আনোয়ার আল ফারুক

শীত বাংলা ঋতু বৈচিত্রের অন্যতম এক উপভোগ্য ঋতু। শীতকে ভালোবাসে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ঢের মুশকিল। শীত নিয়ে প্রাচীন ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যে রচিত হয়েছে কত শত কালজয়ী কাব্যছন্দ। শীতের আবহ বার্তায় আমরা নতুন করে পুলকিত হই। শীত উদযাপনের প্রস্তুতি চলে গাঁও গেরাম শহর নগরে। ষড়ঋতুর সব কয়টি ঋতু গাঁও গেরাম শহর নগরে সমানভাবে সার্বজনীনভাবে উপভোগ্য হয়ে উঠে না। আমাদের শরত ও হেমন্ত এই দু ঋতু গাঁও গেরামে যেমন উপভোগ্য শহুরে জীবনে তার কিন্তু সিকি ভাগও টেরই পাওয়া যায় না কিন্তু শীত এমন এক ঋতু যে ঋতুর আবহ আনন্দ উৎসব সারাদেশে সমানতালে উপভোগ্য। তাই শীতকে সার্বজনীন ঋতু বৈচিত্র বলতে পারি। শরতের প্রথমার্ধের প্রখর তাপদাহের পরে মূলত ধীরে ধীরে শীতের আমেজ আসতে থাকে। হেমন্ত ঋতু শীতের আমেজ প্রবেশের ঋতুদ্বার। দিনে গরম আর রাতে ঝিরঝিরে শীতল হিমেল হাওয়ায় শীতকে ডেকে আনে। আমাদের শীত ঋতুকে নিয়ে প্রাচীন বাংলাসাহিত্য থেকে বর্তমান অবধি আধুনিক বাংলাসাহিত্যে গান কবিতা ছড়া গল্প লেখা হয়েছে ভুরি ভুরি। কবি সাহিত্যিকদের মন মননে এই ঋতু উঠে এসেছে এক অনন্যরূপে। এই অনন্যরূপকে বাস্তব রূপে উপস্থাপন করেছেন তাঁদের লেখনিতে। বাংলা সাহিত্যের এমন কোন কবি সাহিত্যিক নেই যিনি শীতকে নিয়ে এক বা একাধিক লেখা উপস্থাপন করেননি। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে শীত নিয়ে যে ছন্দকাব্য উপস্থাপিত হয়েছে তার একটা চিত্ররূপ তুলে আনার চেষ্টাই আজকের প্রবন্ধের প্রতিপাদ্য বিষয়। বিশ্বকবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর “দুই দিন” কবিতায় শীতের রূপ বৈচিত্রের উপস্থাপন করেছেন ঠিক এইভাবে-

”আরম্ভিছে শীতকাল, পড়িছে নীহার-জাল,

শীর্ণ বৃক্ষশাখা যত ফুলপত্রহীন;

মৃতপ্রায় পৃথিবীর মুখের উপরে

বিষাদে প্রকৃতিমাতা শুভ্র বাষ্পজালে গাঁথা

কুজ্ঝটি-বসনখানি দেছেন টানিয়া;

পশ্চিমে গিয়েছে রবি, স্তব্ধ সন্ধ্যাবেলা,

বিদেশে আসিনু শ্রান্ত পথিক একেলা।”

কবি এখানে শীত প্রকৃতির রূপচিত্র অঙ্কন করছেন তাঁর কাব্য মানসপটে। তুলে ধরেছেন শীতের অনন্য রূপ প্রকৃতি। আবার প্রকৃতিতে শীতের ভয়াবহ অবস্থাও উঠে আসছে তাঁর “বোধন”কবিতায়। তিনি লিখেছেন-

“নির্মম শীত তারি আয়োজনে এনেছিল বনপারে,

মার্জিয়া দিল শ্রান্তি ক্লান্তি- মার্জনা নাহি করে।

জ্ঞান চেতনার আবর্জনায়

পান্থের পথে বিঘ্ন ঘনায়,

নবযৌবন দূতরূপী শীত দূর করি দিল তারে।”

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম শীতের রূপ বৈচিত্রকে কবিচৈতন্যকে তুলে ধরছেন ‘শীতের সিন্ধু’ঠিক এভাবে-

থর থর কাঁপে আজ শীতের বাতাস,

সেদিন আশার ছিল যে দীর্ঘঃশ্বাস

আজ তাহা নিরাশায় কেঁদে বলে, হায়

“ওরে মূঢ়, যে চায় সে চিরতরে যায়!

যাহারে রাখিবি তুই অন্তরের তলে

সে যদি হারায় কভু সাগরের জলে

কে তাহারে ফিরে পায়? নাই, ওরে নাই,

অকূলের কূলে তারে খুঁজিস বৃথাই!

কবি এই কবিতা শীতের চিত্রকল্প আঁকার পাশাপাশি বিরহ বেদনার এক অনন্য দৃশ্যপট উপস্থাপন করেছেন। শীতের এই সময় প্রেয়শীকে হারানোর মর্মপীড়ায় ভোগার যন্ত্রণায় কাতর হয়েছেন। শীতের যাতনার পাশাপাশি প্রিয়জন দূরে সরে যাওয়ার বেদনায় কবি মনকে ব্যথাতুর করে তুলছে।

রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ শীতের রূপ চিত্র আঁকছেন তাঁর ‘শীতের রাত’ কবিতায় এভাবে-

এই সব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে;

বাইরে হয়তো শিশির ঝরছে, কিংবা পাতা,

কিংবা প্যাঁচার গান; সেও শিশিরের মতো, হলুদ পাতার মতো।

শীত যেমন প্রকৃতিকে নির্ঝর করে তুলে ঠিক কবি চৈতন্যকে বেদনায় ভারাক্রান্ত করে তুলছে অজ্ঞাত কোন এক বেদনার দহনে। তাই কবি বলেছেন শীত রাতে হৃদয়ের মৃত্যু আসে। আবার তার ‘জীবন’ কবিতায় শীতের রুক্ষতার চিত্রকল্প তুলে ধরেছেন এভাবে-

যে পাতা সবুজ ছিল,- তবুও হলুদ হতে হয়,-

শীতের হাড়ের হাত আজও তারে যায় নাই ছুঁয়ে-

যে মুখ যুবার ছিল, তবু যার হয়ে যায় ক্ষয়,

হেমন্ত রাতের আগে ঝ’রে যায়,- প’ড়ে যায় নুয়ে;-

পল্লীকবি জসীম উদ্দীন কী অসাধারণ রূপে শীতের চিত্র এঁকেছেন তাঁর রাখাল কবিতায় এভাবে-

‘ঘুম হতে আজ জেগেই দেখি শিশির ঝরা ঘাসে

সারা রাতের স্বপন আমার মিঠেল রোদে হাসে।’

কবি তার হৃদয়ে পোষিত স্বপ্নকে শীত সকালে মিষ্টি রোদে মেলে ধরেছেন। শীতল হিমেল হাওয়া আর কবির হৃদয়ের স্বপ্ন একাকার হয়েছে শীতল মিষ্টি রোদের আবহে।

কবি ফররুখ আহমেদ শীতের তীব্রতার বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর পউষ এল কবিতায়। তিনি লিখেছেন-

উত্তরী বায় এলোমেলো

পউষ এল! পউষ এল!

হিমেল হাওয়ায় শিরশিরিয়ে

এল অচিন সড়ক দিয়ে আর

মাঠ, ঘাট বন ঝিরিয়ে গেল,

পউষ এল! পউষ এল!

শীতের তীব্র কাতরতায় সকালে আমরা খানিক উষ্ণ উম পেতে সূর্য্যের আগমন প্রহর গোনার অপেক্ষায় থাকি সেই অবস্থার কাব্যিক বর্ণনা তুলে ধরেছেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্য ঠিক এভাবে-

হে সূর্য! শীতের সূর্য!

হিমশীতল সুদীর্ঘ রাত তোমার প্রতীক্ষায়

আমরা থাকি,

যেমন প্রতীক্ষা করে থাকে কৃষকের চঞ্চল চোখ।’

কবি আল মাহমুদ ‘জানুয়ারি দু’হাজার’ কবিতায় প্রিয়ার উষ্ণ ভালোবাসার কল্পিত রূপচিত্র আঁকেন এভাবে-

‘না শীত, না গরমে মজা ফেরি করে ভোরের বাতাস

ফেলে যাওয়া মাফলারে জানি লেগে আছে তোমার ছোঁয়া।’

কবি আসাদ চৌধুরী তাঁর ‘সন্দেহ’ কবিতায় শীতের তীব্রতার চিত্রকল্প আঁকেন এভাবে-

‘চিরল চিরল পাতা বাতাস পাইলে কাঁপে

সাপের মতো লক লকাইয়া চুলার আগুন তাপে

আমার শীতে দেহ কাঁপে।’

কবি সুনির্মল বসু তাঁর ‘শীতের সকাল’ কবিতায় শীতকালীন সকালের এক বাস্তব রূপ চিত্র তুলে ধরেছেন ছন্দময় করে এভাবে-

আবছায়া চারদিক, ঝাপসা নিঝুম,

পউষের ভোরবেলা—ভেঙে গেল ঘুম।

উষার দুয়ারে এক তুষারের ঢেউ

কখন পড়েছে ভেঙে, জানে না তা কেউ।

ঝিমঝিমে হিম-হাওয়া বয় বার বার,

দিকে দিকে বাজে যেন শীতের সেতার।

কবি ও গীতিকার মতিউর রহমান মল্লিক শীতকালিন দুঃখীজনের কষ্টগাঁথা তুলে এনেছেন তাঁর ‘শীত যেনো চাবুক আজ’ কবিতায়-

শীত যেনো চাবুক আজ

শীত যেনো অস্ত্র,

সেই শীত ঠেকাবার

দুখীদের বাঁচাবার

নেই শীত বস্ত্র।”

কবি মোশাররফ হোসেন খান তাঁর কবিতায় “শীত নাকি আগ্নেয় প্রপাত” শীতের তীব্র দহনকে দেশের দূর্যোগের সাথে তুলনা করে কবিত চিত্তের আক্ষেপ প্রকাশ করেন ঠিক এভাবে-

এবার শীতে ক্ষেত ভরা তরতাজা সবজির বদলে

লকলকিয়ে উঠছে বুক ভরা কষ্টের লতাগুল্ম।

নাড়ার আগুনেও উষ্ণ হয় না ব্যথাতুর হৃদয়!

এটা কি শীত? নাকি আগ্নেয় প্রপাত!”

কবিরা একগাঁদা হতাশার বুকেও বোপন করতে জানে আশার বীজ। কবিতার শেষাংশে সেই আশা রেখে গেছেন এভাবে-

এই শীতেও হিমালয় থেকে ঝরছে যেন আগ্নেয় প্রপাত!

চারপাশে ঘুরছে কেবল কাক শকুন মশা আর মাছি, আমি তবু আশান্বিত বুকে

একদল ঘোড় সওয়ারির প্রতীক্ষায় দূরে-বহুদূরে-

এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি!