আহসান হাবিব বুলবুল

শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ম্যাগাজিন ‘ঝরোকা’ জুলাই অভ্যুত্থান : ১০০ কবির ১০০ কবিতা সংখ্যা’ ২০২৫ প্রকাশিত হয়েছে। ঝরোকা পড়তে পড়তে সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে গাওয়া সেই সাড়াজাগানো গানÑ ‘সব ক’টা জানালা খুলে দাও না’ ... কানে বাজতে লাগলো। বেশ কাকতালীয় বা সময়ের দাবি যাই বলুন না কেন, কিছু সময়ের জন্য হলেও পাঠককে ভাবায়।

আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন বলেছেন, ‘স্বাধীনতার মধ্যে এক ধরনের উৎসাহ উদ্দীপনা থাকে যা মানব প্রকৃতিকে সাহসিকতা ও বীরত্বের কাজে নিজের থেকে উপরে তুলে ধরে।’

বাক্যটির বাস্তব প্রতিফলন আমরা লক্ষ্য করি জুলাই বিপ্লবে। দেড় যুগের স্বৈরশাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতে মানুষ ভেবেই নিয়েছিল, এই রাত বুঝি আর পোহাবার নয়। কথায় আছে, রাত যত গভীর হয় ভোর তত নিকটে আসে। অত্যাচারীর খড়গ কৃপানের নিচেই ক্রমশ উদিত হচ্ছিল নতুন এক বিজয়ের সূর্য। কিন্তু আমরা কেউ তা বুঝতে পারিনি। আকাশের সিঁড়ি ভেঙে নেমে আসে এ যুগের আবাবিলÑ ‘জেনারেশন জি’। আবু সাঈদ বুক টান করে আঠারোর স্পর্ধা দেখায়। রক্ত ঝরে সবুজ ঘাসে। কিশোর যুবক যুবতী ছাত্র-জনতা মাঠে নামে। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয় রাজপথ : ‘বল বীর বল চির উন্নত মম শীর।’ আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা আশায় নিরাশার প্রহর গোনে, ‘রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরী।’

অবশেষে জুলাই-আগস্টের ৩৬ দিনের অবিস্মরণীয় এক গণজাগরণ ঘোষণা করলো জনতার জয়। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে ছাত্র-জনতার প্রবল প্রতিরোধ যেভাবে পাকিস্তানী অপশাসনের অবসান ঘটিয়েছিল, ঠিক তেমনি ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের আন্দোলনও ঘোষণা করলো বিজয়। স্বৈরাচারের পতনের মুহূর্তটিতে উচ্ছ্বাস তৈরি করলো অসাধারণ সব মুহূর্ত। ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলনে সাধারণ মানুষের মধ্য থেকেই জন্ম নিল অসাধারণ সব বীর। রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে তারা এই ম্যাসেজ দিল যে, জান দেব, তবু আজাদী দেব না। আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধ, ওয়াসিম আকরাম, ফারহান, ফাইয়াজ, রুদ্রসেন, দীপ্ত দেসহ অজস্র বীর যেন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বের স্মৃতিক আবার ফিরিয়ে আনলো। স্বৈরাচারের বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়ে তারা রচনা করলো ইতিহাস। দেয়ালে গাছে সড়কে গ্রাফিতির ভাষায় রচিত হলো মহাকাব্য। যার মূল সুর ছিল, সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতা ও ন্যায় বিচার।

ফ্যাসিস্ট হাসিনা শেখ এর সতেরো বছরের শাসনামলে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধকে পুঁজি করে তৈরি করা হয়েছিল একপক্ষীয় বয়ান। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে ইসলামী মূল্যবোধকে খাটো করার দুঃসাহস দেখিয়েছিল তারা। ফ্যাসিবাদ বিরোধী যেকোনো উদ্যোগকে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার বিরোধিতার তকমা দিয়ে চালানো হতো নির্যাতন। জুলাই বিপ্লব সেই বয়ান থেকে বের করে এনেছে বাংলাদেশকে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান মুক্তিযুদ্ধের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার তথা নতুন রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার প্রেরণা জাগিয়েছে। যেকোন মূল্যে এই প্রেরণাকে আমাদের ধরে রাখতে হবে।

ঝরোকায় স্থান পাওয়া কবিতাগুলো পরতে পরতে এসব অভিব্যক্তি-প্রত্যাশাই প্রতিধ্বনিত হয়েছে বার বার।

কবি সাজজাদ হোসেন খান লিখেছেন,

সামনে কেবল অন্ধকার

বন্ধদ্বার

আসছে তুফান বারংবার।

আকাশ ঘিরে ঝঞ্ঝাঝড়

কড়াৎকড়

ভাঙছে হৃদয় মড়াৎমড়।

প্রভাত প্রভাত প্রভাত চাই,

নইলে শায়ক শানাও ভাই।

কবি হাসান আলিম লিখেছেন,

সাহসের আগুন জ¦ালিয়ে রাখতে হবে

শিখা অনির্বান জ¦লতে হবে সারাক্ষণ।

কবি সোলায়মান আহসান লিখেছেন,

কতটা জল ঝরে গেলে বলবে ভেজা চোখ

কতটা খুন ঝরে গেলে হবো ইতিহাস।

কবি মোশাররফ হোসেন খান লেখেন,

শব্দ স্পর্শ করলেই লিফলেট হয়ে যায়

শব্দ স্পর্শ করলেই চব্বিশের ছত্রিশে জুলাই হয়ে যায়

শব্দ স্পর্শ করলেই কবিতা হয়ে যায়

অনিবার্য বিপ্লবের মুখপাত্র ...।

কবি শরীফ আবদুল গোফরান লেখেন,

বন্দুকের কার্তুজের ঘষায় চমকে ওঠা আলোতে

জানালার ফাঁক দিয়ে চেয়ে দেখি

বোবা পাথরের চোখে পানি ...

কবি রেদওয়ানুল হক লেখেন,

দ্বিধা আর সংকোচ ভাঙো আজ ভাঙো!

ভাঙো বেরিকেড

যত ভেরি বেড!

ভাঙো ভাঙো জুলুমের সব তাজ ভাঙো।

কবি শাহীন সৈকত লেখেন,

‘বুকের ভেতর দারুণ ঝড়, বুক পেতেছি গুলী কর’

বাংলা মায়ের দামাল ছেলে সব পেতেছে বুক

এসব দেখে জালিমশাহী কাঁপছে যে ধুকধুক।

যেকোনো আন্দোলন-সংগ্রাম-বিপ্লবে সাহিত্য হলো উজ্জীবনী শক্তি। কবিতা হয় তখন প্রতিবাদের ভাষা, সাহসের দীপ্ত আবাহন। সেদিক থেকে ঝরোকা’র এ প্রয়াস সফল হয়েছে বলতে হয়। ঝরোকা’র এ সংখ্যাটি জুলাই বিপ্লবের আর্কাইভ(অৎপযরাব) বললেও অত্যুক্তি হবে না।

কবি ওয়াহিদ আল হাসান সম্পাদিত ঝরোকা জুলাই বিপ্লব সংখ্যাটি গেটআপ মেকআপ খুব চমৎকার হয়েছে। প্রবীনদের পাশাপাশি একঝাঁক তরুণ কবির কবিতা সংখ্যাটিকে সমৃদ্ধ করেছে। প্রচ্ছন এঁকেছেন আফসার নিজাম। প্রচ্ছদে শহীদ আবু সাঈদ এর বুক টান করা গর্বের সেই ছবিটি এই সংখ্যায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বর্ণাঢ্য এই সংখ্যাটি সংগ্রহে রাখার মতো।

ঝরোকার আগামী দিনগুলো আরো সুন্দর হোকÑ এই কামনাই করছি।