মোহাম্মদ নূরুল্লাহ্

এই উঠোন, পুকুর, পুকুরের পাকাঘাট, পুকুর খননের প্রারম্ভিক কালে ভৌতিক ডেক ওঠার গল্প, আরো কত কত স্মৃতি চোখের পাতায় ভাসে, মনের মুকুরে ঢেউ খেলে যায়। কতো চাঁদনি রাত, চোখ বেঁধে বৌছি বৌছি খেলা আর কত কী!

কত কিছু মনে পড়ে —

বাড়ির মধ্যখানের পুকুরে কাঠের চারতলা সিঁড়ি, পানির মধ্যে শরবতি থোকা থোকা।

যা আগে কখনো দেখিনি। টিনের চালের তিনদিক এল সাইজের বৃহৎ এ ঘরটিকে

মায়ায় জড়িয়ে ছিল একটি বড়ই গাছ।

পাকা পাকা কুল বড়ইয়ের কোনো এক সময়ে আব্বার হাতের আঙ্গুল ধরে যেদিন আমার প্রথম আগমন। সে দিনের সে সকাল, পাকা কুল বড়ই, ফুফুর আবেগ ও অভিযোগমিশ্রিত কথোপকথন আজও আমাকে নিয়ে যায় উনিশশো চুরাশি কিংবা পঁচাশির শিউলি ঝরা ভোরে।

যতটুকু মনে পড়ে, ফুফু আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন: ‘ এই ফুফুকে দেখতে কি তোর ইচ্ছে করে না!’

এই ছোট্ট বাক্যটিই একসময় মায়ার বাঁধনে আমাকে বেঁধে ফেলে। আমি যখন দাখিল ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি, মাহফুজ দা ও মওদুদ আমার সঙ্গে একই ক্লাসে ভর্তি হলো। আমি মাদরাসায় প্রথম শ্রেণি থেকে পড়ে এ পর্যন্ত আসায় আরবি বিষয়ে তাঁদের তুলনায় একটু পাকা ছিলাম। সে উছিলাকে কেন্দ্র করে একই টিউটরের কাছে তিনজনের পড়াশোনা। গণিত পড়াতেন শ্রদ্ধেয় রুস্তম স্যার। পরবর্তীতে আমার বড় মামার শ্বশুর তাই নানা বলে পরবর্তী সময়ে সম্বোধন করতাম।

এভাবে বারেক স্যার, ফজলুর রহমান হুজুর আমাদের পড়াতেন। রাতে পড়তে বসতে না বসতেই সর্ষে তেলমাখানো মুড়ি হাফেজদার খুব প্রিয় ছিল। এক সময় এ মজাদার খাবারটি আমাদেরও প্রিয় হয়ে উঠলো।

বৃহস্পতিবার এলে বিটিভির সাপ্তাহিক নাটক দেখার লোভে পড়াশোনার পার্টটি আগেই চুকিয়ে নিতে হতো। আজকের দিনের মতো সে সময়ে মোবাইল ফোন ছিল না। যা ছিল আদব-কায়দা শাসন-শ্রদ্ধা-স্নেহ, মায়ায় ঘেরা এক মায়াবী সমাজ। যা আমাকে নিয়ে যেতে চায় বারবার শৈশবের সেই আলো আঁধারি চাঁদনি রাতের বৃক্ষঘেরা ছায়াতলে।

নারকেল-সুপারির বাগান, পাশ দিয়ে বয়ে গেছে মরা এক খাল; বর্ষার কোনো এক ক্ষণে সে যৌবন ফিরে পেতো। খালের পাড় সংলগ্ন পাকা টসটসে পায়লার সঙ্গে প্রথম পরিচয়। কোনো এক রাতে ধরা পড়েছিল এক বাঘদাস।

সে অনেক কথা—

সরকারি পাতারহাট মডেল প্রাইমারী স্কুলেরমাঠে মরহুম আজিজ স্যারের রক্তলাল চক্ষুর অন্তরালে ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট আমাকে নিয়ে যায় সুখ সাগরে।

কোনো এক শীতের মৌসুমে ভাইভাই টুর্নামেন্টে মেজদা ও সেজদা চ্যাম্পিয়ন হলেন। সে যে কী আনন্দ! ভাষায় প্রকাশ করি কীভাবে!

সে সময়ের উত্তেজনা উন্মাদনা মনে পড়লে কেমন যেন নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়ি।

আজকাল ছেলেপেলেতো মাঠেই নামতে চায় না। কেবল ফোন, ইন্টারনেট, ল্যাপটপ,ট্যাব এসব নিয়ে ডুবে থাকে। আমাদের শৈশব ছিল বড়ই আনন্দের! সে আনন্দকে বহুমাত্রায় বাড়িয়ে দিয়েছে

প্রিয় মোল্লাবাড়ি।

আরসি কলেজের মাঠে হাফেজ দা, হাফিজ ভাই, মওদুদ দাদের ক্রিকেট খেলা।

হাফেজ দার বল করা আর ব্যাটিং নৈপুণ্য দেখে আমার কাছে মনে হতো এযে পাক ক্রিকেটার ওয়াসিম আকরাম। একথা দাদাকে কখনো বলা হয়নি। ফুফুর পানির কেতলি ব্যবহার করে ওজু করা, তাহাজ্জুদের জন্যে ফুফুর ঘুম থেকে জাগানো, ফুফুর জ্বীনের আসর। আরো কতো কী যে মনে পড়ছে আজ! ফুফু ছিলেন আমার শৈশব কৈশোরের একজন মেন্টর।

ফুফাজানকে সবাই রাশভারী মানুষ হিসেবে জানতো। অনার্স পাস করার পর আমাকে নিয়ে ফুফাজানের ভবিষ্যত বাণী অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেছে। ফুফাজানের অকৃত্রিম স্নেহ আমাকে মুগ্ধ করেছে। ফুফাজান বরিশাল যখন বাসা নিয়ে থাকতেন, বাসায় যাওয়ার জন্যে প্রায়ই বলতেন। পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় মাসে অন্তত দুই একবার যেতাম।

বাসা থেকে বিদায়বেলায় হাতের মুঠোয় জোর করে একটি নোট ধরিয়ে দিতেন। আমি নিবনা বলে কাচুমাচু করতাম। তাই এভাবে দেয়া। মুঠি খুলে দেখতাম লাল চকচকে একটি নোট। সে সময়ের সে নোটের বর্তমান অর্থমূল্য ছিল হাজার টাকার সমান।

তাঁর কাছে অনেক গল্প শুনেছি। তাঁরা আফা, শিউলি আফা, পাপিয়া আফা,পলি সব যেন এক বৃন্তের ফুলের মতো আমরা বেড়ে উঠেছি। তাঁরা আফার পাকা টমেটোসমেত ইলিশের দোপেঁয়াজোর স্বাদ আর কড়া ঘ্রাণ আজও জিহ্বা ও নাকের চারপাশে ঘোরে।

সেজ দা (মাসুদ দাদা), মেজদা, বড়দা সবাই যেন ছিল আমার পরমাত্মীয়। বাড়ির পশ্চিম দিকে ছিল এক সাঁকো। নিচে তেমন একটা পানি নেই তারপরও খালের উপর সেই সাঁকো পার হতে গিয়ে বুক ধরফর করে উঠতো।

দিন, মাস, বছর ঘুরে ঘুরে এক সময় এ পরিবারে যুক্ত হয় ওয়াহিদ ভাই। কী যে ভালো লোক ছিল! তা ভাষাতীত অবর্ণনীয়। নতুন মেহমান আসলো পাপিয়া আফার কোল জুড়ে।

মামা ডাকের স্বাদটি লুবনাই আমাকে প্রথম দিয়েছিল। খুবই আদরের ভাগ্নী ছিল। আমি বিএম কলেজ, বরিশালে ভর্তি হলাম, এবার তন্বীএসে ঘুরঘুর করে

পাশে মামা ডাকটিকে সমৃদ্ধ করলো। কনক , লামিশা এ দুজন আমাকে খুব বেশি না পেলেও ওদের শ্রদ্ধাবোধ আমাকে মুগ্ধ করতো প্রতিনিয়ত।

ওরা চার চারটি বোন আল্লাহর অফুরন্ত নেয়ামত। বরিশালে ওদের বাসায় মাঝে মধ্যে যাওয়া ছিল আমার রুটিন ওয়ার্ক।

আমার আব্বা আর মোল্লা বাড়ি-মিয়া বাড়ি যেন একাকার। সুখেদুঃখে বিপদে আপদে নিঃস্বার্থ এমন ভালোবাসা জগতে

দ্বিতীয়টি আছে বলে আমার মনে হয় না।

নাসির কাককু, শান্ত মামি, ফয়সাল দা, আলতাফ কাককু , নাজমা আপার বিয়ে সব যেন এক নস্টালজিয়া।