বাংলাদেশের অন্যতম কবি সায়ীদ আবুবকর। জন্ম ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৭২ যশোর জেলায়। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ১৬টি। প্রণয়ের প্রথম পাপ (১৯৯৬) ও নবিনামা (মহাকাব্য ২০২১) তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি কাব্যগ্রন্থ। তিনি একজন দ্বিভাষী লেখক। ইংরেজি ভাষায় রয়েছে তাঁর দুই শতাধিক কবিতা। বিশ্বের শীর্ষ ১০০ কবির অন্যতম এ কবির বহু কবিতা অনূদিত হয়েছে চাইনিজ, রাশিয়ান, কোরিয়ান, স্প্যানিশ, আরবি, উড়িয়া প্রভৃতি ভাষায়। ইংরেজি ভাষায় তিনি অনুবাদ করেছেন নজরুলের সাম্যবাদী ও আল মাহমুদের সোনালি কাবিন। কবি সায়ীদ আবুবকরের সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ নরক নগরে প্রকাশিত হয় ২০২৫-এর একুশে বইমেলায়। এ গ্রন্থটি নিয়ে কবির মুখোমুখি হন তরুণ কবি ও সমীক্ষণ-সম্পাদক তারেক আলি। পাঠকদের উদ্দেশে সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। -সাহিত্য সম্পাদক
তারেক আলি: আধুনিক বাংলা কবিতার জগতে আপনার উত্থান কীভাবে?
সায়ীদ আবুবকর: কবিতা লেখা শুরু করি নব্বইয়ের দশকের একেবারে শুরুর দিকে। তখন তো আমরা কবিতা লিখে ছাপানোর জন্য পাঠাতাম জাতীয় দৈনিকগুলোতে। সেসময় সবচেয়ে নামকরা ছিলো ইত্তেফাকের সাহিত্য সাময়িকী। সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন কবি আল মুজাহিদী। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলো সংবাদ সাহিত্য। সম্পাদনা করতেন আবুল হাসনাত। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাকে কবিতা পাঠাতাম। ইত্তেফাক ও সংবাদে ছাপা হতে থাকে আমার কবিতা। এছাড়া বাংলা একাডেমির উত্তরাধিকার, পাক্ষিক পালাবদল, সচিত্র বাংলাদেশ, শৈলী, মাসিক কলম, ইনকিলাব, সংগ্রাম, সাপ্তাহিক পূর্ণিমা, রোববার প্রভৃতি পত্রপত্রিকায় একের পর এক আমার কবিতা ছাপা হতে থাকে। সারা দেশে একটা পরিচিতি এসে যায়। ১৯৯৬ সালে পালাবদল প্রকাশনী প্রকাশ করে আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রণয়ের প্রথম পাপ। প্রণয়ের প্রথম পাপ কবিতার অঙ্গনে একটা আলোড়ন তোলে। অতি দ্রুত এটি একটি জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থে পরিণত হয়। বলা যায় প্রণয়ের প্রথম পাপই আমাকে ব্যাপক কবিখ্যাতি এনে দেয়। এরপর তো একের পর এক আসতে থাকে আমার নতুন কাব্যগ্রন্থগুলো।
তারেক আলি: আপনি তো কবি ও অধ্যাপক। কবিতা ও অধ্যাপনা একসাথে কিভাবে চলছে? এ দুটির পারস্পরিক সম্পর্ক ও প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাই।
সায়ীদ আবুবকর: অধ্যাপনা তো আমার পেশা। শিক্ষকতা আমি ভালবাসি। স্টুডেন্টদের সাথে আমি নিবিড়ভাবে মিশতে পছন্দ করি। শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করি ১৯৯৯ সালে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে। ক্যাডেট কলেজেও আমি একজন জনপ্রিয় শিক্ষক ছিলাম। ক্যাডেটদের সাথে ছিলো আমার নিবিড় সম্পর্ক। ২০০৩ সালে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সরকারি কলেজে যোগদান করি— প্রথমে সরকারি লালন শাহ কলেজে প্রভাষক পদে; এরপর সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজ। সহকারী ও সহযোগী অধ্যাপক পদে সেখানে কাটাই। দুটি প্রতিষ্ঠানেই আমি ছিলাম খুবই জনপ্রিয় শিক্ষক। এরপর তো রাজশাহীতে, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজে। এখানে অধ্যাপক হই। এখানে এসে তো হয়ে পড়ি শিক্ষকদের শিক্ষক। এখানে আমার স্টুডেন্টরা তো সবাই শিক্ষক। এদের সাথে ক্লাস নেওয়ার মজাই আলাদা। আমি আমার বিষয়ে পাঠদান করতে খুবই ভালবাসি। এটা আমার পেশা। কিন্তু কবিতা লেখা তো আমার নেশা। আমার রক্তের মধ্যে রয়েছে কবিতা। এ কাজে আমি কখনো ক্লান্তি বোধ করি না। আমার সীমাবদ্ধ সময় কাটে অধ্যাপনায় আর বাকি সমস্ত সময় কেবল কবিতাতে। দুটো দুই জিনিস; কারো সাথে কারো কোনো সম্পর্ক নেই।
তারেক আলি: বর্তমানে কী ভাবছেন, কোন ধরনের লেখালেখিতে আছেন?
সায়ীদ আবুবকর: জুলাই বিপ্লবোত্তর একটা অস্থির সময় পার করছি আমরা। অনেক কিছুই ভাবছি। কিন্তু অস্থিরতার মধ্যে সৃজনশীল কাজ সুচারুরূপে সম্পন্ন করা কঠিন। কবিতা, প্রবন্ধ এসব তো লিখছি। কিন্তু বৃহৎ কিছু কাজ করার পরিকল্পনা ছিলো, হয়ে উঠছে না।
তারেক আলি: জুলাই গণঅভ্যুত্থানোত্তর কবিতায় দেশজুড়ে যে বদল এসেছে, সে সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী? সেইসঙ্গে আপনার কবিতায় কি সে পরিবর্তন লক্ষ্যণীয়?
সায়ীদ আবুবকর: কবিতায় কী বদল এসেছে, সেটা খোলাশা করে বলা মুশকিল। আঙ্গিকগত কোনো পরিবর্তন আসেনি। তবে দেশকে নিয়ে, এদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে কবিতা লেখার প্রবণতা বেড়ে গেছে। হ্যাঁ, আমার সাম্প্রতিক সময়ের কবিতায় এ ধরনের পরিবর্তনের হাওয়া তোমরা লক্ষ্য করে থাকবে। ’২৪-এর বিপ্লব চলাকালীন অনেক ঝুঁকিপূর্ণ কবিতা লিখেছি; ‘ঝরা পাতার নৃত্য, একটাই শুধু লক্ষ্যÑ এমন সব কবিতা, জাতীয় পত্রিকায় ছাপতে দিয়েছি তখন, চাকরি হারানোর ভয় ছিলো, দেশের জন্য কিছু পরওয়া করিনি। ৫ই আগস্টোত্তর আরো অনেক কবিতা লিখেছি, আগুনঝরা কবিতা, আমার লেটেস্ট কাব্যগ্রন্থে কিছু কিছু এসেছে।
তারেক আলি: ২০২৫-এর বইমেলায় আপনার কাব্যগ্রন্থ ‘নরক নগরে’ প্রকাশ পায়। অনেক বোদ্ধাপাঠকের মাঝে এ নিয়ে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এর সপক্ষে আপনার যুক্তি কী?
সায়ীদ আবুবকর: তরুণ পাঠকরা বরাবরই আমার কবিতার ভক্ত। আমার নতুন কোনো কবিতার বই বের হলে কিছু পাঠক তা লুফে নেয় এর ভেতরে কী আছে তা দেখার জন্য। তারপর এটা নিয়ে আলোচনা হয় ও নতুন নতুন পাঠকের আগ্রহ সৃষ্টি হয়। নরক নগর-এর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে জুলাই বিপ্লবের পর নতুন বাংলাদেশের প্রথম একুশে বইমেলায় তরুণ পাঠকদের অন্যরকম অনুভূতি ছিলো। আমার এ কাব্যগ্রন্থটি দুঃসময়ের রচনা। এখানে এমন এক জগতের চিত্র আছে, যেটা ভয়, আতংক, অবিশ্বাস ও দীর্ঘশ্বাসে ভরা।
তারেক আলি: নরক নগরে-এর কাব্যিক ব্যঞ্জনা ও নিবেদন কী, যা যুগ যুগ ধরে স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে আপনি মনে করেন?
সায়ীদ আবুবকর: কোন্ কবিতা যুগ যুগ ধরে টিকে থাকবে, তা কখনো আগ বাড়িয়ে বলা যায় না। কালের অতলে অনেক ভালো জিনিসও হারিয়ে যায় আবার অনেক বাজে জিনিসও টিকে থাকে। সফোক্লিসের মাত্র সাতটা নাটক টিকে আছে অথচ তিনি লিখেছিলেন ১২০ টার অধিক নাটক। বাংলাদেশে অনেক কবিতা বছরের পর বছর ধরে আবৃত্তি হতে দেখি যাদের কোনো কাব্যমূল্য নেই। রাজনৈতিক কারণে এসব নিকৃষ্ট শ্রেণির কবিতাও টিকে আছে। আসলে মূল কথা হলো, কবিতাকে কবিতা হয়ে ওঠা, তাকে শিল্পোত্তীর্ণ হয়ে ওঠা, এটা খুবই কঠিন কর্ম। এরকম কিছু কবিতা নরক নগরে কাব্যগ্রন্থে আছে বলে মনে করি। নরক নগর, কবরজীবন, মানুষ ও কুত্তা-খচ্চরবকাহিনী, হে সবুজ শিমুলবালিকা, বস্ত্রবাদ, বন্দনাÑএরকম কিছু কবিতা এখানে আছে, যা পাঠকদের আপ্লুত করেছে বলে শুনেছি। শিলিগুঁড়ির এক সম্পাদক ও পাঠক, নাম সোমনাথ বিশ্বাস, আমার ‘হে সবুজ শিমুলবালিকা’ কবিতাটি পড়ে তো রকমারিতে অর্ডার করে আমার শ্রেষ্ঠ কবিতা বইটি সংগ্রহ করে ফেলেন। সুদূর শিলিগুঁড়ি থেকে বাংলাদেশের বই সংগ্রহ করা, চারটেখানি কথা নয়। আমি তো ফেসবুকে তাঁর মেসেজ পেয়ে অবাক বনে যাই। নরক নগরের কবিতাগুলো একটু ভিন্ন রকমের: ছন্দ-অলংকারে নতুনত্ব আছে; মেসেজগুলোও নতুন।
তারেক আলি: আধুনিক সভ্যতার অন্ধকারাচ্ছন্ন অধ্যায় এ কাব্যগ্রন্থকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে, আপনি কি একমত?
সায়ীদ আবুবকর: একদম। তুমি বিষয়টি ধরতে পেরেছো। আধুনিক সভ্যতাকে এভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে এখানে। বিশ্বাসহীন, ভোগবিলাসিতা-কলুষতায় নিমজ্জিত জীবন তো নরকেরই জীবন। এখানে আলো নেই, কেবলি অন্ধকার। এ অন্ধকার থেকে উত্তোরণের কথা অবশ্য এখানে আছে।
তারেক আলি: ‘নরক নগরে’-এর সাথে আপনার ‘সাদা অন্ধকারে কালো জ্যোৎস্নায়’ কাব্যগ্রন্থের প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে জানতে চাই।
সায়ীদ আবুবকর: সাদা অন্ধকারে কালো জ্যোৎস্নায় আমার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। আধুনিক জীবনযন্ত্রণা ও সভ্যতার সংকট এ কাব্যগ্রন্থে আমি ফুটিয়ে তুলি। নরক নগরে কাব্যের সঙ্গে এর স্বভাবে একটু মিল আছে, এটা সত্য। তবে নরক নগরে কাব্যে সাররিয়েলিজমের যে ব্যবহার আছে, তা একেবারে নতুন।
তারেক আলি: জুলাই অভ্যুত্থান কি আপনার এ কাব্যে কোনো প্রভাব ফেলেছে?
সায়ীদ আবুবকর: অবশ্যই। গ্রন্থটাই আমি উৎসর্গ করেছি জুলাই যোদ্ধাদের। জুলাই বিপ্লবের বেশ কিছু কবিতা এখানে আছে। জুলাই বিপ্লবকালীন দ্রোহের কবিতা যাঁরা লিখেছিলেন, তাঁদের সামনের সারিতে ছিলাম কিন্তু আমি। সংকটময় সে সময়ে আমার কয়েকটি কবিতা জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশ পায়, যা বিপ্লবীরা পছন্দ করেছিলেন। একজন কবি তো সময়ের সবচেয়ে সংবেদনশীল মানুষ। এত বড় বিপ্লব ঘটলো, হাজার হাজার মানুষ শহীদ হলো, এটা একজন কবিকে তাড়িত না করে পারে না। আমাকেও করেছে। দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে গেছে একেবারে। ‘বাঘের বাড়ি’, ‘পাঁচই আগস্টনামা’ প্রভৃতি কবিতা পড়লে বুঝতে পারবেন রক্ত কেমন টগবগ করছে দেশের জন্যে।
তারেক আলি: বিশ্বসাহিত্যে বাংলা ভাষায় লিখিত জাগরণমূলক কবিতার অবস্থান আপনার দৃষ্টিতে কীভাবে চিহ্নিত হয়েছে?
সায়ীদ আবুবকর: সত্যি কথা বলতে কী, বাংলা ভাষার খুব কম কবিতাই ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ অনূদিত হলেও, নজরুল তেমন হয়নি এখনো। বাংলা ভাষায় জাগরণমূলক অনেক কবিতা আছে, যা বিশ্বসাহিত্যে উল্লেখ করার মতো। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমরা এখনো আমাদের সাহিত্যকে অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছাতে পারিনি। তরুণপ্রজন্মকে এ কাজে এগিয়ে আসতে হবে।
তারেক আলি: কবিতা নিয়ে আপনার আগামীর পরিকল্পনা কী?
সায়ীদ আবুবকর: পরিকল্পনা অবশ্যই আছে। কিন্তু তা আমি এখনই প্রকাশ করতে চাই না। নবিনামার মতো বৃহৎ কিছু কাজ করতে চাই। দেখা যাক শেষ করতে পারি কিনা।
তারেক আলি: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
সায়ীদ আবুবকর: ধন্যবাদ তোমাকেও।