মনসুর আহমদ

স্নেহধন্যা বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদকে লেখা এক চিঠিতে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, “গানের পাখি গান গায় খাবার পেয়ে নয়; ফুল পেয়ে আলো পেয়ে সে গান গেয়ে ওঠে। মুকুল-আসা- কুসুম - ফোটা বসন্তই পাখিকে গান গাওয়ায়, ফল পাকা জ্যৈষ্ঠ আষাঢ় নয়।” প্রকৃতির আহ্বানে পাখির কন্ঠে যেমন গান ভেসে ওঠে মানুষের কন্ঠেও তেমনি প্রকৃতি গান জাগিয়ে তোলে। তফাৎ এতটুকু যে পাখির গানে কোন বৈচিত্র্য নেই কিন্তু মানুষে গানের পেছনে কবির দৃশ্য অন্তর্দৃশ্য কল্পনা ও ইন্দ্রিয়ানুভূতি সম্বন্ধ কল্পনা কাজ করে বলে তাতে যেমন ভাবের জোয়ার ভাটা আছে তেমনি আছে বৈচিত্র্য ভরপুর সুর ব্যঞ্জনা।

কবির বিভিন্ন কল্পনা সুন্দর ভাবে প্রকাশিত হয় বিভিন্ন উপমা প্রয়োগের মাধ্যমে। দেশে দেশে যুগে যুগে কবি সাহিত্যিকেরা তাদের শিল্পকর্মকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছেন বিভিন্ন উপমা প্রয়োগ করে। নজরুলের গানে উপমা প্রয়োগে কবি আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধকারী। এ সব উপমায় প্রাকৃতিক উপাদানের সাথে অতিপ্রাকৃতিক উপাদান সংমশ্রিত হয়ে গানকে অধিকতর সৈন্দর্যাভিসারী ও হৃদায়াগ্রাহী করেছে। যেমন কবির বিখ্যাত গান :

বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুল শাখাতে দিসনে আজি দোল ।

আজো তার ফুল কলিদের ঘুম টুটেনি তন্দ্রাতে বিভোল।।

কবে সে ফুল- কুমারী ঘোমটা চিরে আসবে বাহিরে,

শিশিরের স্পর্শ সুখে ভাঙ্বে রে ঘুম রাঙ্বে রে কপোল।।

এখানে ফুল কুমারী, ফুল কলি প্রতীক ও উপমা হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে কিন্তু উপমেয় ঘোমটার আড়ালেই রয়ে গেছে।

নদীর জল যেমন সাগরমুখী হয়ে সাগর জলে স্বচ্ছ হয়, তেমনি কবির কন্ঠে সুর সমন্বয় সঙ্গীত নানা উপমা নিয়ে ইসলামী স্রোত ধারায় মিশে তাঁর গানকে স্ফটিক স্বচ্ছ ও মূল্যবান করেছে। যেমন একটি গানে কবি বলেছেন,

মোর অন্তরেরই হেরাগুহায়

আজও তোমার ডাক শোনা যায়

জাগে আমার প্রেমের কাবাঘরে

তোমারি সুরত।।

কবি এখানে তাঁর অন্তরকে রূপকধর্মী উপমা রূপে হেরাগুহা ও কাবাঘরকে বেছে নিয়েছেন। নজরুলের হৃদয়ে কাবা পাকাপোক্ত ভাবে আসন করে নিয়ে ছিল বলে বারবার তাঁর কবিতা গানে বিভিন্ন রূপে কাবা এসেছে। তিনি গেয়েছেন ,

-বক্ষে আমার কাবার ছবি

চক্ষে মোহাম্মদ রসুল।

- কাবার জিয়ারতে তুমি কে যাও মদিনায়

আমার সালাম পৌঁছে দিও নবীজীর রওজায়।

-পঙ্গু আমি আরব সাগর লঙ্ঘি কেমন করে

তাই নিশি দিন কাবা যাওয়ার পথে থাকি পড়ে।।

-দূর আরবের স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশের কুটির হতে।

বেহোঁশ হয়ে চলছি যেন কেঁদে কেঁদে কাবার পথে

-উৎপীড়িতের লোনা আঁসু জলে ডুবে গেল কত কাবা

কত উজ তাতে ডুবে ম’ল হায় কত নুহ হল তাবা।

- আরব ছাপিয়া উঠিল আবার ব্যোম পথে দীন্ দীন্।

কাবার মিনারে আবার আসিল নবীন মুয়াজ্জিন।

-আজ কি আবার কা’বার পথে

ভিড় জমেছে প্রভাত হতে।

বিষয়ের গুরুত্ব বিবেচনা করে কবি উপমা ব্যবহার করে তার গানকে সুন্দর ও মূল্যবান করেছেন। যেমন তিনি মা আমেনার কোলের উপমা হিসাবে উষার কোলকে গ্রহণ করেছেন। একটি গজলে তিনি গেয়েছেন,

তোরা দেখে যা আমেনা মায়ের কোলে।

মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে।

যেন উষার কোলে রাঙা রবি দোলে।

মহানবীর আবির্ভাবে মরু প্রান্তরে যে আনন্দের বান বয়েছিল তা বর্ণনা করতে গিয়ে কবি প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের উপমা হাজির করেছেন তার গানে। যেমন-

লুু হাওয়া বাজায় সারেঙ্গী বীণ

খেজুর পাতার তারে

বালুর আবীর ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারে

স্বর্গে গগন পারে।

কবি কখন নবীর উপমা খুঁজেছেন রবির মাঝে। যেমনÑ

পুরাতন রবি উঠিল না আর

সেদিন লজ্জা পেয়ে

নবীন রবির আলোকে সেদিন

বিশ্ব উঠিল ছেয়ে।

আবার কখন কবি রসুলের উপমা করেছেন চাঁদের সনে। যেমন-

-নুরের দরিয়ায় সিনান করিয়া

কে এলো মক্কায় আমেনার কোলে

ফাগুন পুর্ণিমা- নিশীতে যেমন

আসমানের কোলে রাঙা চাঁদ দোলে।।

-তোরা দেখে যা আমেনা মায়ের কোলে।

মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে ।

যেন ঊষার কোলে রাঙা রবি দোলে।

হযরতের তিরোভাবে শোক বিহ্বল বিশ্ব প্রকৃতির বেদনা কাতর রূপ কবি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন উপমা হিসাবে মরুভূমির কান্নাকে ব্যবহার করে। যেমন,

আকাশে ললাট হানি কাঁদিতেছে মরুভূমি।

আকাশ সম্পৃক্ত আর একটি উপমা এসেছে কানন বালা দেবীর কন্ঠে গীত “আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ” নজরুলের বিখ্যাত গানে। কবি মেঘের উপমা দিয়েছেন পাহাড়ে সাথে। নজরুলের এ উপমাটি রয়েছে কোরআনে। কোরআনে শীতল মেঘমালাকে পাহাড়ের সাথে তুলনা করে এরশাদ হয়েছে: “ ওয়া ইউনাঝ্েঝলু মিনাস্ সামায়ে মিন জিবালেন ফিহা মিম্ বারাদিন - আর তিনি আকাশ থেকে উচু পাহাড় গুলোর সাহায্যে শিলা বর্ষণ করেন। (সুরা নূর, আয়াত -৪৩ )। ” এখানে আকাশ থেকে উচু পাহাড় বলতে মেঘমালাকে বুঝান হয়েছে।

কবি কোরআন থেকে আকাশে হেলান দিয়ে পাড় ঘুমাবার উপমা গ্রহণ করছেন কি না জানি না। তবে কোরআনের উপমার সাথে এ উপমার মিল দেখে বুঝতে বাকি থাকে না যে নজরুলের অন্তর তলে কোরআনের ভাবের ফল্গুধারা বয়েছিল। এ সব গান যে স্বর্গীয় ভাব দ্যোতক তাতে সন্দেহের কোন কারণ নেই।

কবি সূফী তত্ত্বের গভীর ভাব প্রকাশে ‘অম্বর’ ও ‘ফেেেদৗস’কে রূপক হিসাবে ব্যবহার করেছেন তাঁর গানে। যেমন-

Ñনামে যার এত মধূ ঝরে, তার রূপ কত মধূময়।

কোটি তারকার কীলক রূদ্ধ অম্বর দ্বার খুলে

মনে হয় তার স্বর্ণ -জ্যোতি দুলে ওঠে কুতুহলে।

Ñঘুম-নাহি আসা নিঝ্ঝুম নিশি- পবনের নিঃশ্বাসে

ফিরদৌস আলা হতে যেন লালা ফুলের সুরভি আসে।

কবি আল্ল¬াহর প্রেমে উদ্বেলিত হয়ে যে সব গান রচনা করেছেন তাতে রয়েছে প্রচুর উপমা। এ ধরনের একটি গান-

সকাল সাঝেঁ প্রভু সকল কাজে

বেজে উঠুক তোমারই নাম।

নিশীথ রাতের তারার মত

বেজে উঠুক তোমারই নাম॥

তরুর শাখার ফুলের সম বিকশিত হোক, প্রভু,

তব নাম নিরুপম,

সাগর মাঝে তরঙ্গ-সম

বহুক তোমারই নাম ॥

পাষাণ শিলায় গিরি- নির্ঝর সম

বহুক তোমারই নাম

আকুল সমুেদ্র ধ্রুবতারা সম

প্রভু জাগি রহুক তব নাম॥

শ্রাবণ দিনের বারি ধারার মত

ঝরুক ও নাম প্রভু অবিরত,

মানস- কমল- বনে মধুকর সম

লুটুক তোমারই নাম॥

এই একটি গানে রয়েছে সাতটি পূর্ণোপমা। নজরুলের সকল গানে উপমার এমন প্রাচুর্য নাই বটে তবে তার শতকরা পঁচানব্বইটি গানেই উপমা বিদ্যমান, যে কারণে নজরুলের গীতিকে বলা হয়ে থাকে পূর্ণোপমা- প্রধান গীতিকা।

দুঃসহ দারুণ দিনে কবির হৃদয় যে হাহাকার জাগে তা যেন মরু সাহারার প্রবল তাপে উত্তপ্ত। কবির এ উপমা খুবই ব্যঞ্জনা ময়।

Ñ দুর্দিনের এই দারুণ দিনে

শরণ নিলাম পানশালায়,

হায় সাহারার প্রখর তাপে

পরাণ কাঁপে দিল কাবাব।।

আবার এক অতুলনীয় কল্পনা বিলাসে কবি তার প্রিয়তমাকে সাজাতে আসমানের চাঁদ তারা রংধনু জেওরের উপমা রূপে গানে সাজিয়েছেন। যেমনÑ

মোর প্রিয়া হবে, এস রাণী, দেব খোঁপায় তারার ফুল।

কর্ণে দোলাব তৃতীয়া তিথির চৈতী চাঁদের ফুল।

জ্যোস্নার সাথে চন্দন দিয়ে মাখাব তোমার গায়,

রামধনু হতে লাল রং ছানি ’ আলতা পরাব পায়।

নজরুল তাঁর জৈব ভাবদ্যোতক পার্থিব ভালবাসার গানে রূপক উপমা এমন ভাবে গ্রহণ করছেন যা শ্রোতাকে মুহূর্তে স্বর্গে মর্তে বিচরণ করিয়ে আনে। যেমন:

‘এত জল ও কাজল চোখে পাষাণী আনলে বল কে’, ‘ চেয়ো না সুনয়না আর চেয়ো না এই নয়ন পানে’ ইত্যাদি গান। এ সব গান রূপক কামনা বাসনার রূপায়ণ মূলক রচনা হলেও এ সবের মধ্যে এমন সূক্ষ্মতা আছে যার আবেদন কাব্যভাবগ্রাহীর কাছেই শুধু অমূল্য সম্পদ রূপে ধরা দেয়। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে একটি গানের কিছু অংশ তুলে দেওয়া হল যেন তারা তাতে রূপক উপমার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন। এ উদ্ধৃতিতে শুধু কথার সৌন্দর্যই ধরতে পারা যাবে. সুরের সৌন্দর্য নয়, যেমনÑ

‘চেয়ো না সুনয়না আর চেয়ো না এই নয়ন পানে।

জানিতে নাইকো বাকি সই ও আঁখি কী যাদু জানে।

এঁকে ঐ চাউনি বাঁকা সুর্মা আঁকা তায় ডাগর আঁখি,

বাঁধতে তায় কেন সাধ, যে মেরেছে ঐ আঁখি বাণে?

কাননে হরিণ কাঁদে সলিল ফাঁদে ঝুরছে শফরি,

বাঁকায়ে ভূরুর ধনু ফুল অতনু- কুসুম শর হানে।’

এ গানটিতে এক প্রেমিকের প্রেমতপ্ত হৃদয়ের হতাশা মথিত কাতোরক্তি রূপক ও উপমার যাদুতে অনবদ্য ব্যঞ্জনা লাভ করেছে।

এ ভাবে নজরুলের হাজার হাজার গানে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য অনুপম উপমা। আমার মনে হয় উপমা প্রয়োগের ক্ষেত্রে নজরুল সব কবিকে পেছনে ফেলেছেন।