ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

শীত নামলেই আমরা যেন একটু বদলে যাই। গরমের দেশের মানুষ বলেই হয়তো সামান্য কুয়াশা, একটু ঠাণ্ডা বাতাস এলেই মনে হয়, বড় কোনো শীতযজ্ঞ শুরু হয়ে গেছে। ভোরের আলো দেরি করে আসে, সূর্যটাও যেন শীতের আলসেমিতে ঢেকে পড়ে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে চায়ের কাপ হাতে মানুষ কেবল শরীর নয়, নিজের ভাবনাগুলোকেও উষ্ণ করার চেষ্টা করে।

শীত মানে শুধু কম্বল আর সোয়েটার নয়। শীত মানে স্মৃতি। মায়ের হাতে ভাজা পিঠার গন্ধ, গ্রামের উঠোনে খড় জ্বালানোর আগুন, কিংবা স্কুলে যাওয়ার আগে ঠান্ডা পানিতে মুখ ধোয়ার অনিচ্ছা -এসব ছোট ছোট অভিজ্ঞতা শীতকে আমাদের জীবনের গভীরে গেঁথে দেয়। এই ঋতু মানুষকে একটু বেশি মানুষ করে তোলে- কথা বাড়ায়, দূরত্ব কমায়, নীরবতাকে করে গভীর।

এক শীতের সকালে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কুয়াশার ভেতর মানুষগুলোকে আলাদা করে চেনা যাচ্ছিল না।

সবাই যেন একই রঙে রাঙানো-ধূসর। হঠাৎ চোখে পড়ল, এক বৃদ্ধ তার পাতলা চাদরটি খুলে কাঁপতে থাকা একটি ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন। কোনো কথা হলো না, কোনো পরিচয়ও নয়। শুধু শীতের ভেতর একটি উষ্ণ মুহূর্ত। তখনই মনে হলো-শীত আসলে আমাদের পরীক্ষা নেয়, কে কতটা মানবিক হয়ে থাকতে পারে।

শীতের হাসিও আলাদা। ঠান্ডায় দাঁত কাঁপতে কাঁপতে বলা কৌতুক, আগুন পোহাতে গিয়ে গল্পের পর গল্প, কিংবা ভুল করে গরম চায়ের বদলে ঠান্ডা চুমুকÍএই হাসিগুলো ক্ষণিক নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী। শীত আমাদের ধীর করে দেয়, আর সেই ধীরতার মধ্যেই হাসি পায় গভীরতা।

কবিতার ভাষায় শীত যেন-

কুয়াশার চাদরে ঢাকা পথ,

নিভু নিভু রোদে বসে থাকা সময়,

আর বুকের ভেতর জমে থাকা

অকথিত কথার শিশির।

শীতের রাতগুলো সবচেয়ে বেশি কথা বলে। কম্বলের নিচে লুকিয়ে থাকা স্বপ্ন, জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া হিমেল বাতাস, দূরের কোনো ট্রেনের হুইসেল- সব মিলিয়ে রাত যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তখন বোঝা যায়, শীত কেবল একটি ঋতু নয়; শীত এক ধরনের অনুভব।

আমরা শীতকাতুরে জাতি, এ কথা সত্য। কিন্তু এই শীতই আমাদের শেখায় উষ্ণতার প্রকৃত মূল্য। আগুনের পাশে বসে থাকা মানুষ, ভাগ করে নেওয়া এক কাপ চা, কিংবা নিঃশব্দ সহানুভূতির স্পর্শ, এসবই শীতে বেশি সত্যি লাগে।

শেষ পর্যন্ত শীত চলে যাবে। সূর্য আবার তীব্র হবে, ঘাম ফিরে আসবে। কিন্তু শীতের রেখে যাওয়া ছোট ছোট মুহূর্ত- একটু মানবিকতা, একটু স্মৃতি, একটু নীরব উষ্ণতা, সেগুলো থেকে যাবে আমাদের ভেতরে। ঠিক অণুগল্পের মতো সংক্ষিপ্ত, অথচ গভীর।