সোনিয়া হুসাইন
গবেষক, ইতিহাসনিষ্ঠ লেখক হিসেবে পরিচিত আহমদ মতিউর রহমানের সাহিত্যচর্চা বহুমাত্রিক। শিশু সাহিত্য ও কবিতা দিয়ে সাহিত্য জগতে তাঁর পদচারণা শুর হলেও এরপর থেকে তিনি বিভিন্ন বিষয় ভিত্তিক লেখালেখি, বিশেষ করে সাহিত্য সমালোচনামূলক প্রবন্ধ নিবন্ধ গ্রন্থ, ইতিহাসঘনিষ্ট বই এবং বিশ্বসাহিত্য নিয়ে ক্রমাগভাবে কাজ করে আসছেন। কয়েকটি উপন্যাস ও বেশ কিছু ছোট গল্পও লিখেছেন। তার সবচেয়ে উজ্জ্বল পদচারণা শিশুসাহিত্য ও ছড়া সাহিত্যের অঙ্গনে। বেশ কিছু বই তিনি অনুবাদও করেছেন। ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁক এবং চলচ্চিত্র সংগীতসহ সংস্কৃতির বিভিন্ন বিষয়েও তার লেখনি অসামান্য ।
তিনি স্ত্তুর দশকের একজিন মেধাবী ছড়াকার। ছড়া ও শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য সম্প্রতি তিনি পেয়েছেন ‘ছোটদের সময় শিশুসাহিত্য পুরস্কার ২০২৫’। স্ত্তুর দশক থেকে সক্রিয় এই আহমদ মতিউরের লেখনীতে জীবন, প্রকৃতি, প্রেম, মানবতা, প্রতিবাদ ধরা দিয়েছে। তিনি সত্যি প্রকাশে আপোসহীন থেকেছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী চেতনা, সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন এবং শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙক্ষা রয়েছে তার লেখায়।
আহমদ মতিউর রহমান একজন নিবিষ্ট প্রাবন্ধিক ও ইতিহাস গবেষকও । ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁক, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব নিয়ে তিনি যেমন বই লিখেছেন তেমনি ঐতিহাসিক ঘটনাবলী নিয়ে তাঁর গবেষণা ও লেখালেখি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বিজ্ঞানমনস্ক লেখক হিসেবেও কয়েকটি গ্রন্থে তার প্রমাণ রেখেছেন। তার প্রথম কবিতার বই ‘সাংকেতিক চিহ্নগুলো’, এটি প্রকাশিত হয় আশির দশকে। তিনি আশির দশকের অন্যতম কবি।
মতিউরের রচিত ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘সিরাজউদ্দৌলার পতনের কারণ : বাংলার ২০০ বছর’। এই বইতে তিনি নবাব সিরাজকে নতুনভাবে মূল্যায়নের চেষ্টা করেছেন। বইতে সিরাজের পতনের কারণগুলো ব্যাখ্যা করা হয়েছে আর তার জীবন কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে, করা হয়েছে নতুন করে বিশ্লেষণ। এখানে মীর মদন বা মীর মর্দান, মোহনলালসহ সিরাজের অনুগত বাহিনির সদস্যদের উজ্জলভাবে তুলে আনা হয়েছে। মীর মর্দান, মোহনলাল, খাজা আব্দুল হাদী খান, নব সিং হাজারী প্রমুখের অধীনে নবাবের সেনারা বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ চালায়। রয়েছে সে কথা। অন্যদিকে মীরজাফর, ইয়ার লতিফ এবং রায় দুর্লভ এর অধীনে নবাবের প্রায় ৪৫ হাজার সেনা নিষ্ক্রিয়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে ও পরিস্থিতি অবলোকন করে সিরাজকে পরাজয়ের দিকে ঠেলে দেয়, তার বিবরণও আছে।
আহমদ মতিউর ইতিহাস গবেষণামূলক আরো বই লিখেছেন: তার মধ্যে আছে ‘মোগল সাম্রাজ্যের ইতিহাস : হেরেমের অন্তরালের কথা’। এই গ্রন্থে মোগল নারীদের কথা তুলে ধরে ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে তারা অসাধ্য সাধন করেছেন তা উঠে এসেছে। তাজমহল নির্মাণে বাদশাহ শাহজাহান কন্যা জাহানারা কি ভূমিকা রাখেন সে কথাও উঠে এসেছে। তিনি ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী শাহজাদী। ১৬৩১ সালে মা মমতাজ মহলের অকাল মৃত্যুর পর, ১৭ বছর বয়সী জাহানারাকে রাজকীয় সীলমোহরের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং মুঘল সাম্রাজ্যের পাদশাহ বেগম (প্রথম মহিলা) উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এই বইতে মোগল মহলের কয়েকজন নারীর জীবন কাহিনি ও সাফল্যের বিবরণ দেয়া হয়েছে।
তার আরেকটি ইতিহাসমূলক বই ‘স্বাধীনতার ৫০ বছর : নারিকেলবাড়িয়া থেকে বাংলাদেশ। ’ স্বাধীনতার ৫০তম বছরে প্রকাশিত এই বইতে আহমদ মতিউর দেখিয়েছেন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বিষয়টি কিভাবে ধাপে ধাপে অগ্রসর হলো, স্বাধীনতা কিভাবে অর্জিত হলো। আর পেছনের সত্যিগুলো। তিতুমীরের বীরত্বের কাহিনি বর্ণিত, তেমনি তার যে স্বপ্ন ছিল বাংলা আবার এক দিন স্বাধীন হবে তারই প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় এই বইতে। এই গ্রন্থগুলিতে তিনি প্রচলিত ইতিহাসের বাইরে গিয়ে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাবলী ও ব্যক্তিত্বকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন।
তার আরো দুটি গবেষণা গ্রন্থ হচ্ছে ‘মহাবিশ্বের বিশ্বয় : সৃষ্টির অপার রহস্য’ এবং ‘জীব বৈচিত্র্যের আধার : বিশ্ব ঐতিহ্যের সুন্দরবন’। প্রথম বইটিতে মহাবিশ্বের কাহিনি, ইতিহাস, সৃষ্টি রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করেছেন। দ্বিতীয় বইতে উঠে এসছে সুন্দরবনের ইতিহাস ও জীব বৈচিত্র্য।
সমসায়িক ঘটনাবলী বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানের পর তিনি তিনটি বই লিখেছেন । বইগুলো হচ্ছে ১. ‘ছাত্র জনতার অভ্যুত্থান ২০২৪’ ২ ‘দেশ কাঁপানো ২৩ দিন’ ৩. ‘আামি বিজয় দেখেছি ৩৬ জুলাই। এসব বইয়ে উঠে এসেছে বিগত স্বৈারচারী আমলের কথা, থারাবাহিক আন্দোলন ও শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারের পতন কিভাবে হলো, ছাত্র জনতার বিজয় কি করে হলো সেই সব দিনের সংগ্রামমুখর সময়কালের আনুপুংক্ষ বিবরণ। এগুলোও ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠছে। ফলে এসব বইয়েরও ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে। আহমদ মতিউর রহমান চলচ্চিত্রের ইতিহাস নিয়েও কাজ করেছেন- লিখেছেন ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস ও উপমহাদশের চলচ্চিত্রের ১০০ বছর’। বইটি সেরাজউদ্দীন সরকার সাহিত্য পুরস্কার ২০২২ লাভ করেছে।
বাংলা সাহিত্য অঙ্গনের খ্যাতিমান সাহিত্যিক গবেষকদের উপর কাজ করেছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও সাময়কিতে প্রবন্ধ নিবন্ধ লিখেছেন। তিনি দীর্ঘ দিন ধরে বিশ্ব সাহিত্য অঙ্গন নিয়ে নিয়মিত বিভিন্ন সাময়িকী ও পত্রিকায় লিখে চলেছেন। বিশ্ব সাহিত্যের হালচাল ও গতি প্রকৃতি উঠে এসছে এসব লেখায়। তিনি মার্কিন লেখিকা জিলিয়ান লরেনের একটি বই অনুবাদ করেছেন। জিলিয়ানের সাম গার্লস : মাই লাইফ এন এ হারেম বইটি বইটি একটি পুরস্কারেও ভূষিত হয়। আরো অনুবাদ করেছেন মার্কিন লেখিকা জেনিফার শ্যাননের একটি মোটিভেশনাল বুক ‘ডোন্ট ফিড দি মাংকি মাইন্ড’। আরো অনুবাদ করেছেন জর্জ অরওয়েলের এনিমেল ফার্ম।
জীবনী সিরিজের বইয়ের মধ্যে রয়েছে শেরে বাংলা একে ফজলুল হক , হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, পল্লীকবি জসীম উদ্দীন, পাঁচ ভাষা শহিদের জীবন কথা, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মহিয়সী বেগম রোকেয়া, বিজ্ঞানী নিউটন, বিজ্ঞানী আইনস্টাইন। ভ্রমণ বিষয়ক: বাংলাদেশ ভ্রমণ গাইড: ভ্রমণ বাংলা, ভ্রমণ উপন্যাস-নীলগিরি কক্সবাজার (২য় সংস্করণ)। তার লেখা ছোটদের বইগুলোও অসামান্য এর মধ্যে রয়েছে : ১, গল্পঃ সোনারং বিকেলে ২. গল্পগুলো ভূতের (২য় সংস্করণ) ৩. গভীর রাতের আতংক (গল্প ) ৪। আমাদের বারান্দায় এখন পাখি আসে (গল্প) । ছড়া : ১. ধিচিং লালের ছড়া (২য় সংস্করণ) ২. লাল লাল নীল নীল (২য় সংস্করণ) ৩. প্রজাপতির রঙিন পাখা । ৪. সবুজ সুখের আমার স্বদেশ। আরও বই ১. ছোটদের সাংবাদিকতা ২. ছোটদের নবাব সিরাজউদ্দৌলা (জীবনী) উপন্যাস –১. আতংকের রাত ( প্রকাশের পথে) ২. সুন্দরবনে চার গোয়েন্দা ( প্রকাশের পথে) । সম্পাদিত গ্রন্থ : ফররুখ শিশু সমগ্র।
আহমদ মতিউর রহমান বিভিন্ন পত্রিকার নিয়মিত কলাম লেখক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক। লেখালেখির সুবাদে কয়েকটি পুরস্কার ও সম্মাননা তিনি পেয়েছেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা ৪৮ টি। ৩১ জানুয়ারি ছিল তার ৬৬তম জন্মদিন। জন্মদিনে তাকে শুভেচ্ছা।