নয়ন আহমেদ

প্রথম বইপ্রকাশের অনুভূতি তখন বাংলা ১৪০২ সাল। ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দ। সিদ্ধান্ত নিলাম বই প্রকাশ করবো। জীবনের প্রথম বই। কবিতা। একা নই। আল হাফিজ, কামাল আহসান আর আমি। কামাল আহসানের গল্পের বই। আর আমাদের দুজনের কবিতার বই। মনের ভেতরে অদ্ভুত এক আবেগ। অদ্ভুত অনুভূতি। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় “ ওরে প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি। “ নির্ঝর বা ঝর্নার স্বপ্নের মতোই হৃদয়ের আবেগ প্রকাশের জন্য কী এক অস্থির অনুভূতি! এ যে বাধা মানে না। বারিরাশি যেমন উছলে ওঠে, ঢেউ সৃষ্টি হয়— অপার আবেগ আর ঔদার্যে আরক্তিম হই। বই প্রকাশিত হবে। আনন্দ, উত্তেজনায় হৃদয় যেন কম্পমান। কিন্তু বাইরে টের পায় না অন্যরা। চুপচাপ থাকি। পত্রিকা অফিসে যাই। বরিশালের একটা স্থানীয় দৈনিকে সম্পাদনা সহযোগীর পদে কাজ করি। কাজটা অনেকটা সোজা। ভুলসংশোধনের কাজ। যেহেতু বাংলায় পড়েছি, আমার কাছে কাজটা তাই ভালোই লাগে। অন্য কাজ বা চাকরির আগ পর্যন্ত চালিয়ে নেয়া যাবে। বিয়ে করেছি আগেই, ১৯৯২ সালে। সংসার তো চালাতে হবে। তবে কাজ রাতে, একটু কষ্ট করতে তো হয়ই। কাজের ফাঁকে কিছুটা আড্ডা হয়। বাইরে। হাফিজ অথবা কামালের সঙ্গে। বিষয়— লেখালেখি আর বইপ্রকাশ নিয়ে। বই তো করবো। কিন্তু কীভাবে? জানা নেই তেমন কিছু। ইতোমধ্যে শেকড় সাহিত্য সংসদ— এর কয়েকটি সংখ্যা করেছি। ভরসা আছি বই করতেও পারবো। পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করলাম। কম্পোজ করতে দিলাম। কম্পিউটার কম্পোজ। এই নতুন প্রযুক্তি চালু হয়েছে কিছু দিন আগে। বরিশাল শহরে অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটারে কাজ চলে। আমরা কম্পোজের কাজ দিলাম অধ্যাপক বদিউর রহমানের কাছে। তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে। তিনি একটা পত্রিকারও সম্পাদক। ইংরেজি মাসিক। আমাদের শিক্ষক তিনি। তাঁর কয়েকটা বইয়ের প্রুফ দেখে দিয়েছিলাম। স্যার আমাদের বইয়ের কম্পোজ করে দিলেন। ট্রেস নিয়ে এলাম। বই হবার প্রাথমিক কাজ হয়ে গেলো। আরও কতো কিছু বাকি। কোনো প্রকাশক ধরিনি। সুতরাং সব কিছু নিজেদের করতে হবে। মনকে বলি— ওরে মন, সবুর করো। সবুরে মেওয়া ফলে। এরপর দিন চলে যায়। জানুয়ারি যায় যায়। প্রচ্ছদ পাবো কই। এটা তো একটা বড় ব্যাপার। সেটাই একটা মজার বিষয় হয়ে রইলো। নিজেই করলাম প্রচ্ছদ। কেমন এক আত্মবিশ্বাসে প্রকৃত শিল্পীর মতোই নামাঙ্কণ করে আঁকলাম বইয়ের প্রচ্ছদ। “ অসম্ভব অহংকার “। ইংরেজি নাম— অহ অৎঃরংঃ ঙভ ইবধঁঃু.

২.

নিজেরা নিজেরা কাজ করার মধ্যে একটা আনন্দ আছে। আছে সুন্দর অভিজ্ঞতা। অখণ্ড তৃপ্তি পাওয়া যায়। পুকুরে পুঁটি যেমন খলবল করে পানির সাথে, মনও তেমনি আনন্দে অবগাহন করতে লাগলো। এক লেখা কয়েকবার দেখি। নতুন শব্দ বসাই। ট্রেস নেবার পরও এভাবে চলতে থাকে। আবার নতুন করে সংশোধন করে আনি। বই বের হলে টাকা দরকার। সেটা যোগাড় করি। কাগজ কিনি। মুনশি প্রকাশনী থেকে। বড় উদার লোক। সব টাকা যোগাড় হয়নি। শুনে বাকিতে দেন। আমরা পরে দিয়ে দেবো। সেই কাগজ হলো দুই ধরণের। অফসেট। শাদা ধবধবে। আর দ্বিতীয়টা কর্ণফুলী। এই দুই ধরনের কাগজ দিয়েই ছাপা হবে বই। জীবনের প্রথম বই। ভালোবাসা ফুল হয়ে ফুটতে শুরু করেছে। আমারটা সহ মোট তিনটা বই বের হবে। প্রকাশক আমরাই। অর্থাৎ আমাদের হাতে গড়া শেকড় সাহিত্য সংসদ। অফসেট প্রেস আছে ৬ /৭ টা। আমরা গেলাম পরিচিত এক লোকের কাছে। শিপুর মামা প্রেসের মালিক। বয়োজ্যেষ্ঠ। শিপু আমাদের বয়সী। বন্ধু। কাছেই শহরের মধ্যে কাউনিয়ায় থাকে। তার মামা খুবই ভালো মানুষ। আমাদের অত্যন্ত স্নেহ করলেন। বইপ্রকাশের জন্য উৎসাহ দিলেন। ছাপলেন প্রথম সূর্যোদয়ের মতো আমার আবেগগুলো। আমাদের বিন্দু বিন্দু সোনার কণাগুলো। ছাপা হলো। তখন মার্চ মাস। কী আশ্চর্য! তিনি বললেন, পরে টাকা পরিশোধ কইরো। এখন বাঁধাই করতে দিবা। পরে বিক্রিবাট্টা করে টাকা পরিশোধ কইরো। এমন কথায় আমরা খুব খুশি। আবেগ ঢেউ হয়ে দুলছে। বাঁধাই হলো প্রত্যেকের বই। আমাদের বই। আমার প্রথম বই। নতুন বঊয়ের মতো কী সাজগোজ! শাদামাটা প্রচ্ছদেই বইটা নজরকাড়া হয়ে উঠলো। মাত্র দুই ফর্মার দুই। কবিতা ২৮টি। মূল্য শাদা ২৫টাকা আর অফসেট ৩০ টাকা। উৎসর্গ করলাম দুই প্রিয় কবি আল মাহমুদ আর আবিদ আজাদকে। বইয়ের ভেতরের গোটা দুয়েক কবিতা উৎসর্গ করলাম মোশাররফ হোসেন খান, তমিজ উদ-দীন লোদী ও হাসান আলীমকে। এঁরাই ছিলন সে সময়ে আমাদের কাছে ভালোবাসার জন। পরম প্রিয়।

৩.

কবিতা তো কতো সূক্ষ অনুভূতির বিষয়। সেই বিষয়টা কিছু তুলে আনতে পেরেছি কলমের আঁচড়ে। কবি মনে হয়। মনে হয় যেন এ হচ্ছে দ্বিতীয় রৌদ্র। বিধাতার প্রথম রোদ আর কবির সৃষ্ট দ্বিতীয় রোদ। কবি প্রকাশের পর প্রকাশনা অনুষ্ঠান হয়। বরিশালের লেখক- কবিরা অংশগ্রহণ করেন এতে। আমার একগুছ কবিতা প্রথম ছাপা হয়েছিলো বিএম কলেজের ম্যাগাজিনে। সম্পাদক ছিলেন আমার শ্রদ্ধেয় গুরু দক্ষিণ বাংলার শিক্ষকদের শিক্ষক অধ্যাপক আ খ মো আবদুর রব স্যার। সেটাই প্রথম লেখা। “ অসম্ভব অহংকার “ প্রকাশিত হলে তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন। আমার কবিতা সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করেছিলেন। “ ও ভালো কবিতা লেখে”। অনেকের কাছে এমন মন্তব্য করেন তিনি। তো হয়ে যাক গ্রন্থটি থেকে সবচেয়ে ছোট্ট একটি কবিতা: কবিতার শিরোনাম — একটি কবরের আহার ধানের বীজ ছিটানোর মতো প্রতারণাকারীগণ উপস্থিত থাকুক। জাল ফেলে যারা রৌদ্র ধরেছে — ডাকো তাদের।

অবৈতনিক সংযোগ — তার জালের নাম। ধূর্ততা — তার চোখের নাম। আর ডানায় যার অজুহাতের পতাকা— সেও হাজির থাকুক। এই শহরের সম্মানিত কবি আজ বিচারক । ওহে, মাছির পোশাক পরা মেজবানরা, একটি ক্ষুধার্ত কবর আহার হিসেবে চাচ্ছে তোমাদের। আমি, কবরের প্রার্থনা মঞ্জুর করি। কবিতার সাথে সেই থেকে লেগে আছি। কবিতার মধ্যেই এক হয়ে আছে বিস্ময় ও আনন্দ।