তাজ ইসলাম

‘বিপ্লব এসেছে আজ অবরূদ্ধ এক জনপদে।/সকল ফটক তার খুলে গেছে যেন অবলীলায়।/ বইছে স্বস্তির সুবাতাস। ( বিপ্লব এসেছে আজ)।’

বিপ্লব আসার পর দেশ হল ফ্যাসিবাদ মুক্ত। স্বৈরাচারের পতন হল। আর জনজীবনে নেমে এলো প্রশান্তি ও মুক্তির আনন্দ। দীর্ঘ দেড় দশকের জুলুম, নিপীড়ন, আবদ্ধ পরিবেশ থেকে মুক্ত হল একটি জনপদ। তখন সবার কণ্ঠেই মুক্তির গান। শিল্পী, সাহিত্যিক, রাজনীতিক সবাই তখন মুক্ত কণ্ঠ।বিপ্লব এসেছে আজ কবির কবিতায় শ্রাবণের প্লাবনের মতো’। এই প্লাবন ধারায় কবিরা লিখছেন অজস্র কবিতা। জানে আলম একজন কবি। দেশপ্রেম, শুদ্ধ চিন্তা, সততা, বিশ্বাস ও কাব্যে সমর্পিত কবিকণ্ঠ তিনি। বিপ্লবের আগেও তিনি দেশ জনতার পক্ষে কাব্যে ছিলেন সরব লড়াকু সৈনিক। বিপ্লবোত্তর সময়েও তার কলম থামেনি,হয়েছে আরও তীব্র ও তেজস্বী। তিনি লিখে যাচ্ছেন অবিরাম। খণ্ড খণ্ড লেখার অখণ্ড সংকলন তার প্রকাশিত কবিতার বই ‘ স্বাধীনতার ফুল ফুটেছে বিপ্লবীদের হাতে’। বিপ্লব, বিপ্লবী, দেশ,সমাজ,বিশ্বাস ও সমসাময়িক বিষয়ের কবিতা সমগ্র এই কবিতা পুস্তক। বিষয়ের বৈচিত্র ও কাব্যচর্চার উত্তম নমুনা হিসেবে ধর্তব্য তার এই বই।

জানে আলম কবি, কবিতা তার বক্তব্য প্রকাশের মাধ্যম। চিন্তা, বিশ্বাস,আদর্শ প্রকাশ করেন তিনি কবিতার পঙক্তি সাজিয়ে। এসবের সমন্বয় করে তার প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রকাশ হয় আবু লাহাব ও পরবর্তী কালে তার অনুগতরা। তাই কবিতায় তিনি বলেন,

‘কিছু হাত আমাদের উপর কর্তৃত্ব করতো।/

সে সব হাত এখন আবু লাহাবের হাতের মতো ধ্বংস হয়ে গেছে। ( আমাদের জালালি কবুতরগুলো)। আবু লাহাবের হাতের মতো ধ্বংস অনিবার্য সকল যুগের,সকল সময়ের আবু লাহাবদের। জানে আলম বিশ্বাসী মানুষের কবিকণ্ঠ। তার কবিতার শব্দচয়নে যে ঐতিহ্য, বিশ্বাসের সমন্বয় ঘটে তা সফল সমাপ্তি ঘটান ইতিহাসের সেই সব চরিত্রগুলো উপমা হিসেবে উল্লেখ করে।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও তার ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন কবিতায় জানে আলম।

‘ তাদের কেউ তাড়ায়নি/ তবু ওরা পালিয়েছে/ যেভাবে লক্ষ্মণ সেন খিড়কী দিয়ে পালিয়েছিল/ বখতিয়ারের আগমেন।/ ( সন্তানহারা মায়ের অশ্রু)’।

ওরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। তাদের পক্ষে এদেশ, এদেশের জনতা কেউ ছিল না। অপরপক্ষে কবির ভাষায় ‘ বিপ্লবীদের পক্ষে ছিল সন্তানহারা কতশত মায়ের গোপন অশ্রু’।

যারা পালিয়ে গেল তারা কারা? তারা স্বাধীন দেশের বুকে চেপে বসা ফ্যাসিবাদ। ফ্যাসিবাদ, ফ্যাসিস্টকে মানুষ ঘৃণা করে। তারা মানুষের আকৃতিতে বন্য ও জঘন্য কেউ। কবিতায় তাদেরকে চিহ্নিত করেছেন ‘ ফ্যাসিবাদীদের দিকে তাকালে মানুষ নয়, খিঞ্জিরের চেহারা দেখি।’ (ফ্যাসবাদীদের দিকে তাকালে)।

অনুপ্রাস কবিতার অলংকার। কবিতার নানাবিধ অলংকার আছে। উপমা,উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প, সবই কবিতাকপ সৌন্দর্যময় করে তোলে। কবি কবিতার শরীরে শব্দ, চিত্রকল্প, উপমা, অনুপ্রাসের মালা গাঁথেন দক্ষ কারু ও চারু শিল্পীর মতো। এসব বিষয় কখনো হয়ে থাকে স্বতঃস্ফূর্ততার সাথে, কখনো বা হয় কবির স্বজ্ঞান পরিকল্পনায়। যেভাবেই হোক পাঠক বিশেষত সচেতন ও কাব্য রসিক পাঠকের তা নজর কাড়ে।

‘একটি প্রসন্ন প্রসূন প্রত্যুষের প্রত্যাশায় প্রজন্ম আজ প্রসব যন্ত্রণায় যেন কাটাচ্ছে কাল।’

দীর্ঘ পঙক্তিতে প এর প্রচ্ছন্নতায় পাঠক চমকিত হয়। জানে আলমের কবিতা কিতাব ‘ স্বাধীনতার ফুল ফুটেছে বিপ্লবীদের হাতে’ এর প্রথম কবিতা ‘ তবু আমি দাঁড়ালাম ‘ এই কবিতার শুরুটাই এমন।

তারপর কবি কেন দাঁড়ালেন, কীভাবে দাঁড়ালেন তার বর্ণনা দিয়েছেন স্ববিস্তারে।

কবি দাঁড়িয়েছিলেন জুলাই বিপ্লব ২০২৪ এ মজলুম, মুক্তিকামী ছাত্র জনতার পক্ষে। যারা যে কবি সেদিন মানবতা, গণতন্ত্র, মজলুমের পক্ষে দাঁড়ায়নি কবির ভাষায়’ যার কবিতা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে জানে না সে কবি নয়, শব্দ জল্লাদ।’

মনে রাখার মতো বিশেষণ, শব্দ জল্লাদ। এভাবেই একজন সাহসী কবি মানবতার শত্রুকে চিহ্নিত করে দেন নিজস্ব বয়ানে।

চব্বিশের জুলাই বিপ্লবকে কবিতায় উপমা ও চিত্রকল্পময় করে শব্দে শব্দে হাজির করতে গিয়ে কবি জানে আলম লেখেন, ‘ একটি ভোর আনতে গিয়ে আমরা শাহজালাল হয়েছি’ আর এর পরিণতি চিত্রিত করেছেন পরের লাইনে,

‘ আমাদের আজানের ধ্বনি প্রতিধ্বনি সামলাতে না পেরে ধ্বসে গেছে গৌর গোবিন্দের গৌরমহল।/ একটি ভোরের জন্য আমরা বখতিয়ার হয়েছি/ আর খিড়কি দিয়ে পালিয়েছে জালিম শাসক।’ ( একটি ভোরের জন্য)’। দু হাজার চব্বিশে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ উৎখাতে যে বিপ্লব হল তা ইতিহাসের পাতায় থাকবে উজ্জ্বল হয়ে।

কবির কথায় ‘ প্রজন্ম চব্বিশ এক মহাকাব্য/ এই মহাকাব্য পঠিত হতে থাকবে হাজার বছর। ( এক মহাকাব্য)’। জানে আলম কবি। তিনি সময় ও রাজনীতি সচেতন কবি। ঘটনাকে তিনি বর্ণনা করেন কাব্যিক উপমাযুক্ত করে। বর্তমানকে হাজির করেন অতীত ঐতিহাসিক যোগসূত্রতায়।

কবি লেখেন, ‘ ফ্যাসিবাদের টাইটানিক ডুবল/ একখণ্ড বৈষম্য বিরোধী বরফখণ্ডে ধাক্কা লেগে।( ফ্যাসিবাদের টাইটানিক)। ‘

কবি হলেন শব্দের জাদুকর। শব্দে শব্দে নির্মাণ করেন নান্দনিক শাড়ি। আমরা জানে আলমের কবিতায় যখন পড়ি

‘শহীদ বাগান হয়ে গেছে / আমার বাংলাদেশ’

‘চির আগুনের গাছ’ ,

‘স্বৈর শেয়াল’ ,

‘ফাগুনের গাছ লাগিয়েছি’,

‘ভোরের শুভ্র শিশিরের মতো অনাবিল করে তোল।’ তখন এইসব শব্দগুচ্ছকে মনে হয় নান্দনিক শাড়ির কারুকাজ খচিত নকশা বা তার মাঝের ঝমকালো পাথর দানা। একজন কবি এভাবেই আলাদা করতে চেষ্টা করেন নিজের কবিতায় উপমা, অলংকার, চিত্রকল্পের সমন্বয় ঘটিয়ে।

কবিতার বই হিসেবে এটি একটি বড় কলেবরের বই। প্রায় ১৭৬ পৃষ্ঠার বইয়ে ছোট বড় অনেকগুলো কবিতার সমাহার এই বইয়ে। এতে যেমন আছে ছোট ছোট কবিতা, আছে দীর্ঘ কবিতাও।

‘কথার ঘ্রাণ জুড়ায় প্রাণ ‘ একটি দীর্ঘ কবিতা। জানে আলম ছন্দ সচেতন কবি। ছন্দের সকল প্রকরণেই লিখতে সিদ্ধহস্ত। অন্তমিল তার পছন্দনীয় বিষয়। কবিতা লিখছেন মনের আনন্দে, ইচ্ছার ঘুড়ি উড়িয়ে। বিপ্লবের সমগ্র চিত্রই যেন অঙ্কন করেছেন কবিতায় কবিতায়, বইয়ের পাতায় পাতায়। বিপ্লবীদের কথা যেমন বলেছেন ঠিক তেমন সাহসীকতার সাথে প্রকাশ করেছেন ফ্যাসিস্ট আমল, স্বৈরশাসক ও স্বৈর দোসরদের কীর্তি সমগ্র। জুলাই বিপ্লবের কাব্যে তার বইটি একটি অন্যমাত্রার মূল্যায়নযোগ্য প্রয়াস। জুলাই বিপ্লব কেন্দ্রিক বই হলেও বিষয়ের বৈচিত্র আছে তার বইয়ে। জুলাই ছাড়াও কবি তার চিন্তা, বিশ্বাস, আদর্শের কথাও বলেছেন কবিতায়। কবির পরিচয় আমরা কবিতা দিয়েই দিতে পারি। ‘ বাংলাদেশের মানুষ আমি/ বাংলাদেশের লোক।/ আমি তো চাই আমার কাজে/ সত্যেরই জয় হোক।

(বাংলাদেশের মানুষ আমি)।’

এই হলো কবি জানে আলমের পরিচয়। তিনি সত্যের জয় চান, বাংলাদেশের জয় চান।

গ্রন্থটি জুলাই বিপ্লব কেন্দ্রিক।

জুলাই বিষয়ক উদ্ধৃতি দিয়েই শেষ করছি। কবি লিখেন,’ একটি জুলাই শিমুল পলাশ রক্তজবার ডাল/এক জুলাইয়ের কাব্যকথা চলবে মহাকাল।( জুলাই কাব্য)।’

‘ স্বাধীনতার ফুল ফুটেছে বিপ্লবীদের হাতে’ জানে আলম। প্রকাশক মো. মঈনউদ্দীন।

প্রচ্ছদ: শাহাদাত শিবলী। মূল্য ৪৫০ টাকা। বইটি বহুল প্রচার কাম্য।