আ. শ. ম. বাবর আলী
কবি জসীম উদদীন পল্লীকবি অভিধায় খ্যাত হলেও মাটি ও মানুষের কবি হিসেবে তাঁর পরিচিতির পূর্ণতা। এদেশের শতকরা আশিজন মানুষ পল্লিবাসী। তাদেরই সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা আর শ্যামল ও সুষমামণ্ডিত পল্লির চিত্ররূপকে অনুষঙ্গ করে সৃষ্টি হয়েছে তাঁর কাব্যজগৎ। সেজন্যই তিনি পল্লিকবি।
জসীম উদ্দীনের জন্ম ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা নামে এক নিভৃত পল্লিতে। শৈশবে লালিত অনুরূপ পরিবেশেই। পল্লি মানসিকতা গঠনে এটা তাঁর অনুকূল সহায়ক হিসেবে কাজ করে। অবশ্য এটাই একমাত্র কারণ নয়। কারণ পল্লির শ্যামল কোলে জন্ম নিলেই যে তাঁর মধ্যে কাব্য প্রতিভার সৃষ্টি হবে অথবা তিনি যে পল্লি বিশ্লেষক কবি হবেন, এমন কোনো কথা নয়। আসল কথা তেমনি মানসিকতা। প্রয়োজন পল্লি প্রকৃতি, পল্লির মানুষ আর পল্লির সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহ, আকর্ষণ আর মমত্ববোধ। জসীম উদ্দীনের মধ্যে তা অকৃত্রিমভাবে ছিল বলেই তাঁর পক্ষে এধরনের কাব্য সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে। পল্লিকবির অভিধায় তিনি পরিচিতি হয়েছেন।
জসীম উদ্দীন আধুনিক যুগেরই মানুষ। আধুনিক শিক্ষাতেই শিক্ষিত। তিনি যখন সাহিত্যচর্চা শুরু করেন, তখন বাংলাসাহিত্য চরম আধুনিকতার শীর্ষে অবস্থান করছিল। গোটা সাহিত্য অঙ্গন রবীন্দ্র-নজরুল বলয়ে আবৃত। তখনকার কোনো সাহিত্যসাধকই সে বলয়ের প্রভাব থেকে নিজকে মুক্ত রাখতে পারেননি। অথচ জসীম উদ্দীন সে প্রভাব থেকে নিজকে মুক্ত রেখে চললেন অন্যপথে। সৃষ্টি করতে থাকলেন একটি নিজস্ব স্বতন্ত্র ভুবন। তাঁর এ সৃষ্টি প্রচণ্ডভাবে সমাদৃত হল এদেশের সর্বশ্রেণির পাঠকমহলে।
বাংলাদেশের গ্রামগুলো যেন দক্ষ শিল্পীর সৃষ্ট এক অনিন্দ্য সুন্দর রূপচিত্র। সুন্দরভাবে থরে থরে সাজানো ঘরবাড়ি, মাঠ-জঙ্গল। তারমধ্যেই আমাদের বসবাস। সে গ্রামের চিত্রবর্ণনা রূপকাহিনির মত উঠে এসেছে জসীম উদ্দীনের কবিতায়। তাঁর একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় কাহিনিকাব্য ‘নকশী কাঁথার মাঠ’-এ সে বর্ণনা তিনি দিয়েছেন এভাবেÑ
‘এই এক গাঁও ওই এক গাঁওÑ মধ্যে ধু ধু মাঠ,
ধান কাউনের লিখন লিখি করছে নিতুই পাঠ।
এ গাঁও যেন ফাঁক ফাঁকা হেথায় হোথায় গাছ,
গেঁয়ো চাষীর ঘরগুল সব দাঁড়ায় তারি পাছ।
ও-গাঁয় যে জমাট বেঁধে বনের কাজল কায়া,
ঘরগুলিরে জড়িয়ে ধরে বাড়ায় ঘরের মায়া।’
ধর্মীয় অনুভূতি পল্লির জনগণের অন্যতম কৃষ্টির পরিচায়ক। শহরবাসীর চেয়ে তাঁরাই এ কৃষ্টিকে তুলনামূলকভাবে একটু গভীর অনুভূতিতেই লালন করে। শুভকাজে যাত্রায় অথবা বিপদ-আপদে তারা ধর্মীয় অনুশাসনে নির্ভরশীল হয়। যেমন, ‘সকিনা’ কবিতায়Ñ
‘খোদার নিকট পঞ্চ রেকাত নামাজ আদায় করি,
সাতবার সে যে মনে মনে নিল দরুদ সালাম পড়ি।
এমনি ধরনের ধর্মীয় কৃষ্টি আর ঐতিহ্যের চিত্রণ আছে তাঁর জীবনধর্মী সকল কবিতাতেই।
কবি জসীম উদদীনের সবচেয়ে বিখ্যাত দুটি কাহিনিকাব্য ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ ও ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’। পল্লি জীবনকাহিনিভিত্তিক এ কাব্য দুটি কবিকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে তোলে। মূলত কবির গোটা জীবনের যে বৈশিষ্ট্য, স্বাতন্ত্র্য রূপময়, তা এই দুটি গ্রন্থে বিদ্যমান। বলা যেতে পারে, তাঁর গোটা কাব্যমানসিকতার সন্নিবেশ ঘটেছে এই গ্রন্থ দুটিতে। অর্থাৎ পল্লির মাটির সাথে তাঁর সম্পৃক্ততা, এদেশের মানুষের সাথে তাঁর হৃদ্যতা, জাতীয় ঐতিহ্যের বিশ্লেষণ, পল্লিপ্রকৃতিতে তাঁর নিমগ্নতাÑ এক কথায় গোটা পল্লি জীবনযাত্রার স্বরূপ বিধৃত হয়েছে এ গ্রন্থ দুটিতে।
পল্লির পটভূমিতে রচিত দুটি গ্রাম্য ছেলেমেয়ে রূপাই আর সাজুর প্রেমকাহিনি ‘নকশী কঁথার মাঠ’-এর বিষয়বস্তু। পাশাপাশি দুটি গ্রামের মানুষের মধ্যে বৈরি সম্পর্ক দুটি ছেলেমেয়ের প্রেমকে কেন্দ্র করে দুটি গ্রামের মানুষদের মধ্যে কানাকানি, সংস্কারাক্রান্ত অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়া, ঘটকের ভূমিকা, সামাজিক প্রতিবন্ধকতাÑ এসবই তো আমাদের পল্লিজীবনের নৈমিত্তিক রূপ।
এসব অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ও বাস্তবভাবে আশ্রিত হয়েছে এ কাব্যে। তারসাথে প্রতিটি দৃশ্যে আছে পল্লিপ্রকৃতির রূপ বর্ণনা।
অশিক্ষিতা পল্লিবালা সাজুর প্রতি গ্রামের সহজ-সরল ছেলে রূপাই-এর প্রথম প্রেমানুভব ঘটেছে এমনিভাবেÑ
‘বাঁশ কাটিতে যেয়ে রূপাই মারলো গাছে দা,
তল দিয়ে যায় কাদের মেয়ে হলদে পাখির ছা!’
মুগ্ধতা থাকলেও কোনো অশ্লীলতা নেই রূপাইয়ের অনুভূতিতে; বরং আছে এক নিষ্পাপ প্রাপ্তির আকাক্সক্ষা, যা নাগরিক আচরণ থেকে স্বতন্ত্র। সেই অনুভূতির প্রকাশ ঘটিয়ে যথার্থ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন কবি জসীম উদ্দীন।
দুটি ছেলেমেয়ের ভালোবাসায় কানাকানির অভাব নেই গাঁয়ে। তাদের কাছে এটা যেন এক মজাদার উপাদান। রূপাই আর সাজুর প্রেমের ঘটনাকে নিয়ে একজন গ্রাম্য মহিলা রূপাইয়ের মায়ের কাছে কাছে এসে মজা করে বলেÑ
‘ওই গাঁয়ের এক ডাগর ছুঁড়ি নামটি যে তার সাজু,
তারে নাকি তোর ছেলে গইড়া দিছে বাজু?
ঢাকাই শাড়ি কিন্যা দিছে নথনি দিছে নাকি,
এত করে এখন কেন সাদীর রাখিস বাকি?’
রূপার মা কয়Ñ ‘রূপাই আমার একরত্তি ছেলে,
আজিও তার মুখ শুকিলে দুধের ঘিরান মেলে।
এমন ছেলের নামে যেজন রটায় গাঁয়ে গাঁয়ে,
সে যেন বেটার আস্ত মাথা চিবায় বাড়ি যেয়ে।’
এমন ধরনের সামাজিক চিত্র আমাদের কাছে অতি পরিচিত। কী সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন কবি আমাদের সম্মুখে! এ কাব্যগ্রন্থটি সম্পর্কে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘....এই লেখার মধ্যদিয়ে বাংলার পল্লিজীবন আমাদের কাছে চমৎকার একটি মাধুর্যময় ছবির মত দেখা দিয়েছে।’
সোজন আর দুলীর অসম প্রেমকাহিনি ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’। পল্লি অঞ্চলের হিন্দু-মুসলমান চাষি সমাজের এক নিখুঁত দলিল। ‘নকশী কাঁথার মাঠ’-এর মত এ কাব্যকাহিনিটিও পল্লিচিত্রে ভরপুর। ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ কাব্যে চিত্রিত হয়েছে জমি নিয়ে গ্রাম্য চাষিদের মধ্যে দাঙ্গা ও জোতদার মহাজনের সামাজিক শোষণের বর্ণনা। ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ কাব্যের চিত্রকল্প অনেকটা অনুরূপ হলেও তার বিন্যাস আরও গভীরতর। পল্লির কিশোর-কিশোরীর প্রেমানুভূতি উভয় গ্রন্থের মূল উপজীব্য। তবে পল্লিপ্রকৃতি, পল্লির মানব-মানবীর আচার-আচরণ, অনুভূতির প্রকাশ, লৌকিক ঐতিহ্য ও লোক সংস্কার, লোকবিশ্বাস, লোকসংস্কৃতিÑ এক কথায় গোটা পল্লির অবয়বের মসৃণ দর্পণ বলা যেতে পারে গ্রন্থ দুটিকে। বলা যেতে পারে, কবি জসীম উদ্দীনের মানবিক চরিত্র, মানসিকতা আর কৃতিত্বের পরিচিতি ঘটেছে এখানে। পল্লিকবি হিসেবে জসীম উদ্দীনের যে কৃতিত্ব ও ব্যক্তিগত স্বতন্ত্রতা, তা তাঁর সব কবিতাতেই আছে। আর আছে বলেই এ ক্ষেত্রে তিনি অনন্য ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
পল্লির সার্বিক চিত্রায়ণে কবি জসীম উদ্দীন এমন একজন দক্ষ কারিগর, মনে হয় তিনি নিজেই ওই সমাজের একজন সব্যসাচী প্রতিনিধি। বাংলাসাহিত্যে শুধু নয়, বিশ্বসাহিত্যেও এ কৃতিত্ব আর কারও নেই। বিশ্বের বিভিন্ন সাহিত্যে লোকসাহিত্য, তথা পল্লিসাহিত্যের ওপর অনেক চর্চ-গবেষণা হয়েছে বটে, কিন্তু পল্লিচিত্র বিশ্লেষণে একমাত্র জসীম উদ্দীন ছাড়া এমন দক্ষতা আর কেউ দেখাতে পারেননি। এ আনন্দময় গর্ব বাঙালি হিসেবে আমাদের তো বটেই।
এটা নিঃসন্দেহ যে, কবি জসীম উদ্দীন সুদক্ষ কাব্যশক্তির অধিকারী ছিলেন। ইচ্ছা করলে তখনকার অনেকেরই মত তিনিও রবীন্দ্র-নজরুলের অনুসারী হয়ে আধুনিক কাব্যক্ষেত্রে অনেক কৃতিত্ব অর্জন করতে পারতেন। কিন্তু সে পথে না যেয়ে গেলেন তিনি এক ভিন্নপথে। পল্লিপ্রকৃতির প্রতি মুগ্ধতা, পল্লিমানুষের প্রতি ভালোবাসা, পল্লির কৃষ্টি আর ঐতিহ্যের প্রতি অনুরক্ততাÑ এসব কিছুই তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল এ পথে যাত্রা দিতে। আর এ ব্যাপারে তাঁর অকৃত্রিম আন্তরিকতা আর সাধনা ছিল বলেই এক্ষেত্রে তিনি পুরোপুরি সার্থক।
পল্লিকবি জসীম উদ্দীনের কাব্যের উপাদান সম্পর্কে সাহিত্যগবেষক সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘জসীম উদ্দীনের কাব্যের বিষয় প্রায় বরাবরই পল্লি থেকেই সংগ্রহ করেছেন।
পল্লিবাংলার সরস শ্যামল প্রকৃতি ও পল্লির নরনারীর জীবনের আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ, মিলন-বিরহের চিরন্তন গাঁথা তাঁর কবি-কল্পনাকে উদ্দীপিত করেছে। ....ব্যাপকভাবে কাজে লাগিয়েছেন পল্লি গীতিগাঁথা, ছড়া-প্রবাদ, কিংবদন্তীর অজস্র সম্পর্কে।’
তাঁর গ্রামীণ কবিতার বৈশিষ্ট্যকে উল্লেখ করে ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, ‘গ্রাম্য জীবন ও গ্রামীণ সংস্কৃতির অযত্নরক্ষিত অনুজ্জ্বল উপকরণ জসীম উদ্দীনের কবিতায় দ্যুতিমণ্ডিত অলংকারে রূপান্তর লাভ করেছে। এই রূপান্তর এতই বৈপ্লবিক যে, একে জন্মান্তর বললেও অত্যুক্তি হয় না।’
জসীম উদ্দীনের পল্লিকাব্য প্রতিভার উৎস সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন, ‘অতি সহজে যাদের লিখবার ক্ষমতা যাদের নেই, এমনতর খাঁটি জিনিস তারা কখনোই লিখতে পারে না।’
সত্যিই তো। মাটি আর মানুষের সাথে সম্পর্কযুক্ত, লৌকিক আচার-আচরণ আর কৃষ্টি সম্পৃক্ত সহজ-সরল মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের চিত্রকল্প সংযুক্ত পল্লিচিত্রের বিশ্লেষণ বর্ণনার চেয়ে খাঁটি জিনিস আর কী হতে পারে?
তাইতো আশা নিয়ে বিশ্বকবি বলেছিলেন,
‘..... যেজন রহিবে মাটির কাছাকাছি,
সে কবির লাগি আমি কান পেতে আছি।’
পল্লিকবি ‘মাটির কাছাকাছি’ কবি, নদীবিধৌত শ্যামল-সবুজ প্রকৃতির কবি। গ্রামীণ সহজ সরল মানুষের সুখ-দুঃখের কবি, সামগ্রিক কথায় বাংলার লোক ঐতিহ্যের কবি জসীম উদ্দীন বিশ্বকবির সে আশাকে পূরণে অনেকখানি সক্ষম হয়েছিলেন বললে অত্যুক্তি হবে না।