শরীফ আবদুল গোফরান
আবহ বাংলা ও বাঙালি ঐতিহ্যের শ্রেষ্ঠ রূপকার আমাদের প্রেরণার কবি আল মাহমুদ। তিনি বাংলা সাহিত্যেরও এক কালজয়ী কবি। ১৯৩৬ সালের জুলাই মাস। এ মাসের ১১ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন কবি আল মাহমুদ। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোয়াইলের মোল্লা বাড়িতে তার জন্ম। বাংলাভাষা ও সাহিত্যের জন্য আশীর্বাদ এই কবি হয়ে উঠলেন ভাষা সৈনিক ও একজন মুক্তিযোদ্ধা আল মাহমুদ। তিনি বৃটিশ পাকিস্তান ও বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ সাক্ষী আল মাহমুদ। স্বাধীন বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে ময়দানে নিজেকে সমান্তরালভাবে নিয়ে এসেছেন।
অপরাজেয় এই প্রবাদ পুরুষ ভাঙা সুটকেস বগলদাবা করে রাজধানীতে এসেছিলেন। তারপর তিনি সে সুটেকেস খুলে একের পর এক দেখিয়েছেন বাংলাদেশের নদনদী, খাল-বিল, পাহাড়-তারণ্য, খড়ের গাদা, নারী নিসর্গ, মক্তব্যের চুলখোলা আয়েশা আক্তার ও গাছের ডালের ফাঁকে ফাঁকে আটকে যাওয়া আঁধখানা চাঁদ। এক কথায় বলা যায়, সমগ্র বাংলাদেশ। ফলে গীতি কবি মতিউর রহমান মল্লিক বলেছেন, আল মাহমুদের ভাঙা সুটকেস আসলে তার ভেতরে ছিল আস্থা এক বাংলাদেশ। আল মাহমুদের সৃষ্টির পরিধি এত বিমাল ও ব্যাপক যে, তাকে একজন যুগস্রষ্টা হিসেবে চিহ্নিত করলেও অতিরঞ্জিত বলা হবে না।
সমকালীন বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে কবি আল মাহমুদের সমতুল্য আর কোনো কবি ছিল না। রবীন্দ্র, নজরুল, জসীম উদ্দীন, ফররুখ, জীবনানন্দের পর তার উত্তরকালে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছেন কবি আল মাহমুদ। কবি আল মাহমুদ যেমনি ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন তেমনি প্রতিহিংসারও শিকার হয়েছেন। বরং নিক্তিতে ওজন করলে প্রতিহিংসার দিকটাই ভারি হবে বেশি।
বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে দুলে এক সময় পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাসী হয়ে উঠলেন তিনি ঘোষণা দিয়েই। একজন কবির বিশ্বাস কি জানো? হ্যাঁ দর্শনই হলো একজন কবির বিশ্বাস। এ সবকিছুর প্রেরণা তিনি পান মা, মাটি আর মানুষের কাছ থেকে। সঙ্গত কারণে কবি আল মাহমুদ একজন সর্বাধিক আলোচিত কবি। প্রেরণার বাতিঘর।
বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী এই কবির জীবনে বৈচিত্র্য আছে। তিনি সবার চোখে আঙুল দিয়ে প্রমাণ করেছেন তার একটি মাত্র দর্শন এবং বিশ্বাস রয়েছে, তার নাম দেশপ্রেম। যাকে আমরা বলতে পাারি বাংলাদেশ। এই বিশ্বাসের ব্যাপারে ø মাহমুদ চুল পরিমাণ আপস করেননি। ইসলামের অনুসারী জীবনের গোধুলীলগ্নে উপনীত আল মাহমুদের প্রাণের ধর্মের নামই তো ইসলাম।
আল মাহমুদের ঘষায় তিনি বাংলা সাহিত্যের ফসলি জমিনকে অর্থের উর্বর করেছেন। তার মনে যেমন ভালোবাসা ছিল তেমনি তিনি নিজেও সারা জীবন মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন। এক কথায় ভালোবাসা তার পুরো জীবনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
বাংলা কবিতা যাদের হাত ধরে আধুনিকতায় পৌঁছেছে আল মাহমুদ তাদের অগ্রগামী।
এবার তা হলে অন্য প্রসঙ্গে আসি। কবি আল মাহমুদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ কোনটি? তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘লোক লোকান্তর’। এই কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯৬৩ সালে এরপর বের হয় ‘কালের কলস’ ও ‘সোনালি কাবিন’। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগন্থ হলো ‘মায়াবি পর্দা দুলে ওঠো’, দোয়েল ও দয়িতা, দ্বিতীয় ভাঙন, বখতিয়ারের ঘোড়া ও তোমার রক্তে আমার গল্পেসহ আরো অনেক।
কবি আল মাহমুদের রয়েছে নতুন এক গদ্যশৈরী। তিনি লিখেছেন, পানকৌড়ির রক্ত’র মতো গল্পগ্রন্থ ।তার কলমে বের হয়ে এসেছেÑ ‘উপমহাদেশ’ ও ‘কাবিলের বোন’ উপন্যাস। ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ জীবনী গ্রন্থটি যেন একটি নতুন ধারার উপন্যাস। এত সুন্দর জীবনীগ্রন্থ বিশ্ব সাহিত্যেরল।
আল মাহমুদের লেখা কিশোর কবিতার বই বাংলা সাহিত্যে দুর্লভ। কিশোর কবিতা দিয়ে শুরু করেছিলেন নজরুল। নজরুলের পর একমাত্র কবি আল মাহমুদ কিশোর কবিতায় এক বিপ্লবের ডামাঢোল বাজিয়ে দিলেন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আল মাহমুদের অনেক কবিতা পাঠ্য। তার কর্মজীবন কি দিয়ে শুরু হয়েছে বলতে পারো? হ্যাঁ, বলছি শোনা সাংবাদিকতা দিয়ে কবি আল মাহমুদের কর্মজীবন শুরু হয়েছে। তবে তিনি এক সময় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে কর্মরত ছিলেন। শিল্পকলা একাডেমীর পরিচালক হিসেবে নব্বইয়ের দশকে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। তবে তিনি মৃত্যুর পূর্বদিন পর্যন্ত লিখে গেছেন রকমারী লেখা। ভালোবাসা আর সৌন্দর্য পিয়াসী এই কবি স্বপ্নচারী মানুষের প্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকবেন চিরকাল। মানুষের ভালোবাসায় ধন্য এই বরেণ্য কবি এখন আর আমাদের মাঝে নেই। তিনি মৃত্যুর আগেই তো তার স্মৃতি ‘মেঘলা ভোরে’ কবিতায় লিখে যানÑ
‘কোনো এক ভোরবেলা রাত্রি শেষে
শুভ শুক্রবার মৃত্যুর মেয়েস্তা এসে যদি
দেয় যাওয়ার তাকিদ;
অপ্রস্তুত এলোমেলো ও গৃহের
আলো অন্ধকারে
ভালোমন্দ যা ঘটুক মেনে নেবো।
এ আমার ঈদ।’
তাইতো কাবিনবিহীন হাতে মহাকাল স্পর্শ করতে করতে চলে গেছেন তোমার আমার সবার প্রিয় কবি আল মাহমুদ।