মুহাম্মদ আবুল হুসাইন
কবি মতিউর রহমান মল্লিক ছিলেন বাংলাদেশের ইসলামী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রনায়ক। তাঁর গান শুধু আবেগনির্ভর নয়; বরং তা আদর্শনিষ্ঠ, সংগ্রামমুখর এবং চেতনা-জাগানিয়া। “চলো চলো চলো মুজাহিদ”, “সাহসের সাথে কিছু স্বপ্ন জড়াও” এবং “আমাদের সামনে বাধার পাহাড়”—এই তিনটি গান বিশ্লেষণ করলে তাঁর সৃষ্টিশীল মনন ও আন্দোলনধর্মী শিল্পবোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
১. অগ্রযাত্রার অগ্নিসংগীত
“চলো চলো চলো মুজাহিদ” গানটি মূলত এক অদম্য অগ্রযাত্রার ডাক। সূচনাতেই তিনি ঘোষণা করেন—
“চলো চলো চলো মুজাহিদ
পথ যে এখনো বাকি”
এখানে পথের অসমাপ্ততা মানে সংগ্রামের ধারাবাহিকতা। জীবনের কষ্ট, হতাশা বা ক্লান্তিকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বানই গানের প্রাণ—
“ভোলো ভোলো ব্যথা ভোলো
মুছে ফেলো ওই আঁখি ॥”
এই গান শুধু মানসিক দৃঢ়তার কথা বলে না; এটি আদর্শিক শপথকেও স্মরণ করিয়ে দেয়—
“আসুক ক্লান্তি শত বেদনা
শপথ তোমার তবু ভুলো না”
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ উচ্চারণ—
“ভয় কী তোমার সঙ্গী খোদা
দীলের কাবায় কুরআন বাঁধা
মরলে শহীদ বাঁচলে গাজী”
এখানে ভয়হীনতার চূড়ান্ত রূপ ফুটে ওঠে। জীবন-মৃত্যু উভয় অবস্থাতেই সাফল্যের দর্শন তুলে ধরে কবি এক ধরনের আধ্যাত্মিক সাহস নির্মাণ করেছেন।
২. আত্মগঠন ও নেতৃত্বের সুর
“সাহসের সাথে কিছু স্বপ্ন জড়াও” গানটি তুলনামূলকভাবে নির্মাণধর্মী। এখানে সরাসরি যুদ্ধের আহ্বান নয়; বরং আত্মপ্রস্তুতির তাগিদ বেশি—
“সাহসের সাথে কিছু স্বপ্ন জড়াও
তারপর পথ চল নির্ভয়”
স্বপ্ন ও সাহসের সমন্বয়ই সফলতার মূল—এই দর্শন তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। অন্ধকারের বিপরীতে সূর্যের প্রতীকী ব্যবহার লক্ষণীয়—
“আঁধারের ভাঁজ কেটে আসবে বিজয়
সূর্যের লগ্ন সে নিশ্চয় ॥”
এখানে সংগ্রামকে এক অনিবার্য প্রভাতের পূর্বসূচনা হিসেবে দেখানো হয়েছে।
নেতৃত্বের মনস্তত্ত্বও ফুটে ওঠে—
“তোমার পায়ের ছাপ স্পষ্ট কর
ক্লান্ত রুগ্ন ভাব নষ্ট কর
তবেই সাথীরা আরো এগিয়ে যাবে”
অর্থাৎ নিজেকে দৃঢ় ও স্বচ্ছ না করলে অন্যদের এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। গানটি তাই ব্যক্তিগত আত্মশুদ্ধি ও দূরদর্শিতার উপর জোর দেয়—
“নিজেই নিজের দিকে তাকিয়ে দেখে
আবেগের পথ কর নির্ণয় ॥”
এ গান মূলত ভেতর থেকে মানুষ গড়ে তোলার প্রেরণা।
৩. সম্মিলিত সংগ্রামের চিত্রকাব্য
“আমাদের সামনে বাধার পাহাড়” গানটিতে ভাষা আরও চিত্রময় ও তীব্র—
“আমাদের সামনে বাধার পাহাড়
সাথে বহে টলমল রক্ত নদী”
‘বাধার পাহাড়’ ও ‘রক্ত নদী’—এই দুটি শক্তিশালী প্রতীক সংগ্রামের কঠোর বাস্তবতাকে তুলে ধরে। কিন্তু হতাশা নয়; বরং দুঃসাহসই এখানে সমাধান—
“মঞ্জিল দূরে নয় দুঃসাহসে
কদম কদম পথ চলো যদি।।”
গানের কেন্দ্রে আছে অগ্নিময় শপথ—
“সংগ্রাম মুখর এই জীবনে
শপথ তপ্ত করে আগুনে”
এখানে শপথকে ‘আগুনে তপ্ত’ বলা হয়েছে—যা সংকল্পের দৃঢ়তা বোঝায়।
সমষ্টিগত চেতনার প্রকাশও স্পষ্ট—
“তাকবীর দিকে দিকে ছড়িয়ে
বজ্রবর্ম বুকে জড়িয়ে”
এই পঙ্ক্তিতে ঐক্য, সাহস ও সম্মিলিত আত্মরক্ষার প্রতীকী ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে।
শিল্পরূপ ও ভাবধারার বৈশিষ্ট্য
এই তিনটি গানের মধ্যে কিছু অভিন্ন শিল্পগুণ লক্ষ করা যায়—
ক্স ক্রিয়ামূলক ভাষা: “চলো”, “জড়াও”, “ধর”, “ছড়িয়ে”—সবই কর্মমুখী আহ্বান।
ক্স প্রতীকী চিত্রকল্প: পাহাড়, সূর্য, রক্তনদী, কাবা—এসব শব্দ গানে দৃশ্যমানতা সৃষ্টি করে।
ক্স ঈমানভিত্তিক দর্শন: ভয়হীনতা ও আত্মত্যাগের নৈতিক ভিত্তি গড়ে ওঠে ঈশ্বরবিশ্বাসে।
ক্স সমবেত কণ্ঠের উপযোগিতা: গানের ছন্দ ও গঠন এমন যে তা মিছিল, সমাবেশ বা দলগত পরিবেশনার জন্য উপযুক্ত।
উপসংহার
মতিউর রহমান মল্লিকের এই তিনটি গান কেবল সঙ্গীত নয়; এগুলো আদর্শচেতনার জাগরণী উচ্চারণ। একদিকে ব্যক্তির আত্মগঠন, অন্যদিকে সমষ্টিগত অগ্রযাত্রা—দুটি স্তরেই তাঁর শিল্প সজাগ।
সংগ্রাম, স্বপ্ন ও শপথ—এই ত্রিমাত্রিক শক্তির উপর দাঁড়িয়ে তাঁর গান আজও প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।