ড. কামরুল হাসান
এবনে গোলাম সামাদ ছিলেন একজন বহুপ্রজ প্রতিভার অধিকারী। অর্থাৎ একের মধ্যে অনেক। প্রাযুক্তিক কিংবা বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষের এই আমলে সকল বিশেষজ্ঞই বিশেষ জ্ঞানে বিশেষায়িত। অর্থাৎ বিশেষ জ্ঞানকে খণ্ডিত এবং আরো খণ্ডিত অংশের উপরই সবার বিশেষজ্ঞতা অনেকাংশে নির্ভরশীল হয়েছে। অবশ্য এটি জ্ঞানের সৌন্দর্য বটে। তবে এবনে গোলাম সামাদ এই প্রচলিত ধারার বাইরের একজন বিশেষ ব্যক্তিত্ব। কোনো বিশেষায়িত একমাত্র জ্ঞানের গণ্ডিতে আবদ্ধ তিনি ছিলেন না। বরং তিনি একই সাথে অনেকগুলো বিষয়ে তার পাণ্ডিত্য ও বিশেষজ্ঞতা ছিল প্রোজ্জ্বল ও দীপ্তমান। এমনকি প্রত্যেকটি বিষয়েই তার জ্ঞানের প্রোজ্জ্বলতা একটি অন্যটির চেয়ে বেশি দীপ্তিময়। এটি যেন আমাদের সেই পূর্বসূরীদের আরেক অঞ্জলি। অর্থাৎ মুসলমানদের গৌরবের দিনে যারা জ্ঞান-বিজ্ঞানে অতি মাত্রায় পারদর্শি ছিলেন তারা কেবল ঐ একটি মাত্র শাখা নিয়েই ব্যাপৃত ছিলেন এমনটি নয়। যেমন ইবনে সিনা তার চিকিৎসা বিজ্ঞানের অনবদ্য উদ্ভাবনের জন্য খ্যাতিমান হলেও তিনি দর্শন, বিজ্ঞান, ধর্ম প্রভৃতি বিষয়েও তার ব্যুৎপত্তি ছিল চোখ ধাঁধিয়ে দেবার মতো। আর আল-কেমি যাকে রসায়ন শাস্ত্রের জনক বলা হয় তিনিও ধর্ম, দর্শন, সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়ে সর্বকালের কৃতি ব্যক্তিত্ব ছিলেন। একইভাবে প্লেটো, এরিস্টোটল, সক্রেটিস তারা নীতিশাস্ত্র বা দর্শন শাস্ত্রে খ্যাতিমান হলেও জ্ঞানের প্রায় সকল শাখায় তাদের বিচরণ ও কর্তৃত্ব ছিল বিস্ময়ের। এবনে গোলাম সামাদ তেমনি একজন জ্ঞানবান ও জ্ঞানরাজ এক মহান ব্যক্তিত্ব। একাধিক নয় অসংখ্য মহান গুণাবলি ও জ্ঞানের প্রায় সকল শাখাই ছিল তার আত্মস্থ। এ জন্যই আমরা তাকে বলতে চাই একজন বহুপ্রজ প্রতিভার অধিকারী এবনে গোলাম সামাদ।
এবনে গোলাম সামাদ ছিলেন একজন শেকড় সন্ধানী ঐতিহাসিক। তিনি ছিলেন ইতিহাসের পোকা। ইতিহাসের দুটো দিক থাকে। একটি প্রকাশ্য অন্যটি প্রচ্ছন্ন। ইতিহাসের বহির্ভাগ তথা প্রকাশ্য দিকের অনুধ্যান অত্যন্ত সহজ হলেও ইতিহাসের অন্তর্নিহিত তথা প্রচ্ছন্ন দিকটি খুবই ভয়াবহ ও জটিল ধরণের হয়ে থাকে। ধী-শক্তির গভীরতা ও উপলব্ধির প্রখরতা ব্যতীত কেউ ইতিহাসের অন্তর বিদীর্ণ করতে চাইলে তার বিপদাশঙ্কা ভয়াবহতর হতে জটিলতর হতে বাধ্য। এ জন্যই চাই ইতিহাসের প্রকৃত জ্ঞান, গভীর জ্ঞান এবং যথামাত্রার উপলব্ধি শক্তি। তাই মোহাবিষ্ট ও অনিরেপক্ষ ঐতিহাসিকদের যাতাকলে নিপিষ্ট হতে দেখা যায় ইতিহাসের সাধারণ পাঠক ও শিক্ষানবিশদের। এ নিয়ে চলে রকমারি রাজনীতির উলট-পালট খেলা।
এবনে গোলাম সামাদ ছিলেন একই সাথে ইতিহাস সচেতন ও রাজনীতি সচেতন। ইতিহাস ও রাজনীতির পথচলা যুগপৎ। তারা একে অন্যের সহগ ও সহোদর। রাজনীতিবিদরা খেলতে চান ইতিহাস নিয়ে আর ইতিহাসবিদরা শুধরাতে প্রয়াসী থাকেন রাজনীতিবিদদের। কেউ কারো স্পর্শের বাইরে যেতে পারে না।
ইতিহাসের সার্বিক বিষয়ে পর্যালোচনা শেষে বলা যায়- তিনি ইতিহাসের নির্মোহ পাঠক, নিরপেক্ষ অনুসন্ধানী ও নিখাঁদ গবেষক। তিনি ইতিহাসকে চর্চা করেছেন তার মৌল উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। প্রবেশ করেছেন তার অতলান্তে। তাতেই ধরা পড়েছে ইতিহাসের পেছনের ইতিহাস তার হাতে অতি সহজেই। প্রথমেই তিনি মনোনিবেশ করেছেন ইতিহাস ও তার আঙ্গিক নির্বাচনে, এরপর আত্মস্থ করেছেন ইতিহাসের গোড়ার বয়ান। এরপর অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হয়েছেন ইতিহাসের ফলাফল অন্বেষণে। এ কাজে তিনি ছিলেন নিরলস, নিরপেক্ষ ও একাট্টা। তিনি ইতিহাসের সবক নিয়েছেন তার মৌল উৎস ও আকর থেকে। ফলে তিনি পথভ্রান্ত হোননি কখনও। ইতিহাসের পাঠ ও উপলব্ধি থেকে অর্জিত সকল নির্যাস তিনি উপস্থাপন করেছেন দেশ ও জাতির কল্যাণ তরে। কারো দৃষ্টির বক্রতা বা বাক্যের তির্যকতা তাকে লাইনচ্যুত করতে পারেনি।
প্রফেসর এবনে গোলাম সামাদের উল্লেখযোগ্য একটি গ্রন্থ বাংলাদেশে ইসলাম। তিনি এ বইটি রচনা করেছেন এক স্বতন্ত্র চিন্তা থেকে, যে চিন্তা প্রায়শ আমাদের মধ্যে সক্রিয় ও সচল থাকে না। এ বইটির মূলথিম ছিল- বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের উদ্ভবের নেপথ্যে সক্রিয় চেতনা ছিল ইসলামের ধর্ম বিশ্বাস। এ ক্ষেত্রে তার যুক্তিও খুব প্রাসঙ্গিক ও অকাট্য। গোটা বইয়ের আলোচনায় তিনি স্পষ্টরূপে প্রমাণ করতে চেয়েছেন- বাংলাদেশে ইসলাম ধর্ম না থাকলে আর যাই হোক বর্তমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভব হতো না। কারণ বাঙালি হিন্দুরা কোনদিনই চাননি বাঙলা ভাষা ভিত্তিক একটি পৃথক জাতি-রাষ্ট্র গড়তে। কিন্তু বাংলাভাষী মুসলমানরা তা চেয়েছেন। গোটা বইতে তিনি এ বিষয়ে নানান যুক্তি, তথ্য, প্রমাণ ও দলিল সন্নিবেশন প্রচেষ্টা চালিয়েছেন নির্মোহ ঐতিহাসিক সত্যতায়। উক্ত বইতে তিনি উল্লেখ করেছেন-
অন্যদিক থেকে বলা যায়, ধর্ম কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় নয়- ধর্ম হলো জনমতের উৎস। ধর্ম একটা সামাজিক ঘটনা, কেবল ব্যক্তি মনের খামখেয়ালীপনার সৃষ্টি বলে তাকে চিহ্নিত করা যায় না। সমাজ জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার গভীর প্রয়োজন থেকেই উদ্ভব হয়েছে ধর্মের। ধর্মের সমাজতন্ত্র এখন একটা অতি শ্রদ্ধেয় আলোচ্য বিষয়। ধর্ম ও রাজনীতির সম্বন্ধটা তাই দূরের নয়, কাছের। ইতিহাসে দেখা যায় মানুষের ধর্ম বিশ্বাস তার রাষ্ট্র চেতনাকে নানাভাবেই নিয়ন্ত্রিত করছে। আধুনিক জাতীয়তাবাদের জন্মভূমি ইউরোপের ইতিহাসও এ থেকে মুক্ত নয়। ১৮৩০ সালে রাষ্ট্র হিসেবে বেলজিয়ামের আবির্ভাব হয় প্রধানত ধর্মীয় কারণেই।
এভাবেই পুরো বইটিকে তিনি সাজিয়েছেন এক বিশেষ আদলে। বাঙালি মুসলমানদের নৃ-পরিচয়, বাঙালি মুসলিম মানসের রূপরেখা ও রাষ্ট্র চেতনা, সমাজ জীবনে ইসলাম, বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে মুসলিম উপাদান ইত্যাদি সুচিক্রমে তিনি বাংলাভাষী ও বাংলাদেশী সমাজ বিনির্মাণের নেপথ্যের কারিগর হিসেবে ইসলামকে দেখিয়েছেন এবং তা যথামাত্রায় সঠিক বলে পাঠকমাত্রই ঠাহর করতে এবং ইতিহাসের বিভ্রান্তি থেকে মুক্তি পেতে সক্ষম হয়েছেন এবনে গোলাম সামাদের ক্ষুরধার যুক্তি ও তাথ্যিক অনবদ্য পরিবেশনায়।
এবনে গোলাম সামাদের ছাত্রজীবনের পাঠ ও কর্মজীবনের অধ্যাপনা উদ্ভিদবিদ্যা বিষয়ে হলেও তিনি তার পাঠের চৌহদ্দিকে সীমায়িত করেননি কখনও। জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তার দক্ষতা ছিল সুবিদিত। তার সমকালে এমন বোদ্ধা-পণ্ডিতের খোঁজ মেলা ভার। তবে নৃ-তাত্ত্বিক বিষয়ে নিবিষ্ট পাঠ ও গভীর অধ্যয়ন বাংলাভাষীকে দিয়েছে এক জগতের ঠিকানা। এ বিষয়ে সমৃদ্ধ পাঠ, ব্যাপক অধ্যয়ন, মনোযোগী গবেষণা সর্বোপরি এসবের সরল উপস্থাপনায় ঋদ্ধ হয়েছে বাংলা ভাষায় জ্ঞানের এ শাখা। এতদিন এ অঙ্গনে উৎস ও আকর গ্রন্থের যথেষ্ট দৈন্য ছিল। এবনে গোলাম সামাদের এ বিষয়ক প্রবন্ধ, নিবন্ধ, কলাম ও গ্রন্থাদি নৃ-বিজ্ঞানের মৌলিক ও আদি গ্রন্থ হিসেবে সর্বদা স্বীকার্য।
তিনি অর্ধশতেরও বেশি রাজনৈতিক কলাম লিখেছেন আন্তর্জাতিক বিষয়ে। আধুনিক বিশ্বের শক্তিমান দেশসমূহের রাজনীতি, কৌশল, দাম্ভিকতা, বিপর্যয়ের অশনি, দুর্বলদের করণীয়, প্রতিবেশি দেশসমূহের অন্তর্দ্বন্দ্ব, খামখেয়ালীপনা ইত্যাদি ইস্যুকে সামনে এনে মানব কল্যাণে রচিত তার সকল প্রবন্ধ-নিবন্ধ। মুসলিম নিধন, দুর্বলদের উপর অবলাদের খড়গ, মোড়লদের একচোখা নীতি, দুই বন্ধু প্রতিম দেশের মাঝে বিবাদ সৃষ্টি করা, মোফত ফায়দা হাসিল, স্থলপথ, জলপথ, আকাশপথকে অনিরাপদ করার কূটকৌশল ইত্যাকার বিষয়ে সুস্পষ্ট উচ্চারণ সন্বলিত বাঙালি লেখক কেবল তাকেই নজরে পড়ে। এত সমৃদ্ধ ও সম্ভ্রান্ত লেখা সমকালে আর কারো ঝুড়িতে দেখা যায় না। প্রচণ্ড সাহসী আর বিক্রমী লেখার জন্যই তিনি অনেকদিন বেঁচে থাকবেন- বাংলাদেশিদের হৃদয়ে, বিশ্ববাসীর চেতনায়। যাহোক আঞ্চলিক, আন্তর্জাতিক কিংবা দেশের নানান ইস্যুতে লিখিত ও রচিত প্রবন্ধ এবং নিবন্ধগুলো ছিল আলোক সঞ্চারী। জ্ঞানরাজ্যের নবদ্যুতি। প্রতিটি নিবন্ধের গন্তব্য ছিল লক্ষ্যাভিসারী। এ যেন জ্ঞান সম্রাজ্যের এক একটি ঝকঝকে নুড়ি।
দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে, প্রয়োজনে সকল প্রকার আত্মত্যাগের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে এ গ্রন্থের প্রতিটি পাঠ, বরং প্রতিটি শব্দ আমাদেরকে সচকিত করে আমি কী করছি? দেশ আমাকে কী দিয়েছে? তার প্রাপ্য কী? আমি কি মূর্চ্ছিত? আমার স্বজ্ঞা ফিরে পেয়ে, খামখেয়ালী মুক্ত হয়ে দেশের কল্যাণে, উন্নয়নে ও পরিবর্তনে সত্ত্বর মনোনিবেশ করতে হবে এখনই।
সমাজ বিনির্মাণের টান, দুনিয়াকে কল্যাণে ভরে দেবার মোহাবিষ্ট আহ্বান তার প্রতি সব শ্রেণী-পেশার মানুষের ভালোবাসার গোপন রহস্য এখানেই। কারণ তার কল্যাণ ভাবনা ছিল নিরপেক্ষ, তার সুস্থ বিনির্মাণ পরিকল্পনা ছিল নিষ্কণ্টক। তার সংস্কৃতির ভিত্তিভূমি ছিল নিখাঁদ, বিশ্বাসে টুইটুম্বর।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী বহুপ্রজ এবনে গোলাম সামাদ যুগ যুগ বেঁচে থাকবেন তার জ্ঞান সাধনার অনন্যতায়। তার বিদগ্ধ মননশীলতা অনন্তকাল টিকে থাকবে তার সৃষ্টির অনবদ্যতায়। প্রচার বিমুখ এবনে গোলাম সামাদ প্রোজ্জ্বল হয়ে উঠবেন দিনকে দিন তার বিকিরিত জ্ঞানের দীপ্ত শিখায়।
আমাদের এ আলোচনা কোনোভাবেই এবনে গোলাম সামাদকে প্রতিমূর্ত করতে পারবে না। কারণ সূর্যের ছায়া নির্মাণ প্রচেষ্টা যে অসম্ভবকে সম্ভব করারই ব্যর্থ প্রচেষ্টা। এবনে গোলাম সামাদের পূর্ণ চিত্রায়ন প্রচেষ্টা কেবল দুঃসাধ্য নয় এ রীতিমতো স্পর্ধাও বটে। তাই প্রফেসর এবনে গোলাম সামাদের সামগ্রিক উম্মোচন নয় বরং আমরা জ্ঞানের এ সাম্প্রতিক অধীশ্বরকে সাধুবাদ জানাই। তার চিন্তার পরিধির বিশালত্বে বিস্মিত হই। নিবেদন করি- জ্ঞানতাপস, শ্রদ্ধাবর এবনে গোলাম সামাদের জন্য অকৃত্রিম শ্রদ্ধার আন্তরিক অর্ঘ। ওপারের জীবনেও তিনি চির সুখের অধিকারী হউন সে প্রত্যাশা সর্বক্ষণের।
এবনে গোলাম সামাদের চিন্তা অমর হোক। তার দর্শনে পুলকিত হোক প্রাযুক্তিক এ বিশ্ব।