মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন

ভাষা ক্ষমতা ও রাজনৈতিক অস্তিত্ব

ভাষা কেবল ভাব বিনিময়ের মাধ্যম নয়; বরং এটি একটি জাতির মনস্তত্ত্ব, ইতিহাস এবং রাজনৈতিক অস্তিত্বের রক্ষাকবচ। একটি জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় নির্মিত হয় তার মুখের ভাষাকে কেন্দ্র করে, আবার সেই ভাষাই শাসকের হাতে দমিত হলে জাতিসত্তার অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়ে। বাংলা ভাষার উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি কখনোই সরলরৈখিক পথে এগোয়নি। বরং ক্ষমতার পালাবদল, ধর্মীয় আধিপত্য এবং ঔপনিবেশিক চক্রান্তের মধ্য দিয়ে এই ভাষাকে বারবার তার স্বাভাবিক গতিপথ থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করা হয়েছে। চর্যাপদের কাল থেকে শুরু করে আজকের চব্বিশের বিপ্লব পর্যন্ত বাংলা ভাষার লড়াই মূলত ‘সাংস্কৃতিক আজাদী’ বা সাংস্কৃতিক মুক্তি অর্জনের লড়াই। এই প্রবন্ধে আমরা বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক বিবর্তন, হিন্দু ও মুসলিম শাসনামলে এর ভিন্নমুখী অবস্থান, ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি পর্বের সংঘাত এবং একাত্তর পরবর্তী সময়ে ভারতীয় আধিপত্যবাদের স্বরূপ উন্মোচন করে চব্বিশের বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে ওসমান হাদির চিন্তাধারা ও তরুণ প্রজন্মের সাংস্কৃতিক স্বপ্নের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করব।

প্রাচীন প্রেক্ষাপট: সংস্কৃতের দাপট ও লৌকিক ভাষার অস্তিত্বের সংগ্রাম

বাংলা ভাষার উদ্ভবের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এর জন্মলগ্নটি ছিল চরম অবহেলা ও অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে লিপ্ত। হাজার বছর আগে বাংলা যখন মাগধী প্রাকৃত ও অপভ্রংশের খোলস ছেড়ে নিজস্ব অবয়ব পেতে শুরু করেছিল, তখন এই ভূখণ্ডের সামাজিক ও রাজনৈতিক আকাশে সংস্কৃত ভাষার একচ্ছত্র আধিপত্য বিরাজমান ছিল। প্রাচীন ভারতে, বিশেষ করে সেন শাসনামলে, ভাষাকে কেন্দ্র করে এক উগ্র শ্রেণি-বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। ব্রাহ্মণ শাসিত সমাজব্যবস্থায় সংস্কৃতকে ‘দেবভাষা’ বা ঈশ্বরের ভাষা হিসেবে মহিমান্বিত করা হয়, যা ছিল মূলত উচ্চবর্ণের অভিজাত শ্রেণি ও পুরোহিতদের কুক্ষিগত সম্পদ। এর বিপরীতে সাধারণ কৃষক, জেলে, তাঁতি ও শ্রমজীবী মানুষের মুখের ভাষাÑযা থেকে আজকের বাংলার উদ্ভবÑতাকে ‘প্রাকৃত’ বা ‘ইতর’ জনের ভাষা বলে আখ্যায়িত করা হতো।

সেন রাজাদের শাসনকালকে (একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দী) বাংলা ভাষার জন্য এক অন্ধকারময় যুগ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। কর্ণাটক থেকে আগত সেন শাসকরা ছিলেন কট্টর রক্ষণশীল হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদের অনুসারী। তাঁরা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে নির্দেশ জারি করেছিলেন যে, জ্ঞানচর্চা, সাহিত্য এবং ধর্মাচরণের একমাত্র মাধ্যম হবে সংস্কৃত। সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায় কোনো শাস্ত্র রচনা বা চর্চা করা ছিল তখন ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। তৎকালীন সমাজের মনস্তাত্ত্বিক ভীতি এতটাই প্রবল করা হয়েছিল যে, একটি সংস্কৃত শ্লোকের মাধ্যমে ফতোয়া জারি করা হয়: “অষ্টাদশ পুরাণানি রামস্য চরিতানি চ। ভাষায়াং মানবঃ শ্রুত্বা রৌরবং নরকং ব্রজেৎ।।” অর্থাৎ, অষ্টাদশ পুরাণ বা রামায়ণ-মহাভারত যদি কেউ লৌকিক ভাষায় (বাংলায়) শুনে বা পাঠ করে, তবে তাকে রৌরব নামক ভয়ানক নরকে নিক্ষিপ্ত হতে হবে।

এই কঠোর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষকে জ্ঞান ও ক্ষমতার বৃত্ত থেকে দূরে রাখা। শাসকরা জানতেন, যদি সাধারণ মানুষ নিজেদের ভাষায় ধর্ম ও রাষ্ট্রকে বুঝতে শেখে, তবে ব্রাহ্মণ্যবাদী শোষণের বিরুদ্ধে তারা প্রশ্ন তুলতে শুরু করবে। তাই সংস্কৃতের কঠিন ব্যাকরণ ও আভিজাত্যের দেয়াল তুলে দিয়ে বাংলা ভাষাকে শ্বাসরুদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। রাজদরবারে তখন জয়দেব, ধোয়ী বা উমাপতি ধরের মতো সংস্কৃত কবিদের জয়জয়কার, অথচ মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের সুখ-দুঃখের কোনো স্থান সেই সাহিত্যে ছিল না।

তবুও এই চরম দমনের মুখে বাংলা ভাষা নিঃশেষ হয়ে যায়নি। সমাজের নিচুতলার মানুষ এবং বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকরা (সিদ্ধাচার্যগণ) সংস্কৃতের এই দাপটকে উপেক্ষা করে গোপনে তাদের সাধন-ভজন ও মনের ভাব প্রকাশের জন্য লোকভাষাকেই বেছে নিয়েছিলেন। ‘চর্যাপদ’ হলো সেই বিদ্রোহের প্রথম দলিল, যা রচিত হয়েছিল সংস্কৃতের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে। তাই প্রাচীন যুগে বাংলা ভাষার ইতিহাস কেবল বিবর্তনের ইতিহাস নয়, বরং এটি ছিল সংস্কৃতের ঔপনিবেশিক মানসিকতার বিরুদ্ধে এদেশের খেটে খাওয়া মানুষের আত্মপরিচয় টিকিয়ে রাখার এক দীর্ঘ ও নীরব লড়াই। অভিজাত শ্রেণি ও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে ভাষার এই বিভাজন ছিল মূলত শ্রেণি শোষণেরই একটি হাতিয়ার, যা পরবর্তীতে তুর্কি বিজয়ের আগ পর্যন্ত বাংলা ভাষাকে রাজসভার বাইরে ব্রাত্য করে রেখেছিল।

সুলতানি ও মোগল আমল: বাংলা ভাষার স্বর্ণযুগ ও মুসলিম রেনেসাঁ

বাংলা ভাষার ইতিহাসে সবচেয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে ত্রয়োদশ শতকে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয়ের মধ্য দিয়ে। মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষা রাজদরবারের আনুকূল্য লাভ করে। সুলতানি আমলকে বাংলা ভাষার ‘স্বর্ণযুগ’ বলা হয়। ইলিয়াস শাহী ও হোসেন শাহী বংশের সুলতানরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, এদেশের মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিতে হলে সংস্কৃত নয়, বরং তাদের মাতৃভাষাকেই গুরুত্ব দিতে হবে।

সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ, আলাউদ্দিন হোসেন শাহ এবং নসরত শাহের মতো শাসকরা মহাভারত, রামায়ণ এবং অন্যান্য সংস্কৃত গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মুসলিম শাসনামলে বাংলা ভাষায় প্রচুর আরবি ও ফারসি শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটে। এটি কোনো চাপিয়ে দেওয়া বিষয় ছিল না; বরং ইসলাম ধর্মের প্রসার এবং প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে সাধারণ মানুষ এই শব্দগুলোকে আপন করে নিয়েছিল। এর ফলে বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার অভূতপূর্বভাবে সমৃদ্ধ হয়। মোগল আমলেও এই ধারা অব্যাহত থাকে। মধ্যযুগের কবিরাÑযেমন শাহ মুহম্মদ সগীর, আলাওল, দৌলত উজির বাহরাম খানÑতাঁরা যে ভাষায় সাহিত্য রচনা করেছেন, তা ছিল এদেশের মানুষের মুখের ভাষার কাছাকাছি। সেখানে ‘আল্লাহ’, ‘রসুল’, ‘খোদা’, ‘গোস্ত’, ‘নামাজ’, ‘রোজা’ ইত্যাদি শব্দ ছিল বাংলা ভাষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। মুসলিম শাসকরা বাংলা ভাষাকে সংস্কৃতের নাগপাশ থেকে মুক্ত করে একে একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী রূপ দিয়েছিলেন। এ সময় বাংলা ভাষা ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে একটি সার্বজনীন মানবিক ভাষায় পরিণত হয়।

ঔপনিবেশিক চক্রান্ত: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও কৃত্রিম সংস্কৃতায়ন

পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর ব্রিটিশরা যখন ক্ষমতা দখল করে, তখন তারা শুধু রাজনৈতিকভাবেই শাসন করেনি, বরং সাংস্কৃতিকভাবেও এদেশকে পঙ্গু করার পরিকল্পনা করে। তাদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ বা ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ নীতির প্রতিফলন ঘটে ভাষার ক্ষেত্রেও। উনিশ শতকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে ‘শুদ্ধ’ করার নামে একটি ভয়ানক চক্রান্ত শুরু হয়।

উইলিয়াম কেরি এবং তার সহযোগী মৃত্যুঞ্জয় তর্কালঙ্কারসহ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা বাংলা ভাষা থেকে আরবি-ফারসি শব্দ ঝেটিয়ে বিদায় করার মিশনে নামেন। তাঁরা দাবি করেন, মুসলমানদের ব্যবহৃত বাংলা ‘অশুদ্ধ’ এবং সংস্কৃতঘেঁষা বাংলাই ‘আসল’। এর ফলে বাংলা গদ্যের যে নতুন রূপ তৈরি করা হলো, তা ছিল সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা থেকে যোজন যোজন দূরে। বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমচন্দ্রের হাত ধরে যে সাধু ভাষার প্রচলন হলো, তা ছিল মূলত কৃত্রিম ও তৎসম শব্দবহুল। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা সুকৌশলে মুসলমানদের হাজার বছরের লালিত ভাষিক ঐতিহ্যকে অস্বীকার করল। তারা বোঝাতে চাইল, বাংলা মূলত হিন্দুদের ভাষা, আর মুসলমানদের ভাষা হলো উর্দু বা অন্য কিছু। এই তাত্ত্বিক বিভাজন বাঙালি মুসলমানদের মনে গভীর হীনম্মন্যতার জন্ম দেয় এবং পরবর্তী সময়ে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বীজ বপন করে।

পাকিস্তান পর্ব: তমুদ্দুন মজলিস ও বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের বিদায়ের পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরা শুরু থেকেই পূর্ব বাংলার মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানে। তারা ঘোষণা করে, “উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।” এই ঘোষণা ছিল মূলত বাঙালি সত্তার ওপর সরাসরি আক্রমণ। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই আক্রমণের প্রথম প্রতিবাদটি এসেছিল একটি ইসলামি সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে। অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে গঠিত ‘তমুদ্দুন মজলিস’ ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে প্রথম পুস্তিকা প্রকাশ করে।

অনেকে মনে করেন, ভাষা আন্দোলন ছিল কেবল ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের প্রকাশ। কিন্তু তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, তমুদ্দুন মজলিস চেয়েছিল এমন একটি বাংলা ভাষা, যা এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও কালচারকে ধারণ করে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পায়। এই আন্দোলন ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক মানসিকতার বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার মানুষের প্রথম সশস্র ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ। কিন্তু বায়ান্নর চেতনা কি পুরোপুরি সফল হয়েছিল? নাকি ভাষাকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো রাজনীতির জন্ম হয়েছিল?

একাত্তর পরবর্তী সময়: আধিপত্যবাদ ও নতুন উপনিবেশের ছায়া

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল মূলত ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত রাজনৈতিক পরিণতি। আশা ছিল, পাকিস্তানি শোষণের অবসানের পর স্বাধীন ভূখণ্ডে বাংলা ভাষা পাবে তার সার্বভৌম সিংহাসন এবং সর্বস্তরের মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম হবে তাদের প্রাণের ভাষা। কিন্তু স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার সাংবিধানিক স্বীকৃতি জুটলেও, ব্যবহারিক ও মনস্তাত্ত্বিক জগতে এটি এক গভীর ষড়যন্ত্র ও অবহেলার শিকার হয়েছে। একাত্তরের বিজয় ভৌগোলিক স্বাধীনতা দিলেও, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তি বা ‘আজাদী’ নিশ্চিত করতে পারেনি।

স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই রাষ্ট্রযন্ত্র ও আমলাতন্ত্রে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক মানসিকতা নতুন মোড়কে জেঁকে বসে। উচ্চ আদালত, চিকিৎসা, প্রকৌশল ও উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলা ভাষাকে সুকৌশলে ‘অক্ষম’ ও ‘অপ্রতুল’ করে রাখা হয়। ইংরেজি জানা একটি ক্ষুদ্র এলিট শ্রেণি ভাষাকে পুঁজি করে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু দখল করে রাখে, যা বাংলা ভাষাকে কার্যত রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে ‘দ্বিতীয় ভাষা’র স্তরে নামিয়ে দেয়। তবে এর চেয়েও ভয়াবহ ছিল বাংলা ভাষার ‘মান’ বা ‘স্ট্যান্ডার্ড’ নির্ধারণের রাজনীতি। ‘শুদ্ধ বাংলা’ চালুর নামে মূলত কলকাতা-কেন্দ্রিক এবং সংস্কৃতঘেঁষা ভাষারীতির আধিপত্য বিস্তার করা হয়। বাংলাদেশের নিজস্ব ভৌগোলিক ও সামাজিক বাস্তবতায় হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা যে সমৃদ্ধ শব্দভাণ্ডারÑযাতে আরবি, ফারসি ও দেশি শব্দের অপূর্ব মেলবন্ধন ছিলÑসেগুলোকে ‘আঞ্চলিক’, ‘গ্রাম্য’ বা ‘সাম্প্রদায়িক’ আখ্যা দিয়ে পাঠ্যপুস্তক ও সাহিত্য থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করার এক সূক্ষ্ম প্রক্রিয়া শুরু হয়। ঢাকার নিজস্ব ভাষিক স্বকীয়তাকে অবজ্ঞা করে, ওপার বাংলার ভাষারীতির অন্ধ অনুকরণকে ‘প্রগতিশীলতা’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় একাত্তর-পরবর্তী ভারতীয় সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ বা ‘কালচারাল হেজিমনি’। রাজনৈতিক বন্ধুত্বের আড়ালে আকাশ সংস্কৃতি, টেলিভিশন চ্যানেল, চলচ্চিত্র ও সাহিত্যের অবাধ প্রবাহের মাধ্যমে ভারতীয় সংস্কৃতি এদেশের ড্রয়িংরুম থেকে শুরু করে তরুণ প্রজন্মের মনন পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে।

উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত গভীরÑবাংলাদেশের মানুষকে তাদের স্বতন্ত্র মুসলিম ঐতিহ্য ও দেশজ শেকড় ভুলিয়ে দিয়ে কলকাতার সাংস্কৃতিক বলয়ের একটি দুর্বল উপগ্রহে পরিণত করা। বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে এই প্রক্রিয়া চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে এমন এক ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করা হয়, যেখানে নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরাকে ‘মৌলবাদ’ বা ‘পশ্চাৎপদতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। ফলে স্বাধীন দেশেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের ভাষা ও সংস্কৃতি নিজ ঘরেই পরবাসী হয়ে পড়ে। বাংলা ভাষা পরিণত হয় কেবল ফেব্রুয়ারি মাসের আবেগসর্বস্ব আনুষ্ঠানিকতায়, অথচ দাপ্তরিক ক্ষমতা ও জ্ঞানচর্চায় তা থাকে ব্রাত্য ও উপেক্ষিত।

চব্বিশের বিপ্লব: ফ্যাসিবাদের পতন ও শেকড়ের জাগরণ

দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং সাংস্কৃতিক দমনের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে এক অভূতপূর্ব গণজাগরণ বা বিপ্লব সংঘটিত হয়। এই বিপ্লব কেবল একটি রাজনৈতিক সরকারের পতন ঘটায়নি, বরং এটি ছিল দীর্ঘদিনের চাপিয়ে দেওয়া ফ্যাসিজম এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে একটি সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ। তরুণ প্রজন্ম বা ‘জেন-জি’ এই বিপ্লবের সম্মুখভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন যদি না সাংস্কৃতিক আজাদী অর্জিত হয়।

ফ্যাসিজমের বিদায়ের পর এদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে এক বিশাল পরিবর্তন আসে। মানুষ আবার নিজেদের পরিচয় নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে। এতদিন ধরে যে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ এর নামে কলকাতা-কেন্দ্রিক সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তার বিপরীতে ‘বাংলাদেশি মুসলমানের নিজস্ব জবান’ বা ভাষারীতির প্রশ্নটি সামনে চলে আসে।

ওসমান হাদি ও বিউপনিবেশায়নের তাত্ত্বিক লড়াই

চব্বিশের গণবিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনের যে জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে চিন্তাবিদ ও গবেষক ওসমান হাদির চিন্তাধারা এবং তাঁর তাত্ত্বিক লড়াই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ওসমান হাদি কেবল একজন ব্যক্তি নন, বরং তিনি একটি দীর্ঘমেয়াদী বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের অগ্রদূত, যিনি বাংলা ভাষার ‘বিউপনিবেশায়ন’ বা ‘উবপড়ষড়হরুধঃরড়হ ড়ভ খধহমঁধমব’-এর দর্শনে বিশ্বাসী। তাঁর এই লড়াই মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল এবং তৎপরবর্তী সময়ে এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর যে কাঠামোগত নিপীড়ন চালানো হয়েছে, তার বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। ওসমান হাদির তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মূল ভিত্তি হলো ইতিহাসের পুনর্পাঠ। তিনি মনে করেন, পলাশী-পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশরা ক্ষমতা দখলের পর কেবল ভূখণ্ডই দখল করেনি, বরং এদেশের মানুষের মনন ও ভাষাকে উপনিবেশিত বা গোলামে পরিণত করার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। উনিশ শতকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের মাধ্যমে উইলিয়াম কেরি এবং মৃত্যুঞ্জয় তর্কালঙ্কাররা বাংলা ভাষাকে ‘শুদ্ধ’ করার নামে যে প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন, তা ছিল মূলত বাংলা ভাষা থেকে ‘ইসলামি অনুষঙ্গ’ বা আরবি-ফারসি-তুর্কি শব্দগুলো বর্জন করার অভিযান। হাজার বছর ধরে এদেশের মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ‘আল্লাহ’, ‘রসুল’, ‘কেতাব’, ‘দুনিয়া’, ‘হক’, ‘ইনসাফ’-এর মতো জীবন্ত শব্দগুলোকে ‘যবন দোষ’ বা ‘অশুদ্ধ’ আখ্যা দিয়ে তৎসম ও সংস্কৃত শব্দের কঠিন বেড়াজালে ভাষাকে আবদ্ধ করা হয়। ওসমান হাদি যুক্তি দেন যে, এই কৃত্রিম সংস্কৃতায়ন প্রক্রিয়া বাংলা ভাষাকে তার নিজস্ব শেকড় এবং ব্যবহারকারী জনগোষ্ঠীর নাড়ির যোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে।

হাদির দর্শন অনুযায়ী, একটি ভাষার প্রাণশক্তি নিহিত থাকে সেই ভাষায় কথা বলা মানুষের বিশ্বাস, জীবনাচরণ ও সংস্কৃতির ওপর। বাংলাদেশের মানুষ যেখানে দৈনন্দিন জীবনে সালাম দেয়, আল্লাহর নাম নেয়, রোজা রাখে এবং জানাজা পড়েÑসেখানে সাহিত্যে ও দাপ্তরিক কাজে সেই শব্দগুলো ব্যবহার করতে লজ্জা পাওয়া বা সেগুলোকে ‘আঞ্চলিক’ মনে করা মূলত ঔপনিবেশিক হীনম্মন্যতারই নামান্তর। গত দুইশ বছর ধরে এই হীনম্মন্যতাকে ‘প্রমিত বাংলা’ বা ‘ভদ্রলোকের ভাষা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে, যা প্রকারান্তরে মুসলমানদের মানসজগতে এক ধরণের দাসত্বের জন্ম দিয়েছে। ওসমান হাদি এই মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তির ডাক দিয়েছেন, যাকে তিনি ‘সাংস্কৃতিক আজাদী’ হিসেবে অভিহিত করেন।

তাঁর প্রস্তাবিত বিউপনিবেশায়ন মানে অন্য কোনো ভাষার প্রতি বিদ্বেষ নয়, বরং নিজের ভাষার হৃত সম্পদ পুনরুদ্ধার করা। তিনি এমন একটি ভাষারীতির পুনজাগরণ চান, যা সুলতানি ও মোগল আমলের পুঁথিসাহিত্যের মতো উদার এবং সর্বজনীন হবে। যেখানে ‘জল’ ও ‘পানি’, ‘মা’ ও ‘আম্মা’, ‘ঈশ্বর’ ও ‘আল্লাহ’র মধ্যে কোনো রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক দেয়াল থাকবে না, বরং এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের বুলি সাহিত্যের পাতায় কোনো সংকোচ ছাড়াই ঠাঁই পাবে। ওসমান হাদি প্রমাণ করতে চান যে, আরবি-ফারসি শব্দগুলো বিদেশি নয়, বরং এগুলো বাংলা ভাষারই অঙ্গীভূত সম্পদ, যা আমাদের পূর্বপুরুষরা শত শত বছর ধরে ব্যবহার করে এসেছেন।

ওসমান হাদির এই লড়াইকে কেউ কেউ সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার চেষ্টা করলেও, তাত্ত্বিকভাবে এটি মূলত একটি ‘অধিকার আদায়ের সংগ্রাম’। এটি একটি জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক স্মৃতি ও সত্তাকে মুছে ফেলার ঔপনিবেশিক চক্রান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। তাঁর মতে, যতক্ষণ না আমরা আমাদের ভাষায় আমাদের নিজস্ব পরিভাষা ও সাংস্কৃতিক প্রতীকগুলোকে সগৌরবে পুনঃস্থাপন করতে পারছি, ততক্ষণ রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন। তাই ওসমান হাদির এই বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই আগামীর বাংলাদেশে একটি আত্মমর্যাদাশীল, শেকড়সন্ধানী ও নিজস্ব জবান বা ভাষারীতি প্রতিষ্ঠার পথনকশা হিসেবে কাজ করছে।

সাংস্কৃতিক আজাদী: তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন ও আগামীর রূপরেখা

১. বিপ্লব-পরবর্তী মানসজগৎ ও ‘আজাদী’র নবসংজ্ঞা

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সংঘটিত গণবিপ্লব বা ‘চব্বিশের বিপ্লব’ বাংলাদেশের ইতিহাসে কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল মূলত একটি জাতির মনোজাগতিক ও সাংস্কৃতিক পুনর্জন্ম। দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন কেবল রাজনৈতিকভাবেই মানুষকে পরাধীন করে রাখেনি, বরং সুকৌশলে একটি সাংস্কৃতিক দাসত্বের জিঞ্জির পরিয়ে দিয়েছিল। বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে, বিশেষ করে ‘জেন-জি’ (এবহ-ত) বা জেনারেশন জেড-এর মধ্যে যে ‘সাংস্কৃতিক আজাদী’র আকাক্সক্ষা জেগে উঠেছে, তা গতানুগতিক স্বাধীনতার ধারণা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

এই প্রজন্মের কাছে ‘আজাদী’ মানে কেবল ভৌগোলিক স্বাধীনতা বা একটি পতাকা ও জাতীয় সংগীতের মালিকানা নয়। তাদের কাছে আজাদী মানে হলোÑনিজস্ব চিন্তা, বিশ্বাস, ধর্ম এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে কোনো হীনম্মন্যতা ছাড়া মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো। তারা সেই ‘সেকুলার’ বা ধর্মনিরপেক্ষতার বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করছে, যা ধর্মহীনতাকে প্রগতিশীলতার মাপকাঠি মনে করে। তরুণরা বুঝতে শিখেছে যে, তথাকথিত প্রগতিশীলতার নামে তাদের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করার একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প চালু ছিল। ফলে চব্বিশের বিপ্লবের পর তাদের কণ্ঠে যে স্লোগান ও গ্রাফিতি দেখা গেছে, তা ছিল নিজস্ব সত্তার পুনর্জাগরণের দলিল। তারা আর ধার করা বুলিতে, ধার করা সেিিলব্রিটি বা ধার করা আইডিওলজিতে বিশ্বাসী নয়। তারা এমন একটি রাষ্ট্র চায়, যেখানে একজন দাড়ি-টুপি পরিহিত মাদ্রাসা ছাত্র এবং একজন জিন্স-টি শার্ট পরা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের সাংস্কৃতিক মর্যাদা সমান হবে। এই মানসিক রূপান্তরই আগামীর বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর।

২. শেকড়হীনতার সংকট ও পাঠ্যপুস্তকের রাজনীতি

সাংস্কৃতিক আজাদীর এই দাবির মূলে রয়েছে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। তরুণরা এখন প্রশ্ন তুলছেÑআমাদের পাঠ্যবইগুলো কাদের ইতিহাস শেখাচ্ছে? কেন আমাদের বীরদের ইতিহাস সেখানে অনুপস্থিত বা বিকৃত? ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমল পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশেও শিক্ষাব্যবস্থায় এক ধরনের ‘সেলফ-হেট’ বা আত্মঘৃণার বীজ বপন করা হয়েছে।

পাঠ্যপুস্তকে দেখা যায়, বাংলার স্বাধীনতার ইতিহাস পড়াতে গিয়ে পলাশীর যুদ্ধ এবং তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার কথা উল্লেখ থাকলেও, মুসলিম শাসকদের অবদান বা সুলতানি আমলের শৌর্যবীর্যকে সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। বখতিয়ার খিলজিকে যেখানে ‘বিজেতা’ বা ‘মুক্তিকামী’ হিসেবে দেখানোর কথা, সেখানে ঔপনিবেশিক ঐতিহাসিকদের বয়ানে তাকে ‘লুণ্ঠনকারী’ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। তরুণরা প্রশ্ন তুলছেÑসিরাজউদ্দৌলার পতনের পর যে দীর্ঘ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন হয়েছে, সেখানে ফরায়েজী আন্দোলন বা ফকির- সন্ন্যাসী বিদ্রোহে মুসলমানদের যে রক্ত ঝরেছে, তা কেন আমাদের জাতীয় ইতিহাসের মূলস্রোতে নেই?

তরুণ প্রজন্ম এখন বুঝতে পারছে যে, ইতিহাস পাঠে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আধিপত্য বজায় রাখা হয়েছে। যেখানে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বা রাজা রামমোহন রায়কে ‘রেনেসাঁ’র বা নবজাগরণের পথিকৃৎ বলা হয়, সেখানে হাজী শরীয়তুল্লাহ, দুদু মিয়া বা তিতুমীরের মতো বিপ্লবীদের নিছক ‘ধর্মীয় নেতা’ বা ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। এই ঐতিহাসিক অবিচারের বিরুদ্ধেই এখনকার সাংস্কৃতিক আজাদীর লড়াই। তরুণরা চাইছে এমন একটি শিক্ষাক্রম, যেখানে তাদের পূর্বপুরুষদের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়গুলো কোনো কার্পণ্য ছাড়াই উঠে আসবে। তারা এমন বীরদের গল্প জানতে চায়, যারা তাদের নিজেদের বিশ্বাস ও মাটির কাছাকাছি ছিল।

৩. ভাষা: আধিপত্যবাদের প্রধান হাতিয়ার ও প্রতিরোধের দেয়াল

সাংস্কৃতিক আজাদীর লড়াইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল ক্ষেত্রটি হলো ভাষা। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি রাজনৈতিক শক্তি এবং সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের ধারক। চব্বিশের বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে তরুণরা ভাষার রাজনীতি বা ‘ল্যাঙ্গুয়েজ পলিটিক্স’ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে ‘প্রমিত বাংলা’র নামে যে ভাষারীতি চালু রয়েছে, তা মূলত কলকাতা-কেন্দ্রিক এবং সংস্কৃতায়ন প্রক্রিয়ার ফসল। ঔপনিবেশিক আমলে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতরা এবং পরবর্তীতে রবীন্দ্র-যুগের সাহিত্যিকরা বাংলা ভাষাকে ‘শুদ্ধ’ করার নামে এর আরবি-ফারসি-তুর্কি শব্দভাণ্ডারকে বর্জন করেছিলেন। এই প্রক্রিয়াটি এতই সূক্ষ্ম ও দীর্ঘমেয়াদী ছিল যে, আজ ‘পানি’ বললে তা ‘অশুদ্ধ’ বা ‘মৌলবাদী’ মনে হয়, আর ‘জল’ বললে তা ‘শুদ্ধ’ বা ‘সাংস্কৃতিক’ মনে হয়। অথচ এদেশের আশি শতাংশ মানুষ দৈনন্দিন জীবনে ‘গোসল’, ‘ওজু’, ‘নামাজ’, ‘রোজা’, ‘খাবার’, ‘আসমান’, ‘জমিন’Ñএই শব্দগুলোই ব্যবহার করে।

তরুণরা এখন প্রশ্ন তুলছেÑকেন আমাদের মুখের ভাষাকে সাহিত্যে ও দপ্তরে ‘ব্রাত্য’ করে রাখা হয়েছে? কেন ‘আম্মা’ ডাকলে তা খ্যাত মনে হয়, আর ‘মা’ বা ‘মাম্মি’ ডাকলে তা আধুনিক? ওসমান হাদি এবং তাঁর সমসাময়িক চিন্তাবিদদের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তরুণরা বুঝতে পারছে যে, এটি কোনো স্বাভাবিক বিবর্তন ছিল না, বরং এটি ছিল একটি ঔপনিবেশিক চক্রান্ত (ঈড়ষড়হরধষ চৎড়লবপঃ)। এর উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের ভাষিক ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে তাদের মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া।

আজকের তরুণরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, ব্লগে এবং তাদের শিল্পকর্মে সচেতনভাবে এই ‘ঔপনিবেশিক বাংলা’কে বর্জন করছে। তারা তাদের লেখায় ‘আল্লাহ হাফেজ’, ‘ইনশাআল্লাহ’, ‘শুকরিয়া’র মতো শব্দগুলো কোনো সংকোচ ছাড়াই ব্যবহার করছে। তারা প্রমাণ করতে চাইছে যে, একটি ভাষা তখনই শক্তিশালী হয় যখন তা তার জনগোষ্ঠীর হৃদস্পন্দনকে ধারণ করে। এই ভাষিক প্রতিরোধই সাংস্কৃতিক আজাদীর অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।

৪. ওসমান হাদি ও বিউপনিবেশায়নের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি

এই সাংস্কৃতিক জাগরণের তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রদানে ওসমান হাদির ভূমিকা অপরিসীম। তিনি তরুণ প্রজন্মের সামনে ইতিহাসের এক নতুন জানালা খুলে দিয়েছেন। তাঁর দর্শন ও গবেষণা তরুণদের শিখিয়েছে যে, আমরা যা কিছু ‘বাঙালি সংস্কৃতি’ বলে জানি, তার অনেকটাই আসলে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ‘ঔপনিবেশিক সংস্কৃতি’।

ওসমান হাদি ‘বিউপনিবেশায়ন’ (Decolonization)-এর যে ধারণা সামনে এনেছেন, তা তরুণদের চিন্তার জগতে বড় ধরণের ধাক্কা দিয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে ব্রিটিশরা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, আইন ও ভাষাকে এমনভাবে সাজিয়েছে যাতে আমরা চিরকাল মানসিকভাবে তাদের গোলাম হয়ে থাকি। তাঁর মতে, সাংস্কৃতিক আজাদী মানে পশ্চিমাদের বা ভারতীয়দের ঘৃণা করা নয়, বরং তাদের চশমা দিয়ে নিজেদের বিচার করা বন্ধ করা।

তিনি তরুণদের বুঝিয়েছেন যে, সুলতানি ও মোগল আমলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য কতটা সমৃদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক (Inclusive) ছিল। সে সময় আলাওল, দৌলত উজির বাহরাম খান বা শাহ মুহম্মদ সগীরের মতো কবিরা যে ভাষায় সাহিত্য রচনা করেছেন, তা ছিল এদেশের মানুষের প্রাণের ভাষা। সেখানে আরবি-ফারসি শব্দগুলো ছিল অলংকারের মতো, যা ভাষাকে গতি ও গাম্ভীর্য দিত। ওসমান হাদির এই বয়ান তরুণদের মধ্যে এক ধরণের আত্মবিশ্বাস বা ‘ঝবষভ-ঊংঃববস’ তৈরি করেছে। তারা এখন বুঝতে পারছে যে, নিজেদের ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরা মানে পিছিয়ে পড়া নয়, বরং এটিই প্রকৃত আত্মমর্যাদা।

ওসমান হাদি এবং তাঁর অনুসারী বুদ্ধিজীবীরা যে তাত্ত্বিক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, তা মূলত ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক সার্বভৌমত্ব’ (Epistemological Sovereignty) অর্জনের লড়াই। তারা তরুণদের শেখাচ্ছেন, জ্ঞান কেবল পশ্চিম বা ভারত থেকে আসে না; আমাদের নিজেদেরও জ্ঞান উৎপাদনের ক্ষমতা ও ঐতিহ্য রয়েছে।

৫. ভারতীয় ও পশ্চিমা হেজেমনির বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ

সাংস্কৃতিক আজাদীর লড়াইয়ের আরেকটি বড় দিক হলো বিদেশি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বা হেজিমনি (Hegemony) রুখে দেওয়া। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল, সিনেমা এবং ওয়েবের মাধ্যমে এক ধরণের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালানো হয়েছে। এর ফলে আমাদের নিজস্ব পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, এমনকি পারিবারিক মূল্যবোধও প্রভাবিত হয়েছে।

তরুণরা দেখছে, ভারতীয় সিরিয়াল বা সিনেমায় মুসলমানদের যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, তা অত্যন্ত আপত্তিকর ও স্টেরিওটাইপড। সেখানে মুসলিম মানেই সন্ত্রাসী, বা অশিক্ষিত, বা ভিলেন। এই ‘নারেটিভ’ বা বয়ানটি আমাদের অবচেতন মনেও প্রভাব ফেলছিল। অন্যদিকে, পশ্চিমা সংস্কৃতি ‘সেকুলারিজম’ ও ‘ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ’-এর নামে আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনগুলোকে শিথিল করে দিচ্ছিল।

চব্বিশের বিপ্লব এই বিদেশি হেজেমনির বিরুদ্ধে একটি বড় চপেটাঘাত। তরুণরা এখন দেশি কন্টেন্ট, দেশি ফ্যাশন এবং দেশি পণ্য ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠছে। তারা ভারতীয় বা পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণকে ‘কুল’ বা স্মার্টনেস মনে করছে না। বরং তারা নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা বজায় রাখাকেই স্মার্টনেস হিসেবে সংজ্ঞায়িত করছে। ‘ইসলামোফোবিয়া’ বা ইসলামভীতির যে সংস্কৃতি বিশ্বজুড়ে এবং আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে চালু রয়েছে, তরুণরা তার বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। তারা প্রমাণ করছে যে, আধুনিক হওয়া এবং ধার্মিক হওয়া পরস্পরবিরোধী নয়।

৬. ইনক্লুসিভ বাংলা: আগামীর রূপরেখা

তাহলে আগামীর বাংলাদেশের রূপরেখা কেমন হবে? তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন হলো একটি ‘ইনক্লুসিভ’ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়া। তারা এমন একটি সমাজ চায় না যেখানে মাদ্রাসার ছাত্ররা সমাজের মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে, কিংবা ইংরেজি মাধ্যমের ছাত্ররা বাংলা ও ধর্ম থেকে দূরে সরে যাবে।

আগামীর রূপরেখায় ওসমান হাদি প্রস্তাবিত ভাষার মডেলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি ‘জাতীয় ভাষা’ তখনই সার্থক হয়, যখন তা টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার সকল মানুষের ভাব প্রকাশে সক্ষম হয়। তরুণরা চাইছে এমন একটি বাংলা ভাষা, যা হবে নমনীয় ও উদার। যেখানে তৎসম শব্দের পাশাপাশি আরবি, ফারসি, ইংরেজি এবং দেশি শব্দগুলোও সমান মর্যাদায় ব্যবহৃত হবে। তারা এমন একটি সাহিত্য ধারা তৈরি করতে চাইছে, যেখানে শহুরে জীবনের যান্ত্রিকতার পাশাপাশি গ্রামের মানুষের ইমান-আকিদা ও সংগ্রামের কথা উঠে আসবে।

শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছে তারা। এমন একটি কারিকুলাম, যা আমাদের ইতিহাসকে বিকৃত করবে না, বরং সত্যকে উদ্ভাসিত করবে। যেখানে আমাদের শিশুরা জানবে যে, এই ভূখণ্ডের স্বাধীনতার জন্য তিতুমীর বা হাজী শরীয়তুল্লাহর অবদান মাস্টারদা সূর্যসেন বা প্রীতিলতার চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না।

সাংস্কৃতিক আজাদী মানে হলোÑভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা, কিন্তু নিজের মতের প্রতি অটল থাকা। তরুণরা চাইছে রাষ্ট্র এমন পরিবেশ নিশ্চিত করবে, যেখানে কেউ তার দাড়ি, টুপি বা হিজাবের জন্য কর্মক্ষেত্রে বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৈষম্যের শিকার হবে না। আবার কেউ তার ভিন্নমতের জন্য নির্যাতিত হবে না। এই ভারসাম্যপূর্ণ সমাজই চব্বিশের বিপ্লবের মূল আকাক্সক্ষা।

একটি সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাশীল জাতির অভ্যুদয়

তাই বলা যায়, চব্বিশের বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে যে ‘সাংস্কৃতিক আজাদী’র স্বপ্ন দানা বেঁধেছে, তা একটি ঐতিহাসিক অনিবার্যতা। এটি কোনো সাময়িক আবেগ নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার সূচনা। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশ আজ নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাইছে।

ওসমান হাদি এবং তাঁর মতো চিন্তাবিদদের তাত্ত্বিক দিকনির্দেশনা এই যাত্রাপথকে আলোকিত করছে। তরুণরা বুঝতে পেরেছে যে, রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনশীল, কিন্তু সাংস্কৃতিক ক্ষমতা (Cultural

Power) স্থায়ী। তাই তারা এখন গান, কবিতা, নাটক, সাহিত্য, সিনেমা এবং ডিজিটাল কন্টেন্টের মাধ্যমে তাদের নিজস্ব বয়ান বা ‘Narrative’ তৈরি করছে।

ভাষা, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এই পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়া সহজ নয়। এর পথে অনেক বাধা আসবে। ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ বা ‘মৌলবাদী’ ট্যাগ দিয়ে এই জাগরণকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। কিন্তু চব্বিশের বিপ্লব প্রমাণ করেছে যে, এদেশের তরুণরা আর ভয় পায় না। তারা তাদের শেকড় চিনেছে, এবং সেই শেকড়কে আঁকড়ে ধরেই তারা ভবিষ্যতের আকাশ ছোঁবে।

আগামীর বাংলাদেশ হবে এমন এক বাংলাদেশ, যা তার নিজস্ব ভাষায় কথা বলবে, নিজস্ব সংস্কৃতিতে বাঁচবে এবং বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে নিজের পরিচয় দেবেÑকোনো কলোনি বা উপগ্রহ হিসেবে নয়, বরং একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাশীল মুসলিম প্রধান রাষ্ট্র হিসেবে। এটাই চব্বিশের বিপ্লবের প্রকৃত চেতনা এবং তরুণ প্রজন্মের লালিত স্বপ্ন।

লেখক :

সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, নর্দান বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ