উমাইর আফতাব
লিটলম্যাগ বা ছোট কাগজ কি সে বিষয়ে বিভিন্ন জন বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে। লিটলম্যাগ সম্পর্কে লিটলম্যাগ কর্মী ও সাহিত্যকর্মীদের মধ্যে একটা স্বচ্ছ ধারণা থাকার কথা। কোনটা লিটলম্যাগ আর কোনটা না সেটা কমবেশি প্রায় প্রতিটি লেখক সাহিত্যিকই জানে। কেননা যারা লেখালেখি করে তারা সাধারণত লেখালেখি শুরুর প্রথম থেকেই সাহিত্যের কাগজগুলোর ব্যাপারে একটা ধারণা নিয়ে থাকে। সেখানে লিটলম্যাগ গুরুত্বর সাথে বিশেষভাবে বিবেচিত হয় এবং সাহিত্য পত্রিকাগুলোকে পর্যালোচনা করতে শেখে। তখন থেকেই লেখকরা চিনতে থাকে, জানতে চেষ্টা করে লিটলম্যাগাজিনকে যাকে আমরা লিটলম্যাগ বা সাহিত্যের ছোট কাগজ বলি। এটা একটা গবেষণাধর্মী কাজের মতো যা প্রতিনিয়ত সে নিজের ভিতর বিশে¬ষণ করতে থাকে।
লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে বিভ্রান্তমূলক আলোচনা ও তথ্য উপাস্থাপন আমাদের সেই দিক থেকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমাদের লিটলম্যাগ স¤পর্কিত বোধবুদ্ধি প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পড়ছে কি না কে জানে। এসব বিষয় মাঝে মাঝে উদয় হয়। তবে সেসব ভেবে দেখা দরকার।
লিটলম্যাগ যদি নিয়মিতই বের হয় তাহলে কি তা লিটলম্যাগ থাকে? কিংবা লিটলম্যাগ কি নিয়মিত বের হয়? নিয়মিত অবশ্যই থাকে না। কারণ, লিটলম্যাগ বৈশিষ্ট্যগতভাবেই অনিয়মিত। আচরণগত দিকেও অনিয়মিত স্বভাবই তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। তা যে নিয়মিত বের হয় না সবাই জানে। নিয়মিতই যদি বের হবে তাহলে তো সেটা আর লিটলম্যাগ বা ছোট কাগজ থাকে না। সেটা একটা নিয়মিত পত্রিকা হয়ে যায়, হোক সেটা সাপ্তাহিক, মাসিক, দ্বি-মাসিক, ত্রৈমাসিক বা এধরনের কিছু। তখন এগুলো নিয়মিত সাহিত্য পাত্রিকা হিসেবেই বের হয়। এর একটা নিয়মিত চরিত্র আছে। সেভাবেই সে পত্রিকা মর্যাদা পায়।
লিটলম্যাগ নিয়ে সবসময় টানাহ্যাঁচড়া হয়। এই টানাহ্যাঁচড়া অনেক আগ থেকেই ছিল। এর সাথে জড়িতরা নিজেদের মতো করে বক্তব্য ব্যাখ্যা দাঁড় করায়। একপেশে আলোচনাও হয় অনেক। এগুলো হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। তবে এর স্বভাব বৈশিষ্ট্য নিয়ে মতপার্থক্য বা বিরোধ তেমন দেখা যায় না। কারণ এর সাথে জড়িতরা একে আবেগের সাথে দেখে থাকে এবং এই আবেগের ভিতর তারা নিজেরা পুরোটাই মিশে থাকে। তাদের আবেগজড়িত থাকে শতভাগ। অন্যদিকে এখানকার কৃত্রিম সুবিধাভোগীদের চেহারা বোঝা যায়। তাদের আলোচনায় অযাচিত বক্তব্যে চাপা পড়ে যায় লিটলম্যাগের মান ও মূল্যায়ন। থাকে না নিরপেক্ষতা। থাকে না ব্যাপক অনুসন্ধানীমূলক পর্যালোচনা। একে নিয়ে থাকে না কোনো জ্ঞানগর্ভ কথা। থাকে নিজের পান্ডিত্য জাহির করার কৌশল। একপেশে বক্তব্য। তাদের কাছে উপেক্ষিত থাকে প্রকৃত ছোট কাগজ।
লিটলম্যাগের একটা আকর্ষণবোধ আছে। এটা একটা অনিয়মিত প্রকাশনা ও লেখকদের অনিয়মিত স্টেশন। আর অর্থের অভাবে মুখ থুবড়ে পড়া আবেগের নাম।
কিন্তু একটা মাসিক পত্রিকাকেও আমরা লিটলম্যাগাজিনের সাথে মিলিয়ে দিচ্ছি। এটা ভুলবশত একটা পত্রিকার ক্ষেত্রে হলেও হতো। কিন্তু দেখা যাচ্ছে একাধিক পত্রিকাকেও বলা হচ্ছে লিটলম্যাগ যারা নিয়মিত বের হচ্ছে। সেগুলো আবার সাহিত্য পত্রিকা বা চিন্তাশীল পত্রিকা বা এধরনের বিভিন্ন নাম নিয়ে নিয়মিত বের হচ্ছে। তাদের প্রকাশিত সংখ্যাও অনেক। এটা এমন হতো যে মাসিক বা ত্রৈমাসিক হিসেবে ঘোষণা দিয়ে কয়েক সংখ্যা বের হলো কিন্তু তারপর আর বের হয়নি কোনো সংখ্যা। অনেক আবেগ নিয়ে একটা সংখ্যাই বের হয়েছে পরবর্তীতে কিন্তু তার আর কোনো সংখ্যা বের হয়নি। বন্ধ হয়ে গেছে কিংবা অদূর ভবিষ্যতে বের করার স্বপ্ন বুকে চাপা দিয়ে স¤পাদক তার নিত্যআবেগ ধরে রেখেছেন। এভাবে দিন যেতে যেতে আবেগের অশ্রুগুলো বুকের ভিতর শুকিয়ে গেছে। তখন তাকে কেউ লিটলম্যাগের স্বভাব চরিত্রে মেপে ছোট কাগজ বা লিটলম্যাগ আখ্যা দিতে পারে।
কিছু দিন আগে দেখলাম একজন লেখক একটি পত্রিকায় লিটলম্যাগ নিয়ে বিশাল বিস্তৃত হেডিং দিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি অনেক কিছু বলেছেন। লিটলম্যাগের সংজ্ঞাও দিয়েছেন। তবে দুঃখজনক হলো সেই বিশদ আলোচনার সারবত্তা বলে তেমন কিছু খুঁজে পেলাম না। যোগসূত্র পেলাম না হেডিং এর সাথে আলোচনার। আবার আলোচনার ভিতর অযথা এমন কিছু বিষয় উপস্থাপন করেছেন যা লেখার মান ও বিষয়বস্তুর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে বলে একান্ত আমার কাছে মনে হয়েছে। তিনি তার লেখায় অনেক বিষয়ের সাথে মিলিয়ে তাল মনে হয় ঠিক রাখতে পারেননি। ফলে গুলিয়ে গেছে লিটলম্যাগ আন্তর্জাতিকের চমকে। কেননা তিনি সেই লেখাকে আন্তর্জাতিক বলয়ের ভিতর দিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছেন পাঠককে। আর পাঠককে আন্তর্জাতিক চিন্তাশীল পাঠক করতে চেয়েছেন।
তিনি তার লেখায় মাসিক, দ্বি-মাসিক বা ত্রৈমাসিক হিসেবে নিয়মিত বের হওয়া চার-পাঁচটা পত্রিকাকে লিটলম্যাগ বলছেন। অর্থাৎ দুঃখজনক হলো সাহিত্য পত্রিকাকে লিটলম্যাগ বলে সেগুলোর মূল্যায়ন করেছেন আর উপেক্ষিত থেকেছে প্রকৃত লিটলম্যাগের বিষয়আশয়। আর সেই আলোচনায় মেলানো হলো এমন পত্রিকাকে যাকে তিনি লিটলম্যাগ বলছেন, আবার যেটা নিয়মিত বের হচ্ছে বলেও উলে¬খ করেছেন। যে পত্রিকাকেন্দ্রিক সেই আলোচনা তিনি করেছেন তা নিয়মিত প্রকাশনা হিসেবে ইতোমধ্যে পাঁচটি সংখ্যাও বের হয়েছে বলে উলে¬খ করা হয়েছে। যদিও আমার কোনো সুযোগ বা সৌভাগ্য কোনোটাই হয়নি সেই পত্রিকাটি দেখার। তবে তাকে নিয়মিত প্রকাশিত উলে¬খ করে প্রশংসা করার সাথে সাথে তার ভবিষ্যৎ অগ্রিম করে মহিমান্বিত করা হয়েছে। নিশ্চয় এটা লেখক প্রকৃতভাবেই উপলব্ধি করেছেন। তবে সেই পত্রিকাকে নিয়মিত বের হচ্ছে উলে¬খ না করলেও হতো। সেখানেই বিভ্রান্তি লেগেছে। আবার যে পত্রিকাগুলোকে টেনে আনা হয়েছে সেগুলোকে কোনো লেখক সাহিত্যিকই লিটলম্যাগ বলবে না বলেই মনে হয়। বিভ্রান্তি এখানেও। লিটলম্যাগের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা খটকা লাগার মতো। ব্যাপারটা জ্ঞানগর্ভ আলোচনার পরিবর্তে ছোটকাগজকে নিয়ে তাচ্ছিল্য করার মতো।
সাম্প্রতিক সময়ের সেই লেখায় দেখা যায় আমাদের লিটল ম্যাগাজিনকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরে লেখক লিটলম্যাগকে ধন্য করতে চেয়েছেন। সেখানে কয়েকটি সাহিত্য পত্রিকা ধন্য হয়েছে আর প্রকারান্তরে খর্ব হয়েছে আমাদের লিটলম্যাগ সাহিত্য এবং এ কেন্দ্রিক আন্দোলন ও চর্চা। সেখানে লিটলম্যাগের নামে অন্য কিছু আলোচিত হয়েছে। এক্ষেত্রে শিরোনাম পাল্টে দিলে মনে হয় ভালো হতো। সেখানে প্রাণান্তর চেষ্টা ছিল অনেক কিছু বলার তবে সেটা হোঁচট খেয়েছে কিছু নিয়মিত প্রকাশনাকে লিটলম্যাগ হিসেবে উলে¬খ করাতে। একই সাথে অপ্রাসঙ্গিক কিছু আলোচনা এসেছে। লেখক হয়ত ইচ্ছা করে এই কাজ করেননি। তবে গুণগানগুলো মনে হলো কৃত্রিমতায় বিন্যাসিত। লেখক এখানে এভাবেই হয়ত আমাদের বিশ্বদরবারের আসনে বসাতে চেয়েছেন। তাকে হয়ত গুগল সাহিত্য সহায়তা করেছে তথ্য উপাত্ত দিয়ে। সেজন্য নিজের মননশীলতাকে সৃষ্টিশীলতার সাথে মিলিয়ে নিজেকে খাটো করতে চাননি। তবে তার দীর্ঘ আলোচনার প্রচেষ্টা প্রশ্নবিদ্ধই বলে মনে হয়েছে।
আমরা যার প্রশংসা করি হয়ত তার বা তাদের আনুকূল্য পেতে চাই। নাহলে এত এত উদাহরণ থাকতে হুট করে মাসিক, ত্রৈমাসিকের মতো নিয়মিত প্রকাশিত পত্রিকা নিয়ে টানাটানি করব কেন? যেগুলো আবার মূল আলোচ্য বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। জোরজবরদস্তি করে দেখাব তারাই জাতের অন্যরা কেউ না বা এরকম জাতের আর কেউ নেই - ব্যাপারটা ওরকমই মনে হয়েছে। আবার যে পত্রিকাগুলো নিয়ে টানাটানি করছি অযাচিতভাবে সে পত্রিকার চিন্তা চেতনা আপনার লিটলম্যাগ ভাবনার সাথে যায় কি না তাও বিবেচ্য রাখিনি। অবশ্য ধরে নিচ্ছি আপনি সে পত্রিকার একান্ত ভক্ত বলেই ভক্তি প্রকাশে তাদের অনাকাক্সিক্ষতভাবে আলোচানায় টেনে এনেছেন সেই গরুর রচনার মতো। কিন্তু যে পত্রিকা নিয়মিত, যাকে আপনি বিশ্বদর্শনে প্রতিষ্ঠিত করতে লিটলম্যাগ হিসেবে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তুলে ধরতে আলোচনা করছেন আসলে সেটা লিটলম্যাগ কি না সেটাই তো পরিষ্কার হলো না।
পত্রিকাকে আন্তর্জাতিক করতে হলে সঠিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। কোনো পত্রিকাকে সেই আন্তর্জাতিকতার সাথে তুলনা করতে হলে সময়ের দরকার। যে পত্রিকার মূল্যায়ন ধীরে ধীরে হতে হতে আন্তজার্তিক পর্যায় নিয়ে যাওয়া হয় তার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। তার আসন পাকাপোক্ত করতে হয় এবং এটা করতে সময় লাগে। কিন্তু একটা নিয়মিত পত্রিকা কখনো লিটলম্যাগের মর্যাদা পেতে পারে না। তাহলে নিয়মিত সাহিত্য পত্রিকা ও সাহিত্যের ছোট কাগজের মধ্যে পার্থক্য থাকলো কোথায়? সেটা হয় জোরজবরদস্তি না হয় বোধগম্যের অভাব। সাহিত্য আলোচনা বা সাহিত্য চর্চা জোরজবরদিস্তে করে হয় না এটা জোরের বিষয়ও নয়।
জ্ঞানগত ধারণা ব্যাপক না থাকায় অনেক সময় অনেক আলোচনা অর্থহীন হয়ে পড়ে। গুরুত্ব হারায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের আলোচনা। ছোট কাগজই সেখানে লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যায়। যেমন কোনো লেখকের গবেষণা বা ধারণা ব্যাপক না থাকায় তাদের চোখের আড়ালে থেকে যায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছোট কাগজ। এসব ছোট কাগজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা যে অনেক ক্ষেত্রে অনেককে প্রভাবিত করতে পারে বা করে সে স¤পর্কে কোনো আলোচনা উঠে আসে না। এসব আলোচনা দুর্বল মনে হয়। অনেক সময় মনে হয় অবজ্ঞা করা হয়েছে লিটলম্যাগাজিনকে ইন্টারনেটের জগতে একটুআধটু ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে। এজন্যই বলছিলাম লিটলম্যাগ স¤পর্কিত বোধবুদ্ধি প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পরল কি না? এখানে এত বড় আলোচনা হলেও সেসব নিয়ে আলোচনা হয়নি বলেই মনে হয়েছে।
আমাদের আসলে ¯পষ্ট থাকতে হবে লিটল ম্যাগাজিন বা ছোট কাগজ ও এর বিষয়বস্তু স¤পর্কে। জানতে হবে লিটলম্যাগ কি।