ছড়া-কবিতায় লোকউপাদান

আশরাফুল হক পলাশ

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে ছড়াসাহিত্যচর্চায় যাঁরা নিরন্তর কাজ করছেন, ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ তাঁদের অন্যতম। তাঁর এ পর্যন্ত লেখা ছড়াগুলোর মধ্যে থেকে মাত্র কয়েকটি বিষয়ভিত্তিক ছড়া নিয়ে আলোচনা এ নিবন্ধের বিষয় প্রেক্ষিত। বাংলায় কতদিন আগে ছড়াসাহিত্যের উদ্ভব হয়েছে, তার কাল নিরূপণ সহজ নয়। তবে আধুনিক ছড়াসাহিত্য উদ্ভবের পেছনে লোকছড়ার প্রভাব অনস্বীকার্য। আধুনিক ছড়ার পূর্বসূরি হিসেবে লোকছড়ার আবেদন চিরন্তন। বাংলাদেশের অজোপাড়াগ্রামে আজও লোকছড়ার চর্চা অব্যাহত রয়েছে। এ সমস্ত লোকছড়ায় হরেক বিষয় দেখা যায়। ঘুম পাড়ানির ছড়া, খেলার ছড়া, ধাঁধার ছড়া, জীব জন্তুর ছড়া, কিস্সা- কাহিনীর ছড়া, আমকুড়ানোর ছড়া, বউয়ের ছড়াসহ হাজার রকমের লোকছড়ার সন্ধান পাওয়া যায় বাংলা লোকছড়া সাহিত্যে। এ সমস্ত ছড়ার শিল্পগুণ, শব্দ ও ছন্দের বিন্যাসভাবের মাধুর্যতা, সুরের তন্ময়তা, দ্যোতনা এবং ব্যঞ্জনা অপরিমেয় অলঙ্কার অবাক বিস্ময়ের ব্যাপার। গ্যেটে বলেছেন-Flok song is the mother of poetry’ অর্থাৎ ‘লোক সঙ্গীত হলো কবিতার জননী।’ কাজেই লোকছড়াই হলো আধুনিক ছড়ার উদ্ভবের ক্ষেত্র তা সহজেই অনস্বীকার্য। কেননা, কারো কারো মতে ছড়াও এক ধরনের কবিতা।

আধুনিক ছড়াসাহিত্যচর্চায় হরেক প্রসঙ্গ যুক্ত হয়েছে অনিবার্যভাবে। যোগীন্দ্রনাথ সরকার থেকে শুরু করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, উপেন্দ্র কিশোর রায়, সুকুমার রায়, সত্যেন্দ্র নাথ দত্ত, অন্নদা শঙ্কর রায়, বন্দে আলী মিয়া, মঈনুদ্দীন খান, যতীন্দ্র মোহন বাগচী প্রমুখ প্রোথিতযশা কবিগণ নিজস্ব ঘরানায় ছড়া রচনা করে আধুনিক ছড়া সাহিত্যচর্চার পথকে সত্যিকারভাবে উন্মুক্ত ও সুগম করেছেন।

১৯৪৭ এ দেশবিভাগ এবং ১৯৭১ এ মহান মুক্তিযুদ্ধের পর এদেশের ছড়া সাহিত্যচর্চা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ দেশের ছড়াকারগণও উদ্দীপ্ত হয়েছেন আধুনিক ছড়াসাহিত্যচর্চায়। যুগ পরিবর্তনের সাথে সাথে ছড়ারও আঙ্গিক পরিবর্তন হচ্ছে। বর্তমানে ছড়ায় লক্ষ্য করা যাচ্ছে দেশ-কাল এবং সমাজের নানাচিত্র। কাজেই বর্তমানের ছড়ায় শুধুমাত্র ছোটদের মনোরঞ্জনই নয়, কোনো কোনো ছড়ায় লক্ষ্য করা যাচ্ছে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ, রাজনৈতিক বিষয় যথেষ্টভাবে বক্তব্যভিত্তিক। অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক ছড়া এখন সমাজ গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। সুতরাং বলা যায়, বর্তমান কালের ছড়া শুধুমাত্র শিশুতোষ, নৈসর্গিক বা প্রকৃতি নির্ভর নয়- রাষ্ট্র, সমাজ ধর্ম, সংস্কৃতি সকল ক্ষেত্রেই ছড়া এখন গৌরবের ভূমিকা পালনে সমর্থ।

এ প্রসঙ্গে আমরা সাম্প্রতিক কালের অন্যতম আলোচিত ছড়াকার মাহফুজুর রহমান আখন্দের ছড়ার কতকবিষয় নিয়ে আলোচনা করবো। মাহফুজুর রহমান আখন্দ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন না, ছিলেন ইতিহাসের মতো কঠিন বিষয়ে শিক্ষানবীশ। পরবর্তী কালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের লব্ধ প্রতিষ্ঠিত শিক্ষক এবং গবেষক। অথচ তিনি কাব্য তথা রাঢ় ভান্ডারে রত্ন সংযোগ করতে তৎপর রয়েছেন।

নদীমাতৃক বাংলাদেশ বিল, ঝিল ও হাওড়ের দেশ। আর সেই সমস্ত বিল ঝিল হাওড় আর নদীতে বিচরণ করে পর্যাপ্ত জলজ প্রাণীদের মধ্যে নানা জাতের মৎস্যকুল। সে সমস্ত মৎস্যকুল আবহমান কাল যাবত বাঙালির শুধুমাত্র খাদ্য তালিকায় নয়- রসনাতৃপ্তির পরিপূর্ণ উপাদান। প্রবাদ আছে ‘মাছে ভাতে বাঙালি’।

আলোচ্য ছড়াকার মাহফুজুর রহমান আখন্দ সেই জলজ ভূমি তথা বিল, ঝিল, হাওড় এবং নদীতে বিচরণরত মৎসকূলকে আবহমান বাংলার লোকজ নামেই ছড়া ছন্দে গ্রন্থিত করেছেন; তাতে ছড়াগুলো হয়ে উঠেছে জীবন্ত গ্রামবাংলার শাশ্বত রূপের প্রতিফলন। এই সমস্ত লোকজ নামের মাছগুলো হচ্ছে, ‘কৈ, মাগুর, শিং, টাকি, বোয়াল, খলসে, পুঁটি, গজাড়, গুঁচি, দাঁড়ক্যা, ইলিশ, কাতলা, টেংরাসহ ফুল-পাখি, নদী, মাছ, বাঁশ মাঠ এবং ফল ফসলের কথা, মেঘের কথা, বৃষ্টির কথা- এক কথায় তাঁর ছড়ায় উঠে এসেছে দেশ, মাটি, মানুষ এবং জীবন ও প্রকৃতির কথা। তাঁর প্রকৃতি নির্ভর একটি ছড়া ‘বউ সেজেছে বউ’। এই ছড়াটিতে তিনি ফুল, ফসল, মাছ এবং পতঙ্গ একটার সঙ্গে আরেকটি মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন অপূর্ব কৌশলে। যেমন তিনি লিখেছেন-

বকুল গোলাপ হাস্না হেনা/ নতুন ধানে মউ

পদ্মকুঁড়ি ঘোমটা টেনে/ বউ সেজেছে বউ।

ছড়াকার মাহফুজুর রহমান আখন্দ পদ্মকুঁড়িকে বউ সাজিয়ে তার সখি শাপলা কুঁড়িকে সে বউয়ের কানে ঝুমকা রূপে দুলিয়েছেন। এবং তা দেখে মৌমাছিরা গুনগুনিয়ে হারমোনিয়ামে ‘সা রে গা মা’ গলা সাধছে। মৌমাছিদের সুরের তন্ময়ে খুকু যখন নাচতে লেগেছে, তাদের সে অপূর্ব নাচ দেখার জন্য শাপলা আর পদ্মবন থেকে খলসে, পুটিরা উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে যেমন-

বউয়ের সখি শাপলা নাচে/ পাপড়ি দোলে কানে

মৌমাছিরা গুনগুনিয়ে/ সুরের বেতার আনে

সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি-সা/ তা তৈ নাচে খুকি

খলসে, পুটি মাগুর, টাকি/ মারছে উঁকি ঝুঁকি।

  • [মামদো তূতের ছাও]

গ্রাম প্রধান বাংলাদেশ। গ্রামবাংলায় আবহমান কাল যাবত আমাদের শিশুরা সুযোগ পেলেই বনভোজনের আয়োজন করে কোনো ভর দুপুরে, কোনো দিঘির পাড়ে, আম-কাঁঠালের তলে। শিশুদের অফুরন্ত মুক্তমন, গ্রামবাংলার শাশ্বত লোক উপাদান নিয়ে আয়োজন হয় ছোটদের এই লোক উৎসব। এ উৎসবের উপকরণগুলোও বিচিত্র রকম; ঝরেপড়া শুকনো কাঁঠাল পাতা, ইটের গুড়ো, কাদামাটি, হরেক রকম খেলনাপাতি। ছোটদের মধ্যেই কেউ হয় দোকানি, কেউ ক্রেতা আবার কেউ রাঁধুনি। এ রকম হরেক রকম লোকজ উপাদান নিয়েই অনুষ্ঠিত হয় বনভোজন বা চড়ুইভাতি।্ ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দের ছড়ায় এরকম একটা লোক উপাদানের গন্ধ পাওয়া যায়। তবে ছড়াটিতে সুকৌশল রাজনৈতিক নেতাদের চরিত্রও বিশে¬ষণ করেছেন। তিনি লিখেছেন-

খেলনা পাতি চড়ুইভাতি/ ইটের গুড়ায় হলদি,

শুকনো পাতায় টাকার বাহার/ বাজার আনো জলদি।

কাতলা-ইলিশ-মাগুর আনো/ মুরগি খাশি-আন্ডা

আমার খাওয়ায় চোখ লাগালে/ লাল সাজোয়া ডাঙ্গা!

[হাল চাষুয়া পরে; ছড়ামাইট, পৃ: ১২১।]

আবহমান বাংলা, প্রকৃতির লীলা নিকেতন। প্রকৃতি বাংলাকে দিয়েছে তার অপরিমেয় রূপ ঐশ্বর্য। প্রকৃতির এই শাশ্বত রূপ ছড়িয়ে আছে তার নানা রকম উপাদানের অরতে পরতে। ধূসর-নীল উদাম আকাশে কখনো জমাট মেঘের হুড়োহুড়ি, বৃষ্টি ধারার সাথে মুক্ত হাওয়ার মাতামাতি, অবারিত দিগন্ত কিশোরীর মতো ধানক্ষেত কিম্বা নতুন ধানের মৌ মৌ গন্ধে মাতাল উঠোন। রাখাল ছেলের ঝাকড়া চুলের সাথে কিষান বধূর মেঘলা খোপায় শালুক ফুলের মেলবন্ধন বাঙালির নিত্য সঙ্গি। জষ্টি মাসে যখন গাছে গাছে আম-তেঁতুলের হাস্যোজ্বল উপস্থিতি তখন গুড়ুম গুড়ুম শব্দে হুড়মুড়িয়ে মেঘের দল বৃষ্টি নিয়ে উপস্থিত হয় দোরগোড়ায়। প্রবাদ আছে- ‘আমে ধান/তেঁতুলে বান।’ তখন রাখাল ছেলে তার বাঁশি ফেলে, গান ভুলে গোলায় ধান তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামে গ্রামে তখন শোর পড়ে যায়। ফসলের আবাহনে-কিষাণ বধূর হাতে নতুন ধানের ‘চিড়া-মুড়ি’র আস্বাদনে। এই তো বাঙালি জনজীবনের চিরন্তন রূপ। আবহমান বাঙালির লোকজ জীবন চর্চা। সংস্কৃতির সাথে জীবনের সম্পৃক্ততা। এ সবই প্রাধান্য পেয়েছে মাহফুজুর রহমান আখন্দের ‘গাঁও গেরামের ছড়া’র ছন্দে। তাঁর এ ছড়াটিতে আবহমান গ্রামবাংলার শাশ্বত রূপের মধুরতা অবলোকিত হয়। ছড়াকার মাহফুজুর রহমান আখন্দ তাঁর শিল্পিত মননে, প্রাণের ছোঁয়ায় নানান রঙের আল্পনা এঁকেছেন, দক্ষ শিল্পীর মতো। ‘গাঁও গেরামের ছড়া’টি তাই হয়ে উঠেছে বিমূর্ত রূপকল্পের এবং ভাব, ভাষা তথায় স্বর-ধ্বণির ব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধ। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এ ছড়াটির অনুক্রমিক বর্ণনা প্রকৃতি নির্ভর, ছন্দপতনহীন দোলা ছোটদের মুগ্ধ করবে নিঃসন্দেহ। গাঁও গেরামের ছড়া’র উপমা, উৎপ্রেক্ষা এবং অসাধারণ চিত্রকল্প লক্ষ্য করা যায়-

পূবাল হাওয়া দোল দিয়ে যায়/ধানক্ষেতে

মেঘের ছায়া পাগলপারা/গান গেতে

রাখাল ছেলের মাথায় দ্যাখো/ ঝাঁকড়া চুল

কিষাণ বধূর মেঘলা খোপায়/শালুক ফুল

বাঁশের বাঁশির সুরে বাজে/মধুর গান

নতুন ধানের চিড়া-মুড়ি /বধূর দান

ধান কেটেছে মৌ মৌ তাই/ /উঠানটায়

মেঘ ডেকেছে গুড়ুম গুড়ুম/তুফান বায়

বিষ্টি আসে/জষটি মাসে

আম কান্দে/তেঁতুল হাসে

পাড়ায় পাড়ায় শোর পড়েছে/ধান তোলার

রাখাল ছেলের এই তো সময়/গান ভোলার।

[গাঁও গেরামের ছড়া; ধনচে ফুলের নাও পৃ. ৮-৯]

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ এর অন্য ছড়াগুলোর মধ্যে ‘মাতবর বোয়াল, হায়রে টিপাইমুখ, ঠেলা-অলা সরকার, ধনচে ফুলের নাও, মাছের আন্দোলনে, শেয়ালের ছা এবং লিমেরিক-শরৎ’ প্রভৃতি উলে¬¬খযোগ্য। এ ছড়াগুলো শুধু শিশুতোষ বা প্রকৃতিনির্ভর নয়। কোনো কোনো ছড়াতে রাজনৈতিক গন্ধ যেমন পাওয়া যায় তেমনি ছড়াগুলো বাস্তব ও বক্তব্যভিত্তিক। তাছাড়াও প্রায় প্রতিটি ছড়াতেই উঠে এসেছে বাংলার গ্রাম, নদী, বিল-ঝিল, হাওড়, আর নানা জাতের মাছের কথা। চিরন্তন বাংলা ধানের দেশ এবং গানের দেশ। তাই ছড়াগুলোতে অবধারিতভাবে গ্রামের কথা, গ্রামের প্রকৃতির কথা বেশি বেশি প্রধান্য পেয়েছে। গ্রাম বাংলার শিশু-কিশোরদের কথা, তাদের আবাল্য স্বপ্ন-সাধের কথা- যেমন বড়শি হাতে বিকেলে মাছ ধরবার কথা, বর্ষা বিদায়ের পর কোনো নয়নজুলিতে পানি সেচে মাছ ধরবার উৎসবে কাদা মেখে ভুত সাজার কথা- এ সবই তো পরিদৃশ্যমান হয় তাঁর সাম্প্রতিককালের ছড়াগুলোতে। এ প্রসঙ্গে তাঁর ‘শরৎ’ নামের একটি লিমেরিক- বর্ষার শেষে ধান ক্ষেতে কাঁদা ঘেটে, ভূত সেজে ছোটরা মাছ ধরবার উৎসবে মেতে ওঠে- সে কথা সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে-

বান বিদায়ী ধানের ক্ষেতে মাছের মেলা

কিম্বা ঝিলে বড়শি হাতে বিকেল বেলা

মাছ হাতানো উৎসবে

কাদা মেখে ভূতসবে

দিন বদলের ব্যস্ত সময়-মজার খেলা।

  • [ধনচে ফুলের নাও, পৃ. ৪]

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ একজন প্রতিষ্ঠিত ছড়াকার। সাম্প্রতিককাল পর্যন্ত তিনি অবিরাম লিখছেন এবং লিখেছেন বেশ কিছু উৎকৃষ্ট ছড়া। কবি খান মুহাম্মদ মঈন উদ্দীনের ‘ঐ দেখা যায় তালগাছ’ ছড়াটিতে কানাবগীর ছা পান্তা ভাতের পরিবর্তে পুঁটি মাছ খাওয়ার লোভ মামলাতে পারে না, কিন্তু মাহফুজুর রহমান আখন্দের ‘শেয়ালের ছা’ ছড়াটিতে বগী যখন পুঁটি মাছ ছেড়ে কাঁটা-অলা টেংরা খাওয়ার লোভে পড়ে, তখন তার টেংরা মাছের কাঁটার বিষে মরনদশায় নিপতিত হয়। গ্রামাঞ্চলে প্রবাদ আছে ‘লোভে পাপ, পাপে বিনাশ।’ আলোচ্য ছড়াকার মাহফুজুর রহমান আখন্দের ছড়া ‘শেয়ালের ছা’ একটি সরস হলেও শেষ পঙক্তি দুটিতে সে চিত্রই ফুটে উঠেছে। ছড়াটি নিম্নরূপ-

শাপলা ফোটা তেলেন গাঁ/ এক শেয়ালের তিন ছা

শেয়াল ডাকে হুক্কা হুয়া/ তাইতে হাসে কাকাতুয়া

কাকাতুয়ার মাথায় ঝুঁটি/ খাচ্ছে বগি খলসে পুঁটি

ট্যাংরা মাছ ধরছে/ কাঁটার বিষে মরেছে।

  • [শেয়ালের ছা, ধনচে ফুলের নাও; পৃ. ১০]

ছড়াকার মাহফুজুর রহমান আখন্দের সাম্প্রতিক কিছু ছড়াতে অতি সূক্ষ্মভাবে বর্তমান সময়ের কিছু চালচিত্রের বিষয় ফুটিয়ে তুলেছেন। আমাদের দেশের জোটবদ্ধ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কিম্বা যৌথ ব্যবসা বাণিজ্য প্রভৃতিতে লাভের চাইতে ক্ষতিই যে বেশি হয়, এই কথাটিই বলতে চেয়েছেন। স্বরবৃত্ত ছন্দে লেখা ছড়াটি অতি সাম্প্রতিক সময়ের বাস্তব প্রেক্ষাপট নিহিত-

সুমির বাবু কুমির পোষে/ বাপপি পোষে হাঁস

আমির সোহেল সেই পুকুরে/ করলো মাছের চাষ।

মাছ কুমিরে বন্ধু হলো/ বিপদ হলো হাঁসের

মাছও গেল হাঁসও গেল/ খবর সর্বনাশের।

  • [চাষের ছড়া; ধনচে ফুলের নাও, পৃ. ৬]

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ জন্মগ্রহণ করেছেন গ্রামে। তিনি আশৈশব এবং আবাল্য সময়কাল লালিত হয়েছেন গ্রামের মাটি, জল আর মুক্ত বাতাসে। প্রাথমিক পর্যায়ের তাঁর শিক্ষানৈবিশকতা গ্রামের মক্তবে, প্রাইমারী স্কুলে, মাদরাসায়। এতদকারণে তিনি আবাল্য দেখেছেন গ্রামের সেই নৈসগিক রূপ, শুঁকেছেন গ্রামের সোঁদা মাটির গন্ধ, ফুল, ফল এবং ফসলের সুঘ্রান। দেখেছেন, প্রকৃতির নিবিড় লীলা-উৎসব। তাঁর জন্মভূমি শ্যামপুর গ্রাম আর গ্রামের পাশে তেলিয়ান বিলের নিসর্গের নিখুঁত ক্যানভাসে আঁকা সবুজের সমারোহ-আদিগন্তব্যাপি ধূসর নীল-আকাশ। পাখিদের অবাধ বিচরণ; সেই চিরচেনা বিহঙ্গ হলো-‘শাদা শাদা বক, মাছরাঙা আর রকমারি হাঁসদের দল। তিনি তন্ময় হয়ে শুনেছেন ডাহুকের একটানা রব, রাখালের বাঁশি ভাটিয়ালি সুরের সাথে মিলে মিশে একাকার। তেলিয়ান বিলে জেলেদের মাছ ধরা জেলেডিঙি, পূবাল হাওয়ায় ‘শাপলা পদ্মবুকে হাসে খিলখিল’। ছড়াকার মাহফুজ রহমান আখন্দ তাঁর জন্মভূমি শ্যামপুর গ্রামের পাশের এই ‘তেলিয়ান বিলকেই ‘সোনার বিল’ অভিধায় চিহ্নিত করেছেন। সত্যি কথাই তো, আমাদের বিলাঞ্চলেই রয়েছে বাঙালির অর্থনৈতিক মুক্তির চাবিকাঠি, সম্পদের প্রাচুর্যময় ক্ষেত্র। বিস্তীর্ণ বিলের অগাধ জলসম্পদ, নানাজাতি জলজ উদ্ভিদ, মৎস্য সম্পদ আর শালুকের খনিজভূমি। হরেক রকম পাখ-পাখালী, শাপলা-পদ্ম কৌমুদীর অপরূপ শোভায় মণ্ডিত এই বিলই তো বাংলার প্রাণ, বাঙালির আবহমান জীবনযাত্রার অনন্য মাধ্যম। কাজেই ছড়াকার মাহফুজুর রহমান আখন্দ এই ‘সোনার বিল’ দেখার জন্য আমন্ত্রণ করেছেন। অন্য কথায় বাংলার সমস্ত বিল তথা জলসম্পদকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বলেছন-

‘শ্যামপুর গাঁ পাশে তেলিয়ান বিল/শাপলা-পদ্ম বুকে হাসে খিলখিল। মাছরাঙা ঝুপ ঝুপ ডুবে দেয় জলে/ছেলে-মেয়ে সাঁতরায় শাপলার ছলে। শাদা শাদা বক ওড়ে শাদা ডানা মেলে/ নাও আর জাল নিয়ে মাছ ধরে জেলে। ডাহুকের ডাক শুনে জুড়ায় পরান/ দুই তীরে রাখালের ভাটিয়ালী গান। সবুজের সমারোহ আহা দুই কুলে/ পুবাল হাওয়ার তালে নাচে দুলে দুলে। প্যাঁক প্যাঁক ডাকে কত রকমারি হাঁস/কেবা জানে বিলে কত পাখির আবাস। এমন সোনার বিল নেই বুঝি আর/এমন সুখের গাঁ খুঁজে পাওয়া ভার। এই গাঁয়ে এলে আর যেতে নাহি চাবে/ যত কিছু মনে চায় সব কিছু পাবে। দাওয়াত রইলো তোমার এই গাঁয়ে যেতে/ সুন্ধী শালুক দেব মজা করে খেতে। ভাত মাছ সব দেব ভুল বুঝ না/একলা এসো না যেন এসো দু’জনা।’ (সোনার বিল, ধনচে ফুলের নাও- পৃ.৭)

ছড়াকার মাহফুজুর রহমান আখন্দ শুধুমাত্র প্রকৃতি নির্ভরই নয়, কঠিন বাস্তবমুখী ছড়াও লিখেছেন। তাঁর ছড়ায় উত্তরবঙ্গ তথা পদ্মা-মেঘনা পাড়ের জনজীবন যে হুমকীর মুখোমুখী দাঁড়িয়ে মৃত্যুর প্রহর গুণছে, ‘টিপাই মুখ’ এর বাঁধের কারণে বৃষ্টিবিহীন শুস্কতায় আমাদের সম্পদসমূহ তথা বনজ সম্পদ, কৃষি সম্পদ, মৎস্য সম্পদসহ প্রাণী ও জলসম্পদ আজ ধ্বংসের করাল গ্রাসে নিপতিত মরুপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত, এ অবশ্যম্ভাবী তথ্য পরিবেশিত হয়েছে এই উপলব্ধি, জনজীবনের দুঃসহ পরিণতির সংবাদ চিত্রায়িত হয়েছে। তিনি লিখেছেন- শিমূল গোলাপ হাসনাহেনা/জুঁই-চামেলী-কেয়া/ সবার হাসি বন্ধ হলো/গুড়ুম গুড়ুম দেয়া। শুস্ক ঝড়ো হাওয়া/বৃষ্টি কোথায়? রোদের মিছিল/বালির পরশ পাওয়া। পদ্মা হলো শেষ/ মাছে ভাতে বাঙালি আর/ নয়তো সবুজদেশ। হায়রে টিপাইমুখ/রাজার মুখে আনলি হাসি/মেঘনা পাড়ে দুখ। (হায়রে টিপাইমুখ; ছড়ামাইট, পৃ. ১১৩।)

ছড়াকার মাহফুজুর রহমান আখন্দ প্রকৃতির নানারকম বিষয় নিয়ে তাঁর ছড়ায় ছন্দোবদ্ধ করেছেন। আবহমান বাংলায় বাঙালির চিরন্তন জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পৃক্ত নানা উপাদান ও উপকরণের একটা নিখুঁত চিত্রের সন্ধান পাওয়া যায় তাঁর ছড়াতে।

এই কারণে তাঁর ছড়াগুলো হয়েছে লোকজজীবন ঘনিষ্ঠতায় সমৃদ্ধ। এছাড়াও তার ছড়াতে লোক উপাদান লক্ষ্য করা যায়; যেমন- জষ্টির বৃষ্টিতে ছেলে-বুড়োদের আমকুড়ানো, বড়শি হাতে মাছ ধরা, চড়ুইভাতি, ‘ঠেলা অলা সরকার’ ছড়ায় ‘ঠেলা অলার জীবন সংগ্রামে রত থাকা, রাখাল ছেলের গান ভুলে, বাঁশি ফেলে বৃষ্টি আসার সময় ফসল সংগ্রহের প্রাণান্তকর চেষ্টা, খলসে, পুঁটি, মাগুর, টাকি প্রভৃতি মাছের লোকজ নাম, ফুল পাখিদের সমারোহ -বাঙালির লোকজীবন চর্চার অনন্তরূপেই পরিস্ফুটিত এবং তা আমাদের ছড়ার ভাণ্ডারে বাড়তি সংযোগ তা বলার অপেক্ষা রাখে না ।

আলোচ্য ছড়াকার ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর শিক্ষা কার্যক্রম ও গবেষণায় সংশি¬ষ্ট ও ব্যস্ত থেকে আমাদের যান্ত্রিক জীবন যেখানে কলুর বলদের মতো ঘানি টানতে অভ্যস্ত এই কঠিন দুঃসময়ে ছোটদের নিয়ে তিনি নিরন্তর ভাবছেন। সেইসঙ্গে বিজ্ঞানচর্চার নামে আমাদের পণ্ডিতসমাজ যখন আমাদের এই সমস্ত প্রাকৃতিক ও লোকসম্পদের নামসমূহ বিদেশীদের দেয়া নামে চিহ্নিত করতে সাড়ম্বরে রত, সেই সময়ে ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ বাঙলা এবং বাঙালির প্রকৃতির নানা উপাদান ও লোকসম্পদের লোকজ নাম তাঁর ছড়াগুলোতে অবলীলায় ব্যবহার করেছেন এ জন্য তাঁকে অকৃত্রিম সাধুবাদ।