ড. এম এ সবুর
বেগম রোকেয়া (১৮৮০-১৯৩২ খ্রি.) বাঙালি মুসলিম নারী জাগরণের পথিকৃৎ ও খ্যাতিমান সাহিত্যিক। তার সমকালে সামাজিক কুসংস্কারে ও ধর্মীয় অজ্ঞতার কারণে বাঙালি নারীসমাজ ছিল অবহেলিত ও বঞ্চিত। আর এসব অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি চালিয়েছেন ক্ষুরধার মসিযুদ্ধ। তাই বাঙালি মুসলিম নারীজাগরণই হয়েছে তার সাহিত্য সাধনার মূল উপজীব্য। আর তার সাহিত্যের অগ্নিশিখায় অজ্ঞতার অন্ধকার দূরীভূত হয়ে আলোর প্রভা উদ্ভাসিত হয় এবং মুসলিম নারীসমাজে জাগরণের সূচনা হয়।
বেগম রোকেয়ার সমকালে বাঙালি মুসলিম নারীসমাজের অধঃপতনের প্রধান কারণ ছিল কুসংস্কার, অশিক্ষা ও অজ্ঞতা। এ সময় মুসলিম নারীশিক্ষা বা মেয়েদের শিক্ষার জন্য কোন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল না। মৌলভী রেখে শরীফ শ্রেণীর মেয়েদেরকে ঘরে আরবি শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা হলেও তাদেরকে বাংলা-ইংরেজি শিক্ষা দেয়া হতো না। এতে নারী মনের সুকুমার বৃত্তির বিকাশতো হতোই না; অধিকন্তু নানা কুসংস্কার বাসা বাঁধতো। সমকালীন বাঙালি মুসলিম নারীসমাজের এ করুণ অবস্থা উল্লেখ করে বেগম রোকেয়া আমাদের অবনতি প্রবন্ধে লিখেন, ‘...আমরা আলস্যের, প্রকারান্তরে পুরুষের দাসী হইয়াছি। ক্রমশঃ আমাদের মন পর্যন্ত দাস (enslaved) হইয়া গিয়াছে। এবং আমরা বহুকাল দাসীপনা করিতে করিতে দাসত্বে অভ্যস্ত হইয়া পড়িয়াছি। এইরূপে আমাদের স্বাবলম্বন, সাহস প্রভৃতি মানসিক উচ্চবৃত্তিগুলো অনুশীলনের অভাবে বার বার অঙ্কুরে বিনাশ হওয়ায় এখন আর বোধ হয় অঙ্কুরিত হয় না।’
বাঙালি মুসলিম নারীসমাজের এহেন করুণ দশা দেখে ব্যথিত হয়ে তিনি নারীসমাজকে উদ্ধার করতে প্রথমেই নারীশিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। নারীশিক্ষার প্রতি উদাসীনতাকেই তিনি নারীসমাজের দুঃখ-দুর্দশার মূল কারণ উল্লেখ করে বঙ্গীয় নারী শিক্ষা সমিতি-র সভার অভিভাষণে বলেন, ‘মোছলমানদের যাবতীয় দৈন্য-দুর্দশার একমাত্র কারণ স্ত্রীশিক্ষায় ঔদাস্য’।
সমাজ ও জাতীয় উন্নয়নের জন্য নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা তিনি যথার্থই উপলব্ধি করেছিলেন। তাই সমাজের ও জাতির উন্নতির লক্ষ্যে নারীশিক্ষার গুরুত্ব উল্লেখ করে ১৯০৪ সালে নবনূর পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধে তিনি লিখেন, ‘আমরা উচ্চশিক্ষা প্রাপ্ত না হইলে সমাজও উন্নত হইবে না।.....তাই আমাদিগকে সকল প্রকার জ্ঞান চর্চা করিতে হইবে।’
বেগম রোকেয়া নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য রূপচর্চার পরিবর্তে জ্ঞানচর্চার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। অলংকারকে তিনি নারীর জন্য দাসত্বের শিকল মনে করেছেন। এজন্য অলংকারের শিকল থেকে নারী জাতিকে মুক্ত করতে বেগম রোকেয়া বোরকা প্রবন্ধে মেয়েদের অল্কংার ছেড়ে জ্ঞান চর্চার আহবান জানিয়ে লিখেছেন, ‘নারীর শোভন-অলংকার ছাড়িয়া জ্ঞানভূষণ লাভের জন্য ললনাদের আগ্রহ বৃদ্ধি হওয়া বাঞ্ছনীয়।’ নারীশিক্ষাবিরোধী কথিত আলেমদের বিরুদ্ধাচারণ করে এবং নারীশিক্ষা ধর্মীয় নির্দেশ প্রমাণ করতে তিনি নারীশিক্ষা সমিতি প্রবন্ধে বলেন, ‘পৃথিবীর যিনি সর্বপ্রথম পুরুষ-স্ত্রীলোককে সমভাবে সুশিক্ষা দান করা কর্তব্য বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন তিনি আমাদের রসূল মকবুল (অর্থাৎ পয়গম্বর সাহেব)।’
বেগম রোকেয়া নারীসমাজে যেমন শিক্ষার চেতনা জাগ্রত করেছেন তেমনি নারীশিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে ১৯০৯ সালে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গালর্স স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। অনেক বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করে বাঙালি মুসলিম সমাজের শিক্ষা বিস্তারে এ প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এছাড়া তিনি ১৯১৬ সালে আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুসলিম নারীসমাজকে সংঘবদ্ধ করেছেন।
বেগম রোকেয়ার সমকালে সমাজের প্রায় অর্ধেক অংশ তথা নারীসমাজকে বাদ দিয়েই সমাজ উন্নয়নের চেষ্টা করা হতো! নারীর সহযোগিতা ছাড়া পুরুষের একার পক্ষে সমাজ উন্নয়ন যে সম্ভব নয় তৎকালীন মুসলিমসমাজ তা বুঝতো না, অফিস-আদালতে নারীদের কাজ করার কথা বাঙালি মুসলিমসমাজ চিন্তা করতেই পারতো না। সমাজের এ ভুল অপনোধনে বেগম রোকেয়া আমাদের অবনতি প্রবন্ধে লিখেন, ‘....আমরা সমাজেরই অর্ধঅঙ্গ। আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কিরূপে? কোন ব্যক্তির এক পা বাঁধিয়া রাখিলে, সে খোঁড়াইয়া কতদূর চলিবে? পুরুষদের স্বার্থ এবং আমাদের স্বার্থ ভিন্ন নহেÑ একই।’
তৎকালীন বাঙালি মুসলিম নারীসমাজের কোন মর্যাদা ও স্বাধীনতা ছিল না। স্ত্রীর নিজস্ব কোন চিন্তা ও ইচ্ছার স্বাধীনতা ছিল না। অথচ ইসলামই নারী জাতিকে দাসত্বের শৃংঙ্খল থেকে মুক্ত করে যথাযথ মর্যাদা দিয়েছে, নারীজাতির চেতনা জাগিয়েছে। এ প্রসঙ্গে নারীমুক্তিদাতারূপে হযরত মুহাম্মদ সা. এর বিশেষ ভূমিকা উল্লেখ করে বেগম রোকেয়া অর্দ্ধাঙ্গী প্রবন্ধে লিখেন, ‘আরবে স্ত্রীজাতির প্রতি অধিক অত্যাচার হইতেছিল, আরববাসীগণ কন্যা হত্যা করিতেছিল তখন হযরত মুহাম্মদ (দঃ) কন্যাকুলের রক্ষকস্বরূপ দন্ডায়মান হইয়াছিলেন। তিনি কেবল বিধি-ব্যবস্থা দিয়াই ক্ষান্ত থাকেন নাই, স্বয়ং কন্যা পালন করিয়া আদর্শ দেখাইয়াছেন।’ এজন্য বেগম রোকেয়া ইসলামী বিধান অনুযায়ী নারীর মর্যাদা ও অধিকার আদায়ের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি তৎকালীন পর্দা নামের অবরোধ প্রথার বিরোধিতা করে শরিয়ত সম্মত পর্দা করতে আগ্রহী হয়ে বোরকা প্রবন্ধে বলেন, ‘আমরা অন্যায় পরদা ছাড়িয়া আবশ্যকীয় পরদা রাখিব। প্রয়োজন হইলে অবগুণ্ঠন (ওরফে বোরকা) সহ মাঠে বেড়াইতে আমাদের আপত্তি নাই।’
বিশ শতকের বাঙালি মুসলিম সমাজে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের ব্যবধান ছিল ব্যাপক। সমকালীন নারী-পুরুষের ব্যবধান উল্লেখ ও প্রতিবাদ করে বেগম রোকেয়া বলেন, ‘নিম্ন শ্রেণীর পুরুষ যে কাজ করিলে মাসে ২্ বেতন পায় ঠিক সেই কাজ স্ত্রী লোকে করিলে ১ ্পায়। আবার চাকরের খোরাকী ৩ ্ আর চাকরাণীর খোরাকী ২ ।’ এসব অন্যায় ও বৈষম্যের প্রতিবাদ করে তিনি অর্দ্ধাঙ্গী প্রবন্ধে লিখেন, ‘আমরা ঈশ্বর ও মাতার নিকট ‘অর্দ্ধেক’ নহি। তাহা হইলে এইরূপ স্বাভাবিক বন্দোবস্ত হইত, পুত্র যেখানে দশমাস স্থান পাইবে দুহিতা সেখানে পাঁচমাস; পুত্রের জন্য যতখানি দুগ্ধ আমদানি হয় কন্যার জন্য তাহার অর্ধেক। সেইরূপ ত নিয়ম নাই।’
তৎকালে স্বামী-স্ত্রীর শিক্ষা ও জ্ঞানের ব্যাপক পার্থক্যও ছিল। স্বামী যখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে চিন্তা গবেষণায় নিয়োজিত স্ত্রী তখন ঘরের মধ্যে গৃহস্থালীর ছোট ছোট বিষয় নিয়ে ব্যস্ত। জ্ঞানের এ বৈষম্য উল্লেখ করে বেগম রোকেয়া ব্যথিত হৃদয়ে নারীসমাজকে জাগ্রত করার প্রয়াস চালিয়ে লিখেন, ‘স্বামী যখন পৃথিবী হইতে সূর্য ও নক্ষত্রের দূরত্ব মাপেন, স্ত্রী তখন একটা বালিশের ওয়ারের দৈর্ঘ্য প্রস্ত (সেলাই করিবার জন্য) মাপেন! স্বামী যখন কল্পনা-সাহায্যে সুদূর আকাশে গ্রহ-নক্ষত্রমালা বেষ্টিত সৌরজগতে বিচরণ করেন, সূর্যমণ্ডলের ঘনফল তুলাদণ্ডে ওজন করেন এবং ধুমকেতুর গতি নির্ণয় করেন, স্ত্রী তখন রন্ধনশালায় বিচরণ করেন, চাল-ডাল ওজন করেন এবং রাঁধুনির গতি নির্ণয় করেন।’
তৎকালে নারীদের পরাধীন ও পুরুষের উপর নির্ভরশীল মনে করে পুরুষেরা নারীদের প্রতি দয়া-অনুগ্রহ করতো। পুরুষসমাজের এ অনুগ্রহ নারীসমাজের কল্যাণ না হয়ে অকল্যাণ বয়ে এনেছিল। এজন্য তিনি নারীসমাজকে পুরুষের অনুগ্রহ নির্ভর না হয়ে নিজস্ব স্বকীয়তায় বলীয়ান হবার আহ্বান জানিয়ে আমাদের অবনতি প্রবন্ধে লিখেন, ‘ফলত তাহারা যে অনুগ্রহ করিতেছে তাহাতেই আমাদের সর্বনাশ হইতেছে।
আমাদিগকে তাহারা হৃদয় পিঞ্জরে আবদ্ধ করিয়া জ্ঞান-সূর্যালোক ও বিশুদ্ধ বায়ু হইতে বঞ্চিত রাখিয়াছেন, তাহাতেই আমরা মরিতেছি।’ তবে তিনি শুধু পুরুষদের সমালোচনা না করে প্রতিকারের জন্য নারীদের সক্ষমতা অর্জনের পরামর্শ দিয়েছেন। রাণী ভিখারিনী প্রবন্ধে তার ভাষায়, ‘অযোগ্য বলার জন্য রাগ না করিয়া ‘যোগ্য’ হইবার চেষ্টা করাই শ্রেয়।’
বাল্যবিয়ে নিরুৎসাহিত করে তিনি শিশু পালন প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘আমাদের ভবিষ্যৎ বংশরক্ষার জন্য দু‘টি বিষয় দরকারী; প্রথম স্ত্রীশিক্ষার বহুল প্রচার, দ্বিতীয় বাল্যবিবাহ রহিত করা।’ অধিকন্তু মায়ের দায়িত্ব-কর্তব্য না জেনে-বুঝে মা হওয়ার জন্য নিরুৎসাহিত করে একই প্রবন্ধে আরও লিখেন, ‘মায়ের কর্তব্য কি, তা না জেনে শুনে কেউ যেন মা না হয়।’
বেগম রোকেয়া বাঙালি নারীসমাজের মুক্তির জন্যে সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন। নারীসমাজকে জাগ্রত করতে তিনি প্রতিকূল পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করেছেন। তিনি নির্যাতিত ও অসহায় নারীসমাজকে পুরুষের অত্যচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার প্রেরণা ও শক্তি যুগিয়েছেন। বেগম রোকেয়া পুরুষের চোখরাঙানী উপেক্ষা করে নারীসমাজকে অধিকার আদায়ের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি পুরুষের সমকক্ষতা অর্জনের জন্য নারীসমাজকে সামাজিক বাধা উপেক্ষা এবং কঠোর পরিশ্রমের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘পুরুষের সমকক্ষতা অর্জনের জন্য আমাদিগকে যাহা করিতে হয়, তাহাই করিব। আবশ্যক হইলে লেডী কেরানী হইতে আরম্ভ করিয়া লেডী-ম্যাজিস্ট্রেট, লেডি-জজ, লেডি-ব্যারিস্টার সবই হইব। পঞ্চাশ বৎসর পর লেডি Viceroy হইয়া এদেশের সমস্ত নারীকে ‘রাণী’ করিয়া ফেলিব।’
প্রকৃতপক্ষেই বাঙালি নারীসমাজকে রাণী করার তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে। বাঙালি নারীসমাজ আজ রাণীতেই পরিণত হয়েছেন। নিকট অতীতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পীকার, বিরোধীদলীয় নেতা, অনেক মন্ত্রী এবং বর্তমানে সরকার ও প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীরা আসীন হয়েছেন। তারা পুরুষসমাজের আধিপত্যের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়েছেন। অধিকন্তু সর্বস্তরে নারীর স্বাধীনতা ও অধিকার নিশ্চিত চেষ্টা-আন্দোলন অব্যাহত আছে। নারীসমাজের এ উন্নতি-অগ্রগতির জন্য সমগ্র বাঙালি জাতি নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার কাছে ঋণী।