তাজ ইসলাম

‘নির্ঘুম চোখের ঘাম’ সহজ একটি বাক্যের অন্তরে লুকিয়ে আছে শ্রম, সাধনা, ত্যাগ, চেষ্টা, সমাপ্ত করে কাক্সিক্ষত স্থানে পৌছার ঈঙ্গিতপূর্ণ কথা। এটি একটি প্রবন্ধ গ্রন্থের নাম। সাহিত্য চর্চাটাই উপরোক্ত শব্দসমুহের সমন্বয় সাধন। সাহিত্য চর্চা করতে হলে তার সবগুলো ধাপই পার হতে হয়। প্রবন্ধ আরও জটিল কঠিন বিষয়। প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশ করতে বহু বিনিদ্র রজনী অতিক্রম করে গন্তব্যে পৌছতে হয়। তারপরও শঙ্কা থেকে যায় সার্থক হওয়া না হওয়ার বিষয়ে। আপাতত লেখক প্রকাশের তীরে পৌছেছেন। প্রকাশ হয়েছে তার প্রবন্ধগ্রন্থ ‘ নির্ঘুম চোখের ঘাম’। প্রাবন্ধিক একজন কবিও বটে। চোখের ঘাম কাব্যভাষা প্রয়োগ করেছেন তার প্রবন্ধ কিতাবে। মোট ২২ টি প্রবন্ধ এক মলাটবদ্ধ করেছেন আবুল খায়ের বুলবুল। আবুল খায়ের বুলবুল পেশায় শিক্ষক, আর অস্থিমজ্জায় লেখক। কবিতা,গল্প,প্রবন্ধ,গান বিচিত্র বিষয়ে লেখেন। আলোচ্য প্রবন্ধ কিতাবেও আছে বিষয়ের বৈচিত্র। নানা বিষয় নিয়ে লিখেছেন তিনি। কেমন লিখেছেন তা নির্ণয় করবে তার পাঠক।

‘বাংলা সাহিত্য জগতে রয়েছে কবিতা ছড়া প্রবন্ধ গল্প নাটক নাটিকা উপন্যাস নিবন্ধ ও গান। একেকটির প্লট একেক রকম। মানুষের সুখ দুঃখের কাহিনী নিয়ে গল্প বা উপন্যাস রচিত হয় আবার নাটকও এই শ্রেণির ভেতর পড়ে, যদিও নাটককে দৃশ্যকাব্যও বলা হয়ে থাকে। প্রবন্ধে ও নিবন্ধ হচ্ছে গবেষণা লব্ধ জ্ঞান উপস্থাপন করা।’

এভাবেই প্রবন্ধের বিষয়ে নিজের অভিমত প্রকাশ করেছেন লেখক। সাহিত্যের গবেষণা লব্ধ শাখা নিয়েই কাজ করছেন গ্রন্থকার। তিনি লিখছেন প্রবন্ধ, প্রকাশ হয়েছে সে প্রবন্ধের পুস্তক। বিভিন্ন বিষয়, ব্যক্তি, ঘটনার গবেষণা ও শ্রমলব্ধ কাজের প্রকাশিত রূপ তার এই কিতাবখানা।

কবি আসাদ বিন হাফিজ বাংলা ভাষার একজন প্রখ্যাত কবি। ‘ জাতিকে সঠিক পথ দেখাবার প্রেক্ষাপটে কবি আসাদ বিন হাফিজ দু’হাতে রচনা করছেন কালজয়ী উপন্যাস, গল্প, ছড়া, কবিতা, প্রবন্ধ ও নিবন্ধ। অনিবার্য বিপ্লবের ইশতেহার কবিতা তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ।’ প্রাবন্ধিক কবিকে নিজের ভাষায় তার রচিত প্রবন্ধে চিত্রিত করতে যথা চেষ্টা করেছেন। কবির কবিতা, বা শিল্প সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। কবিতার ভাষা, ছন্দ, শিল্প নিয়ে আলোচনা করেছেন ‘ স্নিগ্ধ ভোরের কবি আসাদ বিন হাফিজ’ শিরোনামীয় লেখায়। সমকালীন সাহিত্যের আরও গুরুত্বপূর্ণ বা লেখকের পছন্দনীয় কবি শিল্পীদের নিয়ে মূল্যায়নধর্মী লেখা স্থান দিয়েছেন এই গ্রন্থে।

এক্ষেত্রে লেখক বয়স বা অগ্রজ অনুজের বিষয়টি উপেক্ষা করে গেছেন। অথচ এ বিষয়টি মান্য করা কর্তব্য ছিল। কবি লিখেছেন ‘ স্নিগ্ধ সকালের কবি রেদওয়ানুল হক’ ‘ বীরকণ্ঠ যোদ্ধা লিটন হাফিজ চৌধুরী ও কিছু কথা’ ‘ কবি আহমদ বাসির ব্যক্তি ও মানুষ’ ‘ কবি ও গীতিকার মতিউর রহমান মল্লিক’ প্রমুখদের নামে উল্লেখিত শিরোনামের প্রবন্ধ।সূচিতে বয়স, অগ্রজ বিষয়টি মান্য না করায় প্রশ্নবিদ্ধ কিংবা দৃষ্টিকটু হয়ে রইল। বিষয়গুলোও ভাগ করে পৃথক পৃথক পর্ব রাখা যেত। ব্যক্তি, ইতিহাস, ভ্রমণ অভিজ্ঞতা আলাদা আলাদা হতে পারত। হলে গ্রন্থের সূচি পরিচ্ছন্ন হত।

লেখক জীবনই সমাজ সংশোধন ও সমাজ সচেতনতার ও দেশ সেবার অংশ হিসেবে প্রকাশ পায়। আবুল খায়ের বুলবুলও তার লেখায় দেশ, সমাজ,ইতিহাসের নানা বিষয়কে তুলে এনে নিজের অবস্থানকে স্পষ্ট করেছেন। লিখেছেন ইতিহাসের কথা, সমাজের কথা। সমাজের অসঙ্গতি ও অসামাজিকতার কথা।জাতির ভাগ্যাকাশে কিশোর গ্যাং এর থাবা’ এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা। তার ভাষায়, ‘ কিশোর গ্যাং একটি অপরাধীর নাম, একটি অভিশাপের নাম।’ শব্দ চয়নে আরও সতর্ক ও দক্ষতা দেখাতে পারলে লেখা আরও তাৎপর্যময় হয়ে হাজির হয়। কিশোর গ্যাং একটি অপরাধীর নাম না হয়ে একটি অপরাধ চক্রের নাম হলেই উত্তম হয়ে বিষয়টি প্রকাশ পায়। এটি একক কোন কিশোরের অপরাধ না, বরং সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের কাজ। তার প্রবন্ধে কিশোর অপরাধ চক্রের ভয়াবহতা চিত্রিত করেছেন মুন্সিয়ানার সাথে। কবি মতিউর রহমান মল্লিক একজন কবিপুরুষের নাম। উল্লেখযোগ্য কবি। তিনি শুধু কবি নন। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, গীতিকার, ছড়াকার ও বিশ্বাসী কবি। তাকে নিয়ে আলোচনা করা মূলত জাতীয় দায়িত্বের অংশ। বুলবুল এই দায়িত্ব পালন করেছেন। আহমদ বাসিরও একজন প্রতিভাবান কবি। খুব অল্প বয়সে তিনি মারা গেছেন। তার প্রতিও লেখকের দায়বদ্ধতা অবশ্যই প্রশংসনীয়। রেদওয়ানুল হক একজন কবি, সম্পাদক ও ছড়াকার। ‘ কবি রেদওয়ানুল হক প্রাত্যহিক জীবনে নানা ঘটনা নিয়ে ছড়া ও কবিতা লিখে থাকেন।... কবি রেদওয়ানুল হক আগাগোড়ায় একজন সহজ সরল সুমানুষ, বলতে গেলে একজন জ্ঞান সমৃদ্ধ মুমিন মুসলমান কবি। জীবনকে ভালেবেসেছেন কবিতার রঙতুলি দিয়ে।’ একজন কবি তার পাঠকের কাছে, প্রাবন্ধিকের কাছে, একজন গবেষকের দৃষ্টিতে মূল্যায়িত হওয়া দারুণ বিষয়।

আবুল খায়ের বুলবুল সাহিত্য চর্চাকে সমাজ ও দেশের প্রতি দায় আদায়ের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সমাজ সংস্কারের হাতিয়ার হিসেবেও প্রয়োগ করেছেন। তিনি কাজ করছেন নিজের সাধনার জায়গা থেকে। চেষ্টা আরও জোরদার হলে অনন্য দৃষ্টান্ত হতে পারবেন।

আমরা শুরুতেই উল্লেখ করেছি প্রবন্ধ শ্রম, সাধনা,গভীর পর্যবেক্ষণের বিষয়। সাহিত্যের এই শাখায় নিজেকে নিয়োজিত করায় অভিনন্দন আবুল খায়ের বুলবুলকে। তিনি প্রবন্ধ ছাড়াও লেখেন কবিতা, গল্প ও গান। তিনি একজন সচেতন শিক্ষকও বটে। এজন্যই শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষকদের শিক্ষাদানের ভেতরগত অবস্থান তার জানা বেশি। সত্য বর্ণনা করেছেন অকপটে। তিনি লেখেন,’ অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রায় উনিশ হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে, এখানের প্রায় মহিলা শিক্ষক ও পুরুষ ( কম) শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের শুধু পড়্ পড়্ বলে পুরো ঘন্টস মোবাইলে চ্যাট করে ঘন্টস পড়লে তারা শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে আসে। শব্দ,বাক্য,ভাষার বিষয়ে আরও সচেতনতা জরুরি। একই প্যারায় শ্রেণি কক্ষ শব্দটি দুইভাবে প্রয়োগ হয়েছে। শ্রেণি ও কক্ষ যুক্ত ও বিযুক্ত।

আবুল খায়ের বুলবুল ‘ নির্ঘুম চোখের ঘাম’ প্রকাশ করেছে চারু প্রকাশ। মূল্য ২৫০ টাকা। আমরা বইটির বহুল প্রচার কামনা করি।