিহ্যের হামদ, নাত, নামাজ, রোযা, হজ,যাকাত, ঈদ, মর্সিয়া প্রভৃতি বিষয়ের গানও রয়েছে। এসব রচনা চল্লিশের দশকের শেষাবধি অব্যাহত ছিল। নজরুলের সঙ্গীত রচনার ধারাকে আধুনিক ও লোক-ঐতিহ্যভিত্তিক সঙ্গীত চর্চার অধ্যায় হিসাবে অভিহিত করা হয়। এইসব গানের মাধ্যমে নজরুল ইসলাম আধুনিক বাংলা গানের ভিত্তিকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। গানের প্রতি ছিল নজরুলের অদম্য উচ্ছ্বাস। গানের ব্যাপারে তিনি বলেন ‘আপনারা আমার কবিতা সম্পর্কে যা ইচ্ছা হয় বলুন, কিন্তু গান সম্পর্কে নয়। গান আমার আত্মর উপলব্ধি’।

নজরুলের ইসলামি গান বাংলা গানের জগতে তুলনাহীন। ইসলাম ধর্মের মর্মবাণীকে নজরুলের মতকরে গানে ধারণ করার দৃষ্টা›ত বিরল। সুলতানি সময় থেকে মোঘল সময় পর্যন্তু ইসলামি গানের বিষয় হিসাবে পাওয়া যায়, নবি, রসূল, জান্নাত, জাহান্নাম, পুলসিরাত, আখেরাত, মালাইকাত, নামাজ, রোযা, হজ, যাকাত, কুরবানি। কিন্তু নজরুল এই প্রথম এ সবের পাশাপাশি ইসলামি গানে তুলে ধরলেন ধর্মের ভিতর মানুষের মর্যাদাকে। ধর্মের নিগূঢ়তত্ত্ব হচ্ছে দুনিয়া ও আখেরাতে মানুষের স্বস্তিলাভ নিশ্চিত করা; মানবতায় গুরুত্তারোপ করা; মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরুনার্থে নিজের জান, মাল ও সময়কে উৎসর্গ করা। সেজন্য ধর্মের বিধি-নিষেধ প্রণীত হয়েছে মানুষকে মানুষের জন্য নিবেদিত করার উদ্দেশ্যে। ধর্মের এই আহ্বান নজরুল বুঝেছিলেন গভীরভাবে। (৭-এর পাতায় দেখুন)

(৬-এর পাতার পর)

সেই উপলব্ধিরই চিত্র আঁকলেন ইসলামি গানে। তিনি ‘বকরীদ’ শিরোনামের গানে বললেন- ‘ইব্রাহিমের কাহিনী শুনেছ? ইসমাইলের ত্যাগ?/ আল্লাহরে পাবে মনে কর কোরবানি দিয়ে গরু ছাগ?/ আল্লাহর নামে, ধর্মের নামে, মানব জাতির লাগি’/ পুত্রেরে কোরবানি দিতে পারে, আছে কেউ হেন ত্যাগী?/ সেই মুসলিম থাকে যদি কেউ, তসলিম করি তারে/ঈদগাহে গিয়া তারি সার্থক হয় ডাকা আল্লাহরে। অন্তরে ভোগী, বাইরে যে রোগী, মুসলমান সে নয়,/ চোগা চাপকানে ঢাকা পড়িবেনা সত্য যে পরিচয়।.. .. ইবরাহিমের মত পুত্রেরে আল্লাহর রাহে দাও,/ নৈলে কখনো মুসলিম নও, মিছে শাফায়াৎ চাও/ নির্যাতিতের লাগি’ পুত্রেরে দাও না শহীদ হতে/চাকরিতে দিয়া মিছে কথা কও-‘যাও আল্লাহর পথে’।.. .. পিছন হইতে বুকে ছুরি মেরে, গলায় গলায় মেলো/ করো না আত্ম-প্রতারণা আর, খেলকা খুলিয়া ফেল!/.. .. কোথায় আমার প্রিয় শহীদান মৃত্যুঞ্জয়ী প্রাণ?/ ঈদের নামাজ পড়িব, আলাদা আমাদের ময়দান’-(বকরীদ)।

মুসলিমরা ইবরাহিম ও ইসমাইলের কুরবানির কাহিনী শুনেছে। তারা বুঝেছে আল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু কুরবানি করলেই আল্লাহকে পাওয়া যাবে। সেজন্য তারা বড় বড় উট গরু ছাগল কুরবানি দেওয়ার প্রতিযোগিতা করে। কিন্তু নজরুল কুরবানি অর্থে বুঝেছেন ভিন্ন কথা। তিনি বুঝেছেন, ইবরাহিমের দেওয়া কুরবানির মাহত্ম্য সাধারণ মুসলমান যা বোঝে তা নয়। পৃথিবীতে বহু মানুষ প্রতিদিন জুলুম অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এসব নির্যাতিত মানুষকে উদ্ধার করার জন্য নিজের সন্তানকে উৎসর্গ করার নামই কুরবানি। নজরুল জিজ্ঞাসা করেছেন- মানব জাতির স্বস্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য ক জন আছে যারা তার সন্তানকে কুরবানি (সংগ্রামের জন্য উৎসর্গ) করতে পারেন? এই জিজ্ঞাসার জবাব আমাদের জানা নাই। পশু কুরবানির প্রতীককে নজরুল বুঝেছেন মানবতাকে প্রতিষ্ঠা করার পথই আল্লাহর পথ। নজরুলের এই উপলব্ধি যে নির্ভুল ছিল তা পবিত্র কুরআনের সূরা নিসার এই বক্তব্য পরিষ্কার করে। আল্লাহ বলেন- ‘আর তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর পথে লড়াই করছ না; অথচ দুর্বল পুরুষ, নারী ও শিশু যারা বলে, হে আমাদের রব! আপনি আমাদেরকে এ অত্যাচারী জনপদ থেকে বের করে দিন, আপনি আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য বন্ধু ও সাহায্যকারী নির্ধারণ করে দিন। যারা ঈমান এনেছে তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে’ (পবিত্র কুরআন, সূরা নিসা, আয়াত ৭৫-৭৬)। কুরআনের এ বক্তব্যে স্পষ্ট বুঝা যায়, জনপদ থেকে অন্যায়, অবিচার আর বঞ্চনার মুলউৎপাটন করে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করাই হচ্ছে আল্লাহর পথ। আর এই পথে নিজের সন্তানকে উদ্বুদ্ধ করার নামই কুরবানি।

নজরুল রমযানের তাৎপর্য উপলব্ধি করতে গিয়ে লেখলেন- ‘ও মন, রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ/ তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাকিদ/ তোর সোনাদানা বালাখানা সব রাহে লিল্লাহ/ দে জাকাত, মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিঁদ/.. .. আজ ভুলে গিয়ে দোস্ত-দুশমন হাত মিলাও হাতে/ তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরীদ। যারা জীবন ভরে রাখছে রোজা নিত-উপবাসী/ সেই গরীব এতিম মিসকিনে দে যা কিছু মফিদ।’ বিখ্যাত এই গানের সারসংক্ষেপ নজরুল গ্রহণ করেছিলেন কুরআন থেকে। পবিত্র কুরআনে সূরা মাউন- এ বলা হয়েছে- ‘আপনি কি দেখেছেন তাকে, যে কর্মফল দিবসকে অস্বীকার করে? সে তো সেই ব্যক্তি যে ইয়াতিমকে তাড়িয়ে দেয়; সে অভাবগ্রস্তকে অন্নদানে উৎসাহ দেয় না; সুতরাং দুর্ভোগ সেসমস্ত নামাজিদের; যারা তাদের নামাজ সম্পর্কে উদাসীন; যারা তা লোক দেখানোর জন্য আদায় করে; আর গৃহস্থালীর নিত্যপ্রয়োজনীয় ছোটখাটো জিনিস (অন্য প্রতিবেশীকে) প্রদানে বিরত থাকে।’ নজরুল বুঝেছিলেন মানুষের অর্জিত বিপুল ধনসম্পদ, সোনা-দানা বালাখানা সবই আল্লাহর জন্য। আর আল্লাহর জন্য মানে অভাবগ্রস্তদের জন্য। অভাবগ্রস্তরা তো জীবনভরই রোজা রাখে। তাদের ক্ষুধাকে উপলব্ধি করে তাদের জন্য মফিদের ব্যবস্থা করাই তো ঈদের শিক্ষা। শত্রুমিত্রকে ভুলে গিয়ে সবাইকে কাছে টেনে নেওয়ার যে শিক্ষা সেই শিক্ষাও ঈদের শিক্ষা। অভাবগ্রস্তদের অভাব মোচনের জন্য ধর্মে জাকাতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অভাবী মানুষের প্রয়োজন মিটানোর জন্য সম্পদ ব্যয় করাই হচ্ছে শাফায়াৎ। নজরুলের গানে এই বিষয়টি বার বার এসেছে। যেমন- ‘আল্লাহর রাহে ভিক্ষা দাও’ শিরোনামের সঙ্গীতে নজরুল বলেন-হে ধনিক, তার পাইয়াছ বহু দান/ রতœ মানিক ভোগ যশ সম্মান/ তব প্রাসাদের চারিদিকে ভিখারিরা/ প্রসাদ মেগেছে ক্ষুধার অন্ন, চায়নি তোমার হীর্/া বলো বলো, সেই নিরন্নদের মুখে/ অন্ন দিয়াছ? কেঁদেছ তাদের দুখে?/.. .. তব আত্মার আত্মীয় যারা, তারা ক্ষুধা তৃষ্ণায়/কাঙালের বেশে কাঁদে তব দরজায়/ তাড়ায়ে তাদেরে, গাল দিয়ে দরওয়ান/ তুমিও মানুষ, কাঁদেনা তোমার প্রাণ?/ হীরা মানিকের পাষাণ পরিয়া তুমি কি পাষাণ হলে?/ তোমার আত্মা কাঁদেনা তোমার দুয়ারে মানুষ মলে? আবার ’দীন দরিদ্র কাঙালের তরে’ পঙক্তিতে নজরুল বলেন-‘মানুষের ব্যথা অভাবের কথা ভাবিবার কেহ নাই/ ধনী মুসলিম ভোগ ও বিলাসে ডুবিয়া আছে সদাই/ তোমারেই ডাকে যত মুসলিম গরীব শ্রমিক চাষী/ বঞ্চিত মোরা হইয়াছি আজ তব রহমত হতে/ সাহেবী গিয়াছে, মোসাহেবী করি’ ফিরি দুনিয়ার পথে/ আবার মানুষ হব কবে মোরা মানুষেরে ভালোবাসি’।

নজরুলে বয়স যখন ৯ বছর তখন তাঁর বাবার মৃত্যু। বাবার মৃত্যুর পর নজরুল সংসারের কথা ভাবে। আর মক্তব পাশ করে নজরুল শিক্ষকতার চাকরি নিতে বাধ্য হোন। ইমাম মোয়াজ্জিন মাজারের খাদেম সবই করেছেন অর্থ উপার্জনের প্রয়োজনে। খেয়েপরে বেঁচে থাকতে ইমাম থেকে লেটোর দলের গীতিকার ও শিল্পী হিসাবেও যোগ দেন। এসবের ভিতর দিয়ে নজরুল পারিবারিকভাবেও ইসলামের মৌলিক জ্ঞান লাভ করেন। সে কারণে তিনি বলতে পেরেছেন- গাহি সাম্যের গান/ যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান/ যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলমান-খ্রীশ্টান’/... মিথ্যে শুনিনি ভাই/ এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির কাবা নাই।

সাম্যবাদের ধর্ম ইসলাম। সর্বজনীন ভাতৃত্ব রক্ষা করা মুসলমানদের মৌলিক কর্তব্য। কিন্তু মুসলমান সেই কর্তব্যে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে চলছে। ব্যক্তিস্বার্থে মুসলমান অন্ধ। স্বার্থান্ধ মুসলমান খোলাফায়ে রাশেদিনের সময় নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। আমিরে মুয়াবিয়া, ইয়াজিদ, হযরত আলী, ইমাম হাসান হোসেনের মধ্যে যে সংঘাত তার বর্ণনা ‘মহর্রম’ লিপিতে নজরুল লিপিবদ্ধ করেছেন। আজকের আফ্রিকার সুদানেও মুসলমান নিজেরদের মধ্যে সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে শুধু ব্যক্তিস্বার্থ সংরক্ষনের জন্য। মুসলমানদের এই চরিত্র দেখে নজরুল ব্যথিত হয়েছেন; মনে করেছেন স্বার্থন্ধতা শাফায়াৎ এর পথ নয়। নজরুল চেয়েছেন এই অন্ধকার থেকে মুক্তি- তিনি লিখেছেন- ‘ঐক্য যে ইসলামের লক্ষ, এরা তাহা দেয় ভেঙ্গে/ ফোরাত নদীর কূল যুগে যুগে রক্তে উঠেছে রেঙে/সর্বজনীন ভ্রাতৃত্ব, ইসলামের সাম্যবাদ/ যুগে যুগে এই অসুর সেনারা করিয়াছে বরবাদ/ লোভ ও অহঙ্কার ইহাদের করিয়াছে অজ্ঞান/সাম্য মৈত্রী মানেনা, তবুও এরা যে মুসলমান/ ত্যাগ করে না ক ক্ষুধিতের তরে সঞ্চিত সম্পদ/ নওয়াব বাদশা জমিদার হয়ে, চায় প্রতিষ্ঠা মদ/ ভোগের নওয়াব আমীর ইহারা,ত্যাগের আমীর কই/ মোহর্রমের বিষাদ-মলিন চাঁদ পানে চেয়ে রই।’

পৃথিবীর ধর্মান্ধতা দেখে নজরুল প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন জ্ঞানী-গুণী, লেখক-কবি, শিল্পী-সাহিত্যিকদের প্রতি; কেনো তারা তাদের জ্ঞান, লেখনি, বুদ্ধি, কাব্য দিয়ে পৃথিবীতে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারলো না? কেনো তাদের বুদ্ধির আলো মানুষের বিবেককে নাড়া দিল না? কেনো তাদের জ্ঞানের রশনি রথি-মহারথিদেরকে স্বার্থান্ধতা থেকে বের করে আনতে পারল না? কেনো নিরন্নদেরকে অন্ন যোগাতে উৎসাহ দিল না? নজরুল বুদ্ধিবাদীদের দায়ী করে গাইলেন- ওগো জ্ঞানী, ওগো শিল্পী, লেখক কবি/ তোমরা দেখেছ উর্ধের শশী রবি/ তোমাদের এই জ্ঞানের প্রদীপ-মালা/ করে না ক কেন কাঙালের ঘর আলা?/ এত জ্ঞান, এত শক্তি, বিলাস সে কি?/ আলো তার দূর কুটিরে যায় না কোন সে শিলায় ঠেকি?- (‘আল্লাহর রাহে ভিক্ষা দাও’)

ধর্মের মর্মকথা যে গ্লানিকর হানাহানি ও স্বার্থান্ধতাকে উৎসাহিত করে না এটা নজরুল বার বার ব্যক্ত করেছেন তার গানে। নজরুল লক্ষ করেছেন মানুষ ধর্মের বাণী গ্রহণ করেনি; গ্রহণ করলে হানাহানি করতো না। যারা হানাহনিতে নিজেকে নিযুক্ত রাখেন তারা ধর্মের নামে ভন্ডামীতে ডুবে আছে। নজরুল গেয়েছেন-‘তুমি চাহ নাই ধর্মের নামে গ্লানিকর হানাহানি/ তলোয়ার তুমি দাও নাই হাতে দিয়াছ অমর বাণী/ মোরা ভুলে গিয়ে তব উদারতা/ সার করিয়াছি ধর্মান্ধতা।- ‘তোমার বাণীর করিনি গ্রহণ’ ॥

তথ্যসূত্র

১. ওয়াকিল আহমদ- নজরুল লেটো ও লোক-ঐতিহ্য, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা।

২. কাজী নজরুল ইসলাম- সঞ্চিতা, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা।

৩.আবদুল হাই শিকদার, বাংলাদেশে নজরুল চর্চা:মুখোশ ও বাস্তবতা, মাসুম বুক ডিপো,ঢাকা।

৪. কামরুন্নেছা আজাদ-ধর্মীয় চেতনায় নজরুল, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা।

৫. মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন- সওগাত যুগে নজরুল ইসলাম, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা।

৬ বিশ্বজিৎ ঘোষ- নজরুল মানস ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, বাংলা একাডেমি,ঢাকা।

৭. ড. সুশীলকুমার গুপ্ত, নজরুল চরিতমানস,

৮. কাজী নজরুল ইসলাম, নজরুল রচনাবলী, বাংলা একাডেমী, ঢাকা।

৮. আব্দুল মান্নান সৈয়দ-আমার নজরুল, ঐতিহ্য, ঢাকা।