জাহেদুল ইসলাম বাঁধন
বইমেলা শুধু বই কেনাবেচার একটা আয়োজন নয়, এটি একটি জাতির চেতনার প্রতিফলন, জ্ঞানের তীর্থস্থান এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক অনন্য উদ্যাপন। বাংলাদেশে যখনই “বইমেলা” শব্দটি উচ্চারিত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে অমর একুশে গ্রন্থমেলা।
যাকে আমরা সংক্ষেপে একুশে বইমেলা বলে চিনি। ফেব্রুয়ারি মাস এলেই ঢাকার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান জুড়ে যে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে, তা পুরো জাতিকে একটা সাংস্কৃতিক জোয়ারে ভাসিয়ে দেয়।
ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখা যায় বাংলাদেশে বইমেলার যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৫ সালে। তখন খুবই সাদামাটা আয়োজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার প্রাঙ্গণে ছোট্ট একটা মেলা। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকে বাংলা একাডেমি এই মেলার দায়িত্ব নেয় এবং ধীরে ধীরে এটি জাতীয় পর্যায়ে রূপ নেয়। ১৯৭৮ সাল থেকে এটি নিয়মিতভাবে ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে আয়োজিত হতে থাকে, যাতে ভাষা আন্দোলনের অমর স্মৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে থাকে। প্রথম দিকে বইমেলা ছিল মূলত বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণকেন্দ্রিক। পরবর্তীতে জনসমাগম বাড়তে থাকায় ২০০০ এর দশক থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে যুক্ত করা হয়। আজ এই মেলা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বইমেলাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে, যেখানে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ মানুষের পদচারণা ঘটে।
একুশে বইমেলার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সময়কাল। পুরো ফেব্রুয়ারি মাস ; কখনো কখনো মার্চের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ধরে চলে। এই মেলার মতন বিশ্বের অন্য কোনো বইমেলাই এত দীর্ঘ সময় ধরে চলে না। এই দীর্ঘ সময়কালের কারণেই প্রকাশকরা নতুন বই প্রকাশের জন্য এই মেলাকে প্রধান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বেছে নেন।
মেলার প্রতিপাদ্য প্রতিবছর ভিন্ন হয়। যেমন ২০২৫ সালে প্রতিপাদ্য ছিল “জুলাই গণঅভ্যুত্থান: নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ”। আর ২০২৬ সালে নির্বাচন ও রমজানের কারণে মেলা শুরু ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে এবং চলবে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত। এই ধরনের তারিখ পরিবর্তন নিয়ে প্রকাশকদের মধ্যে বিতর্কও হয়েছে। অনেকের মতে মেলার প্রাণশক্তি হারিয়েছে, আবার কেউ কেউ সুন্দরও বলছেন।
একুশে বইমেলা শুধু বইয়ের মেলা নয়, এটি একটি সামাজিক মিলনমেলা। লেখক-পাঠকের সরাসরি সাক্ষাৎ অটোগ্রাফ প্রোগ্রাম আলোচনা সভা, কবিতা পাঠ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিশু-কিশোরদের জন্য আলাদা কর্নার, এসব মিলিয়ে মেলা একটা উৎসবের রূপ নেয়। পরিবার-পরিজন নিয়ে মানুষ আসে। ছাত্র-শিক্ষক-চাকরিজীবী-গৃহিণী। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ভিড়ে মেলা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
বইমেলা নতুন লেখকদের উৎসাহ জোগায়। অনেকেই প্রথম বই প্রকাশের সাহস এখান থেকেই পান। প্রকাশনা শিল্পের বৃদ্ধিতেও এর অবদান অপরিসীম। এক মাসে যে পরিমাণ বই বিক্রি হয়, তা সারা বছরের বইবাজারের একটা বড় অংশ।
বইমেলা এখন একটা বিরাট অর্থনৈতিক ইভেন্ট। শত শত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। হাজারেরও বেশি স্টল ও প্যাভিলিয়নকাগজ, প্রিন্টিং, বাইন্ডিং, ডিজাইন-সংশ্লিষ্ট শিল্পেও কর্মসংস্থান বাড়ে ফুড কোর্ট, পরিবহন, হকার। সব মিলিয়ে একটা অস্থায়ী অর্থনীতি তৈরি হয় চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা সাফল্যের পাশাপাশি কিছু সমালোচনাও আছে। অতিরিক্ত ভিড় ও কিছু নিম্নমানের বই প্রকাশ দাম বৃদ্ধি, পাইরেসি রাজনৈতিক প্রভাব ও বিতর্ক, তবুও প্রতিবছর মানুষের উৎসাহ কমে না।
অমর একুশে বইমেলা বাঙালির অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছিলাম বলেই আজ আমরা নিজস্ব সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি। বইমেলা শুধু বই কেনার জায়গা নয়। এটি আমাদের স্বপ্ন দেখার, চিন্তা করার, বিতর্ক করার এবং একসঙ্গে বেড়ে ওঠার এক অনন্য স্থান। যতদিন বাঙালি জাতি বই পড়তে ও ভাবতে ভালোবাসবে, ততদিন একুশে বইমেলা অমর থাকবে।