গাজী গিয়াস উদ্দিন
আবিদ আজাদের প্রথম কবিতার বই ‘ঘাসের ঘটনা’ (১৯৭৬) আধুনিক কাব্য দিগন্তের এক মাইলফলক। প্রথম কাব্যেই বিদগ্ধ পাঠক আবিষ্কার করেন টাটকা আর বিচিত্র সব চিত্রকল্পের।
যেমন কবিতা ‘গায়কপাখি’ :
স্বপ্নের ভিতরে আমার জন্ম হয়েছিল
সেই প্রথম আমি যখন আসি
অন্যমনস্কভাবে আমার এই পুনর্জন্ম দেখেছিল
তিনজন বিষণ্ন অর্জুন গাছ।
সেই থেকে আমার ভিতরে আজো আমি স্বপ্ন হয়ে আছি-
মা, স্বপ্নের ভিতর থেকে আমি জন্ম নেব কবে?
(জন্মস্বর : ঘাসের ঘটনা)
‘ঘাসের ঘটনা’র কবিতাগুলো আদ্যোপান্ত আবেগশাসিত ও রোমান্টিকতা আক্রান্ত। তবে আবিদ আজাদের অধিকাংশ কবিতার বাহন গল্পময়তা। আর স্মৃতিনির্ভর বলেই তাঁর কবিতাও হয়ে ওঠে নস্টালজিক। এই নস্টালজিয়ায় শহর ও গ্রাম মিশে আছে :
আজ মনে পড়ছে সেইসব মুঠোবন্দি জোনাক পোকার দুঃখ
হাওয়ার হাওরে ছইনৌকার মতো এক রত্তি পাখি
গলার নিচের দিকে অদ্ভুত নরম নীল রোঁয়া
উঠোনমনির মুখ, ভোরবেলাকার হিমভেজা কার চোখ
আগডুম বাগডুম চারদিক, বাক দিচ্ছে সুন্দর মোরগ।
(দুঃখ : আমার মন কেমন করে)
কবিতায় গল্পকাঠামো নির্মাণ আবিদ আজাদকে বিশেষ ভাবে চিহ্নিত করে। তাঁর কোন কোন কবিতা যেন গল্প-কবিতা। আবিদ আজাদের কবিতায় শৈশবের স্মৃতিকাতরতা এবং ঐতিহ্যের অনুসন্ধান রূপ পায় নতুন ব্যঞ্জনায়। যাত্রাগান বাঙালির আদি শিল্পমাধ্যম। সংস্কৃতির এই শেকড়মুখী দৃষ্টি তাঁর কবিতার অন্যতম চেতনা।
গোটা পৃথিবী রঙ্গমঞ্চ আর মানুষসকল অভিনেতা-অভিনেত্রী। সেই জীবনের যাত্রা শেষে ভাঙা মঞ্চের বাইরের একটি সাদামাটা দৃশ্যকে কবি করে তোলেন চিত্ররূপময়। এই কবিতার মধ্যে ছোট একটি গল্প আমরা টের পাই। সেই গল্পই আবিদ আজাদের কণ্ঠে হয়ে ওঠে
গীতিময় :
.....। একজন অত্যন্ত সাধারণ মানুষ আর একজন অতি সাধারণ মানুষীর
দাম্পত্য জীবন কি ভাবে সাদামাটা ভয়ংকর স্বপ্নের দাঁতে সারাক্ষণ ছিঁড়ে যেতে-যেতে
প্লাবন ও পরিমার্জনার পৃথিবীতে ঝলমল করতে থাকে আজ আর তাও আমি বুঝতে
চাই না। কারণ মৃত্যু, যে মরে তার নয়—মৃত্যু, যে বাঁচে, বেঁচে থাকে, তার। বৃষ্টি ও
কুয়াশা জীবিতদের পাঠ্য বলেই কি আমি আর দাঁড়াতে পারি না তোমার ছবির সামনে
মুখ তুলে?
(তোমার ছবির সামনে : আরো বেশি গভীর কুয়াশার দিকে)
আবিদ আজাদ তাঁর কবিতার বিষয়বস্তু করেন চারপাশের চেনাজানা বৃত্ত থেকে। কবিতায় জড়িয়ে থাকে সহজ সূক্ষ্ম অনুভব চিত্র । চিত্রকল্প রচনায় তিনি সিদ্ধহস্ত । কবিতায় রয়েছে এক অনিঃশেষ স্বতন্ত্র আঙ্গিক ও উপাদান।
অভিজ্ঞতা আর অনুভূতির অলিতে গলিতে তিনি নির্মাণ করেন কবিতার শরীর। প্রাত্যহিক জীবনের খুঁটিনাটি প্রসঙ্গও তাঁর পরশে কবিতায় পায় বিশিষ্টতা। মানুষের যাপিত জীবনের—অভাব, প্রেম, রোমাঞ্চ, বিরহ, বিচ্ছেদ, ব্যর্থতা-সাফল্য—এই সমস্ত কিছুই আবিদ আজাদ প্রত্যক্ষ করেছেন।
অতিপ্রাকৃত পরাবাস্তবতার যোগসাধনে তাঁর কবিতার ছত্রে ছত্রে বয়ে যায় এক সুরেলা পাখির গীতলতা:
তোমাদের উঠোনে কি বৃষ্টি নামে? রেলগাড়ি থামে?
মন-গড়া বৃষ্টি নিয়ে মন-গড়া ট্রেন
মন-গড়া রেললাইন ছেড়ে দিয়ে ঝিকঝিক ধোঁয়ার বহর নিয়ে থামে এসে
তোমার ঘুমের মশারির কাছে? বালিশের পাহাড়ের কাছে?
ঘাসের কাছের কোনো এক ইস্টিশানে?
(তোমাদের উঠোনে কি বৃষ্টি নামে? রেলগাড়ি থামে? : তোমাদের উঠোনে কি বৃষ্টি নামে? রেলগাড়ি থামে?)
আবিদ আজাদের কবিতা স্বচ্ছন্দ পাঠের কবিতা। শব্দ নির্বাচনে, প্রয়োগে ও সৃষ্টিতে আবিদ অতিশয় সতর্ক। ক্লিশে শব্দ পরিত্যাগ করে ব্যঞ্জনাধর্মী নতুন যৌগিক শব্দের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ঈর্ষণীয়। শব্দের অর্থের পাশাপাশি ধ্বনিসংগতিও তাঁর বিবেচ্য বিষয়।
আবিদ আজাদ সত্তরের দশকের অন্যতম প্রধান কবি। হাসপাতালের রোগশয্যায় রচিত এবং কবি আবিদ আজাদের মৃত্যুর পরে প্রকাশিত ‘হাসপাতালে লেখা’ কাব্যের কবিতাগুলোতে পাঠক আবিষ্কার করেন সেই পুরাতন পরিচিত গায়কপাখিকে। এই শেষতম কবিতাগ্রন্থের কবিতাগুলোতে পুনরায় তাঁর পরিচিতনির্ভর গীতিময়তা বেশ স্পষ্ট, যা তাঁর পুরনো পাঠকের জন্যে গভীরতম অর্থে তৃপ্তিদায়ক :
মৃত্যুর হাতকে আজ পরিচ্ছন্ন মনে হলো খুব
জীবন, প্রতিষ্ঠা, গ্লানি সব তার মুঠোয় লুকালো
কৃতি, খ্যাতি, সম্ভাবনা, পুরস্কার সব আজ চুপ
তিন পুত্র বাবার শরীর নুয়ে কাফন পরালো।
(মৃত্যুর হাত : হাসপাতালে লেখা)
গীতিময়তায় কবি আবিদ আজাদ ছিলেন তাঁর প্রজন্মের মধ্যেও অগ্রবর্তী। তাঁর কাব্য র্পযালোচকগণ বলেছেন, সমসাময়িক অন্য কোন কবির রচনা বিদেশী প্রসঙ্গ দ্বারা ভারাক্রান্ত হলেও আবিদ আজাদ তাঁর কবিতাকে সর্বদাই সচেতন ভাবে অনাবশ্যক ভারমুক্ত রেখেছেন। আবিদের কবিতায়, বিশেষত তাঁর প্রথম পর্যায়ের কবিতায় দুর্লভ এক গতি সঞ্চারিত হয়েছে, যা তাঁর কবিতাকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করে রাখে।
মূলত কবিতা রচনার প্রয়োজনে আবিদ আজাদ একটা নতুন আধার অর্জনের উপর জোর দিয়েছেন বেশি, তা হচ্ছে কবিতায় গীতলতা। পরবর্তীতে নির্মাণ কুশলতার ভিতরে গভীর চিন্তার অনুশীলনে কবিতায় ব্যক্তিত্বের পরিস্ফুটন স্পষ্ট করে তুলেছেন।
বাংলাদেশের কাব্যভুবনে আবিদ আজাদ একটি প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ও সার্বভৌম নাম। সৃষ্টিশীলতার পথে উত্তরণের মধ্য দিয়ে তিনি আবহমান বাংলা কবিতার ধারাকে পৌঁছে
দিয়েছেন বর্তমানের জীবিত উপত্যকায়। তাঁর কবিতা বর্ণিল ও চিত্রল, বিষয়-পরিধিতে বিপুল ও বহুবিচিত্র। পরিশ্রুত বাংলা গীতিকবিতা বিশুদ্ধ ও চূড়াস্পর্শী এবং পরিণত কাব্যরূপ লাভ করেছে কবি আবিদ আজাদের ঈর্ষণীয় কুশলতায়। ফলে আবিদ আজাদ সত্তরের দশকের অন্যতম প্রধান কবি হওয়া সত্বেও, তিনি আজ দশকের গণ্ডি পেরিয়ে বাংলাদেশের কবিতার এক অনিবার্য ও গুরুত্বপূর্ণ কবি হিসেবে সমাদৃত।
কবি আবিদ আজাদ ১৯৫২ সালের ১৬ নভেম্বর কিশোরগঞ্জের চিকনিরচরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। সত্তরের কালপর্বে কবিতার ভুবনে আবিদ আজাদের (১৯৫২-২০০৫) আবির্ভাব। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঘাসের ঘটনা (১৯৭৬) প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই তরুণতম কবি হিসেবে পাঠক ও বোদ্ধা মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হন। তিনি সাহিত্যের কাগজ ‘শিল্পতরু’র সম্পাদক ছিলেন। প্রকাশিত গ্রন্থ: তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের নাম ঘাসের ঘটনা। এটি ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হয়। বনতরুদের মর্ম (১৯৭৮), ‘শীতের রচনাবলি’ (১৯৮৩), আমার স্বপ্নের আগ্নেয়াস্ত্রগুলি’ (১৯৮৭), ছন্দের বাড়ি ও অন্যান্য কবিতা’ (১৯৮৭) তোমাদের উঠোনে কি বৃষ্টি নামে? রেলগাড়ি থামে?’ (১৯৮৮), আমার কবিতা’ (১৯৮৯), আরো বেশি গভীর কুয়াশার দিকে’ (১৯৯৩), আমার অমতার গল্প’ (১৯৯৮), খেলনাযুগ ও অন্য একুশটি কবিতা’ (২০০০)।
পুরস্কার ও সন্মাননা: তিনি বঙ্গবন্ধু সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৬), শহীদ জিয়া স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮৩), আমি তুমি ও সে পুরস্কার (১৯৮৪), চারণ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৬), আবুল হাসান স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮৯), মাইকেল মধুসূদন একাডেমি পুরস্কার (১৯৯৪, পশ্চিমবঙ্গ) ও ২০১৮ সালে মরণোত্তর সা’দত আলি আখন্দ সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। মৃত্যু: তিনি ২০০৫ সালের ২২ মার্চ ৫২ বছর বয়সে ঢাকার শমরিতা হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।]
নতুন বাক ও চিত্রকল্প নির্মাণে কবি আবিদ আজাদ এর জুড়ি মেলা ভার। ছন্দ তাঁর কবিতার এক উল্লেখযোগ্য দিক। তবে বিশুদ্ধ গদ্যকেও তিনি অনেকবার ব্যবহার করেছেন। সেই গদ্য হয়ে উঠেছে ফলপ্রসূ।