পান্থজন জাহাঙ্গীর
কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র, যিনি “বিদ্রোহী কবি” নামে যুগযুগান্তরে পরিচিত। তাঁর কলমে সমান শক্তিতে ফুটে উঠেছে বিদ্রোহ, প্রেম, মানবতা, প্রকৃতি, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতার অটুট বাণী। তিনি ছিলেন কবি, সংগীতজ্ঞ, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, সাংবাদিকÑএক বহুমাত্রিক প্রতিভা। বাংলার গণজাগরণে তাঁর কবিতা যে অগ্নিশিখার ভূমিকা পালন করেছে, তেমনি তাঁর গানে ফুটে উঠেছে মরমি সুর ও মানবিকতার গভীরতা। দারিদ্র্য, বৈষম্য ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে তাঁর তীব্র প্রতিবাদ যেমন শব্দে প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি প্রেম, আনন্দ ও প্রকৃতির বর্ণনায় তিনি হয়ে উঠেছেন কোমল ও স্নিগ্ধ শব্দশিল্পী। নজরুল বাংলা সাহিত্যে এক অলৌকিক শক্তিÑযিনি বিদ্রোহে যেমন দুর্বার, তেমনি অনুভূতিতে অশেষ মানবিক। এই প্রবন্ধে তার তিনটি শীত বিষয়ক কবিতার আলোচনার প্রয়াস পাচ্ছি।
কাজী নজরুল ইসলামের শীত-নির্ভর কবিতাগুলোতে শীত শুধু ঋতুরূপে আসে নাÑসে আসে জীবন, প্রকৃতি, বিচ্ছেদ, স্মৃতি এবং মানবিক আবেগের বহুবর্ণ ছায়া হয়ে। তাঁর তিনটি কবিতায় ( ‘‘পৌষ,’’ ‘‘শীতের সিন্ধু ’’, “একী হাড়-ভাঙা শীত এল মামা”) শীত যেন তিন ভিন্ন চরিত্রÑকখনো করুণ সন্ন্যাসী, কখনো বেদনাবাহী পথিক, আবার কখনো দুষ্টু-কৌতুকপ্রিয় নির্দয় ঝড়।
“পউষ এলো গো!”Ñএই ডাকেই শুরু হয় শীতের প্রথম রূপ। পউষ যেন ঘন কুজ্ঝটিকার ঘোমটা পরে আসে, “অশ্রু’-পাথার হিম পারাবার পারায়”Ñএই পঙক্তিতে শীতের আগমনে জমে ওঠা নিস্তব্ধতার ছবি ফুটে ওঠে। পাতায় পাতায় বিদায়-ব্যথা কাঁদে, যেন ঋতুর পালাবদলে প্রকৃতিই কাঁদছে। সন্ধ্যাতারার দীপ হারায়, অস্তবধূ মলিন চোখে তাকিয়ে থাকেÑএই সবই শীতকে করে তোলে বিষাদের আগন্তুক। বছরের “শ্রান্তি-পথের কালের আয়ু-ক্ষয়” যেন মানুষের নিজের জীবনের ক্ষয়ের সঙ্গেও মিলে যায়। শীত তাই শুধু প্রকৃতিতে আসে নাÑসে মানুষের মনেও নেমে আসে বিদায়ের নিশ্বাস হয়ে।
অন্যদিকে, “শীতের সিন্ধু” কবিতায় শীত হয়ে ওঠে স্মৃতি ও চিরন্তন বেদনার প্রতীক। কবি ফিরে আসেন সেই তীরে যেখান থেকে এক সময়ে সব হারিয়ে গিয়েছিলেনÑ“সকলই হারায়ে গেল তব বালুচরেÑ/ ঝিনুক কুড়াতে এসেÑগেল আঁখি ভরে।” শীত এখানে হারানো সম্পর্ক, হারানো সময় এবং মনোজগতের এক নির্জন সাগর। বন্ধুকে বলা প্রশ্নÑ“চিনিতে পার কি বন্ধু, মনে তারে পড়ে?”Ñশীতকে করে তুলেছে অতীতের কাছে ফিরে যাওয়ার পথ। মানুষের মন, পোড়া মহাশ্মশানের মতোÑযে স্মৃতি একবার নিভে গেছে, সে কি সত্যিই ফিরে আসে? শীত এই কবিতায় যেন হারানো মণির খোঁজে ব্যাকুল মানুষ, এক অনন্ত প্রত্যাবর্তন। কিন্তু নজরুল শুধু শীতের বেদনা আঁকেননিÑতিনি এঁকেছেন তার কৌতুকমিশ্রিত নির্মমতাও।
“একী হাড়-ভাঙা শীত এল মামা” কবিতায় শীত যেন দুর্মর খলনায়ক। “যেন সারা গায়ে ঘষে দিচ্ছে ঝামা”Ñএই পঙক্তিতে শীতের দংশনকে রসিকতার ধারায় তীক্ষèভাবে চিত্রিত করেছেন। কাঁপতে থাকা মানুষ, লেপের নিচে কুঁজো হয়ে থাকা দুঃখী প্রাণ, গিন্নির ধামা দিয়ে ঢেকে দেওয়াÑসবই শীতকে কমিক অথচ বাস্তব এক অভিজ্ঞতা বানায়।
শীত এখানে ভীতিকর হলেও হাস্যরসের আতিশয্যে তার কঠোরতা কোমল হয়। “হাঁড়িতে চড়িয়ে আমায় উনুনে রাখো”Ñএই অতিরঞ্জন শীতের নিষ্ঠুরতাকে ব্যঙ্গ করে, আবার মানুষের অসহায়ত্বকেও তুলে ধরে।
এই তিনটি কবিতা মিলিয়ে শীত যেন মানুষের জীবনের তিন অধ্যায়Ñবিষাদ, স্মৃতি, আর সংগ্রামী হাসি। কখনো শীত অবচেতনের ম্লান আলো, কখনো হারানো ভালোবাসার সাগর, আবার কখনো শারীরিক দুঃসহ ঠান্ডার হাহাকার। নজরুলের শীত-রূপ তাই বহুমাত্রিকÑমানুষ, প্রকৃতি, সময়Ñসবকিছুকে ছুঁয়ে যায়। শীতের এমন সমৃদ্ধ রূপকল্প বাংলা কবিতায় নজরুলেরই বিশেষ দান। এই তিন রূপের ভেতর দিয়েই নজরুল আমাদের শিখিয়েছেন, ঋতু যেমন বদলায়, তেমনি বদলায় মানুষের অনুভূতির ঢেউÑশীত তাই একই সঙ্গে কাঁদায়, ভাবায়, আবার হাসায়ও।